মেহের আফরোজ শাওনের একটি বক্তব্য দেখলাম দৈনিক নয়া দিগন্তের ডিজিটাল পেজে। তিনি জুলাই বিপ্লবে ‘নিহত’দের পরিবারের কাছে ক্ষমা চেয়েছেন। শাওন সব মাত্রা পেরিয়ে গেছেন। তিনি জুলাইয়ে ‘নিহত’দের কাছে ক্ষমা চেয়েছেন, কিন্তু তাদের একবার শহীদ হিসেবে সম্মান দেননি। তিনি জুলাই বলেছেন, বিপ্লব বলেননি; নিদেনপক্ষে গণঅভ্যুত্থান। তিনি বলেছেন, তিনি ‘নিহত’দের কথা বলেননি, বলেছেন জুলাই সংঘটনের মেটিকুলাস ডিজাইনের কথা। তিনি নিহতদের পরিবারের কাছে ক্ষমা চাইলেন; কিন্তু তারা যে কারণে নিহত হয়েছে, তা অস্বীকার করে গেলেন। কী অদ্ভুত টাইপ ক্ষমা প্রার্থনা!
মন্দবুদ্ধির এই মহিলা জানেন কি, প্রতিটা আন্দোলন-সংগ্রামেরই একটা ডিজাইন থাকে। একটা পরিকল্পনা থাকে। এমনকি হঠাৎ গড়ে ওঠা আন্দোলনও শেষ পর্যন্ত পরিকল্পনা অনুযায়ীই শেষ হয়। এই মহিলা ফ্যাসিজম বিতারণের সেই পরিকল্পনাকে সেই ক্ষমা প্রার্থনার মধ্যেও হাসিমুখে ব্যঙ্গ করে বলেছেন, মেটিকুলাস ডিজাইন। শাওন কি জানেন, হুমায়ূন আহমেদের সংসারে ভাঙন এবং তার প্রবেশও মূলত পরিকল্পনা করেই। এই যে এখন তার যে অবস্থান, তার মতন মন্দবুদ্ধির মানুষ এখনো যে আলোচনায় স্থান পান, আমাদের লিখতে হয়, তাও তার সেই পরিকল্পনারই অংশ। হুমায়ূন আহমেদের স্ত্রী না হলে আপনার যে প্রতিভা তাতে হয়তো অন্য কিছু হতো, কিন্তু আমাদের আলোচনায় থাকা হতো না। সে অনুযায়ী আপনার অবস্থানও মেটিকুলাস ডিজাইনেরই অংশ।
আমাদের দুর্ভাগ্য যে, শাওন, আনিস আলমগীর, জ.ই. মামুন, পান্না—এসব মানুষকে নিয়ে আলোচনা করতে হয়। একটা টক-শোতে এবি পার্টির মজিবর রহমান মঞ্জু আনিস আলমগীরকে বলছিলেন, ‘আপনি ড. ইউনূসকে বাটপাড় বলেছেন বলে ধন্যবাদ জানাই। কিন্তু হাসিনাকে ভোটচোর কিংবা এরশাদকে স্বৈরাচার বলেননি বলে নিন্দাবাদ জানাই।’ এই সামান্য কথাতেই দৃশ্যমান হয় আনিস আলমগীর আর শাওনদের দ্বিচারিতা। সিলেক্টিভ প্রতিবাদ মানেই ধান্ধাবাজি, হারামিপনা। আনিস আলমগীর কত দিন মুখ খুলেছেন ক্রসফায়ারের বিরুদ্ধে? মেজর সিনহা হত্যাকাণ্ডে তিনি মুখ খোলেননি। ওসি প্রদীপের শতাধিক হত্যাকাণ্ডের কথা জেনেও তিনি নীরব থেকেছেন। ইলিয়াস আলী গুমের সময় তিনি ছিলেন শীতনিদ্রায়। হাজার হাজার কোটি টাকা পাচার হওয়ার পরও তিনি ঘুমঘোরে ছিলেন। সম্ভবত সেই পাচারের ভাগীদারও ছিলেন তিনি; বিপরীতে ড. ইউনূসকে বলছেন ‘বাটপাড়’। আজব! অবশ্য না বলারও কথা নয়, কারণ তার সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যে যা ফ্যাসিজমের স্তাবক হিসেবে তিনি পাচ্ছিলেন, তাতে বাদ সেধেছে জুলাই আর ড. ইউনূস এবং জুলাইয়ের নেতৃত্বে থাকা তরুণরা। তাই তিনি তাদের পেছনে লেগেছেন জোঁকের মতন।
শাওনও তাই। অসৎ পিতা-মাতার সন্তান। যার বেড়ে ওঠাই অসৎ উপার্জনে, তার চিন্তা এর চেয়ে ভালো হবে কী করে? তার চিন্তায় তো প্রথমেই আসবে অসৎ ব্যাপারটি। কেউ যদি ১০ টাকা উপার্জন করে, তাতেও তার মনে হবে, ধান্ধাবাজির কামাই। এতেই সে অভ্যস্ত। অন্যরাও তাই। আনিস আলমগীর এবং জ.ই. মামুনের যে এত ঠাটবাট তার সঙ্গে তাদের বৈধ উপার্জনের জের টানলেই বোঝা যাবে, তারা কোন গুদামের মাল।
বাদ দিই বাতিল মালেদের আলাপ। অবশ্য প্রশ্ন করতে পারেন—আপনি বাদ দেবেন, কিন্তু গণমাধ্যমগুলো তো বাদ দিচ্ছে না। বলি, অধিকাংশ গণমাধ্যমের মালিকেরাও তো একই গুদামের। ফ্যাসিস্ট সুপ্রিমোর সামনে তাদের কারো-কারো আলাপ তো আমরা জানিই। প্রকাশ্যে ফ্যাসিস্ট সুপ্রিমোকে টিকিয়ে রাখার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করার দৃশ্যচিত্র তো চোখের সমুখেই। সুতরাং, কোন স্বার্থে এসব বাতিল মালকে ব্যবহারযোগ্য করার প্রচেষ্টা চলছে তা বুঝতে ‘কলাবিজ্ঞানী’ হতে হয় না। আগেই বলেছি, আমাদের দুর্ভাগ্য এদের নিয়েও আমাদের কথা বলতে হয়।
যাক গে, আসি আরেকটি ঘটনার সঙ্গে বাতিল মালদের যোগসূত্র খোঁজার চেষ্টায়। এই যে ফাতাহ কমব্যাট সিস্টেমের কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হলো উগ্রবাদের কারণে। এরা কারা। এদের খোঁজ নিয়ে দেখা যাবে এরা আনিস আলমগীরের সমগোত্রীয়। কারণ এরাও ড. ইউনূসকে পছন্দ করে না। এদেরই চিন্তা ধারণ করা সাবির নামের একজন তো সামাজিক মাধ্যমে ড. ইউনূসকে দা দেখিয়ে হত্যার হুমকি পর্যন্ত দিয়েছে। ভিডিও প্রকাশ করেছে হাতে তৈরি দূরনিয়ন্ত্রিত বোমা ফাটানোরও। আমি আগেও বলেছি, এখনো বলছি, এক্সট্রিমিজম ও সো-কল্ড সেক্যুলারিজমের শিকড় এক মাটিতে এবং তা আমাদের বন্ধুদেশে। ফান্ডিংও হয় সেখান থেকেই। এই দুই ধারাই ফ্যাসিজমকে এতদিন টিকিয়ে রেখেছে। কীভাবে, বলছি। যখনই ফ্যাসিস্ট ক্ষমতাকেন্দ্র কোনো বিপদে পড়তে গিয়েছে, তখনই দেখা গেছে এক্সট্রিমিজমের উত্থান। একই সঙ্গে সো-কল্ড সেক্যুলারিজমের দাঁত-খিঁচুনি। ওই যে, ‘আমি দাঁড়িয়ে যাব, আর আপনি বসিয়ে দেবেন’, সেই ফর্মুলা আর কী। শাওনদের ভাষায় মেটিকুলাস ডিজাইন। সেই এক্সট্রিমিস্ট আর সেক্যুলারিস্টদের মেটিকুলাস ডিজাইনের বানানো সংঘাতে বিপদ থেকে উদ্ধার পেয়েছে ফ্যাসিজম। বিশ্বকে দেখিয়েছে, আমরা না থাকলে দেশে এক্সট্রিমিজমের উত্থান ঘটবে। আমাদের বন্ধুদেশের ক্যারিশমেটিক উপস্থাপনায় বিশ্ব মোড়লরাও বিশ্বাস করেছে সে আলাপ। আর তাতেই দেড় দশকের এক ভয়াবহ দুঃশাসন উপহার পেয়েছে দেশ।
সুতরাং, মূল মেটিকুলাস ডিজাইন ছিল সেই বানানো ঝগড়ায়, যা ফ্যাসিজমকে দীর্ঘস্থায়ী করেছে। এই ডিজাইনেই গত দেড় দশকের বেশি সময় ধরে হাজারো মানুষ প্রাণ হারিয়েছে, গুম হয়েছে এবং নির্যাতিত হয়েছে। শাওন-আনিসরা সেই মেটিকুলাস ডিজাইনের সুবিধাভোগী। সুবিধায় ব্যাঘাত ঘটাতেই তাদের মাথা আউলা হয়ে গেছে। কিংবা তাদের এই কার্যকলাপ নতুন মেটিকুলাস ডিজাইনের অংশও হতে পারে। সংগত কারণেই সেই মেটিকুলাস ডিজাইন হলো জুলাই রেভল্যুশনকে বিতর্কিত করা। ড. ইউনূসসহ জুলাইয়ের নায়কদের কলঙ্কিত করার চেষ্টা করা। জুলাইয়ের শক্তিকে বিভক্ত করার চেষ্টা করা। সেই প্রক্রিয়াতেই তারা এখন ক্ষমতাসীনদের প্রতি কিছুটা নরম, যাতে ক্ষমতাসীনরা তাদের প্রতি গোস্বা না হয়। সঙ্গে জুলাইয়ের অন্য শক্তিগুলোর প্রতি কঠোর। সেজন্যই তাদের বিতর্কিত করার চেষ্টা। ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে বিরোধীদের সংঘাত বাধিয়ে দেশকে অস্থিতিশীল করা সেই ডিজাইনের অংশ। এতে সরকার ও বিরোধীদের মধ্যে যাতে দূরত্ব সৃষ্টি হয়, পরস্পর মারমুখী হয়ে ওঠে। এনসিপির সমাবেশে ককটেল বিস্ফোরণ তারই ধারাবাহিকতা। এই বিস্ফোরণ ঘটানো হয়েছিল এনসিপি আর বিএনপিকে মুখোমুখি করে দেওয়ার প্রচেষ্টায়।
না, ঘটনাগুলো হয়তো অনেকে আমলে নিতে চাইবেন না; কিন্তু আমলে না নিলে ভুল করবেন। বিন্দু বিন্দু জলকণাই যে সিন্ধু গড়ে তোলে, তা ভুলে গেলে চলবে না। অনেকে শাওন-আনিসদের ক্লাউন বলে আখ্যা দিয়েছেন। কিন্তু তারা ভুলে গেছেন, ক্লাউন দিয়েই কিন্তু অনুষ্ঠানের দর্শক ধরে রাখা হয়। এই ক্লাউনগুলো এখন দর্শক ধরে রাখার কাজ করছে। মূল পর্ব এর পরেই। জুলাই রেভল্যুশনের পক্ষের শক্তিগুলোকে এ কথা ভুলে গেলে চলবে না। আর সেই মনে রাখা থেকেই জুলাই প্রশ্নে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশপন্থা এবং বাংলাদেশের অস্তিত্বের প্রশ্নে জুলাইয়ের বিকল্প নেই।
লেখক : কলামিস্ট
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


বিএনপির ভুল করতে চায় না আ.লীগ!