গত সপ্তাহে বঙ্গভবনের অধিবাসী, দেশের একমাত্র ‘মহামান্যের’ একটি বিশেষ চরিত্রের দৈনিক পত্রিকায় সাক্ষাৎকার পাঠ করে বেজায় আমোদ পেয়েছি। বাংলাদেশের এক ভয়ংকর ফ্যাসিবাদী জামানা সম্পর্কে অন্ধকারে থাকা যে কোনো সরল ব্যক্তি সেই সাক্ষাৎকার পড়ে মনে করবেন, ‘আহা রে, এমন একজন শিশুতোষ ব্যক্তিকে ভিলেন ড. ইউনূস গং কতই কষ্ট না দিয়েছে।’ দিল্লিতে পলাতক, গণহত্যাকারী, আইসিটি মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত শেখ হাসিনার অতি স্নেহধন্য এবং বাংলাদেশের ‘টপ লুটেরাদের অন্যতম’ এস আলমের সব কাজের কাজি, ব্যক্তিটি সম্পর্কে আমার আগের একাধিক লেখা এবং কনক সরওয়ারের ইউটিউব চ্যানেলের টক শোতে দেওয়া বিশ্লেষণ উৎসাহী পাঠক কষ্ট করে আর্কাইভ খুঁজলেই পেয়ে যাবেন।
আজকের মন্তব্য প্রতিবেদনে সেসব লেখালেখি ও বক্তব্যের খানিকটা পুনরাবৃত্তি প্রসঙ্গক্রমেই চলে আসবে। আমার অবস্থানের কোনো পরিবর্তন হয়নি। এক কথা বারবার বলা এবং শোনা মহাবিরক্তিকর হলেও, বাঙালি মুসলমানের মতো বিস্মৃতিপ্রবণ জাতিকে পুরোনো ও নিকট, যাবতীয় অতীত সারাক্ষণ মনে করিয়ে না দিলেই সর্বনাশ। তারা অবলীলাক্রমে বন্ধুকে শত্রু এবং শত্রুকে বন্ধু বানিয়ে ফেলবে। মহামান্য এবং তার ‘হ্যান্ডলাররা’ বাঙালি মুসলমানের এই সহজাত দুর্বলতার কথা জানেন বলেই বিপ্লবের দুই বছর পূর্ণ না হতেই তারা ফ্যাসিবাদকে জায়েজ, বিপ্লবকে বিতর্কিত এবং ফ্যাসিবাদের ঘৃণ্য দোসরদের মজলুম বানানোর বয়ান নির্মাণে নেমে পড়েছেন।
বিশেষভাবে লক্ষ করার মতো বিষয় হলো, যে পত্রিকাটি মহামান্যকে ‘প্রচার’ করার মিশনে এগিয়ে এসেছে সেটি পতিত ফ্যাসিবাদ সমর্থক, দেশের অন্যতম বৃহৎ একজন অলিগার্কের মালিকানাধীন। হাসিনার পতন ও পলায়নের সপ্তাহখানেক আগে, জুলাই বিপ্লবের চূড়ান্ত মুহূর্তে সেই অলিগার্ক দেশের অন্যান্য অলিগার্ককে সঙ্গে নিয়ে তৎকালে ক্ষমতাসীন ‘মহারানি’র দপ্তরে গিয়ে তার
ভাষায়, ‘বিএনপি-জামায়াতের সন্ত্রাসের’ বিচার দাবি করে বলেছিলেন, “২০০০-এর আগেও বিএনপি-জামায়াত অনেক কিছু করেছে। জানি না কতদূর বিচার হয়েছে? তাদের যদি আজকে বিচার হতো তাহলে আজকে সাহস পেত না। আমার মনে হয় সেইগুলি বিচারের আওতায় আনেন।... আমাদের সামনে উন্নয়ন আর উন্নয়ন। আমি মাঝে মাঝে বলি কারফ্যুটা আরো আগে দেয়া উচিত ছিল।... আরো এক মাস ব্যবসা বন্ধ থাকলে কিচ্ছু হবে না। কিন্তু আমাদের এই সন্ত্রাসী, এই জঙ্গি বাহিনীকে ধ্বংস করতে হবে।... আপনাদের নেতৃত্বের প্রতি আমাদের আস্থা আছে, বিশ্বাস আছে। ইনশাআল্লাহ মৃত্যুর আগের দিন পর্যন্ত তার প্রতি আমাদের আস্থা ও বিশ্বাস। এবং মৃত্যুর পরেও তার প্রতি আমাদের আস্থা ও বিশ্বাস ইনশাআল্লাহ থাকবে।”
বাংলাদেশের অধিকাংশ মধুমক্ষিকা মিডিয়ার চরিত্রানুযায়ী পত্রিকাটি বর্তমানে ক্ষমতাসীন দলের অতি উৎসাহী সমর্থকের ভূমিকা পালন করে চলেছে। এমন একটি পত্রিকার ‘মহামান্যের’ প্রতি অসামান্য উদার আচরণ একেবারে কাকতালীয় ভেবে নেওয়ার কোনো কারণ নেই। এক্ষেত্রে কোথা থেকে কারা, কোন উদ্দেশ্যে কলকাঠি নাড়ছে তা আমার জানা নেই। যাহোক ‘মহামান্য’ প্রসঙ্গে অতি সংক্ষেপে দু-চারটি পুরোনো কথা বলেই ড. ইউনূস সরকার সম্পর্কে আমার মূল্যায়ন জানাবো।
মহামান্যের যাত্রা শুরু হয়েছিল ১৯৮২ সালে ফ্যাসিবাদের ভাই, স্বৈরাচার এরশাদ কলুষিত বিচার বিভাগ থেকে। তার অনুল্লেখ্য জজিয়তির জীবন নিম্ন আদালতেই সমাপ্ত হয়েছিল। তিনি পাদপ্রদীপের আলোয় এসেছিলেন ২০০৮ সালের তেলেসমাতির নির্বাচন-পরবর্তী শেখ হাসিনার আমলে দুর্নীতি দমন কমিশনের সদস্য পদে নিয়োগপ্রাপ্তির মাধ্যমে। সেখানে তিনি মহা দুর্নীতিবাজ আইনমন্ত্রী, এদেশে বিচার বিভাগ ধ্বংসের অন্যতম কারিগর, বর্তমানে গণহত্যার দায়ে আইসিটিতে বিচারাধীন অ্যাডভোকেট আনিসুল হক ও দুদকের ইতিহাসের শীর্ষতম দুর্নীতিবাজ আইনজীবী মোশাররফ হোসেন কাজলের সঙ্গে মিলে লেনদেনের অত্যন্ত লাভজনক এক ‘ট্রয়কা’ গড়ে তোলেন। দুদকের মেয়াদ সমাপ্ত হলে ভবিষ্যৎ ‘মহামান্য’ হাসিনার অর্থকড়ির জোগানদারদের অন্যতম এস আলমের ছত্রছায়ায় আশ্রয় নেন। ব্যাংক পরিচালনা কিংবা অর্থনীতি সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞ এক ব্যক্তি রাতারাতি দখলকৃত ইসলামী ব্যাংকের ভাইস চেয়ারম্যান বনে যান।
তিনি হাসিনা-রেহানা এবং এস আলমের ক্রীড়নক হয়ে ইসলামী ব্যাংক থেকে গ্রাহক, প্রতিষ্ঠান এবং সরকারের সম্পদের বেশুমার লুটপাটে সর্বদা ‘জি হুজুর’ ভূমিকা পালন করলে শেখ হাসিনা বঙ্গভবনের পরবর্তী বশংবদ বাসিন্দার সন্ধান পেয়ে গিয়ে অবৈধ ক্ষমতা চিরস্থায়ী করার মিশনে অনেকটাই চিন্তামুক্ত হয়ে পড়েন। অপ্রত্যাশিত সুসংবাদটি শুনে প্রথম প্রতিক্রিয়ায় ‘মহামান্য’ আমাদের জানিয়েছিলেন যে, বাংলাদেশের বিকারগ্রস্ত রক্তপিপাসু নারী ফ্যাসিস্টের ‘চরণধূলি’ আর নিতে পারছেন না, সেই শোকে তিনি নাকি বড়ই কাতর। একেই তো বলে প্রশ্নাতীত আনুগত্য। হাসিনার মতো বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর চরণধূলি নেওয়ার সেই অপার সৌভাগ্য হবে কি না, আমরা এখনো তা না জানলেও তেলবাজ বাংলাদেশে সবই তো সম্ভব! নায়ক নিয়ে সংক্ষিপ্ত কথার পর এবার ভিলেনের দিকে দৃষ্টি দিচ্ছি।
প্রসঙ্গক্রমে ড. ইউনূসের প্রধান উপদেষ্টা পদপ্রাপ্তি নিয়ে একটি ব্যক্তিগত ঘটনা বলা প্রয়োজন বোধ করছি। ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট যেদিন ড. ইউনূস প্যারিস থেকে ঢাকায় ফিরছিলেন সেদিন আমি ইস্তান্বুলে নির্বাসিত ছিলাম। ঘটনাচক্রে তার ফেরার মুহূর্তে আমি তুরস্কের প্রখ্যাত ইংরেজি নিউজচ্যানেল টিআরটির প্রাইমটাইম সংবাদে বাংলাদেশি রাজনৈতিক বিশ্লেষক হিসেবে মতামত দিচ্ছিলাম। আমি সেদিন বলেছিলাম, ‘জুলাই বিপ্লবের নায়ক প্রফেসর ইউনূস না হলেও, এই সময়ে সরকারপ্রধানের দায়িত্ব নেওয়ার মতো তিনি ছাড়া আর কোনো দ্বিতীয় ব্যক্তি আমাদের কাছে নেই।’
টিআরটিতে দেওয়া বক্তব্যে আমি জুলাই শহীদ, বিশেষ করে আবু সাঈদকে জুলাই বিপ্লবের নায়ক নামে অভিহিত করেছিলাম। পরবর্তী সময়ে কেন যে ড. ইউনূস সাবেক ছাত্র উপদেষ্টা মাহফুজ আলমকে জুলাই বিপ্লবের ‘মাস্টারমাইন্ড’ বানিয়ে ফেলেছিলেন, সেটা তিনিই ভালো জানেন। অরাজনৈতিক ব্যক্তিরা রাজনৈতিক কথাবার্তা বলার সময় যে কতটা অসতর্ক হতে পারেন এবং অতিসরলীকরণ দোষে দুষ্ট হয়ে পড়েন, তার একটা প্রকৃষ্ট উদাহরণ প্রফেসর ইউনূসের বিপ্লবের এই ‘মাস্টারমাইন্ড’ আবিষ্কার। এই অনর্থক আবিষ্কার জুলাই বিপ্লব এবং ব্যক্তি মাহফুজ, দুটোরই ক্ষতি করেছে। যাহোক, সরকার পরিচালনায় অন্তর্বর্তী সরকারের প্রচুর ভুলভ্রান্তি থাকা সত্ত্বেও আমি আজও দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, ড. ইউনূস ব্যতীত অন্য কোনো ব্যক্তি দেড় বছর সরকার চালাতে পারতেন না। বাংলাদেশের সর্বত্র ছড়িয়ে থাকা দিল্লির এজেন্টরা সেই সরকারকে ফেলে দিয়ে একটা প্রতিবিপ্লব অনেক আগেই ঘটিয়ে ফেলতো। পাঠকদের নির্মোহভাবে ইউনূস সরকারের অন্তত নিম্নলিখিত দশটি কাজ মূল্যায়নের অনুরোধ জানাচ্ছি :
১. চোখে চোখ রেখে ভারতকে মোকাবিলা।
২. শেখ হাসিনাকে গণহত্যার অপরাধে মৃত্যুদণ্ড প্রদান।
৩. জুলাই গণহত্যাবিষয়ক জাতিসংঘের প্রতিবেদন প্রকাশ।
৪. ডিজিএফআইর আয়নাঘর থেকে গুমের ভিকটিমদের মুক্তি।
৫. গুম কমিশন প্রতিষ্ঠা।
৬. কুখ্যাত সিরিয়াল কিলার মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানসহ সেনাবাহিনীর খুনি ও দলবাজ কর্মকর্তাদের মানবতাবিরোধী অপরাধে বিচারের মুখোমুখি করা।
৭. আইসিটিকে কার্যক্ষম করা এবং সঠিক ও সাহসী প্রসিকিউটর টিমের নিয়োগ।
৮. ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের কার্যক্রম স্থগিতকরণ।
৯. প্রতিদিন রাস্তার অসংখ্য আন্দোলন মোকাবিলা করে সম্ভাব্য কম সময়ের মধ্যে নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর।
১০. একটি সম্পূর্ণ ধ্বংসপ্রাপ্ত সামষ্টিক অর্থনীতিতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং সার্বিকভাবে সেখানে স্থিতিশীলতা আনয়ন।
মাত্র দেড় বছর সময়ের মধ্যে ড. ইউনূসের কথিত এনজিওগ্রাম সরকার যে উপরোক্ত কাজগুলো সুচারুরূপে সম্পন্ন করতে পেরেছে সেটাই আমার কাছে বিস্ময়কর বোধ হয়। নির্বাচনের পর থেকে বিএনপিতে আশ্রয় নেওয়া আওয়ামী ও ইসলামবিদ্বেষী গুপ্তদের ড. ইউনূস সম্পর্কে উদ্ধত, অশালীন মন্তব্য শুনে পরিতাপের সঙ্গে আরো মনে হয়, এই পোড়া দেশে কেউ যেন নিজের খেয়ে বনের মোষ তাড়াতে না আসে। সর্বদা হাসিনার শোকে কাতর এক সাংবাদিক নামধারী আধাবৃদ্ধ সেদিন এক টেলিভিশন চ্যানেলে বলছিলেন, রাস্তাঘাটের অপরিচিত যেকোনো লোকও নাকি ড. ইউনূসের চেয়ে ভালো দেশ চালাতে পারতেন।
ফ্যাসিবাদের দোসর এই দলবাজ ক্লাউনগুলোকে বাংলাদেশের অনুতাপবিহীন সব মিডিয়া বিপ্লবোত্তর বাংলাদেশে টক শো স্টার বানিয়েছে। এদেশের মিডিয়ার চরিত্র বোধহয় কেউ আর পাল্টাতে পারবে না। বিএনপিপন্থি টক শো স্টাররা দেড় বছর ধরে অনবরত নালিশ করে গেছেন যে, কেন ড. ইউনূস বিপ্লবের নব্বই দিনের মধ্যেই নির্বাচন দিয়ে ক্ষমতা থেকে বিদায় নিলেন না? সংকীর্ণ দলীয় চিন্তাধারায় একেবারে অন্ধ না হলে কারো পক্ষে এমন ঢালাও, চরম অকৃতজ্ঞ এবং সম্পূর্ণ অযৌক্তিক মন্তব্য করা সম্ভব নয়।
আজকে যারা জাতীয় পতাকা উড়িয়ে গাড়ি চালাচ্ছেন, ফ্যাসিস্ট আমলে তাদের বিরুদ্ধে দেওয়া সাজা এবং মামলাগুলো অন্তর্বর্তী সরকার আইনগতভাবে নিষ্পত্তি না করলে তারা যে কেউ সেই তড়িঘড়ির নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতেই পারতেন না, সেটাও সবাই কী চমৎকারভাবেই না ভুলে গেছেন। আমি আইনবিদ না হলেও ১২৫টি মামলা মোকাবিলা, দীর্ঘদিনের রিমান্ড ও জেলখাটার অভিজ্ঞতা থেকে জোরের সঙ্গে বলতে পারি, যত দ্রুততা ও আন্তরিকতার সঙ্গে সদ্য বিদায় নেওয়া সরকার আজকের ক্ষমতাসীনদের আইনগত জটিলতা দূর করেছে, তার দ্বিতীয় কোনো উদাহরণ দেশে এবং দেশের বাইরে কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবে না।
ড. ইউনূসের সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত কোনো সম্পর্ক, বন্ধুত্ব, কিংবা যোগাযোগ কখনো ছিল না। তিনি সর্বদা সুশীল ও ‘সেক্যুলার’ পরিবেষ্টিত থেকেছেন আর আমি বাংলাদেশের নব্বই ভাগ বাঙালি মুসলমানের সাংস্কৃতিক সংগ্রামে একনিষ্ঠ থেকেছি। আমি জন্ম থেকে ‘এলিটিজম’ বিরোধী একজন আমজনতা। এক-এগারো থেকেই ড. ইউনূস এবং আমার পথ সম্পূর্ণ আলাদা। সেই সময় তার দল করার প্রচেষ্টার বিরোধিতা করেছি। প্রফেসর ইউনূসের সঙ্গে জীবনে সাকুল্যে চারবার সাক্ষাৎ হয়েছে। প্রথমবার নব্বই দশকে আমি যখন বাংলাদেশের বৃহত্তম সুতাকলের প্রধান নির্বাহী ছিলাম। তিনি সেই প্রতিষ্ঠানে তার গ্রামীণ চেকের জন্য সুতা কিনতে এসেছিলেন।
২০০৩ সালের দিকে বিনিয়োগ বোর্ডের নির্বাহী চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালনকালে গ্রামীণ ফোনের প্রথম মিলিয়ন গ্রাহকপ্রাপ্তি অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হয়ে সোনারগাঁও হোটেলে গেলে দ্বিতীয়বার দেখা। তৃতীয়বার তার মিরপুরের গ্রামীণ সেন্টারে ‘ওয়ার্কিং লাঞ্চের’ দাওয়াতে গিয়েছিলাম। হাসিনার সঙ্গে তার বিপদ তখন কেবল শুরু হয়েছে। সালটা বোধহয় ২০১১। আমি প্রথমবার জেল খেটে সদ্য মুক্তি পেয়েছি। তিনি সেই মধ্যাহ্নভোজে সরকারের হুমকি মোকাবিলায় তার করণীয় সম্পর্কে আমাদের পরামর্শ চেয়েছিলেন। আমি ছাড়া সংবাদমাধ্যমের আরো দুজন সেদিন আমন্ত্রিত ছিলেন। যতদূর মনে পড়ে, তার মধ্যে একজন ফ্যাসিবাদের দোসর ডাকসাইটে সাংবাদিক নেতাও ছিলেন, যিনি ষোলো বছরে মহাক্ষমতাধর এবং বিপুল বিত্তের মালিক হয়েছিলেন।
ফ্যাসিবাদের উত্থান পর্বে হাসিনা এবং দিল্লির চিহ্নিত দোসর সাংবাদিক নেতা এবং সদ্য জেলফেরত আমার দেশ-এর কথিত ‘ইসলামিস্ট’ সম্পাদককে কেউ একসঙ্গে পরামর্শের জন্য ডাকতে পারে সেটা আমার চিন্তার বাইরে ছিল। আমি ড. ইউনূসের রাজনৈতিক কাণ্ডজ্ঞানের অভাবে রীতিমতো বিষম খেয়েছিলাম। আমার চরিত্র অনুযায়ী সেদিন ড. ইউনূসকে যে পরামর্শ দিয়েছিলাম সেটা তার মনঃপূত হয়নি বলেই ধারণা করছি। “আমি তাকে বলেছিলাম, হাসিনা যে কতটা ভয়ংকর তিনি টের পাচ্ছেন না। তার সামনে দুটি পথ আছে। তিনি হাসিনার বিরুদ্ধে লড়াই করতে পারেন অথবা বিশাল আন্তর্জাতিক সমর্থন ও পরিচিতি কাজে লাগিয়ে বিদেশে চলে যেতে পারেন। প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম, লড়াই করলে আমার দেশকে সর্বদা পাশে পাবেন।” সেই অর্থে ড. ইউনূস ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াই না করলেও আন্তর্জাতিক মহলে সম্ভবত ভূমিকা রাখতেন।
সাবেক প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে চতুর্থ এবং সর্বশেষ দেখা ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে একুশে পদকপ্রাপ্তি অনুষ্ঠানে। ক্ষমতায় থাকাকালে তিনি দুবার মাত্র কয়েক মিনিটের জন্য আমাকে ধন্যবাদ দিতে ফোন করেছিলেন। তার সরকারের নানা ধরনের সংকটকালে আমার সম্পাদিত পত্রিকার ভূমিকায় তিনি প্রীত হয়েছিলেন। বিশেষ করে, ভারতীয় হেজেমনি মোকাবিলায় আমার দেশ তার সরকারের পাশে ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু রাজনীতি ছাড়া যে রাষ্ট্র কিংবা সরকার কোনোটাই চলে না এই সহজ কথাটাই ড. ইউনূস বুঝতে পারেননি। তিনি কোনো দলের প্রতি ইচ্ছাকৃতভাবে পক্ষপাতমূলক আচরণ না করলেও তার সরকারের সার্বিক কর্মকাণ্ডে নিঃসন্দেহে বিএনপি সবচেয়ে বেশি লাভবান হয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের মধ্যে বিএনপিপন্থিদের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতাও ছিল। সেই সরকারের দুজন প্রভাবশালী ব্যক্তি ইতোমধ্যে নির্বাচিত সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী হয়েছেন। অথচ সরকারে থাকাকালীন এবং এখন সরকারের বাইরে গিয়েও ড. ইউনূস নব্য এবং পুরোনো তাবৎ কিসিমের বিএনপিপন্থিদের নির্মম, অন্যায় এবং অশালীন সমালোচনার শিকার হয়েছেন ও হচ্ছেন। হয়তো রাজনৈতিক দরকষাকষিতে লেনদেনের বিষয়টি তার মাথায় আসেনি। আমার ধারণা, নিজেকে এবং তার অন্তত কয়েকজন সহকর্মীকে তিনি অরক্ষিত রেখে যমুনা ত্যাগ করেছেন।
ভিলেন প্রফেসর ইউনূস এবং নায়ক মহামান্যের মধ্যকার বয়ান নির্মাণের লড়াইয়ে এস্টাবলিশমেন্টপন্থি মিডিয়া যে নায়কের পক্ষে থাকবে সেটা পরিষ্কার হয়ে গেছে। উপরের নির্দেশে তারা নির্দিষ্ট মিশন নিয়ে নেমেছে। সুশীল মিডিয়াও বহু আগেই প্রফেসরকে ছেড়ে গেছে। পুরোনো বন্ধু ইউনূসকে দিয়ে তাদের সব আশা হয়তো পূরণ হয়নি।
গত এক সপ্তাহে বর্তমান সরকার প্রকাশ্যেই মহামান্যের হাত শক্তিশালী করার উদ্যোগ নিয়েছে। তার অভিমান ভাঙাতে বঙ্গভবনে একজন প্রেস সচিব নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। বিচিত্র বাংলাদেশে ড. ইউনূসরা ভিলেন হবেন সেটাই প্রত্যাশিত। কিন্তু আমরা অবিচলভাবে সর্বদা থাকব ইতিহাস, জুলাই বিপ্লব ও সত্যের পক্ষে। কারণ কারো সঙ্গে আমাদের কখনো কোনো লেনদেন ছিল না। আমার দেশ আত্মসমর্পণ অথবা আপস করে না।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

