আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

নির্বাচন : প্রতিপক্ষ নির্মূল মানসিকতা

আমীর খসরু

নির্বাচন : প্রতিপক্ষ নির্মূল মানসিকতা

প্রায় দুই দশক পরে বাংলাদেশে একটি অবাধ, সুষ্ঠু, কোনো চাপবিহীন, দেশি-বিদেশি প্রভাবমুক্ত, নিরপেক্ষ, প্রশ্নাতীতভাবে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে বলে আশাবাদের সৃষ্টি হয়েছিল। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান ড. ইউনূসের পক্ষ থেকে ‘ঐতিহাসিক’ এক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে বলে যে আশ্বাস দেওয়া হয় এবং তাতে মানুষের মনে যে আশাবাদের জন্ম হয়েছিল, সম্ভাবনা দেখা দিয়েছিলÑতাতে ক্রমাগত ফাটল এবং ভাঙনের দৃশ্যমানতা স্পষ্ট হচ্ছে। দুই দশক পরে বললাম এই কারণে যে, ২০০৮ সালের নির্বাচনটি সেনাশাসনের আড়ালে কথিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নামে বহিঃশত্রুর প্রভাবে যে প্রভাবিত এবং ‘পাতানো’ ছিল, তা বুঝতে কিছুটা সময় লেগেছিল। ২০১৪ সালের নির্বাচনে বহিঃদেশীয় শক্তিগুলোর খেলা এমনপর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, এক. ভারতীয় তৎকালীন পররাষ্ট্র সচিব সুজাতা সিংয়ের ‘কূটনৈতিক রীতিনীতির তোয়াক্কা’ না করে ঢাকায় প্রকাশ্যে বৈঠকসহ নানা কর্মকাণ্ড, দুই. বাংলাদেশের নির্বাচনের ভাগ্য নিয়ন্ত্রণের জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের এবং ভারতীয় কর্তৃপক্ষের ‘দিল্লি বৈঠক’ অনুষ্ঠান; মানুষের কাছে আমাদের ভোটাধিকারের মালিকানা আর আমাদের হাতে নেই এমন এক সত্য প্রথমবারের মতো উপলব্ধি করে। বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের ভাগ্য নির্ধারণÑদেশে হয় না, হয় বিদেশিদের দ্বারা, বিদেশিদের ইচ্ছামতো আর এমন অসহায়ত্ব কখনোই দেখেনি কেউই। ২০১৮, ২০২৪-এর নির্বাচন ছিল আরো জঘন্য এবং নিকৃষ্টমানের।

বাংলাদেশ নামক ভূখণ্ডটির মানুষের এমনই দুর্ভাগ্য যে, এ দেশের মানুষের সম্মিলিত রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ইতিহাস কখনোই মসৃণ ছিল না। ১৯৫৪ সালের প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচন ছাড়া আর সত্যিকারের নির্বাচনের স্বাদ আর কখনোই পায়নি।

বিজ্ঞাপন

১৯৭০-এর নির্বাচন সম্পর্কে আমার মতো অনেকেই হয়তো বিশ্বাস করেন যে, ওই নির্বাচনটি নামে সাধারণ নির্বাচন বা জাতীয় পরিষদ নির্বাচন হলেও প্রকৃত রাজনৈতিক বিচারে ওটি ছিল ‘নতুন দেশপ্রাপ্তির লক্ষ্যে, নয়া রাজনৈতিক বন্দোবস্তের’ জন্য প্রত্যাশিত এবং কাঙ্ক্ষিত বিপ্লবী চেতনায় সমৃদ্ধ মানুষের ‘গণভোট’। না হলে আওয়ামী লীগের ৭৪ দশমিক ৯ শতাংশ অর্থাৎ ৭৫ শতাংশ ভোট পাওয়া এবং ভোটদানকারীর সংখ্যা ছিল ৫৭ দশমিক ৬৮ শতাংশ, অর্থাৎ এক কথায় ইতিহাস সৃষ্টিকারী ঘটনা ছিল। ওই নির্বাচনে মওলানা ভাসানীর দল ন্যাপ কার্যত আওয়ামী লীগকে সমর্থন দিয়ে নির্বাচন থেকে দূরে ছিল। ওই নির্বাচনে শুধু জামায়াত ৬ শতাংশ ভোট পায়। অন্য দলগুলো কেউই ৩ শতাংশের বেশি ভোট পায়নি। তবে পাকিস্তান সৃষ্টির দল মুসলিম লীগকে মানুষ চিরতরে বিদায় জানায় এই কারণে যে, তাত্ত্বিকভাবে যাকে ইতিহাসের শুদ্ধিকরণ বা দণ্ড প্রদান কার্যক্রম বলা যায়। কারণ মুসলিম লীগের জনবিচ্ছিন্ন কতিপয়ের ও অভিজাততন্ত্রবাদী শাসনকে মানুষ আর রাজনৈতিক দৃশ্যপর্বে দেখতে চায়নি। এই কারণে মুসলিম লীগের উত্থান এবং পতন থেকে শিক্ষা নেওয়াটা জরুরি।

এর পরের অর্থাৎ বাংলাদেশ নামের দেশ পাওয়ার পরে দু-একটি বাদে আর কোনো নির্বাচন অর্থাৎ ১৯৭৩ সালের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনসহ কোনো নির্বাচনই প্রশ্নের ঊর্ধ্বে উঠতে পারেনি। ১৯৭৩ সালের প্রথম নির্বাচনেই ভোট কারচুপির ঘটনা ঘটে। নির্বাচনের ইতিহাস পর্যালোচনায় ১৯৭৩-এর নির্বাচন সম্পর্কে বলা যায়, মুক্তিযুদ্ধের মাত্র দুই বছরের মাথায় এসে এই নির্বাচনের মাধ্যমে তৎকালীন আওয়ামী লীগই সরকার গঠন করত। তবে ৩০০ আসনের মধ্যে ২৯৩টি আসনে বিজয় ওই সময়ের রাজনৈতিক বাস্তবতায় সম্ভব ছিল কি নাÑসে বিষয়টি বড় একটি প্রশ্নসাপেক্ষ বিষয়। যার কারণে ওই প্রথম এ দেশে বিরোধী দল, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল এবং মওলানা ভাসানীর ন্যাপের সম্ভাব্য বিজয়ী প্রার্থীদের অপহরণ, ব্যালট বাক্স ছিনতাইয়ের মতো ঘটনার মধ্য দিয়ে এ দেশের ইতিহাসের ‘প্রথম কারচুপির’ নির্বাচনটি অনুষ্ঠিত হয়। রাজনীতিতে বিরোধী দল মতকে সহ্য করতে না পারার এমন প্রবণতাকে ‘রাজনৈতিক নির্মূল বা বিলোপ তত্ত্ব বা Politacal Eliminaton Theory’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

১৯৭৩ সালেই জরুরি অবস্থা জারির বিধানাবলি-সংবলিত সংবিধানের তৃতীয় সংশোধনী বিল পাস হয়। এতে ইচ্ছামতো আটক এবং গ্রেপ্তারের বিধানাবলি সংযুক্ত করা হয়। আর এর মাধ্যমে সূচনা হয় স্বৈরাচারী শাসনের। ভবিষ্যতে এ বিষয়গুলো নিয়ে বিস্তাতি লেখার ইচ্ছা রইল।

তবে একটি বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন হয় যে, ১৯৭৩ সালের নির্বাচনের সঙ্গে সম্পৃক্ত কার্যক্রম কয়েকটি বিষয় প্রমাণ করে যে, ১৯৭১-এর ‘মুক্তিযুদ্ধ’ অর্থাৎ রক্তাক্ত, সশস্ত্র বিপ্লবকে অস্বীকার করে জনমানুষের ‘নতুন দেশের নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত’ আসলে যা ছিল মানুষের বিপ্লবী আকাঙ্ক্ষা তাকে ভন্ডুল, লন্ডভন্ড এবং বাতিল করার অনিবার্য ফল হচ্ছেÑএক. স্বৈরতান্ত্রিক বিষবৃক্ষের ক্রমাগত বৃদ্ধি লাভ, দুই. জনবিচ্ছিন্নতা, তিন. তীব্র অবিশ্বাস এবং চার. এর ফলে সৃষ্ট হতাশা এবং আকাঙ্ক্ষার আপাতঃ ইতিটানা।

এরপর অনাকাঙ্ক্ষিত কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে সামরিক শাসন, কখনো কখনো বেসামরিক সরকার, আবার অগণতান্ত্রিক সরকারÑএমন এক বৃত্তবন্দি অবস্থায় বাংলাদেশ চলতে থাকে। ১৯৭৫-এর পর বহুদলীয় সরকার ব্যবস্থায় প্রত্যাবর্তনসহ ওই সময়ের কথায় বিস্তারিত আলোচনা পরে একসময় করা হবে। তবে জেনারেল জিয়াউর রহমানকে এবং তার শাসনকালকে শুধু ‘বহুদলীয় শাসনব্যবস্থার নায়ক’ হিসেবেই চিহ্নিত করা উচিত হবে না। তাকে একই সঙ্গে অনেকগুলো কাজ করতে হয়েছেÑএক. স্বৈরতান্ত্রিক একদলীয় শাসন থেকে বহুদলীয় শাসনব্যবস্থায় প্রত্যাবর্তনের কাজ, দুই. সম্প্রসারণবাদী এবং আধিপত্যবাদী ভয়াল থাবা মোকাবিলা এবং প্রতিনিয়ত তাদের কর্মকাণ্ডকে প্রতিহত করা, তিন. সেনাবাহিনীর মধ্যকার দ্বন্দ্ব নিরসন এবং চেইন অব কমান্ড পুনঃপ্রতিষ্ঠা, চার. রাজনৈতিক অনৈক্য, বিভাজন নিরসন করে জনআকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ আদি অকৃত্রিম একান্ত আপন দেশজ নির্ভেজাল ‘রাজনৈতিক কাঠামোর’ আওতায় নিয়ে এসে রাজনৈতিক স্বতন্ত্র ধারা প্রতিষ্ঠা, পাঁচ. দিশেহারা মানুষকে আশার পথ এবং পদ্ধতি শেখানো এবং দেখানো, ছয়. উন্নয়ন এবং রেল লাইনচ্যুত রেলগাড়িকে অর্থাৎ দেশকে সচল করার কাজগুলো করতে হয়েছে বৈরী সময়কে পাশ কাটিয়ে। এর মধ্যে নির্বাচন ওই সময়ে যা কিছু হয়েছে, তাকে বড় বা ছোট করে দেখানোর কিছু আছে বলে অন্তত আমার কাছে মনে হয় না। তবে ১৯৭৯-এর নির্বাচন অর্থাৎ দ্বিতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে কোনো কারচুপির অভিযোগ শোনা যায় না। আর ওই নির্বাচনে ক্ষমতাসীন হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল ৪১ দশমিক ১৭ শতাংশ ভোট পেয়েছিল। উল্টোদিকে বিতর্কিত এবং কারচুপির দায়ে দায়ী ১৯৭৩-এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পেয়েছিল ৭৩ দশমিক ২০ শতাংশ। আসনসংখ্যার হিসাবে ১৯৭৩ সালে আওয়ামী লীগ পেয়েছিল ৩০০ আসনের মধ্যে ২৯৩টি এবং বিরোধী দলগুলো দুটি এবং স্বতন্ত্র পেয়েছিল পাঁচটি। আর ১৯৭৯-এর নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে ক্ষমতাসীন বিএনপি ২০৭টি। ‘নতুন মোড়কের’ আওয়ামী লীগ ৩৯টি (ভোটসংখ্যা ২৪ দশমিক ৫৬ শতাংশ)। জামায়াত নিষিদ্ধ থাকায় নতুন নামে অর্থাৎ ইসলামিক ডেমোক্রেটিক লীগ ও অতিক্ষুদ্র মুসলিম লীগ ২০টি (ভোটসংখ্যা ২৪ দশমিক ৫৬ শতাংশ)। জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল আসন পায় আটটি (ভোটসংখ্যা ৪ দশমিক ৮৩ শতাংশ)। এছাড়া আওয়ামী লীগ (মিজান গ্রুপ) দুটি, ন্যাপ (মোজাফফর) একটি, বাংলাদেশ গণফ্রন্ট দুটি, নতুন দল কমিউনিস্ট পার্টি (এমএল) একটি, (বর্তমান সিপিবি নয়)। জাতীয় লীগ দুটি, জাতীয় একতা পার্টি একটি এবং স্বতন্ত্র ১৬টি আসন (ভোটসংখ্যা ১০ দশমিক ১৯ শতাংশ)। ৭৯-এর নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতির সংখ্যা ছিল ৫১ দশমিক ২৯ শতাংশ।

এই সংখ্যা এবং আসনভিত্তিক বিশ্লেষণটি এই কারণে করা হলো যে, ক্ষমতাসীন থাকা অবস্থায় যাকে প্রধান দুটি রাজনৈতিক দল না বলে রাজনীতির ধারা হিসেবে চিহ্নিত করা বাঞ্ছনীয়, তাদের রাজনৈতিক মনস্তাত্ত্বিক অবস্থার চিত্র তুলে ধরা। কেন আলাদা দুটো রাজনৈতিক ধারা বলা হয়েছে, সে সম্পর্কে এখন শুধু এতটুকুই বলা চলে যে, আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ভিত্তিভূমির পরিপ্রেক্ষিতে ‘আধিপত্যবাদী এবং সম্প্রসারণবাদী’ শক্তির সঙ্গে বন্ধুত্ব, মৈত্রী এবং জাতীয় প্রতিরক্ষা, নিরাপত্তা ক্ষেত্রের হুমকির ঝুঁকি উপলব্ধিকে (Threat Perception) কীভাবে দেখা হয়? আর জিয়াউর রহমান থেকে শুরু করে খালেদা জিয়ার আমল পর্যন্ত এ বিষয়টিকে কীভাবে দেখা হতো? এটি প্রতিরক্ষাব্যবস্থার নিরিখে খুবই ছোট্ট এবং নিরীহ বিষয় মনে হলেও বাস্তবে বিশাল বিভাজনের একটি মানদণ্ড তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এছাড়া এই বিষয়ের মধ্যে জাতীয়তাবাদের ধারণা একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ নির্ধারক এবং নির্ণায়ক। বাঙালি জাতীয়তাবাদ থেকে কেন বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ আলাদা, সে বিষয়গুলো প্রকৃতার্থে বুঝতে না পারলে বাংলাদেশের রাজনীতির বিভাজন এবং এ সম্পর্কিত বিপরীতমুখী ও আলাদা ‘ধারা’ কেন সে বিষয়গুলো বোঝা যাবে না।

বর্তমান নির্বাচন সম্পর্কিত বিচার-বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে এ বিষয়গুলো জরুরি। তবে জিয়াউর রহমানের বিএনপি এবং খালেদা জিয়ার বিএনপির মধ্যেও একটি পার্থক্য বিদ্যমান। এটা আদর্শের, মতাদর্শিক রাজনীতির বা প্রতিরক্ষা নিরাপত্তা ঝুঁকির ক্ষেত্রে নয়, রাজনৈতিক বাস্তবতার। অর্থাৎ জিয়ার বিএনপির জন্ম এবং বেড়ে ওঠা ক্ষমতার হাত ধরে, এরই মধ্যে। এর নেতাকর্মীরা নানা কারণে ওই দলটিতে জড়ো হয়েছিলেন। তবে তারা সময়ের এবং কঠিন বাস্তবতার নিরিখে পরীক্ষিত ছিলেন না। যার অনিবার্য ফল জিয়া-উত্তর সময়ে অর্থাৎ স্বৈরাচারী এরশাদ সরকারের উত্থানে। লন্ডভন্ড দিশেহারা বিএনপিকে এক কঠিন বাস্তবতার মধ্য দিয়ে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে সময়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েই প্রকৃত ও পরীক্ষিত রাজনৈতিক দল হিসেবে গড়ে উঠতে হয়েছে। আর নেতা এবং কর্মীদের হতে হয়েছে একই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ। এর সঙ্গে সঙ্গে বিএনপির নেত্রীকে ১৯৮৬-এর নির্বাচন বয়কট, ৮৮-এর নির্বাচন পরিপূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান ও রাজপথের আন্দোলন খালেদা জিয়ার নেতৃত্বকে যেমন প্রশ্নাতীতভাবে আপসহীন নেত্রী করেছে, বানিয়েছে ‘কারিসম্যাটিক’ রাজনৈতিক অস্তিত্বের নেতা এবং দলের রাজনৈতিক ক্ষমতার উৎস ও ক্ষমতার ভিত্তি ‘জনসমর্থক’দের সংখ্যা আর আস্থাÑদুই বাড়িয়েছে। এ কথা বলতেই হবে, বহিঃশত্রুর মদতেই জেনারেল এরশাদ ১৯ দফার আদলে ১৮ দফা এবং বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের ও রাজনৈতিক ধারার মধ্যে ভাগাভাগির চেষ্টা করেছিল, তাও ফলপ্রসূ হয়নি। ওয়ান-ইলেভেনের অপচেষ্টায় খালেদা জিয়া আপসহীন থাকলেও দলের অনেক নেতা ‘ক্ষমতাসীনতার হ্যাংওভার বা মৌতাত ও ঘোর’ কাটিয়ে উঠে পরিস্থিতি সামাল দিতে পারেননি। আর ২০০১ থেকে ২০০৬-এর বিএনপির সুনির্দিষ্ট একটি অঙ্কের বিরুদ্ধে বড় ধরনের দুর্নীতি এবং অনানুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমতায় হস্তক্ষেপ, প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ ওঠে, যা পরবর্তী সময়ে এবং তখনই নেতিবাচক বয়ান হিসেবে প্রতিপক্ষ প্রচার করতে থাকে। এতে তারা সফলও হয়। এর পাল্টা বয়ান হিসেবে বেগম খালেদা জিয়া প্রাণপণ চেষ্টা করলেও ব্যর্থ হন।

ওয়ান-ইলেভেন থেকে শুরু করে যেসব ঘটনাবলি ঘটেছে, তার পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে ঘুরে দাঁড়ানোর মতো কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব পুরোপুরি অনাগ্রহী মনোভাব এবং অক্ষমতার পরিচয় দিয়েছেন। তাদের সক্ষমতার অভাবে খালেদা জিয়া হয়ে পড়েন ‘একাকী’ এবং ‘নিঃসঙ্গ শেরপা’।

কর্মীরা লড়াকু থাকলেও ২০১৪, ২০১৮ নির্বাচনসহ আন্দোলন ব্যর্থ হওয়ায় কেন্দ্র বনাম স্থানীয় পর্যায় এবং নেতা বনাম কর্মীদের বিস্তর ফারাক আর দলের সমর্থক অর্থাৎ দলের রাজনৈতিক ক্ষমতার উৎস এবং ভিত্তির হতাশা খালেদা জিয়ার বিএনপিকে কার্যত বদলে দিয়েছে। খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে দলমত-নির্বিশেষে ‘হারানোর বেদনা’ এবং অনুপস্থিতির তীব্র অভাবের মনস্তাত্ত্বিক শূন্যতার সামান্য একটি নমুনা হচ্ছে ঐতিহাসিক জনসমুদ্রের জানাজা। কথা যত তেতো কিংবা অপছন্দেরই হোকÑএই বাস্তবতার উপলব্ধি ছাড়া নির্বাচনের রাজনীতির অঙ্ক মেলানো যাবে না।

নির্বাচনের মাঠে বর্তমানে তারেক রহমানের বিএনপি। এই বিএনপি খালেদা জিয়ার কিংবা জিয়াউর রহমানের বিএনপির থেকে কেন আলাদা বা ভিন্ন সে বিষয়টিও ভেবে দেখতে হবে। উত্তরাধিকারের রাজনীতি যত কার্যকরই হোক না কেন, ব্যক্তি আর ব্যক্তিত্ব, নেতার নেতৃত্বও আলাদা। কারণ রাজনীতির ময়দানে ক্লোন (Clone) বা অনুকৃতি বা হুবহু প্রতিলিপি অথবা ‘একই রকম’ বলতে কিছু নেই। তবে এ কথাও সত্য যে, বিএনপি কমবেশি জনসমর্থনপুষ্ট অবস্থায়ই আছে। তবে নতুন প্রধান নেতৃত্বের অদল-বদলের কারণে দলের গুণগত অথবা মানগত পার্থক্য কতটা বদলায়, তা নির্বাচনেই কিছুটা দেখা যাবে আর পুরোটা দেখতে কিছুটা সময় অপেক্ষা করতে হবে।

সঙ্গে সঙ্গে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং উল্লেখযোগ্য বিষয় হিসেবে যা দেখতে হবে, তা হলোÑপ্রধান নেতৃত্বের বদলের সঙ্গে সঙ্গে দলের মতাদর্শিক, ধারণাগত মৌলিক বাঁকবদল অথবা যুগান্তকারী গভীর পরিবর্তন হয় কি না। উদাহরণ হিসেবে, দলের মূল গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি যেমন পররাষ্ট্রনীতি ও প্রতিক্রিয়া, জাতীয় নিরাপত্তাসহ থ্রেট পারসেপশন বা জাতীয় হুমকির ঝুঁকি উপলব্ধি দেশীয় এবং বহিঃদেশীয় শত্রু-মিত্র বাছাই এবং নির্ধারণে বড় ধরনের রদবদল হয় কি নাÑসে বিষয়গুলো যেমন সবাই মনোযোগের সঙ্গে লক্ষ রাখছেন ও রাখবেন এবং পর্যবেক্ষণ করবেন, ঠিক তেমনি অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক বিষয়সহ সামগ্রিক বিষয়গুলো পর্যবেক্ষণের মধ্যে থাকবে।

দলের অনানুষ্ঠানিক প্রধান ব্যক্তি হিসেবে এতদিন প্রবাস থেকে দেওয়া নেতৃত্ব আর দলের আনুষ্ঠানিক প্রধান হিসেবে দেশে এসে সরেজমিনে রাজনীতির ময়দানে থাকার মধ্যকার পার্থক্যটুকু কারো নজর এড়াবে নাÑএ কথাটি সত্যি। এর ওপরে রয়েছে নির্বাচনের মতো ‘মহাপরীক্ষা’।

বিএনপি যেহেতু বাংলাদেশের রাজনীতির অন্যতম প্রধান শক্তি, সেহেতু ২০২৪-এর জুলাই-পরবর্তী সময়ের পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতার এবং পরিস্থিতির পরীক্ষায় তাকে অবতীর্ণ হতে হচ্ছে প্রধানত জামায়াতে ইসলামী, এনসিপিসহ ১১-দলীয় জোটের বিপক্ষে।

জামায়াত সম্পর্কে বলতে গেলে বলতে হবে, ১৯৭১-এর যুদ্ধাপরাধের দায়ে যাদের দায়ী বলে চিহ্নিত করা হয়েছিল, তাদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এই বিচারকাজ করেছে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীনও সরকার। আর ১৯৭১-এর দালাল বিচারে ১৯৭২-এর জানুয়ারিতে গঠিত ‘Bangladesh Colaborators special tribunal’ গঠিত হলেও তৎকালীন ক্ষমতাসীনদের নানা জটিলতায় এবং এর কার্যক্রমগত দুর্বলতার কারণে শেষ পর্যন্ত ওই প্রক্রিয়া আর আগায়নি। ১৯৭৩ সালের ৩০ নভেম্বর দালাল আইনে আটককৃত ৩৬ হাজার জনকে সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করা হয়। এরপর ১৯৭৫-এর ৩১ ডিসেম্বর ওই আইনই বাতিল করা হয়। তবে ১৯৭২ সালের ভারত-পাকিস্তান এর মধ্যে স্বাক্ষরিত ‘সিমলা চুক্তির’ প্রভাব যে পুরো প্রক্রিয়ার মধ্যে পড়েছিল, সে বিষয়টিও স্পষ্ট।

এসব আইনের মারপ্যাঁচ বাদ দিলেও জামায়াতকে ১৯৭১-এর বয়ানটির মুখোমুখি বারবার হতে হবে। এসব বাদ দিলেও জামায়াতে ইসলামী এবং এনসিপি সমন্বয়ে গঠিত নির্বাচনি জোট এখন বিএনপির শক্তিশালী প্রতিপক্ষ।

তবে এ কথাটি বলতেই হবে, ২০২৪-এর জুলাই বিপ্লবে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক নারীসহ অংশগ্রহণকারীরা পুরোনো কতিপয়তন্ত্রের এবং অধীনতাকেন্দ্রিক শাসনকাঠামো ভেঙে ‘জনঅংশীদারত্বমূলক নয়া রাজনৈতিক বন্দোবস্তের’ জন্য রক্ত দিয়ে, জীবন দিয়ে লড়াই-সংগ্রাম করেছেন এবং কমপক্ষে ১৪০০ তরুণসহ নানা শ্রেণি-পেশার সাধারণ মানুষ জীবন দিয়েছেন, তাদের ইতিহাসের মহানায়কের মর্যাদার বদলে ভিলেন বা খলনায়ক বানানোর বহুকেন্দ্রিক মহাপরিকল্পনা নির্বাচনের আগে এবং পরে আরো স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান হয়েছে। এই পরিকল্পনা জাতির জন্য সর্বনাশী এবং ভয়ংকর, তা অস্বীকার অথবা বুঝতে না চাওয়ার দায় সাধারণ মানুষের নয়, এই দায় বর্তাবে শুধু তাদের ওপরে যারা ওই সর্বনাশা মহাপরিকল্পনার পাত্রপাত্রী, তাদের ওপরই। কারণ বিপ্লবের মৃত্যু নেই।

জামায়াত, এনসিপি সমন্বয়ে গঠিত জোট যেহেতু কখনোই ক্ষমতায় ছিল না, সে কারণে তাদের ক্ষমতাসীনতার পারফরম্যান্স বা কর্মক্ষমতা সম্পর্কে কিছু আলোচনা করতে চাই না। তবে ভবিষ্যতে অবশ্যই তাদের কার্যক্রম নিবিড়ভাবে মানুষ পর্যবেক্ষণ করবে।

উল্লেখযোগ্য নেতিবাচক একটি প্রবণতা হচ্ছে, এই নির্বাচনে প্রতিপক্ষকে রাজনৈতিকভাবে নির্মূল বা বিলোপ করার একটি মানসিকতার জন্ম নিয়েছে। তবে মনস্তাত্ত্বিকভাবে এটি আর রাজনৈতিকভাবে সীমাবদ্ধ না থেকে সহিংসতা এবং রক্তপাতে রূপান্তরিত হয়েছে। ক্ষমতাসীন বা ক্ষমতায় আসার আগেই এমন অবস্থা নিদারুণভাবে বিপজ্জনক। রাজনীতিবিজ্ঞানে রাজনৈতিক নির্মূল বা বিলোপতত্ত্ব আছে। পরিস্থিতি ওই তত্ত্বের চেয়েও মারাত্মক। এ অবস্থাকে মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ের সরকারের আমলের সঙ্গে তুলনা করার মনে হয় সময় এসে গেছে।

এই মানসিকতা যদি এমন হয় নেতা বা নেতৃত্ব শুধু নিরঙ্কুশ ক্ষমতা এবং নিশ্চিত নির্বাচনি বিজয়ই শুধু পেতে চান না, বরং তার শাসনকে রূপান্তরিত করতে চান, যেন ‘আমিই রাষ্ট্র’। এমন প্রবণতা হবে মারাত্মক পর্যায়ের বিভ্রান্তি এবং আত্মবিনাশী। তিনি বা তারা যদি গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক মূল্যবোধ, নীতিনৈতিকতা বা জনসম্পৃক্তার বালাই নেই। কারণ এমন একটা ব্যবস্থার এবং শাসনের স্রষ্টা হতে চান, তাও রাষ্ট্র ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে কোথায় নিয়ে যাবে, তা অনিশ্চিত। তাদের কথায় এ জন্য আমি আছি, আমরা অনুপস্থিত। এটা কাম্য নয় কোনোক্রমেই। কারণ প্রক্রিয়াটি বিপজ্জনক।

এবারের নির্বাচন এ কারণে বহুমাত্রিক, বহুকেন্দ্রিক প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি। তবে সবাই প্রত্যাশা করে একটি অবাধ, সুষ্ঠু যেকোনো ধরনের প্রভাবমুক্ত প্রশ্নবিহীন নির্বাচন। কারণ নির্বাচনটি হচ্ছে অধীনতার বিরুদ্ধে স্বাধীনতার, আধিপত্যের বিপক্ষে সার্বভৌমত্বের, বর্তমান কতিপয়ের শাসনের বিরুদ্ধে জনঅংশীদারত্বের নয়া সরকার ও শাসনকাঠামো প্রতিষ্ঠার।

সবশেষ এ কথাটি বলতেই হবে, জন আকাঙ্ক্ষার মৃত্যু নেই, স্বপ্নের বিনাশ নেই। জনগণ বিজয়ী হবেই আজ না হোক আগামীতে। জয় অনিবার্য।

লেখক : গবেষক, সাংবাদিক

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন