ভারতীয় উপমহাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন কিছু মতাদর্শ আছে, যা দীর্ঘকাল ধরে নীরবে লালিত হয়েছে এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) এবং তার মাতৃসংগঠন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (আরএসএস) হিন্দুত্ববাদী মতাদর্শ সেরকমই একটি রাজনৈতিক দর্শন, যা ভারতকে একটি হিন্দু রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখে এবং উপমহাদেশের বৃহত্তর ভূখণ্ডকে ‘অখণ্ড ভারত’ বা ‘বৃহত্তর ভারত’-এর ধারণায় একীভূত করার কল্পনা করে। এই মতাদর্শ বাংলাদেশের জন্য কেবল একটি তাত্ত্বিক উদ্বেগ নয়—এটি একটি ব্যবহারিক, ঐতিহাসিক এবং অত্যন্ত বাস্তব হুমকি।
হিন্দুত্ববাদের উৎস বুঝতে হলে ১৯২৩ সালে ফিরে যেতে হবে, যখন বিনায়ক দামোদর সাভারকার ‘হিন্দুত্ব’ নামক তার বিখ্যাত গ্রন্থটি রচনা করেন। সাভারকার যুক্তি দিয়েছিলেন, ভারত কেবল একটি ভৌগোলিক সত্তা নয়, বরং একটি সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় সত্তা এবং প্রকৃত ভারতীয় তারাই যাদের পিতৃভূমি ও পুণ্যভূমি উভয়ই ভারত। এই সংজ্ঞা অনুযায়ী মুসলমান ও খ্রিষ্টানরা প্রকৃত ভারতীয় নন, কারণ তাদের ‘পুণ্যভূমি’ অন্যত্র—মক্কায় বা জেরুজালেমে। এই মতাদর্শিক ভিত্তির উপর দাঁড়িয়েই ১৯২৫ সালে কেশব বলিরাম হেডগেওয়ার প্রতিষ্ঠা করলেন আরএসএস—এমন একটি সংগঠন, যার আদর্শগত মডেল ছিল ইতালির ফ্যাসিস্ট আন্দোলন। আরএসএসের প্রথম দিককার নেতারা ইতালির মুসোলিনি ও জার্মানির হিটলারের প্রতি প্রকাশ্যে সহানুভূতি প্রকাশ করেছিলেন। এমএস গোলওয়ালকার, আরএসএসের দ্বিতীয় প্রধান, তার ‘আমরা বা আমাদের জাতীয়ত্ব নির্ধারিত’ গ্রন্থে লিখেছিলেন, ভারতের মুসলমান ও খ্রিষ্টানদের হয় হিন্দু সংস্কৃতিকে গ্রহণ করতে হবে, অথবা নাগরিক অধিকার ছাড়াই এই দেশে বাস করতে হবে।
‘অখণ্ড ভারত’ বা ‘আখণ্ড ভারত’-এর ধারণাটি আরএসএস ও হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির কেন্দ্রীয় স্বপ্ন। এই ধারণা অনুযায়ী বর্তমান ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, ভুটান, মিয়ানমার ও আফগানিস্তানের একটি বড় অংশ নিয়ে একটি ‘বৃহত্তর হিন্দু রাষ্ট্র’ গঠন করা উচিত। আরএসএসের সদর দপ্তরে এবং বিজেপির বিভিন্ন অফিসে ‘অখণ্ড ভারত’-এর মানচিত্র সুস্পষ্টভাবে প্রদর্শিত হয়। এই মানচিত্রে বাংলাদেশকে ভারতের অংশ হিসেবে দেখানো হয়। এটি কোনো গোপন বিষয় নয়—এটি প্রকাশ্যে, গর্বের সঙ্গে এবং বারবার প্রদর্শিত একটি রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা। বিজেপির উত্থান ও ক্ষমতায় আসার পর থেকে এই মতাদর্শ কেবল সাংগঠনিক স্বপ্নে সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং ধীরে ধীরে রাষ্ট্রীয় নীতিতে রূপান্তরিত হয়েছে। ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে বিজেপি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় আসে এবং ২০১৯ সালে আরো বড় বিজয় অর্জন করে। এই দুই মেয়াদে এবং পরবর্তীকালে ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে যা ঘটেছে, তা ভারতের সাংবিধানিক ধর্মনিরপেক্ষতার ধারণাকে মৌলিকভাবে চ্যালেঞ্জ করেছে।
মুসলিম সংখ্যালঘুদের ওপর নিপীড়নের বিষয়টি এখন আন্তর্জাতিকভাবে দলিলকৃত। ২০০২ সালে নরেন্দ্র মোদি যখন গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন, তখন সেখানে সংঘটিত গুজরাট দাঙ্গা সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত সাম্প্রদায়িক গণহত্যার একটি অন্ধকার অধ্যায়। সেই দাঙ্গায় দুই হাজারেরও বেশি মুসলমান নিহত হয়েছিলেন, হাজার হাজার বাড়িঘর ও মসজিদ পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল এবং লক্ষাধিক মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছিলেন। তদন্তকারী সংস্থাগুলো সুস্পষ্টভাবে প্রমাণ করেছে, রাজ্য সরকারের প্রশাসনিক যন্ত্র এই দাঙ্গা ঠেকাতে ব্যর্থ হয়নি, বরং সক্রিয়ভাবে সহায়তা করেছিল। মসজিদ ভেঙে মন্দির নির্মাণের বিষয়টি ভারতে এখন একটি সুপ্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক কর্মসূচিতে পরিণত হয়েছে। সবচেয়ে বড় উদাহরণ অযোধ্যার বাবরি মসজিদ, যা ১৪৯২ সালে মোগল সম্রাট বাবরের আমলে নির্মিত হয়েছিল। ১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর আরএসএস ও বিজেপির সক্রিয় পৃষ্ঠপোষকতায় ২০ হাজারেরও বেশি করসেবকের একটি উন্মত্ত জনতা মসজিদটি ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয়। এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ভারতজুড়ে যে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়েছিল, তাতে দুই হাজারেরও বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছিলেন। ২০১৯ সালে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট একটি বিতর্কিত রায়ে সেই জমিটি রাম মন্দির নির্মাণের জন্য হিন্দু পক্ষকে দিয়ে দেয় এবং ২০২৪ সালে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নিজে সেই মন্দিরের উদ্বোধন করেন।
বাবরি মসজিদ কেবল সূচনা। ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে মসজিদ ভেঙে বা দখল করে মন্দির নির্মাণের দাবি উঠেছে। উত্তর প্রদেশের মথুরায় শাহি ঈদগাহ মসজিদ এবং বারাণসীর জ্ঞানবাপী মসজিদ নিয়ে মামলা চলছে এবং হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠীগুলো দাবি করছে, এই মসজিদগুলো ভেঙে হিন্দু মন্দির পুনর্নির্মাণ করতে হবে। ভারতে আরো তিন হাজারেরও বেশি মসজিদ সম্পর্কে একই দাবি করা হচ্ছে বিভিন্ন হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের পক্ষ থেকে। মসজিদ-মন্দির বিরোধের এই রাজনীতি কোনো বিচ্ছিন্ন ধর্মীয় বিতর্ক নয়—এটি একটি সুসংগঠিত রাজনৈতিক কর্মসূচি, যার লক্ষ্য মুসলিম ঐতিহাসিক উপস্থিতিকে ভারতীয় ভূখণ্ড থেকে মুছে দেওয়া। নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন বা সিএএ এবং জাতীয় নাগরিক নিবন্ধন বা এনআরসি এই রাজনৈতিক প্রকল্পের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ২০১৯ সালে পাস হওয়া সিএএ আফগানিস্তান, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ থেকে আসা হিন্দু, বৌদ্ধ, শিখ, জৈন, পার্সি ও খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বী শরণার্থীদের ভারতীয় নাগরিকত্বের সুযোগ দেয়, কিন্তু মুসলমানদের ইচ্ছাকৃতভাবে বাদ দেয়। এই আইনের ঘোষিত উদ্দেশ্য ছিল প্রতিবেশী দেশ থেকে আসা ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের সুরক্ষা দেওয়া; কিন্তু প্রকৃত উদ্দেশ্য ছিল ভারতের মুসলিম জনগোষ্ঠীকে নাগরিকত্বহীন করার একটি আইনি কাঠামো তৈরি করা। আসামে এনআরসি প্রক্রিয়ায় প্রায় উনিশ লক্ষ মানুষ নাগরিক তালিকা থেকে বাদ পড়েছেন, যাদের অধিকাংশই বাংলাভাষী মুসলমান।
বাংলাদেশের প্রতি বিজেপির মনোভাব ও কৌশল বোঝার জন্য কিছু ঐতিহাসিক ও সাম্প্রতিক ঘটনা বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। বিজেপি ও আরএসএস নেতারা বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশকে ‘মুসলিম অনুপ্রবেশকারীদের’ উৎস হিসেবে চিত্রিত করেছেন এবং ভারতীয় রাজনৈতিক প্রচারণায় বাংলাদেশকে একটি হুমকির উৎস হিসেবে ব্যবহার করেছেন। ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বাংলাদেশি অভিবাসীদের ‘উইপোকা’ বলে অভিহিত করেছিলেন। এই ধরনের বক্তব্য কেবল অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রচারণার হাতিয়ার নয়—এটি বাংলাদেশের প্রতি একটি মৌলিক শত্রুভাবাপন্ন দৃষ্টিভঙ্গির প্রকাশ। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ভারতীয় হস্তক্ষেপের যে ধারাবাহিক ইতিহাস রয়েছে, তা এই মতাদর্শিক প্রেক্ষাপটে আরো স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বিগত দেড় দশকে ভারতের পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত বাংলাদেশের সরকার দেশের জনগণের ইচ্ছার প্রতি দায়বদ্ধ ছিল না, ছিল নয়াদিল্লির প্রতি। এই ব্যবস্থায় বাংলাদেশ ছিল কার্যত একটি উপনিবেশ, যেখানে গণতন্ত্রের নামে রাজনীতি হতো; কিন্তু প্রকৃত ক্ষমতার কেন্দ্র ছিল ভারতীয় হাই কমিশনে। গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপ, পছন্দের রাজনৈতিক দলকে সমর্থন এবং সামরিক ও অর্থনৈতিক নির্ভরতা তৈরির এই প্রকল্প অখণ্ড ভারতের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার একটি পদ্ধতি। বাংলাদেশের হিন্দু সংখ্যালঘুদের নিয়ে বিজেপির রাজনীতিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশে যখনই কোনো সাম্প্রদায়িক ঘটনা ঘটে—বাস্তব হোক বা সাজানো—ভারতের মিডিয়া ও বিজেপি নেতারা সেটিকে অবিলম্বে বাংলাদেশে ‘হিন্দু নির্যাতন’-এর প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করেন। এই আখ্যান একটি দ্বৈত উদ্দেশ্য পূরণ করে—প্রথমত, বাংলাদেশ সরকারের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক চাপ তৈরি করা এবং দ্বিতীয়ত, ভারতের অভ্যন্তরে হিন্দু ভোটারদের একত্রিত করা। ২০২৪ সালে বাংলাদেশে গণঅভ্যুত্থানের পর এই আখ্যান যেভাবে তীব্র হয়েছিল, তা এই কৌশলের সবচেয়ে স্পষ্ট সাম্প্রতিক উদাহরণ।
ভারতের প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের ইতিহাস দেখলে বোঝা যায় বিজেপির আধিপত্যবাদী আচরণ কেবল বাংলাদেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। নেপালের সঙ্গে ২০১৫ সালে ভারত অনানুষ্ঠানিক অবরোধ আরোপ করেছিল, যা নেপালে একটি ভয়াবহ ভূমিকম্পের পরেও জ্বালানি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী প্রবেশ বন্ধ করে দিয়েছিল। মালদ্বীপে ভারতপন্থি সরকার টিকিয়ে রাখার জন্য কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগ করা হয়েছিল। শ্রীলঙ্কার অভ্যন্তরীণ সংকটেও ভারতের ভূমিকা ছিল সক্রিয় ও হস্তক্ষেপকারী। পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক বরাবরই প্রায় যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে থাকে। এই প্রতিটি ঘটনা একটি সামগ্রিক প্যাটার্নের অংশ—ভারতীয় আঞ্চলিক আধিপত্যের বিস্তার। বাংলাদেশের জন্য এই পরিস্থিতি থেকে উপলব্ধির বিষয় স্পষ্ট। অখণ্ড ভারতের স্বপ্ন কোনো ইতিহাসবিদের কাল্পনিক চিন্তা নয়—এটি আরএসএস সদর দফতরের দেয়ালে ঝুলন্ত মানচিত্র, বিজেপির নেতাদের বক্তৃতায় উচ্চারিত আকাঙ্ক্ষা এবং ভারতের আঞ্চলিক নীতির গোপন চালিকাশক্তি। বাংলাদেশ এই স্বপ্নের একটি অংশ এবং যেকোনো স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার জন্য পরিকল্পনা দরকার, ধৈর্য দরকার এবং সুযোগের অপেক্ষা দরকার। বাংলাদেশের জনগণকে এই বাস্তবতা সম্পর্কে সজাগ থাকতে হবে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, যে জাতি তার শত্রুর মতাদর্শ ও কৌশল বোঝে না, সে সেই শত্রুর বিরুদ্ধে নিজেকে রক্ষা করতে পারে না। হিন্দুত্ববাদের উৎস, বিকাশ ও বর্তমান রাষ্ট্রীয় রূপ সম্পর্কে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ থেকে নীতিনির্ধারক পর্যন্ত সবার সম্যক জ্ঞান থাকা দরকার। তাহলেই এই মতাদর্শের বিভিন্ন কৌশলগত প্রকাশকে সঠিকভাবে চিহ্নিত করা এবং কার্যকরভাবে মোকাবিলা করা সম্ভব হবে।
একটি শক্তিশালী, সার্বভৌম ও আত্মমর্যাদাসম্পন্ন বাংলাদেশই এই হুমকির সবচেয়ে শক্তিশালী প্রত্যুত্তর। শক্তিশালী প্রতিরক্ষা, স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি, শক্তিশালী অর্থনীতি ও জাতীয় ঐক্য—এই চারটি স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা বাংলাদেশকে কোনো আধিপত্যবাদী শক্তি তার ইচ্ছা অনুযায়ী পরিচালনা করতে পারবে না। আজকের প্রজন্মের দায়িত্ব হলো এই সত্যটি গভীরভাবে উপলব্ধি করা এবং প্রতিটি ক্ষেত্রে এমনভাবে কাজ করা, যাতে বাংলাদেশ কখনো কারো অখণ্ড স্বপ্নের অংশ না হয়, বরং চিরকাল নিজের স্বাধীন সত্তায় মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকে।
লেখক : নিরাপত্তা বিশ্লেষক, গবেষক ও লেখক
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন



আমি ক্রিকেটার বলে বেঁচে গেলাম, সাধারণ মানুষ হলে কী হতো?