আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

এআই যুগে তারুণ্য স্ফীতি

ড. মোহাম্মদ ফজলুর রহমান খান

এআই যুগে তারুণ্য স্ফীতি

বাংলাদেশ ‘তারুণ্য স্ফীতি’র (Youth Bulge) মতো এক বিরল জনমিতিক বাস্তবতা অতিক্রম করছে। তারুণ্য স্ফীতি হলো এমন একটি অবস্থা, যখন কোনো দেশের জনসংখ্যা কাঠামোয় বয়সের দিক থেকে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর আধিক্য পরিলক্ষিত হয়। সাধারণত কয়েক শতাব্দীর ব্যবধানে কোনো জনগোষ্ঠীর মধ্যে চার থেকে পাঁচ দশকের জন্য তারুণ্য স্ফীতির সুযোগ সৃষ্টি হয়। বাংলাদেশ ব্যুরো অব স্ট্যাটিস্টিকসের (বিবিএস) সর্বশেষ জনশুমারি অনুযায়ী দেশে ১৫ থেকে ৩৫ বছর বয়সি জনগোষ্ঠী মোট জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি। বর্ধিত তরুণদের জন্য সময়োপযোগী শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, স্বাস্থ্যসেবা ও কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা গেলে ‘তারুণ্য স্ফীতি’ রূপান্তরিত হয় ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডে। ফলে দেশের প্রতিটি উন্নয়ন খাত উপযুক্ত জনশক্তির প্রভাবে পৌঁছে যেতে পারে উৎপাদনশীলতার শিখরে। যেমনটি এর আগে দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান ও চীনের ক্ষেত্রে ঘটেছে। তবে তরুণ জনগোষ্ঠীর জন্য উপযুক্ত বিনিয়োগের ব্যর্থতা আর্থসামাজিক ক্ষেত্রে মারাত্মক বৈষম্য ও অস্থিরতার কারণ হয়ে উঠতে পারে।

বিভিন্ন গবেষণা ফলাফল বলছে, বাংলাদেশের জনসংখ্যা কাঠামোতে তারুণ্য স্ফীতির এই ধারা শুরু হয়েছে গত শতকের নব্বইয়ের দশকে, আর চলবে সর্বোচ্চ ২০৪০ সাল পর্যন্ত। কিন্তু বর্ধিত তরুণদের জন্য সময়োপযোগী শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ সুবিধা সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের প্রস্তুতি মোটেও আশাব্যঞ্জক নয়। শ্রমশক্তি জরিপ ২০২৪ বলছে, দেশের প্রায় ৮৪ শতাংশ কর্মসংস্থান এখনো অনানুষ্ঠানিক খাতে। আবার সামগ্রিক বেকারত্বের হার ৪.৬-৪.৭ শতাংশ হলেও তরুণদের বেকারত্ব ১০ শতাংশের বেশি। আরো উদ্বেগের বিষয় হলো, তরুণদের মধ্যে শিক্ষার স্তর যত উচ্চ, বেকারত্বের হার তত বেশি। স্নাতক ও তদূর্ধ্ব শিক্ষিতদের মধ্যে বেকারত্ব যারা মাধ্যমিক পাস করেছে তাদের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। এটি নিছক পরিসংখ্যান নয়, এটি আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার কাঠামোগত অসামঞ্জস্যের প্রতিফলন, যা কেবল দেশের অভ্যন্তরে নয়, প্রবাসী বাংলাদেশি কর্মীদের আয়কেও প্রভাবিত করে। Bureau of Manpower Employment and Training (BMET)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সাল পর্যন্ত প্রবাসী বাংলাদেশির সংখ্যা এক কোটির বেশি। বাস্তবতা হচ্ছে, দক্ষতার ঘাটতির কারণে অধিকাংশ বাংলাদেশি প্রবাসী কর্মী স্বল্প আয়ের কাজে নিয়োজিত। ২০১৬ সালের বাজেট বক্তৃতায় তৎকালীন অর্থমন্ত্রী বলেন, প্রবাসী বাংলাদেশি কর্মীদের ৫২ শতাংশ স্বল্প দক্ষ এবং মাত্র দুই শতাংশ পেশাজীবী। অপরদিকে বাংলাদেশের আরএমজি খাতসহ বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি খাতে টেকনিক্যাল ও ম্যানেজারিয়াল পোস্টে কর্মরত আছেন বেশ কয়েক লাখ বিদেশি নাগরিক, যাদের সঠিক পরিসংখ্যান নিয়েও যথেষ্ট বিতর্ক আছে। ২০১৬ সালে বাজেট বক্তৃতায় তৎকালীন অর্থমন্ত্রী বলেন, দেশে কর্মরত দুই লাখ বিদেশি নাগরিক প্রতি বছর পাঁচ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স হিসেবে নিজ নিজ দেশে পাঠাচ্ছেন। অর্থাৎ আমাদের কমপক্ষে এক কোটি মানুষের কষ্টার্জিত রেমিট্যান্সের একটি বড় অংশ নিয়ে যাচ্ছেন মাত্র কয়েক লাখ বিদেশি নাগরিক। আমাদের নিয়োগকর্তারা বলছেন, দেশে যথেষ্ট সংখ্যায় যোগ্য কর্মী না থাকায় তারা বিদেশিদের নিয়োগ দিতে বাধ্য হচ্ছেন। অথচ শ্রমশক্তি জরিপ ২০২৪ বলছে, বাংলাদেশের মোট বেকার জনগোষ্ঠীর প্রায় ৮০ শতাংশ তরুণ এবং বেকার তরুণদের ১৩ দশমিক ৩০ শতাংশ উচ্চশিক্ষিত (স্নাতক বা তদূর্ধ্ব ডিগ্রিধারী)। এ অবস্থার মধ্যেই প্রতি বছর হাজার হাজার তরুণ অর্জন করছেন স্নাতক ডিগ্রি।

বিজ্ঞাপন

এসব তথ্য দেশে তরুণ জনশক্তির অপর্যাপ্ত এবং অপরিপক্ব ব্যবহারের ইঙ্গিত বহন করে। বাংলাদেশে তারুণ্যের অপচয়ের ভয়াবহতা ফুটে ওঠে দেশের বর্তমান Youth NEET (Not in Education, Employment or Training) রেটে।

কারণ Youth NEET rate একটি দেশের অর্থনীতিতে তারুণ্যের নিষ্ক্রিয়তার চিত্র তুলে ধরে।

বিবিএস বলছে, বাংলাদেশে ২০২৪ সালে Youth NEET rate ছিল ২০ দশমিক ৩ শতাংশ, অর্থাৎ প্রতি পাঁচজন তরুণের একজন উৎপাদন প্রক্রিয়ার বাইরে। এটি শুধু অর্থনৈতিক নয়, সামাজিক অস্থিরতারও পূর্বাভাস। আর এসব পরিসংখ্যান বিবেচনায় নিলে সহজেই প্রতীয়মান হয়, বাজার চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে জনগোষ্ঠীকে বহুমাত্রিক দায়িত্ব পালনে প্রয়োজনীয় পেশাগত ও মানবিক গুণাবলিসম্পন্ন মানবসম্পদে রূপান্তরে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় আশানুরূপ সক্ষমতা অর্জিত হয়নি। ফলে জনসংখ্যা কাঠামোয় তারুণ্য স্ফীতির ধারায় বাংলাদেশ প্রায় তিন দশকের বেশি সময় অতিক্রম করলেও এখনো ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের সুবিধা গ্রহণ করতে পারেনি।

এ অবস্থায় চলমান প্রযুক্তি বিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আমাদের প্রয়োজন পরিবর্তিত বাস্তবতায় অভিযোজন-উপযোগী একটা পূর্ণাঙ্গ শিক্ষাব্যবস্থার। কারণ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অটোমেশন, রোবোটিক্স ও ডেটানির্ভর অর্থনীতি উৎপাদন ও কর্মসংস্থানের চরিত্র পাল্টে দিচ্ছে। বাংলাদেশেও আইসিটি, তৈরি পোশাকশিল্প, ফার্মাসিউটিক্যালস, ফ্রিল্যান্সিং ও সার্ভিস খাত দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। কিন্তু বিদ্যমান শিক্ষাক্রম এখনো তথ্যভিত্তিক ও পরীক্ষাকেন্দ্রিক। ফলে শিল্প খাতের চাহিদা ও শিক্ষাব্যবস্থার আউটপুটের মধ্যে ‘স্কিল মিসম্যাচ’ তৈরি হচ্ছে। এই অসামঞ্জস্য দূর করতে শিক্ষাক্রম রিভিউ অপরিহার্য। আশার কথা হচ্ছে, শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন দায়িত্ব গ্রহণের পরই কারিকুলাম রিভিউয়ের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। আমরা মনে করি, বিদ্যমান বাস্তবতা এবং সম্ভাব্য চাহিদাকে বিবেচনায় নিয়ে তিন থেকে পাঁচ বছর অন্তর নিয়মিতভাবে কারিকুলাম পর্যালোচনা করা উচিত। কারণ নিয়মিত শিক্ষাক্রম রিভিউ, শিল্প-একাডেমিয়া সংযোগ জোরদারকরণ এবং কারিগরি ও প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা সম্প্রসারণ ছাড়া তারুণ্য স্ফীতিকে উৎপাদনশীল মানবসম্পদে রূপান্তর করা সম্ভব নয়।

‘শ্রমশক্তি জরিপ ২০২৪’ অনুযায়ী, প্রতিবছর প্রায় ২০-২২ লাখ তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করছে। কেবল সরকারি উদ্যোগে এসব তরুণের জন্য কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা সম্ভব নয়; তাই উদ্যোক্তা সৃষ্টি ও আত্মনির্ভরশীলতা গড়ে তোলাই হবে টেকসই সমাধান। শিক্ষাক্রমে উদ্যোক্তা শিক্ষা, উদ্ভাবন, আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও বাস্তব জীবনভিত্তিক সমস্যা সমাধান অন্তর্ভুক্ত করা হলে তরুণরা শুধু চাকরিপ্রার্থী নয়, বরং চাকরিদাতা হিসেবেও আত্মপ্রকাশ করতে পারবে। এই প্রেক্ষাপটে বর্তমান সরকারের নির্বাচনি ইশতেহারে মাধ্যমিক পর্যায় পর্যন্ত কারিগরি শিক্ষা বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব যথেষ্ট গুরুত্বের দাবি রাখে। কারিগরি শিক্ষা বাধ্যতামূলক করার অর্থ এই নয় যে, সবাইকে একই পেশায় সীমাবদ্ধ করা হবে; বরং প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে অন্তত একটি প্রযুক্তিনির্ভর ও ব্যবহারিক দক্ষতায় প্রশিক্ষিত করা হবে। কেউ উচ্চশিক্ষায় যাবে, কেউ উদ্যোক্তা হবে, কেউ সরাসরি কর্মসংস্থানে যুক্ত হবে; কিন্তু সবার হাতে থাকবে একটি নির্দিষ্ট দক্ষতা। প্রযুক্তি বিপ্লবের যুগে এটিই হতে পারে ন্যূনতম প্রস্তুতি।

তবে কেবল বাধ্যতামূলক ঘোষণা যথেষ্ট নয়, এর জন্য প্রয়োজন শিল্প খাতের চাহিদা বিশ্লেষণ করে শিক্ষাক্রম নিয়মিত রিভিউ ও হালনাগাদকরণ। কারণ বর্তমান বিশ্বে কর্মসংস্থানের ধরন দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। অর্থনীতি প্রতিনিয়ত নতুন ধরনের দক্ষতার চাহিদা তৈরি করছে। এই বাস্তবতায় শিক্ষাব্যবস্থাকে শুধু জ্ঞান প্রদানকারী নয়, বরং দক্ষতা ও উদ্ভাবনমুখী হতে হবে। এক্ষেত্রে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষাকে মর্যাদা ও আধুনিকায়নের মাধ্যমে আরো কার্যকরভাবে সাজাতে হবে। নিয়মিত শিক্ষাক্রম রিভিউ, শিল্প-একাডেমিয়া সংযোগ জোরদার এবং কারিগরি ও প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা সম্প্রসারণ ছাড়া তারুণ্য স্ফীতিকে উৎপাদনশীল মানবসম্পদে রূপান্তর করা সম্ভব নয়। এ অবস্থায় চালু করতে হবে দক্ষতাভিত্তিক মূল্যায়ন। তাছাড়া প্রশিক্ষিত শিক্ষক ও আধুনিক ল্যাব সুবিধা নিশ্চিত করা না হলে এই উদ্যোগ কার্যকর হবে না।

আমাদের মনে রাখতে হবে, তারুণ্য স্ফীতি সময়সীমাবদ্ধ সুযোগ। আজকের তরুণ যদি দক্ষতায় সজ্জিত না হয়, আগামী দিনে সে প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতিতে পিছিয়ে পড়বে। মাধ্যমিক পর্যায় পর্যন্ত কারিগরি শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা এবং তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নিয়মিত শিক্ষাক্রম রিভিউ—এই দুই পদক্ষেপই হতে পারে চাহিদাভিত্তিক শিক্ষার দৃঢ় ভিত্তি। এখন প্রয়োজন সাহসী নীতি ও কার্যকর বাস্তবায়ন, যাতে প্রযুক্তি বিপ্লবের যুগে তারুণ্য হয়ে ওঠে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি।

তবে বিদ্যমান শিক্ষাব্যবস্থায় যেকোনো রকম পরিবর্তন আনার ক্ষেত্রে শিক্ষা ও শ্রমবাজারসংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মতামতকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্যভিত্তিক গবেষণার আলোকে। কারণ শিক্ষাব্যবস্থা একটা জাতির প্রাণশক্তির আধার। শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যেই প্রতিফলিত হয় জাতির স্বপ্ন। আবার জাতীয় স্বপ্ন পূরণের সম্ভাবনাও বহুলাংশে শিক্ষাব্যবস্থানির্ভর। তাই শিক্ষাব্যবস্থায় সামান্যতম পরিবর্তনেও সর্বোচ্চ সতর্কতার দাবি রাখে।

লেখক : চিফ (ডিএলপি ডিভিশন), বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো, ব্যানবেইস

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন