দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের বিশাল আয়তন, বিরাট অর্থনীতির আকার এবং বিশ্বে সর্বাধিক জনসংখ্যার জন্য আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতি বিষয়ক লেখালেখিতে পণ্ডিত বুদ্ধিজীবীরা ভারতকে প্রায়ই হাতি (Indian Elephant) নামে অভিহিত করে থাকেন। ১৯৭১ সালে পাকিস্তান ভারতের কাছে যুদ্ধে চরমভাবে পর্যুদস্ত হওয়ার পর সেই হাতিকে সব প্রতিবেশী যুক্তিসঙ্গত কারণেই ভীতির চোখে দেখতে শুরু করেছিল। আশির দশকে শ্রীলঙ্কার সঙ্গে ভারতের দাদাগিরি নিয়ে সমস্যা শুরু হলে, হাতি দেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী লোকসভায় বক্তৃতাকালে সব ক্ষুদ্র প্রতিবেশীকে ধমক দিয়ে বলেছিলেন, কেউ যেন ভারতকে এই অঞ্চলের অন্য কোনো দেশের সঙ্গে তুলনা করার স্পর্ধা না দেখায় (‘India cannot be regarded as just any other country’)। আজন্ম শত্রু পাকিস্তানকে দ্বিখণ্ডিত করার সাফল্যে দক্ষিণ এশিয়ায় অদ্বিতীয় ‘হেজেমন’ বনে যাওয়ার অসহনীয় ভারতীয় অহমিকা বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। খণ্ডিত পাকিস্তান অর্থনৈতিক দুর্বলতা সত্ত্বেও ১৯৯৮ সালের ২৮ মে এক দিনে পাঁচ পাঁচটি পারমাণবিক বোমার সফল বিস্ফোরণ ঘটিয়ে এক ঝটকায় দক্ষিণ এশিয়ায় আঞ্চলিক শক্তির ১৯৭১-পূর্ববর্তী ভারসাম্য ফিরিয়ে এনেছিল। দিল্লি বুঝে গিয়েছিল একই অঞ্চলে দুটি রাষ্ট্র পারমাণবিক শক্তিধর হয়ে পড়লে এক দেশ, সেটা যত সুবিশাল হাতিই হোক না কেন, তার আর একাধিপত্য চলে না। দেখছেন না, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর হামলা চালালেও কিম জংয়ের পারমাণবিক শক্তিধর উত্তর কোরিয়াকে বিশেষ একটা ঘাঁটায় না। যা-ই হোক, ভূরাজনৈতিক ডামাডোলের সুযোগে কিছুদিনের মধ্যেই ভারতের আঞ্চলিক মাতব্বরি পুনরায় ফিরে এসেছিল।
নয় এগারোতে নিউ ইয়র্কে সন্ত্রাসী হামলায় টুইন টাওয়ার বিধ্বস্ত হলে সম্পূর্ণ পশ্চিমা বিশ্ব এক-কাট্টা হয়ে কমিউনিজমের জায়গায় ইসলামকে প্রধান শত্রু হিসেবে ঘোষণা করে। ফলে মুসলমানদের ঐতিহাসিক শত্রু ভারত নতুন করে দক্ষিণ এশিয়ার প্রভু বনে যায়। ২০১৪ সালে ‘সফট হিন্দু’ কংগ্রেসকে হটিয়ে কট্টর হিন্দু সাম্প্রদায়িক বিজেপি দিল্লির মসনদ দখলে নিলেও পশ্চিমা বয়ানে কেবল মুসলমানদেরকেই মৌলবাদী, সন্ত্রাসী ইত্যাদি নামে অভিহিত করা হতে থাকে।
ভারতে মুসলমান নিধন চলতে থাকলেও কপটাচারী পশ্চিমা রাজধানীগুলো চোখ-কান বন্ধ করে থাকার নীতি গ্রহণ করে। প্রেসিডেন্ট ওবামা গুজরাটে সংখ্যালঘু মুসলমান গণহত্যার প্রধান কুশীলব নরেন্দ্র মোদির ওপর থেকে চুপচাপ দীর্ঘদিনের মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নিয়েছিলেন। এমন বৈরী ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিতে অনেক মুসলিম রাষ্ট্রের মতো বাংলাদেশও তার সার্বভৌমত্ব হারিয়ে ফেলেছিল।
দিল্লির প্রবল সমর্থনে ফ্যাসিস্ট হাসিনা ইসলামপন্থা দমনের নামে জনগণের ওপর ১৫ বছর ধরে নির্মম অত্যাচার চালাতে পেরেছিলেন। ২০২০ সালে করোনার আক্রমণ বিশ্বব্যবস্থায় যে পরিবর্তন নিয়ে আসে, সেখানে এই সর্বব্যাপী ইসলামোফোবিয়ায় সাময়িক ভাটা পড়ে। এর মধ্যে অনেকটা আকস্মিকভাবে উপমহাদেশে ৪৮ ঘণ্টার এক স্বল্পকালীন বিমানযুদ্ধে পাকিস্তান ভারতকে খানিকটা চমকে দিতেও সক্ষম হয়।
ভারতের পুলওয়ামায় কাশ্মীরি বিদ্রোহীদের হামলায় প্রায় ৪০ জন ভারতীয় সৈন্য নিহত হলে নরেন্দ্র মোদি পাকিস্তানকে অভিযুক্ত করে কোনো ধরনের যুদ্ধ ঘোষণা ছাড়াই রাতের আঁধারে দেশটির অভ্যন্তরে কয়েকটি মাদরাসায় বিমান হামলা চালায়। প্রত্যুত্তরে পাকিস্তান দিনের বেলায় ভারতে পাল্টা বিমান হামলা করে। পাকিস্তানের সেই পাল্টা হামলার জবাব দিতে গিয়ে ভারতের একটি মিগ-২১ বিমান বিধ্বস্ত হয় এবং যুদ্ধবিমানের পাইলট, উইং কমান্ডার অভিনন্দন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর হাতে বন্দি হন।
যুদ্ধবন্দিকে একদিন আপ্যায়নের পর মুক্তি দিলেও ভারতীয় বিমানকে গুলি করে নামানো এবং দেশটির পাইলটের পাকিস্তানের হাতে বন্দি হওয়ার বিষয়টি ভারতের জন্য বেজায় বিব্রতকর ছিল। তার ওপর পাকিস্তান বিমান বাহিনীর আক্রমণের তীব্রতায় দিশাহারা হয়ে ভারতীয় বিমান বাহিনী নিজেদেরই একটি হেলিকপ্টার মিসাইল ছুড়ে ধ্বংস করলে ছয়জন ভারতীয় বায়ুসেনা নিহত হয়। এই সেমসাইড ভারতের লজ্জা বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছিল। আশ্চর্যজনকভাবে, এই সীমিত যুদ্ধের বিপর্যয় থেকে উদ্ধত ভারত যে কোনো শিক্ষা নেয়নি, সেটা বোঝার জন্য বিশ্ববাসীর আরো বছর ছয়েক সময় লেগেছে।
এবারও ঘটনার সূত্রপাত ভারত অধিকৃত কাশ্মীর থেকেই। ২০২৫ সালের ২২ এপ্রিল নান্দনিক সৌন্দর্যমণ্ডিত উপত্যকার পেহেলগামে পাঁচজন স্থানীয় সশস্ত্র সন্ত্রাসী সেখানে বেড়াতে আসা ভ্রমণকারীদের ওপর অতর্কিতে হামলা চালিয়ে ২৬ জন বেসামরিক ভারতীয়কে নির্মমভাবে হত্যা করে। নিহতদের মধ্যে অধিকাংশই হিন্দু ধর্মাবলম্বী ছিলেন। কোনোরকম প্রমাণ ছাড়াই ভারত সরকার এই নৃশংস ঘটনার জন্য আবার পাকিস্তানকে দায়ী করে। ৭ মে ভারতীয় বিমান বাহিনী নিজেদের ভূখণ্ড থেকেই দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে পাকিস্তানের অভ্যন্তরে ২০১৯ সালের মতোই হামলা চালায়।
এই হামলায় ফ্রান্সে নির্মিত সর্বাধুনিক রাফায়েলসহ ভারত অন্যান্য রাশিয়ান ও ফরাসি যুদ্ধবিমানের বহর এবং ড্রোন ব্যবহার করে। রাতের অন্ধকারে এই ব্যাপক হামলা চালানো হলেও পাকিস্তান বিমান বাহিনী সর্বাত্মক আগাম প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছিল। প্রথম দিনের বিমানযুদ্ধ ভারতের জন্য ২০১৯ সালের চেয়েও ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনে।
যুদ্ধ শেষে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ধারাবাহিকভাবে বলেছেন যে, ভারত ওই এক রাতের যুদ্ধে রাফায়েলসহ ছয়টি বিমান হারিয়েছে। ভারত এই দাবি অস্বীকার করলেও ঠিক কতগুলো বিমান হারিয়েছে সেটা আজ পর্যন্ত খোলাসা করেনি। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট সম্ভাব্য পারমাণবিক যুদ্ধ ঠেকাতে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব দিলে কোণঠাসা নরেন্দ্র মোদি তাতে সম্মতি জানান। প্রতিরক্ষা যুদ্ধে পাকিস্তান কোন কৌশলে এমন চমকপ্রদ সাফল্য অর্জন করল, সেটা খানিকটা ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন।
প্রথমেই আমাদের বুঝতে হবে যে, ২০১৯ এবং ২০২৫, দুবারই দুই দেশের মধ্যে কেবল বিমানযুদ্ধ হয়েছে। ভারত এবং পাকিস্তানের স্থলবাহিনী যুদ্ধে জড়ায়নি। ২০১৯ সালের বিমানযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে চীন তখনই পরিষ্কার করে দিয়েছিল যে, ভবিষ্যতের যেকোনো ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে এশিয়ার একমাত্র বিশ্বশক্তি দেশটি সর্বাত্মকভাবে পাকিস্তানকে সহায়তা করবে।
ঘোষণা অনুযায়ী চীন এবং পাকিস্তানের বিমান বাহিনী তাদের মধ্যকার সামরিক সহযোগিতা বহুলাংশে বৃদ্ধি করে এবং সর্বাধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর যৌথ মহড়ার নিয়মিত আয়োজন করতে থাকে। এই প্রশিক্ষণের ফলেই ২০২৫ সালের বিমানযুদ্ধে পাকিস্তান সাফল্যের সাথে ‘Multidimensional warfare’ (বহুমাত্রিক যুদ্ধকৌশল) ব্যবহার করতে পেরেছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক জার্নালে সমর বিশেষজ্ঞরা লিখেছেন যে, পাকিস্তান তাদের সংগ্রহে থাকা চীনে নির্মিত ‘J-10’ যুদ্ধবিমানের রাডার বন্ধ রেখেই অন্য একটি উড্ডয়নরত বিশেষ বিমানের (AWACS) ইলেকট্রনিক সিগন্যাল ব্যবহার করে নির্ভুল নিশানায় ১৫০ কিলোমিটার দূর থেকে আকাশ থেকে আকাশ (Air-to-Air) ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে ভারতীয় আকাশসীমার ভেতরেই আক্রমণকারী বিমান ধ্বংস করতে সক্ষম হয়েছে।
ডিজিটাল যুদ্ধের জন্য অপ্রস্তুত ভারতীয় বিমানের তাকিয়ে দেখা ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না। ১৯৯৮ সালে পারমাণবিক বোমার বিস্ফোরণ ঘটিয়ে পাকিস্তান শক্তির ভারসাম্যের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছিল। এবার তারা চীনের সহায়তায় পুরোনো ‘ডগ ফাইটের’ জায়গায় ডিজিটাল প্রযুক্তিনির্ভর যুদ্ধকৌশল দেখিয়ে তাক লাগিয়েছে।
২০১৯ এবং ২০২৫ সালের দুই বিমানযুদ্ধে পাকিস্তান বুঝিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছে যে, কেবল ভারতীয় বিশালত্ব আধুনিক প্রযুক্তির যুদ্ধে তেমন একটা প্রাধান্য নিশ্চিত করতে পারবে না। পাকিস্তানের এই অপ্রত্যাশিত সাফল্য বর্তমান বিশ্বের তিন সুপারপাওয়ার যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও রাশিয়া যথাযথ গুরুত্বের সাথে গ্রহণ করেছে। তাদেরকে মেনে নিতে হয়েছে যে, দক্ষিণ এশিয়ায় সামরিক সক্ষমতায় এমন একটি শক্তিশালী রাষ্ট্রের উত্থান ঘটেছে, যাকে উপেক্ষা করা আর সম্ভব নয়। এর প্রতিক্রিয়ায় ভূরাজনীতির যে পরিবর্তন ঘটেছে, সেটা আমাদের স্বার্থেই খানিকটা বুঝে নেওয়া দরকার।
চীন এবং পাকিস্তান সেই ষাটের দশক থেকেই অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক এবং কৌশলগত সম্পর্ক গড়ে তুলেছে। এসব সময়ের বন্ধুত্ব (All Weather Friendship) দুই দেশের কোনো বিশেষ সরকারের ওপর নির্ভরশীল নয়। বিগত ষাট বছরে, মাও সেতুং থেকে শি জিনপিং এবং ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খান থেকে ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের জামানায় পাকিস্তান-চীন বিশেষ সম্পর্কের কোনো পরিবর্তন হয়নি। গত বছরের বিমানযুদ্ধে পাকিস্তানের পারঙ্গমতা চীনকে নিঃসন্দেহে অতিশয় আনন্দিত করেছে। এর মধ্য দিয়ে ইউরোপের তুলনায় চীনের প্রযুক্তির শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণিত হয়েছে।
দ্বিতীয় পরাশক্তি রাশিয়ার সাথে ভারতের দীর্ঘদিনের কৌশলগত সম্পর্ক থাকলেও নিজ স্বার্থেই কাছের পারমাণবিক শক্তিধর পাকিস্তানের সাথে মস্কো কোনো অনাবশ্যক বৈরিতা চায় না। রাশিয়ার দুই প্রতিবেশী দেশ, আফগানিস্তান ও ইরানের প্রতিবেশী পাকিস্তান হওয়ায়, সেই দেশকে একেবারে উপেক্ষা করে ভারতের সব হঠকারিতাকে চোখ বুজে সমর্থন করা রাশিয়ার পক্ষে সম্ভব নয়। ‘অপারেশন সিন্দুরের’ ব্যর্থতায় ভারতের সর্বাধিক ক্ষতিটি হয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী রাষ্ট্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে কৌশলগত সম্পর্ক গড়ার ক্ষেত্রে। ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের ওপর মার্কিন কংগ্রেসে প্রায় সাড়ে সাতশ পাতার একটি প্রতিবেদন পেশ করা হয়েছে। সেই প্রতিবেদনে মার্কিন সরকার পরিষ্কার সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছে যে, চার দিনের যুদ্ধে পাকিস্তান জয়লাভ করেছে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের চরিত্রের একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো, তিনি বিজয়ীদের সম্মান করেন। ‘অপারেশন সিন্দুরে’ ভারতের দর্শনীয় ব্যর্থতার পর পাকিস্তানের বিজয়ী সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরকে হোয়াইট হাউসে মধ্যাহ্নভোজে মার্কিন প্রেসিডেন্টের আমন্ত্রণ এবং একাধিকবার সাক্ষাৎ প্রদান দক্ষিণ এশিয়ায় প্রায় তিন দশকের মার্কিন নীতির নাটকীয় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। রাশিয়া ও ইরানের কাছ থেকে সস্তায় জ্বালানি তেল কিনে অতিরিক্ত লাভে বিশ্ববাজারে বিক্রি করে
ভারতের ফায়দা তোলার সোনালি দিনও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বাণিজ্য শুল্কের ধাক্কায় সমাপ্ত হয়েছে। অধিকাংশ ভারতীয় বিশ্লেষকই বলছেন যে, হাস্যকরভাবে বিশ্বগুরুর দাবিদার নরেন্দ্র মোদি নিজ দেশে সংখ্যালঘু মুসলমান ও খ্রিষ্টান জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অব্যাহত ঘৃণা সৃষ্টির মাধ্যমে ধর্মান্ধ হিন্দু জনগণের মগজ ধোলাই করে জনপ্রিয়তা ধরে রাখতে সক্ষম হলেও বাইরের দুনিয়ায় প্রকৃতপক্ষে ভারতকে একঘরে করে ফেলেছেন। বিরাটকায় হাতি ভারত সারা বিশ্বে সংকুচিত হতে শুরু করেছে।
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে সুযোগ পেলেই নরেন্দ্র মোদির বিশ্বের ক্ষমতাবান নেতাদের জড়িয়ে ধরার কূটনীতি কার্যত ব্যর্থ হয়েছে। পাকিস্তানের সাথে যুদ্ধের সময় একমাত্র ইসরাইল ছাড়া অন্য কোনো দেশ ভারতের হঠকারিতার পক্ষে কোনো কথা বলেনি। অন্যদিকে চীন, তুরস্ক ও আজারবাইজান প্রকাশ্যে পাকিস্তানকে সমর্থন জানিয়েছিল। বাইডেন সরকার যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, জাপান ও ভারতের সমন্বয়ে গঠিত নতুন জোট কোয়াড নিয়ে অনেক ঢাকঢোল বাজালেও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর ওয়াশিংটনের এ ব্যাপারে আর কোনো উৎসাহ দেখা যাচ্ছে না। ‘অপারেশন সিন্দুরের’ ব্যর্থতা ভারতকে কাগুজে হাতিতে পরিণত করেছে। ‘ওয়াশিংটন এস্টাবলিশমেন্ট’ সম্ভবত ভারতের সামরিক সক্ষমতা নিয়ে দ্বিধায় পড়ে গেছে। ফলে বিশ্ব কূটনীতিতে ভারত এখন অনেকটাই একা।
এখন প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলো কি ভূরাজনীতির এই গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনটা ধরতে পারছে? আমাদের দেশের অধিকাংশ দল, বিশেষ করে বিএনপির মধ্যে ভারত নিয়ে একধরনের ভীতি সব সময় কাজ করে। এই দলটির অনেক নীতিনির্ধারক এবং সাম্প্রতিক সময়ে অনুপ্রবেশকারী বাম ঘরানার থিংক ট্যাংক মনে করেন যে, ভারতকে সন্তুষ্ট না রাখলে ক্ষমতায় যাওয়া যাবে না কিংবা গেলেও টিকে থাকা যাবে না।
গত দুই দশকে ভূরাজনীতির নাটকীয় পরিবর্তন হলেও তারা এখনো ২০০৬ সালে প্রেসিডেন্ট বুশের তথাকথিত সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের (War against Terror) জামানায় পড়ে আছেন। তাছাড়া, শাহবাগি চিন্তাচেতনার বুদ্ধিজীবীরা আওয়ামী লীগের অবর্তমানে বিএনপিতে কেবল নিরাপদ আশ্রয়ই খুঁজে নেননি, দৃশ্যত শহীদ জিয়ার প্রতিষ্ঠিত জাতীয়তাবাদী দলের মধ্যে তারা যথেষ্ট প্রভাব বিস্তার করতেও শুরু করেছেন। ২০১৩ সালে বেগম খালেদা জিয়ার মতো ব্যক্তিত্বসম্পন্ন এবং আপসহীন সর্বোচ্চ নেতা না থাকলে তখনই বিএনপিতে শাহবাগের নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা হয়ে যেত বলেই আমার ধারণা।
২০১৭ সালের একটা গল্প বলি। তার কিছুদিন আগে প্রায় চার বছর দ্বিতীয় দফার জেল খেটে বেরিয়েছি। আমার সাথে তখনও বিএনপির একধরনের বুদ্ধিবৃত্তিক সখ্য ছিল। বিএনপির অঙ্গদলের এক অনুষ্ঠানে প্রধান বক্তার দাওয়াত পেয়েছিলাম। মনে আছে, আমার অদ্যাবধি অপরিবর্তনীয় রাজনৈতিক বিশ্বাস থেকে স্বভাব অনুযায়ী বক্তৃতায় আমি নরেন্দ্র মোদিকে হিন্দুত্ববাদী ও মুসলিম গণহত্যাকারী অভিহিত করে ফ্যাসিস্ট হাসিনার পক্ষে তার বাংলাদেশ নীতির তীব্র সমালোচনা করেছিলাম। বক্তৃতা করার সময়ই আমি মঞ্চে উপবিষ্ট বিএনপির শীর্ষ নেতাদের ক্রুদ্ধ চেহারা দেখতে পাচ্ছিলাম। আমার নামে সেই রাতেই বেগম খালেদা জিয়ার কাছে নালিশ চলে গিয়েছিল।
আমি নাকি ভারতের বিরুদ্ধে নাহক কথা বলে বিএনপির ক্ষমতায় আসার পথে বাধা সৃষ্টি করেছিলাম। সেটাই বিএনপির মূল অথবা অঙ্গদলের কোনো অনুষ্ঠানে আমার শেষ আমন্ত্রণ ছিল। এরপর ২০১৮ সালে নির্বাসনে যাওয়ার আগে পর্যন্ত কেবল বিএনপিপন্থি পেশাজীবীদের হাতে গোনা কয়েকটি অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলাম। সেসব অনুষ্ঠানে আমার দেওয়া বক্তব্যও নেতাদের একেবারেই পছন্দ হয়নি।
জুলাই বিপ্লবে আমাদের তরুণরা জীবনের পরোয়া না করে ফ্যাসিবাদের সাথে ভারতীয় হেজেমনিকেও বাংলাদেশ থেকে উৎখাত করেছে। ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সেই মহান শহীদদের বিপ্লবের ফসল বলেই হয়তো দেড় বছরে দিল্লিকে কোনোরকম ছাড় না দিয়েই ঘোষিত মেয়াদের অন্তিমলগ্নে প্রবেশ করতে পেরেছে। ভারতের সাথে দ্বিপক্ষীয় নীতিতে ড. ইউনূসকে আমি সর্বান্তকরণে সমর্থন করেছি। তিনি ছাড়া ভারতে অনুষ্ঠেয় টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ বয়কট করার হিম্মত বাংলাদেশে কোনো রাজনীতিবিদ দেখাতে পারতেন না বলেই আমি মনে করি।
ড. ইউনূস সরকারপ্রধান ছিলেন বলেই গত বছরের ৪ এপ্রিল ব্যাংককে বিমসটেক সম্মেলন শেষে এক বৈঠকে সরাসরি নরেন্দ্র মোদিকে পলাতক হাসিনাকে ফিরিয়ে দিতে বলতে পেরেছিলেন। ড. ইউনূস, আপনার এই ব্যক্তিত্ব প্রদর্শন এবং দেশপ্রেমের জন্য ধন্যবাদ। বিএনপি এবং জামায়াতের নির্বাচনি প্রচার শুনে মনে হচ্ছে তারা ক্ষমতায় গেলে দেশে দুধের নহর বইয়ে দেবেন।
দুর্নীতিপরায়ণ দেশের কোষাগারের সীমিত অর্থ যেন কোনো সমস্যাই নয়। আমরা সেই সমাগত সুদিনের অপেক্ষাতেই থাকলাম। তবে, দেশবাসীকে আগাম বলে রাখছি যে, যারাই সরকারে যাক না কেন, নতুন করে ভারতের সাথে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে ভীরুতা ও আপসকামিতা দেখার জন্য আপনারা প্রস্তুত থাকুন। সবশেষে এনসিপির তরুণ নেতৃত্বের উদ্দেশে শুধু বলতে চাচ্ছি, আসন্ন নির্বাচনের ফল যা-ই হোক না কেন, ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামে তাদের মেরুদণ্ড যেন ২০২৪ সালের ৩৬ জুলাইয়ের মতোই সোজা থাকে। রাজপথের সংগ্রাম যেন তারা ভুলে না যায়। অনভিজ্ঞ তারুণ্যের নানারকম ভুলভ্রান্তি সত্ত্বেও জুলাই প্রজন্মই আমাদের মতো প্রবীণদের জীবন সায়াহ্নে ভরসার জায়গা।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

