পৃথিবীর ১৫৭ দেশে প্রায় দেড় কোটি বাংলাদেশি প্রবাসী রয়েছেন। এ দেশের জাতীয় অর্থনীতিতে দ্বিতীয় বৃহত্তম অংশীজন তারা। দেশে ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হতে নির্বাচন কমিশনের কাছে দীর্ঘদিন ধরে দাবি-দাওয়া পেশ করে এলেও আজ পর্যন্ত ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিতই রয়েছেন এই প্রবাসীরা। রাষ্ট্রীয় নিষ্ক্রিয়তা এবং দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর উপেক্ষা, অবহেলা ও সিদ্ধান্তহীনতাই দায়ী এর পেছনে।
প্রবাসীদের ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্তি ও ভোটাধিকারের যৌক্তিকতা অতীতের কোনো সরকারই অস্বীকার করেনি, যদিও কাজের কাজ কিছুই করা হয়নি এ নিয়ে। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারও এর ব্যতিক্রম নয়। তা ছাড়া, জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে রেমিট্যান্স পাঠানো বন্ধ করা ছাড়াও বিদেশে সভা-সমাবেশের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী জনমত গঠন করে ফ্যাসিবাদী হাসিনা সরকারের পতনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন প্রবাসী এই রেমিট্যান্সযোদ্ধারা। ফলে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে প্রবাসীদের এই দাবি আরো জোরালো হয়েছে।
নাগরিক হিসেবে দেশে ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হওয়া এবং নির্বাচনে ভোটাধিকার প্রয়োগ করা প্রবাসীদের সাংবিধানিক অধিকার। দেশের সংবিধানের সপ্তম অধ্যায়ে বর্ণিত রয়েছে এই অধিকার ও যোগ্যতা। সংবিধানের সংশ্লিষ্ট অনুচ্ছেদগুলোয় অবস্থান নির্বিশেষে প্রাপ্তবয়স্ক সব নাগরিকের ভোটার হওয়ার ও ভোটদানের অধিকার স্বীকৃত রয়েছে; প্রবাসীদের নিয়ে আলাদা কোনো বিধান নেই এতে। সংবিধান ছাড়া নির্বাচনবিষয়ক অন্যান্য আইনের ভাষ্যও একই। এর মানে হলো, প্রবাসীদের ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করা বা রাখা বেআইনি।
দেশের উচ্চতর আদালতও আজ থেকে তিন দশক আগেই ‘এ টিএ ম আলী রেজা খান বনাম বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন ও অন্যান্য’ নামে পরিচিত এক রিট আবেদনের (রিট পিটিশন নম্বর : ২৪৪৪/১৯৯৫) রায়ে প্রবাসীদের ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্তির ব্যবস্থা নিতে আদেশ জারি করেছিলেন নির্বাচন কমিশনের ওপর। ওই রিটের আবেদনকারী এ টিএ ম আলী রেজা খান ছিলেন কক্সবাজারের কুতুবদিয়া উপজেলার বাসিন্দা ও যুক্তরাজ্য প্রবাসী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক এই শিক্ষার্থী যুক্তরাজ্যে আইনজীবী হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ভোটাধিকার থেকে বাংলাদেশি প্রবাসীদের বঞ্চনায় সংক্ষুব্ধ হয়ে তিনি হাইকোর্টে ওই রিট আবেদন করেছিলেন। শোনানিকালে ওই রিট আবেদনে প্রবাসীদের ভোটাধিকারের পক্ষে অনুকূল রায় (৫০ ডিএলআর ৫৮) প্রচারিত হয়। রায়টি বাস্তবায়িত হলে প্রবাসীদের ভোটাধিকারের নিশ্চয়তা মিলত ওই সময় থেকেই। কিন্তু উচ্চতর আদালতের জনবান্ধব অন্য অনেক রায়ের মতো বাস্তবায়িত হয়নি এই রায়টিও। ফলে, যা হওয়ার, তা-ই হয়েছে। ওই রায় প্রচারিত হওয়ার বহুকাল পরে এসেও প্রবাসীদের ভোটাধিকারের বিষয়টি সুরাহাবিহীন ঝুলে আছে আজ পর্যন্ত।
প্রবাসীদের ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হওয়া ও ভোটাধিকার প্রয়োগের নজির রয়েছে ইউরোপ, এশিয়া ও উত্তর আমেরিকার বহু দেশে। ওইসব দেশের প্রবাসীরা যে দেশে অবস্থান করেন, সে দেশে থেকেই স্বীকৃত বিভিন্ন উপায়ে নিজ দেশের নির্বাচনে ভোটাধিকার প্রয়োগ করে থাকেন। নির্বাচন কমিশন ঐকান্তিক ভূমিকা রাখলে আমাদের দেশেও সে রকমটি হওয়া সম্ভব। এ জন্য প্রবাসীদের মধ্যে যাদের নাম ভোটার তালিকায় নেই, তাদের ওই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে নিতে হবে সর্বাগ্রে। সহজ পন্থায় করতে হবে এ কাজ। জন্মসনদ, জাতীয় পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট, একাডেমিক সার্টিফিকেট বা সরকারি দলিল মিলিয়ে ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে প্রবাসীদের। তথ্যপ্রযুক্তির চরম উৎকর্ষের এই যুগে অনলাইনে ডিজিটাল পদ্ধতিতে যাচাই-বাছাইসহ খুব কঠিন বা সময়সাপেক্ষ হওয়ার কথা নয় এ কাজ। প্রবাসীদের ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্তির পরই কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে, যেন প্রবাসী এসব ভোটার নির্বাচনের দিন ভোট দিতে পারেন বিদেশে অবস্থান করেই।
ভোটের দিনে বিদেশে অবস্থান করে দেশে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে প্রবাসীদের ভোটদানের একাধিক পদ্ধতি প্রচলিত রয়েছে বিভিন্ন দেশে। প্রথমত, বিদেশে দূতাবাসগুলোর কর্মকর্তাদের মধ্য থেকে নির্বাচনি কর্মকর্তা নিযুক্ত করে দূতাবাসের কার্যালয়েই প্রয়োজনীয় সংখ্যক বুথ স্থাপন করে সেখানেই দেশীয় আদলে ফিজিক্যাল ভোটের ব্যবস্থা করা। তবে, এই পদ্ধতিতে শৃঙ্খলা, গোপনীয়তা ও নিরপেক্ষতা লঙ্ঘিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে যথেষ্ট। দ্বিতীয়ত পোস্টাল ব্যালট পদ্ধতির কথা বলা যায়। এই পদ্ধতিতেও সমস্যা কম নয়। এরপর রয়েছে ই-ভোটিং ও প্রক্সি ভোটিং পদ্ধতি। ই-ভোটিং হলো ইভিএম মেশিনে যান্ত্রিকভাবে ভোটদানের পদ্ধতি। এই পদ্ধতির সমস্যা ব্যাপক হওয়ার কারণে আমাদের দেশসহ বহু দেশে ইভিএম বাদ দেওয়া হয়েছে নির্বাচনি কার্যক্রম থেকে। আর প্রক্সি ভোটিংয়ের ধারণাটা অনেকটা এ রকমÑএই পদ্ধতিতে ভোটগ্রহণে একটা বিশেষ অ্যাপস থাকে। প্রবাসীরা নিবন্ধন করেন সেটিতে। সেই অ্যাপসের মধ্যেই প্রবাসীরা নির্বাচনের দিন এলাকায় থাকবেন এমন লোকজনকে নিজ নিজ প্রতিনিধি হিসেবে নির্ধারণ করে দেবেন এবং সেই প্রতিনিধিরাই প্রবাসীদের পক্ষে ভোট দেবেন প্রবাসীদের পছন্দের প্রার্থীদের। উপযোগিতা ও সম্ভাব্য যাচাই করে ভোটগ্রহণের এই বিকল্প পদ্ধতিগুলোর মধ্য থেকে যেকোনো একটি নিয়েই আগাতে হবে নির্বাচন কমিশনকে। প্রয়োজনবোধে এ নিয়ে অভিজ্ঞ ও দক্ষ ব্যক্তি, বিশেষজ্ঞ এবং দেশি-বিদেশি সংস্থার সহায়তা নিতে পারে নির্বাচন কমিশন।
দেশের জনসংখ্যার মধ্যে ভোটার হওয়ার যোগ্য প্রায় দেড় কোটি নাগরিককে নির্বাচনে ভোটদান থেকে বঞ্চিত করে আর যা-ই হোক, অন্তর্ভুক্তিমূলক বা অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্ভব নয়। এ জন্য আগামী জাতীয় নির্বাচনেই যেন প্রবাসীরা ভোটদান করতে পারেন, সেই লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের তরফে আশু ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি।
লেখক : আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


জামায়াতের সমাবেশ কী বার্তা দিল?
মতাদর্শিক দ্বন্দ্ব ও ‘দক্ষিণপন্থিদের উত্থান’ বিতর্ক