বাংলাদেশে গত ১৫ বছরের দুঃশাসন থমকে যায় দুই হাত প্রসারিত আবু সাঈদ, রাজপথে নিথর ইয়ামিন, মুগ্ধসহ শত শহীদের নিঃসংকোচ আত্মত্যাগ ও সহস্র আহতের আর্তনাদে।
ফ্যাসিস্ট শাসন এ দেশের মানুষকে যে গভীর খাদে ফেলে যায়, সেই ক্ষত সারাতে এক অভূতপূর্ব জাতীয় ঐকমত্যের সৃষ্টি হয়। জনগণ পৌঁছে যায় নতুন এক উচ্চস্তরে প্রবেশের সন্ধিক্ষণে। সৃষ্টি হয় এক দুর্বার আকাঙ্ক্ষার।
কঠিন এই যাত্রার দায়িত্ব নেন বিশ্ববরেণ্য নোবেলজয়ী ড. ইউনূস এবং অন্য সদস্যরা। আজ যে পথ তাদের অতিক্রম করতে হচ্ছে, তা অত্যন্ত অমসৃণ এবং তাতে ছড়ানো আছে ১৫ বছরব্যাপী পুঁতে রাখা অজস্র কাঁটা। একদিকে রয়েছে রাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গে নিয়োজিত অনুগত ব্যক্তিরা, অন্যদিকে আছে ১৫ বছরে পরিপুষ্ট হওয়া দলীয় অপশক্তি। যেকোনো সময় এই কাঁটার আঘাতে থমকে যেতে পারে এই পথপরিক্রমা।
‘জুলাই বিপ্লব’কে বিপ্লব বলতে হয় এ জন্য যে, যেকোনো অভ্যুত্থানের মতো এটি শুধু শাসক বদলের জন্য সংঘটিত হয়নি; বরং এর মূল লক্ষ্য হচ্ছে রাষ্ট্রব্যবস্থাকে পরিবর্তিত করে ভিন্ন এক জায়গায় প্রতিস্থাপন করা। যেখানে মানবাধিকারের নিশ্চয়তা, বিচার পাওয়ার অধিকার, ভোটাধিকার, নতজানু পররাষ্ট্রনীতির পরিহার, ন্যায়ভিত্তিক বৈষম্যহীন এক রাষ্ট্র গঠন করা যায়। সর্বোপরি প্রচলিত যে, সংবিধান নাগরিকের আকাঙ্ক্ষা পূরণের বদলে ব্যক্তির অশুভ আকাঙ্ক্ষা পূরণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে, তাকে নাকচ করে এমন এক সংবিধান প্রণয়ন, যা সদ্য পরিত্যক্ত অপরাজনীতির চির-অবসান ঘটাতে পারে।
বিপ্লবের কয়েক মাসের মধ্যেই সেই পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা প্রতিস্থাপিত হতে দেখা যাচ্ছে নির্বাচনী আকাঙ্ক্ষায়। পরিলক্ষিত হচ্ছে রক্তস্নাত জুলাইয়ের অভিপ্রায় থেকে সন্তর্পণে বেরিয়ে আসার প্রবণতা। দুঃখজনকভাবে প্রশ্ন করা হচ্ছে এ সরকারের অধিকারের সীমাকে। ব্যালটে সিলের মাধ্যমে অর্জিত অধিকারের চেয়ে বিলিয়ে দেওয়া রক্তের উত্তরাধিকার যে উচ্চতর, সেই বোধের অভাব আজ অনেকের ভাষ্যে ফুটে উঠছে চারদিকে। তাই উচ্চতর অধিকারসম্পন্ন এই অন্তর্বর্তী সরকারকে আজ মোকাবিলা করতে হচ্ছে, জুলাই-বিপ্লবকে অনুবাদ করতে না পারা বিভিন্ন গোষ্ঠীর সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করতে না পারার বাধা।
এ সরকার জুলাই বিপ্লবের ফসল। বিপ্লবে অংশগ্রহণ ও অবদান রাখা দেশের লাখ-কোটি ছাত্র-জনতার সম্মতি ও সমর্থন এই সরকারের ভিত্তি। এই অভিনব সম্মতি ও সমর্থন ঝড় হয়ে এসেছে এবং বইছে। এই ঝড় ব্যালটের মাধ্যমে অর্জিত শক্তির চেয়েও শক্তিমান। এই ঝড়কে বইতে হবে। বইতে হবে তত দিন, যত দিন অপসারিত শক্তির অপকর্মগুলোর বিচার সম্পন্ন না হয়। এই ঝড়কে বইতে হবে তত দিন, যত দিন না পুরো জাতিকে এক করে এমন এক জায়গায় নিয়ে যায়; যেখান থেকে আর কখনো এমন অন্ধকার অতীতে ফিরে আসবে না দেশ। দুঃখের বিষয়, যে ব্যক্তি ও দল সীমাহীন দুষ্কর্ম ও নিপীড়ন চালিয়ে পালিয়েছে দেশ ছেড়ে; সেই ব্যক্তির বিচারের আয়োজন হলেও দলটির বিষয়ে করণীয় নির্ধারণে, সুবিবেচনাপ্রসূত কোনো সিদ্ধান্তে উপনীত হতে ব্যর্থ হয়েছে রাজনৈতিক দলগুলো। আত্মদানকারী আমাদের সন্তানদের ও শত শত পঙ্গু দৃষ্টিহারাদের কাছে এই ব্যর্থতার জবাব কী হতে পারে?
প্রফেসর ইউনূস ইতোমধ্যে ঘোষণা করেছেন, ‘এবারের নির্বাচন হবে দেশের ইতিহাসে সর্বকালের সেরা’। তিনি কি নিশ্চিত হতে পেরেছেন, দেড় দশকব্যাপী যে দলীয় প্রতীক ‘রাতকে দিন’ অথবা ‘দিনকে রাত’ করে শুধুই বিজয়ের নিশ্চয়তার প্রতীক হয়ে উঠেছিল; আগামী নির্বাচনের ব্যালট পেপারে সেই প্রতীক স্থান পেলে, সেই নির্বাচন শ্রেষ্ঠত্বের দাবি অর্জন করতে পারবে? ‘আত্মবিলাপ’ কবিতাই কবি মাইকেল মধুসূদন নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করে লিখেছিলেনÑ ‘কি ফল লভিলি? জ্বলন্ত-পাবক-শিখা লোভে তুই কাল ফাঁদে উড়িয়া পড়িলি… নারিলি হরিতে মণি, দংশিল কেবল ফণী; এ বিষম বিষজ্বালা ভুলিবি, মন, কেমনে!’ দেশের সমগ্র নির্বাচনব্যবস্থাকে বিষাক্ত করে ফেলা সেই দল ও সেই প্রতীককে বিলোপ করতে না পারলে সে ‘বিষম বিষজ্বালা’ ড. ইউনূস কি কখনো ভুলতে পারবেন?
মনে রাখা প্রয়োজন, অসংগঠিত জনগণ বারবার আসে না। তাই এই ঝড়েও একদিন ভাটা পড়বে। জনতা যে যার মতো ফিরে যাবে। ঐক্যের ফাটল গলিয়ে কোনো ফাঁকা জায়গা পেয়ে গেলে পালিয়ে যাওয়া শক্তি ফিরতে চাইবে আগের জায়গায়। একদিন হয়তো তারাই প্রশ্ন তুলবে এই অন্তর্বর্তী সরকারের বৈধতা নিয়ে। কী জবাব দেবে তখন এই প্রশ্নের?
‘বিটুইন টু ফায়ার্স’-এর মতো অর্ধেক সংবিধান বাঁচিয়ে রেখে, অর্ধেক সংবিধান উপেক্ষা করে এগোতে চাওয়া বুদ্ধিমানের কাজ নয়। এই অর্ধমৃত সংবিধান একদিন মূর্তমান আতঙ্ক হয়ে আবির্ভূত হতে পারে। এর সঙ্গে যুক্ত হতে পারে সুযোগের অপেক্ষায় থাকা এই ঝড়ের ঝাপটায় আহত বহিঃশত্রু।
এই বিজয়কে সংহত করতে, এই নতুন স্বাধীনতাকে কোনো আধিপত্যের হুমকি থেকে রক্ষা করতে; পারস্পরিক স্বার্থে নতুন বন্ধুর সন্ধান করতে হবে এবং প্রয়োজনে তাদের নিয়ে নতুন আঞ্চলিক (প্রয়োজনে সামরিক) জোট গঠনের উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।
সর্বোপরি ছাত্র-জনতা যেমন করে ৫ আগস্ট পর্যন্ত আগস্টকে জুলাই করে রেখেছিল এবং ৩৬ জুলাইয়ে চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করেছিল; তেমন করে তাদের আত্মত্যাগকে গণমানুষের স্মৃতির আকাশে পূর্ণিমার চাঁদের মতো উদ্ভাসিত রাখতে হবে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

