শরিয়াহ স্কলারদের স্বাধীনতা

হালাল তহবিল ও জাতীয় গভর্ন্যান্স কাঠামো

এম-কবির-হাসান
এম কবির হাসান

হালাল তহবিল ও জাতীয় গভর্ন্যান্স কাঠামো

ইসলামি ব্যাংকিং ও অর্থব্যবস্থার মূল শক্তি শুধু তার আর্থিক পণ্য, মুনাফা বা বাজার বিস্তারে নয়; এর প্রকৃত শক্তি নিহিত রয়েছে নৈতিক আস্থা, শরিয়াহর প্রতি আনুগত্য এবং জনসাধারণের বিশ্বাসযোগ্যতায়। একটি ব্যাংক মুরাবাহা, মুশারাকা, ইজারা বা সুকুকের মতো যে পণ্যই বাজারে আনুক না কেন, সাধারণ আমানতকারী ও গ্রাহকের কাছে শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হলো—এই কার্যক্রম সত্যিই কি শরিয়াহসম্মত, নাকি শুধু নাম ও কাঠামোর মাধ্যমে প্রচলিত অর্থায়নের একটি ভিন্ন ভাষা তৈরি করা হয়েছে?

এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার কেন্দ্রে থাকেন শরিয়াহ স্কলাররা। তারা ইসলামি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পণ্য, বিনিয়োগ, চুক্তি, আয়, ব্যয় ও পরিশোধন প্রক্রিয়া পর্যালোচনা করেন। তাদের প্রত্যয়নই গ্রাহক, বিনিয়োগকারী ও সমাজের কাছে একটি প্রতিষ্ঠানের শরিয়াহসম্মত পরিচয়ের নৈতিক ভিত্তি তৈরি করে। তাই শরিয়াহ স্কলারদের জ্ঞান, তাকওয়া ও প্রজ্ঞা যত গুরুত্বপূর্ণ, তাদের প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা, আর্থিক নিরপেক্ষতা এবং চাপমুক্ত অবস্থানও ততটাই গুরুত্বপূর্ণ।

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশে ইসলামি ব্যাংকিং এখন আর প্রান্তিক কোনো খাত নয়; এটি আর্থিক ব্যবস্থার একটি বড় ও প্রভাবশালী অংশ। এই বাস্তবতায় শরিয়াহ গভর্ন্যান্সকে শুধু ব্যাংকভিত্তিক পরামর্শ কাঠামো হিসেবে রাখলে চলবে না। এটিকে একটি জাতীয়, স্বাধীন, পেশাগত ও স্বচ্ছ প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর অধীনে আনতে হবে। কারণ যারা কোনো প্রতিষ্ঠানের শরিয়াহ পরিপালন তদারকি করবেন, তাদের পারিশ্রমিক, নিয়োগ, পুনর্নিয়োগ ও অপসারণের ক্ষমতা যদি সেই প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদের হাতে থাকে, তবে সেখানে স্বার্থের সংঘাতের কাঠামোগত ঝুঁকি থেকে যায়। এটি কোনো ব্যক্তিগত অভিযোগ নয়; বরং একটি প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা, যা নীতিগতভাবে সমাধান করা দরকার।

সমস্যার কেন্দ্রবিন্দু : স্বাধীনতা শুধু ঘোষণায় নয়, অর্থায়নেও

শরিয়াহ স্কলাররা ব্যাংকের কর্মচারী নন; আবার তারা সাধারণ বাহ্যিক পরামর্শকও নন। তাদের ভূমিকা অনেকটা আর্থিক নৈতিকতার প্রহরীর মতো। তারা যদি কোনো পণ্য বা কার্যক্রম শরিয়াহসম্মত নয় বলে মত দেন, সেই সিদ্ধান্ত ব্যাংকের ব্যবসায়িক স্বার্থের সঙ্গে সংঘাতে যেতে পারে। এ কারণেই তাদের আর্থিকনির্ভরতা সেই প্রতিষ্ঠানের ওপর থাকা উচিত নয়, যার কার্যক্রম তারা মূল্যায়ন করছেন। বিচারকের বেতন মামলার পক্ষরা দিলে যেমন বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়, তেমনি শরিয়াহ তদারকির ক্ষেত্রেও অর্থায়নের উৎস ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা আলাদা হওয়া জরুরি।

বর্তমান ব্যবস্থায় অনেক ক্ষেত্রে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদই শরিয়াহ সুপারভাইজরি কমিটির সদস্যদের নিয়োগ, অপসারণ, মেয়াদ নবায়ন এবং সম্মানী নির্ধারণ করে। একজন সৎ ও জ্ঞানী স্কলার ব্যক্তিগতভাবে স্বাধীন থাকতে পারেন, কিন্তু দুর্বল কাঠামো দীর্ঘ মেয়াদে সৎ মানুষকেও অনাবশ্যক চাপে ফেলে। প্রতিষ্ঠানভিত্তিক পারিশ্রমিক ব্যবস্থা স্কলারদের সিদ্ধান্তকে সরাসরি প্রভাবিত করতেই হবে—এমন নয়; কিন্তু এই ব্যবস্থায় প্রভাবের আশঙ্কা, জনসন্দেহ এবং ‘ফতোয়া-শপিং’-এর সুযোগ থেকে যায়। ইসলামি অর্থব্যবস্থার জন্য এই সন্দেহও ক্ষতিকর।

তাই প্রয়োজন এমন একটি অর্থায়ন ব্যবস্থা, যেখানে শরিয়াহ স্কলারদের পারিশ্রমিক আসবে বৈধ, হালাল, স্বচ্ছ এবং ব্যাংকের প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণমুক্ত উৎস থেকে। একই সঙ্গে প্রয়োজন এমন একটি প্রশাসনিক কাঠামো, যেখানে স্কলার নির্বাচন, মেয়াদ, পারিশ্রমিক, কাজের মূল্যায়ন ও জবাবদিহি কোনো একক ব্যাংকের হাতে নয়, বরং একটি স্বাধীন জাতীয় ব্যবস্থার অধীনে থাকবে।

অশুদ্ধ আয় নয়, সম্পূর্ণ হালাল উৎসই হোক ভিত্তি

ইসলামি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমে কখনো কখনো শরিয়াহ নন-কমপ্লায়েন্স আয়, সন্দেহজনক আয় বা সুদজনিত আয় শনাক্ত হতে পারে। শরিয়াহর নীতি অনুযায়ী এ ধরনের আয় প্রতিষ্ঠান বা শেয়ারহোল্ডারের মুনাফা হিসেবে গ্রহণযোগ্য নয়; তা যথাযথ দাতব্য ও জনকল্যাণমূলক খাতে নিষ্পত্তি করতে হয়। কিন্তু এই আয় দিয়ে শরিয়াহ স্কলারদের পারিশ্রমিক তহবিল গঠন করা উচিত নয়। কারণ এতে দাতা প্রতিষ্ঠান বা সংশ্লিষ্ট শিল্প পরোক্ষভাবে উপকৃত হচ্ছে কি না—এ প্রশ্ন উঠতে পারে।

অতএব নীতিগতভাবে দুটি তহবিলকে সম্পূর্ণ আলাদা রাখতে হবে। প্রথমটি হবে ‘পরিশোধিত আয় নিষ্পত্তি তহবিল’, যার অর্থ দরিদ্র, অসহায়, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, দুর্যোগ সহায়তা, ঋণগ্রস্ত মানুষের পুনর্বাসন এবং সাধারণ সামাজিক কল্যাণে ব্যয় হবে। দ্বিতীয়টি হবে ‘শরিয়াহ গভর্ন্যান্স ও স্কলার স্বাধীনতা তহবিল’, যার অর্থ আসবে শুধু বৈধ ও হালাল উৎস থেকে এবং যার উদ্দেশ্য হবে স্কলারদের স্বাধীন পারিশ্রমিক, গবেষণা, প্রশিক্ষণ ও পেশাগত মানোন্নয়ন নিশ্চিত করা।

এই বিভাজন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ইসলামি অর্থব্যবস্থার নৈতিক ভিত্তি রক্ষা করতে হলে উদ্দেশ্য ভালো হলেই যথেষ্ট নয়; অর্থের উৎস, ব্যবহার এবং উপকারভোগীর সম্পর্কও শরিয়াহসম্মত ও সন্দেহমুক্ত হতে হবে। স্কলারদের স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠার মতো পবিত্র লক্ষ্যকে এমন কোনো উৎসের ওপর দাঁড় করানো উচিত নয়, যা ফিকহি বা নৈতিক প্রশ্ন তৈরি করে।

প্রস্তাব : জাতীয় শরিয়াহ গভর্ন্যান্স ট্রাস্ট

বাংলাদেশে একটি ‘জাতীয় শরিয়াহ গভর্ন্যান্স ট্রাস্ট’ প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে। এটি বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় শরিয়াহ কর্তৃপক্ষ, স্বীকৃত ফিকহ বিশেষজ্ঞ, পেশাদার হিসাবরক্ষক, আইনজ্ঞ, ভোক্তা প্রতিনিধি এবং ইসলামি অর্থনীতির গবেষকদের সমন্বয়ে একটি স্বাধীন কাঠামো হতে পারে। ট্রাস্টের উদ্দেশ্য হবে ব্যাংকভিত্তিক শরিয়াহ সুপারভাইজরি কমিটিগুলোর আর্থিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, জাতীয় পর্যায়ে শরিয়াহ মতামতের সামঞ্জস্য রক্ষা করা এবং ইসলামি আর্থিক খাতের প্রতি জনআস্থা শক্তিশালী করা।

এই ট্রাস্টের অধীনে তিনটি আলাদা জানালা থাকতে পারে। প্রথম জানালা হবে ‘স্কলার পারিশ্রমিক জানালা’, যেখান থেকে ব্যাংকভিত্তিক শরিয়াহ সুপারভাইজরি কমিটির সদস্যদের সম্মানী, সভা-ভাতা এবং গবেষণা-সময়ভিত্তিক পারিশ্রমিক দেওয়া হবে। দ্বিতীয় জানালা হবে ‘গবেষণা ও সক্ষমতা উন্নয়ন জানালা’, যেখান থেকে নতুন পণ্য মূল্যায়ন, শরিয়াহ অডিট পদ্ধতি, প্রশিক্ষণ, সার্টিফিকেশন এবং তরুণ স্কলার তৈরির খরচ বহন করা হবে। তৃতীয় জানালা হবে ‘জনকল্যাণ ও পরিশোধন জানালা’, যেখানে শরিয়াহ নন-কমপ্লায়েন্স আয় আলাদাভাবে জমা হবে এবং শুধু সামাজিক কল্যাণে ব্যয় হবে; স্কলারদের পারিশ্রমিকের সঙ্গে এ অর্থের কোনো সম্পর্ক থাকবে না।

ট্রাস্টের অর্থায়ন আসতে পারে চারটি হালাল উৎস থেকে। প্রথমত, বাংলাদেশ ব্যাংক বা জাতীয় নিয়ন্ত্রক কাঠামোর বৈধ প্রশাসনিক বরাদ্দ। দ্বিতীয়ত, ইসলামী ব্যাংক ও ইসলামি উইন্ডোগুলোর নিরীক্ষিত বৈধ মুনাফা বা সম্পদের ভিত্তিতে নির্ধারিত বার্ষিক অবদান। তৃতীয়ত, বৈধ উৎসের করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা তহবিল, হালাল দান এবং শর্তপূরণ সাপেক্ষে ওয়াকফ অবদান। চতুর্থত, ট্রাস্টের মূলধন নিরাপদ শরিয়াহসম্মত বিনিয়োগে—যেমন সরকারি সুকুক বা অনুমোদিত ইসলামি অর্থবাজার উপকরণে—বিনিয়োগ করে অর্জিত আয়। এভাবে তহবিলটি অশুদ্ধ আয়ের ওপর নির্ভর না করে টেকসই ও শরিয়াহসম্মত ভিত্তি পাবে।

ব্লাইন্ড ট্রাস্ট : অর্থের উৎস ও সিদ্ধান্তের সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন করা

তহবিল হালাল উৎস থেকে এলেই সব সমস্যা শেষ হয়ে যাবে না। অর্থদাতা প্রতিষ্ঠান ও স্কলারের মধ্যে দৃশ্যমান সম্পর্ক থাকলে পক্ষপাতের আশঙ্কা থেকে যায়। তাই জাতীয় শরিয়াহ গভর্ন্যান্স ট্রাস্টের ভেতরে একটি ‘ব্লাইন্ড ট্রাস্ট’ ব্যবস্থা থাকা দরকার। ব্যাংকগুলো নির্ধারিত অবদান দেবে, কিন্তু কোনো ব্যাংক জানবে না তার অর্থ কোন স্কলারের পারিশ্রমিকে ব্যবহৃত হলো। স্কলাররাও জানবেন না কোন প্রতিষ্ঠানের অবদান থেকে তাদের সম্মানী এসেছে।

এই কাঠামোয় অর্থ সংগ্রহ, হিসাবরক্ষণ, বরাদ্দ ও পেমেন্ট হবে কেন্দ্রীয়ভাবে। প্রত্যেক লেনদেন ডিজিটালভাবে নথিভুক্ত থাকবে, কিন্তু ব্যক্তিগত স্কলার ও নির্দিষ্ট ব্যাংকের মধ্যে অর্থের সরাসরি সংযোগ অদৃশ্য থাকবে। স্বাধীন নিরীক্ষক, শরিয়াহ অডিটর এবং নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষ পুরো হিসাব পরীক্ষা করতে পারবেন। এর ফলে ব্যাংকের অর্থনৈতিক প্রভাব, স্কলারের ব্যক্তিগত নির্ভরতা এবং শিল্পভিত্তিক পক্ষপাত—তিনটিই উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে।

ব্লাইন্ড ট্রাস্ট ব্যবস্থার সঙ্গে আরো দুটি সুরক্ষা যুক্ত করা যেতে পারে। প্রথমত, স্কলারদের পারিশ্রমিক নির্ধারিত হবে যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা, কাজের পরিমাণ এবং দায়িত্বের স্তরের ভিত্তিতে; কোনো পণ্য অনুমোদন বা ব্যাংকের ব্যবসায়িক সাফল্যের সঙ্গে তা যুক্ত থাকবে না। দ্বিতীয়ত, কোনো স্কলার কতটি প্রতিষ্ঠানে কাজ করতে পারবেন, কত বছর ধারাবাহিকভাবে একই ব্যাংকে থাকতে পারবেন এবং কোনো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ব্যক্তিগত ব্যবসায়িক সম্পর্ক থাকলে তা কীভাবে প্রকাশ করবেন—এসব বিষয়ে সুস্পষ্ট নীতি থাকতে হবে।

স্কলার রোস্টার, প্রশিক্ষণ ও পেশাগত মানদণ্ড

শুধু অর্থায়ন বদলালেই শরিয়াহ গভর্ন্যান্স শক্তিশালী হবে না; স্কলারদের যোগ্যতা, প্রশিক্ষণ, পেশাগত আচরণ এবং জবাবদিহির মানও উন্নত করতে হবে। জাতীয় পর্যায়ে একটি ‘স্বীকৃত শরিয়াহ স্কলার রোস্টার’ তৈরি করা যেতে পারে। এই রোস্টারে অন্তর্ভুক্তির জন্য ফিকহুল মুআমালাত, আধুনিক ব্যাংকিং, হিসাবরক্ষণ, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, করপোরেট গভর্ন্যান্স এবং আর্থিক আইন সম্পর্কে ন্যূনতম জ্ঞান ও প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক হতে পারে।

প্রতিটি স্কলারের জন্য নির্দিষ্ট সময় অন্তর ধারাবাহিক পেশাগত উন্নয়ন প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করা উচিত। ইসলামি ব্যাংকিং আজ অত্যন্ত জটিল; এখানে সুকুক, ডেরিভেটিভস, ডিজিটাল ব্যাংকিং, ফিনটেক, টোকেনাইজেশন, জলবায়ু অর্থায়ন, ESG, সাইবার ঝুঁকি এবং আন্তর্জাতিক হিসাবমান—সবকিছুই শরিয়াহ মূল্যায়নের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে। তাই শরিয়াহ স্কলারদের শুধু প্রথাগত ফিকহ জ্ঞান নয়, আধুনিক আর্থিক ব্যবস্থার ভাষাও জানতে হবে।

রোস্টারভিত্তিক নিয়োগের ফলে ব্যাংকগুলো নিজেদের পছন্দের স্কলার নির্বাচন করে সুবিধাজনক মতামত খোঁজার সুযোগ কম পাবে। জাতীয় ট্রাস্ট বা কর্তৃপক্ষ যোগ্যতার ভিত্তিতে স্কলার প্যানেল নির্ধারণ করবে, ব্যাংক নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে মতামত দিতে পারবে, কিন্তু চূড়ান্ত নিয়োগ হবে কেন্দ্রীয় নীতিমালার অধীনে। এতে স্কলারদের পেশাগত মর্যাদা বাড়বে এবং ব্যাংকের ওপর ব্যক্তিগত নির্ভরতা কমবে।

ফতোয়া-শপিং কমাতে জাতীয় সিদ্ধান্তভান্ডার

ইসলামি আর্থিক খাতে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হলো একই ধরনের পণ্যে ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা ও অনুমোদন। সব মতভেদ খারাপ নয়; ফিকহি বৈচিত্র্য ইসলামি চিন্তার স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য। কিন্তু যখন মতভেদ ব্যবসায়িক সুবিধা নেওয়ার উপায়ে পরিণত হয়, তখন তা ‘ফতোয়া-শপিং’-এর ঝুঁকি তৈরি করে। এই ঝুঁকি কমাতে একটি জাতীয় ডিজিটাল সিদ্ধান্তভান্ডার গড়ে তোলা জরুরি।

এই সিদ্ধান্তভান্ডারে গুরুত্বপূর্ণ শরিয়াহ সিদ্ধান্ত, পণ্যের কাঠামো, অনুমোদনের যুক্তি, শর্ত, ভিন্নমত এবং পরবর্তী সংশোধনের ইতিহাস সংরক্ষিত থাকবে। সব তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে—এমন নয়; ব্যবসায়িক গোপনীয়তা রক্ষা করা যেতে পারে। কিন্তু নীতিগত সিদ্ধান্ত, প্রধান ফিকহি যুক্তি এবং শরিয়াহ পরিপালনের শর্তগুলো এমনভাবে প্রকাশ করা উচিত, যাতে বাজার, গবেষক, গ্রাহক ও নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষ একটি সামঞ্জস্যপূর্ণ ধারণা পায়।

প্রতিবছর ‘জাতীয় শরিয়াহ গভর্ন্যান্স প্রতিবেদন’ প্রকাশ করা যেতে পারে। এতে থাকবে কতটি পণ্য অনুমোদিত হয়েছে, কতটি সংশোধনের শর্তে অনুমোদিত হয়েছে, কতটি প্রত্যাখ্যাত হয়েছে, কত পরিমাণ শরিয়াহ নন-কমপ্লায়েন্স আয় শনাক্ত ও নিষ্পত্তি হয়েছে, কী ধরনের পুনরাবৃত্ত সমস্যা দেখা যাচ্ছে এবং কোন ক্ষেত্রে নতুন নিয়ন্ত্রক নির্দেশনা প্রয়োজন। এ ধরনের স্বচ্ছতা ইসলামি ব্যাংকিংয়ের নৈতিক দাবিকে বাস্তব জবাবদিহি রূপ দেবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্কুলার : অগ্রগতি ও অসমাপ্ত কাজ

বাংলাদেশ ব্যাংকের ইসলামি ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ কর্তৃক জারি করা সাম্প্রতিক নির্দেশনা শরিয়াহ সুপারভাইজরি কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। এতে সদস্যদের যোগ্যতা, দায়িত্ব, মেয়াদ, কোরাম, সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং অমীমাংসিত বিষয় নিয়ন্ত্রকের কাছে উপস্থাপনের বিধান স্পষ্ট করা হয়েছে। এসব পদক্ষেপ শরিয়াহ গভর্ন্যান্সকে আনুষ্ঠানিক ও সুসংহত করার ক্ষেত্রে ইতিবাচক।

তবে একটি মৌলিক প্রশ্ন এখনো থেকে যায়। যদি নিয়োগ, অপসারণ, পুনর্নিয়োগ এবং পারিশ্রমিক নির্ধারণের ক্ষমতা ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের হাতেই থাকে, তাহলে স্কলারদের স্বাধীনতা আংশিক থেকে যাবে। কাগজে-কলমে স্বাধীনতা থাকবে, কিন্তু অর্থনৈতিক বাস্তবতায় নির্ভরতা বজায় থাকবে। তাই সার্কুলারের ইতিবাচক কাঠামোকে পূর্ণতা দিতে হলে শরিয়াহ স্কলারদের পারিশ্রমিক ও পেশাগত সুরক্ষা কেন্দ্রীয় হালাল তহবিল বা নিয়ন্ত্রক-পোষিত কাঠামোর আওতায় আনতে হবে।

এই প্রস্তাব ব্যাংকের বিরুদ্ধে নয়; বরং ব্যাংক, গ্রাহক, স্কলার ও নিয়ন্ত্রক—সব পক্ষের স্বার্থরক্ষার জন্য। ব্যাংকগুলোও উপকৃত হবে, কারণ স্বাধীন স্কলার ব্যবস্থা তাদের সিদ্ধান্তের বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়াবে। গ্রাহকরা উপকৃত হবে, কারণ তারা জানবে শরিয়াহ অনুমোদন কোনো প্রতিষ্ঠানের বাণিজ্যিক চাহিদার ওপর নির্ভর করে না। স্কলাররা উপকৃত হবেন, কারণ তাদের পেশাগত মর্যাদা ও স্বাধীনতা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সুরক্ষিত হবে। নিয়ন্ত্রকও উপকৃত হবে, কারণ পুরো খাতে শৃঙ্খলা, তথ্যপ্রবাহ ও জবাবদিহি বাড়বে।

বাস্তবায়নের ধাপ

এই মডেল এক দিনে বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। তাই ধাপে ধাপে এগোনো উচিত। প্রথম ধাপে বাংলাদেশ ব্যাংক একটি নীতিগত রূপরেখা প্রকাশ করে ব্যাংক, শরিয়াহ স্কলার, আলেম, আইনজ্ঞ, হিসাবরক্ষক, গ্রাহক প্রতিনিধি ও গবেষকদের মতামত নিতে পারে। দ্বিতীয় ধাপে নির্বাচিত কয়েকটি ইসলামী ব্যাংক ও উইন্ডো নিয়ে ১২ মাসের পাইলট প্রকল্প চালু করা যেতে পারে। তৃতীয় ধাপে পাইলটের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে জাতীয় শরিয়াহ গভর্ন্যান্স ট্রাস্ট, স্কলার রোস্টার, পারিশ্রমিক কাঠামো, ব্লাইন্ড ট্রাস্ট এবং ডিজিটাল সিদ্ধান্তভান্ডারের পূর্ণাঙ্গ বিধিমালা প্রণয়ন করা যেতে পারে।

চতুর্থ ধাপে সব ইসলামী ব্যাংক, ইসলামি শাখা ও উইন্ডোকে ধীরে ধীরে এই কাঠামোর আওতায় আনা যেতে পারে। একই সঙ্গে একটি স্বাধীন আর্থিক নিরীক্ষা এবং পৃথক শরিয়াহ নিরীক্ষা বাধ্যতামূলক করতে হবে। ট্রাস্টের বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশ্য হওয়া উচিত, যাতে তহবিলের উৎস, ব্যয়, প্রশাসনিক খরচ, স্কলার পারিশ্রমিকের মোট পরিমাণ, গবেষণা ব্যয় এবং সামাজিক কল্যাণ ব্যয়ের বিবরণ থাকবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, এই কাঠামোকে শুধু সম্মানী দেওয়ার যান্ত্রিক ব্যবস্থা হিসেবে দেখা যাবে না। এটি হবে ইসলামি অর্থব্যবস্থার নৈতিক অবকাঠামো। এখানে অর্থায়ন, জ্ঞান, স্বাধীনতা, জবাবদিহি ও জনআস্থা—সবকিছু একসূত্রে যুক্ত হবে।

উপসংহার

ইসলামি ব্যাংকিংয়ের দাবি বড়; তাই এর জবাবদিহিও বড় হতে হবে। আমরা যদি বলি ইসলামি অর্থব্যবস্থা শুধু মুনাফার ব্যবস্থা নয়, বরং ন্যায়, আস্থা, সততা ও সামাজিক কল্যাণের ব্যবস্থা, তাহলে এর শরিয়াহ তদারকিও হতে হবে সেই উচ্চ নৈতিক মানের উপযোগী। শরিয়াহ স্কলারদের স্বাধীনতা কোনো সৌজন্যমূলক বিষয় নয়; এটি ইসলামি আর্থিক ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতার প্রাণ।

এই স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজন সম্পূর্ণ হালাল উৎসনির্ভর জাতীয় শরিয়াহ গভর্ন্যান্স তহবিল, ব্লাইন্ড ট্রাস্টের মাধ্যমে অর্থের উৎস ও সিদ্ধান্তের সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন করা, পেশাগত স্কলার রোস্টার, ধারাবাহিক প্রশিক্ষণ, স্বচ্ছ সিদ্ধান্তভান্ডার এবং নিয়ন্ত্রক-পোষিত জবাবদিহির কাঠামো। পরিশোধিত অশুদ্ধ আয় যাবে দরিদ্র ও জনকল্যাণে; আর স্কলারদের পারিশ্রমিক আসবে বৈধ, স্বচ্ছ ও সম্মানজনক উৎস থেকে।

বাংলাদেশ ইসলামি ব্যাংকিংয়ের ক্ষেত্রে বহুবার পথ দেখিয়েছে। এখন সময় এসেছে শরিয়াহ গভর্ন্যান্সের ক্ষেত্রেও একটি নতুন মানদণ্ড স্থাপনের। হালাল অর্থায়ন, স্বাধীন তদারকি এবং স্বচ্ছ জবাবদিহির সমন্বিত কাঠামো গড়ে তুলতে পারলে ইসলামি ব্যাংকিংয়ের প্রতি জনআস্থা শুধু রক্ষা পাবে না; বরং তা আরো গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী হবে।

লেখক : ইউনিভার্সিটি অব নিউ অরলিন্সের ফিন্যান্সের অধ্যাপক ও মফেট চেয়ার, ইসলামি ব্যাংকিং ও অর্থব্যবস্থায় ২০১৬ সালের আইডিবি পুরস্কারজয়ী এবং এএওআইএফআই এথিকস অ্যান্ড গভর্ন্যান্স বোর্ডের সদস্য

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন