জাতীয় স্বাধীনতার প্রথম শর্ত আর মৌলিক উপাদান হলো, জাতীয় স্বকীয়তার বোধ ও তার রক্ষা।
সব জাতিই মূলত একই মানবজাতি থেকে উদ্ভূত। তাই তাদের সকলেরই এমন বহু দিক থাকবে যা জগতের অন্যান্য জাতি, বিশেষ করে প্রতিবেশী জাতি বা জাতিসমূহের সঙ্গে অভিন্ন।
দুনিয়ার অন্যান্য জাতি, বিশেষত প্রতিবেশী জাতিসমূহের সঙ্গে নিজের অভিন্নতার দিকগুলোর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সম্প্রীতির বোধ জাগরূক রাখার সঙ্গে সঙ্গে, তাদের বিশেষ করে প্রতিবেশী জাতি থেকে নিজেদের ভিন্নতা-জ্ঞাপক সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের ভেতর দিয়ে নিজেদের জাতীয় স্বকীয়তার চেতনাকে সার্বক্ষণিক লালন করা জরুরি । তা না করলে, অভিন্নতার দোহাই দিয়ে অন্যরা জাতীয় স্বাধীনতাকেই খর্ব ও হরণ করতে উদ্যোগী হবে অলক্ষে।
এ জন্য হলেও, জাতি হিসেবে বাংলার স্বাধীনতার অতন্দ্র প্রহরী হিসেবে বাংলার প্রত্যেকটি মানুষকেই জাতি হিসেবে, প্রতিবেশী অন্যান্য জাতি—ভারত, পাকিস্তান, বর্মা, নেপাল, চীন, শ্রীলঙ্কা থেকে বাংলার জনসংখ্যার বিশালতর অংশের সাংস্কৃতিক স্বকীয়তা জ্ঞাপক সবকিছুকেই অবচেতনার গভীরে প্রোথিত করে সদাই সচেতনে জাগরূক রাখার জন্য যা কিছু দরকার, তা-ই করণীয় । নিজের ব্যক্তিগত বা সংকীর্ণতর সাংস্কৃতিক বা ক্ষুদ্রতর জনগোষ্ঠীগত পরিচয় বা চর্চার সাধারণ অংশ যদি না-ও হয় । জাতীয় স্বাধীনতা বিপন্ন হলে ব্যক্তি, সম্প্রদায়, ক্ষুদ্রতর জনগোষ্ঠীসহ সারা বাংলার সমগ্র জনসংখ্যার সকলেরই স্বাচ্ছন্দ্য, সম্পদ, জীবিকা, সম্মান ও সম্ভ্রম, সামাজিক শান্তি ও নিরাপত্তাই শুধু নয়, জীবনও বিপন্ন হবে।
সম্ভবত এরকম বিবেচনাপ্রসূত প্রজ্ঞা থেকেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, নিজে মুসলমান না হয়েও, ব্যাপকতর বাংলার বিশালতর সংখ্যাগরিষ্ঠ জনসাধারণের অতি প্রিয় পার্বণ, মুসলমানদের নবীর জন্মোপলক্ষ, ঈদে মিলাদুন্নবী উদযাপন অনুষ্ঠানে গিয়ে নবী প্রশস্তিমূলক বক্তৃতা দিয়েছিলেন।
বিশ্বাসজাত সাংস্কৃতিক স্বকীয়তার প্রতীক-পার্বণ
জাতীয় সাংস্কৃতিক স্বকীয়তা জ্ঞাপক বিষয়ের একটি প্রধান হলো, দেশবাসীর বিশালতর জনসংখ্যার পালিত ও উদযাপিত পার্বণসমূহ— বাংলাদেশের ক্ষেত্রে যথা ঈদ, মহররম, মিলাদুন্নবী, শবেমেরাজ-শবেবরাত, ইত্যাদি।
ঐতিহাসিক আর্থসামাজিক বিবর্তন-পর্যায়গত অবচেতন সাংস্কৃতিক মনস্তাত্ত্বিক কারণে, প্রায়ই এসব পার্বণ হয়ে থাকে মূলত ধর্মোতসারিত । আর তাই বিশ্বাসনির্ভর।
তবে যে বিশ্বাস থেকে একটি সাংস্কৃতিক বিষয়ের উদ্ভব ও উন্মেষ মূলত তাতে নিজে বিশ্বাস না করেও বিষয়টির সাংস্কৃতিক দিকটি মাত্র আপন করে নেয়া সম্ভব । স্বজাতির বৃহত্তর জনসংখ্যার সংস্কৃতির সঙ্গে একাত্মতার জন্য এই আচরণ খুবই জরুরি। বিষয়টির বিশ্বাসগত ভিত্তি বা মূলটা বিশ্বাসের ভিত্তিতে হলে সেই একাত্মতা হয় দৃঢ়তর।
এই দৃষ্টিভঙ্গি লালনে বাঙালির নিজেরই আপন প্রবাদের শিক্ষা খুবই জুতসই—‘বিশ্বাসে মিলায় বস্তু, তর্কে বহু দূর’।
এই প্রবাদের অর্থ তবে এই নয় যে, কুসংস্কারাচ্ছন্ন অন্ধবিশ্বাসে তর্কনির্ভর বিজ্ঞানের সত্যানুসন্ধানের আগ্রহের বিরুদ্ধাচরণ। মোটেও নয়। বরং তার অর্থ হলো সত্যানুসন্ধানের চূড়ান্ত আগ্রহে আগ্রহী সত্যসাধকদের সত্য দর্শননির্ভর ধর্ম প্রবুদ্ধ বোধে যে সত্য উদ্ভাসিত, তারই অনুধাবনে বিজ্ঞানের দিশানির্ধারণ। এমন দিশা ছাড়া, বিজ্ঞানের দশা হবে অন্ধের অন্ধকার মনে হওয়া মহাবিশ্বে আলোর আশায় হাতড়ে মরার মতো।
মহাযাত্রা ‘মেরাজ’
বাংলার বিশালতর জনসংখ্যার মতোই বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের, ঐতিহাসিক বাস্তব তথ্য সমর্থিত বিশ্বাস মতে, নবী হজরত মোহাম্মদ (দ.) ছিলেন ১০০ ভাগ সত্যবাদী । তাঁর নিজের যুগের শত্রু মিত্র যাঁরাই তাঁকে চিনতেন, তারা কেউই এর বিপরীত বলেননি । জিজ্ঞাসিত হলেও।
তাঁর শিক্ষা বা বক্তব্যের ঘোর বিরোধিতাকারী শত্রুরা তাঁকে প্রাণে মেরে ফেলতে চেষ্টা ও ষড়যন্ত্র করেছে। দেশছাড়া করেছে । ১০ বছর ধরে তাঁর ইহধাম ত্যাগের আগে, প্রায় শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তাঁর প্রবাসেও তাঁর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে। তাঁকে ‘পাগল’, ‘জ্বিনগ্রস্ত’, ‘জাদুকর’, এসব নানা কিছু বলেছে। কিন্তু কখনো মিথ্যাবাদী বলেনি। এমনকি মক্কা শরিফ মুক্তির পূর্বপর্যন্ত তাঁর শত্রুতাকারীদের প্রধান ও সেনাপতি, আরবের প্রধান শাসক, কোরেশ-গোত্র প্রধান, আবু সুফিয়ানকেও যখন রোম সম্রাট নবীজি (দ.) সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করেন তখনো তিনি তাঁকে মিথ্যাবাদী বলতে পারেননি। বরং নির্দ্বিধায়, তিনিও তাঁকে চির সত্যবাদীই বলেছেন। তাঁকে চেনা শত্রু-মিত্র সবার মতোই।
বিশ্বের সর্বোচ্চ বিজ্ঞান বিশ্ববিদ্যালয়, এমআইটিতে পড়ানো, বিজ্ঞানতাত্ত্বিক কার্ল পপারের বৈজ্ঞানিক গবেষণা পদ্ধতির তত্ত্ব, যা উপরে বর্ণিত তত্ত্ব মোতাবেক, কোনো একটি সম্ভাব্য বক্তব্যকে মিথ্যা প্রমাণ না করতে পারলে তা সত্য বলেই, বৈজ্ঞানিকভাবেই, গ্রহণ করতে হবে। এই বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব অনুযায়ীই, তা হলে, নবীজি হজরত মোহাম্মদ (দ.) যা বলেন, তার সবটাই সন্দেহাতীতভাবে সত্য। শুধু ধর্মীয়ই নয়, বৈজ্ঞানিক সত্যও।
বিশ্বাসীগণ তবে কোনো বৈজ্ঞানিক সিদ্ধান্তের তোয়াক্কা না করেই ধর্মীয় বিশ্বাস হিসেবেই, তাঁর সব কথাকেই সত্য জানেন । বাদবাকিদের জন্য, তাঁর সত্যবাদী হওয়ার জন্য এই বৈজ্ঞানিক সত্যটিই যথেষ্ট।
আর তাঁরই কথামতে, আল্লাহ পাক তাঁকে এক অসাধারণভাবে, অতি দ্রুতগতিতে এক অসাধারণ যাত্রায় নিয়ে গিয়ে পার্থিব সময় হিসেবে মুহূর্তের ভেতরই আবার মক্কা শরিফে ফিরিয়ে আনেন । তাঁর মক্কা শরিফ থেকে মদিনা শরিফে চলে গিয়ে তাঁর ধর্ম রক্ষা, শিক্ষা ও প্রচারের নিরাপত্তার জন্য চলে যেতে বাধ্য হওয়ার আগে, এক রজব মাসের ২৭তম রাতে । এই অসাধারণ যাত্রারই নাম ‘মেরাজ’, আর যে রাত (আরবিতে ‘লায়ল’, ফারসি ‘শব’, হিন্দিতে ‘রজনী’) । দুই শব্দ মিলে হয়েছে ‘শবেমেরাজ’।
যাত্রাটি হয়েছিল সজাগ সশরীরে, যদিও তার প্রস্তুতিস্বরূপ মেরাজের আগে একবার স্বপ্নেও নবীজিকে (দ.) এই যাত্রাটি দেখানো হয় বলে প্রতীয়মান । এমনকি তাঁর (দ.) জীবনে অন্যান্য অতি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটার আগে নবীজিকে স্বপ্নে ঘটনাটি দেখানো হয়। উদাহরণস্বরূপ সাধারণত কিছুটা ভুলভাবেই ‘মক্কা-বিজয়’ বলে আখ্যাত, মক্কা-মুক্তির মহা ঘটনার সময়ও, ঘটনার আগে, নবীজিকে তা স্বপ্নে দেখানো হয়েছিল। তাই বলে মক্কা-মুক্তি বা ‘মক্কা-বিজয়’ স্রেফ স্বপ্নই ছিল, বাস্তবে, সজাগ সশরীরে ঘটেনি তেমনটা বলা যাবে না । ঠিক সেভাবেই ‘মেরাজ’ শুধু স্বপ্নে হয়েছিল, সজাগ সশরীরে না, তা-ও বলা যাবে না। কেননা নবীজি নিজেই বলেছেন বলে তাঁর কাছ থেকে সরাসরি বা মধ্যবর্তী অন্যান্য বিশ্বস্ত বলে নিযুক্ত বর্ণনাকারীদের সাক্ষ্যমূলক বর্ণনা থেকে তা-ই জানা যায় । বিশ্বব্যাপী কোটি কোটি বিশ্বাসীও তাঁর (দ.) যুগ থেকে নিয়ে আজ পর্যন্ত তা-ই জেনে ও বিশ্বাস করে এসেছে।
কিন্তু তুলনামূলক অতি সাম্প্রতিককালে, প্রধানত ব্রিটিশসহ বিভিন্ন ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদীরা দখল করা দেশসমূহে জনসাধারণের ভেতর প্রচার করায় যে ‘মেরাজ’ ঘটেছিল স্রেফ স্বপ্নে । ধর্মীয় বিভেদ সৃষ্টি করে তাদের ভেতর গন্ডগোল বাঁধিয়ে রেখে, দুর্বল করে দেশ শাসন ও লুটপাট করে যাওয়ার জন্য বিভিন্ন নীতি দিয়ে তৈরি করা অতি ক্ষুদ্র স্থানীয় কিছু ‘আলেম’ বা ‘স্কলার’ সাজাদের দল দিয়ে, ছড়ানো অন্যান্য নানা ভ্রান্ত ধারণার মতোই । যেখানে ‘মেরাজ ছিল শুধুই স্বপ্নে’ এই কথাটি গেলাতে পারেনি, সেখানে কখনো কখনো এটা প্রচার করেছে যে যাত্রাটি ছিল শুধু ‘ইস্রা’ তথা ইহলোকের মক্কা শরিফ থেকে যেরূসালেম পর্যন্ত শুধু।
সাধারণ বিশ্বাসীদের এসব বিভেদ ও গন্ডগোল সৃষ্টিকারী ধারণা গেলানোর জন্য এরা, পাশ্চাত্যের প্রাচ্যবিদ (Orientalist)-দের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ প্রভাবে দুই পথের দুটিই বা যেকোনো একটি অবলম্বন করে। একদিকে, কোরআন-হাদিসের সংশ্লিষ্ট আয়াত বা হাদিসের কথার খণ্ডিত, আংশিক বা প্রেক্ষিত-বিচ্ছিন্ন উপস্থাপনা দিয়ে বিভ্রান্ত করে।
অন্যদিকে ‘বিজ্ঞান’-এর কথা বলে, ‘বৈজ্ঞানিক’ শোনানো উলটাপালটা মলম-বিক্রি মার্কা কথাবার্তা বলে । যা বৈজ্ঞানিক সত্যাসত্য নির্ধারণের বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতির নিয়মনীতির লঙ্ঘনমূলক মূলত অবৈজ্ঞানিক।
এসবের ধারা সৃষ্টির অন্যতম ‘পথিকৃৎ’ ছিলেন, মোটামুটি গণ্ডমূর্খ, ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বেতনভুক এক নিম্নপর্যায়ের কেরানী। স্বাধীনতা সংগ্রামের গৌরবময় সিপাহি বিপ্লবের সময় ব্রিটিশের দালালি করে, স্বাধীনতা সংগ্রামীদের নৃশংস ব্যাপক গণহত্যার পর ব্রিটিশদের যথাযথ গোলামির পুরস্কার হিসেবে ‘স্যার’ উপাধিসহ নানা ইনাম পাওয়া এক বিশ্বাসঘাতক স্যার সৈয়দ আহমদ খান ।
ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদীরা তাঁকে বিলাতে অক্সফোর্ডে নিয়ে পাশ্চাত্য-প্রতীচ্যবিদদের দিয়ে তার মগজ ধোলাই করে। ঘুরিয়ে এনে ভারতবর্ষে ‘স্কলার’ সাজিয়ে তার উদ্যোগে শিক্ষা প্রসার, বিজ্ঞান, উন্নয়ন ইত্যাদি মুখরোচক, মধুর-শ্রবণীয় কথাবার্তার আড়ালে জাতীয় সংস্কৃতি বিধ্বংসী নানা কর্মকাণ্ডের ধারা সূচিত করায়।
এই স্যার সৈয়দ আহমদ ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকদের খুশি করার মতো একটি ‘বড়’ ন্যক্কারজনক কাজ করে। একটি তথাকথিত ‘বৈজ্ঞানিক’ তথাকথিত ‘তফসির’ লেখে। তাতে কোরআন শরিফে বর্ণিত সব অলৌকিক ঘটনার অলৌকিকতাকে অস্বীকার করে। তাঁর জায়গায়, তাঁর নিজের মন মত, সেকালে ‘বৈজ্ঞানিক’ বলে যেসব ধারণ প্রচলিত ছিল—তাঁর কথা বলে, ওসব অলৌকিক ঘটনার অন্য, মিথ্যা ব্যাখ্যা দেয় ।
এই ধারাটি সাক্ষাৎ মূল ছিল সে সময় আমেরিকার বোস্টনে সূচিত ইতোমধ্যে হাজারো ফেরকায় বিভক্ত হয়ে পড়া খ্রিষ্টধর্মে ‘ক্রিশ্চান সায়েন্স’, অর্থাৎ ‘খ্রিষ্টীয় বিজ্ঞান’ নামে সূচিত আরেকটি নতুন ফেরকার অনুকরণে শুরু করা এই তথাকথিত ‘বৈজ্ঞানিক ইসলাম’-এর ধারণা । ‘ইসলাম’ বলে চালানো, প্রকৃত প্রস্তাবে, এই ইসলামের পরিভাষার মোড়কে উপস্থাপিত নতুন একটি ধর্মে সবকিছুর স্রষ্টা ও নিয়ামক হিসেবে ‘প্রকৃতি’ তথা ‘ন্যাচার’-কেই ধরা হয়। তাই আলেম ওলামা আর সাধারণ জনগণ এই নতুন ধর্মকে ‘ন্যাচারি’ ফেরকা বলতে শুরু করে। আজ যারা মেরাজ শরিফের অলৌকিক ঘটনাবলিকে তাদের নিজেদের ‘বিজ্ঞান’-সংক্রান্ত ভ্রান্ত ধারণার সঙ্গে মেলে না বলে সম্পূর্ণই বা আংশিক অস্বীকার করে—তারা ওই ঊনবিংশ শতাব্দীর ‘ন্যাচারি’ ফেরকার অনুসারী। সজ্ঞানে বা নিজেরই অজ্ঞাতে।
মেরাজের শিক্ষা
সম্ভবত মানুষ হজরত মোহাম্মদের (দ.) মানুষরূপেই, স্রষ্টার নৈকট্যগুণে সৃষ্ট জগতের এমন উচ্চতম পর্যায়ে পৌঁছানোর এই অসাধারণ গৌরবেই অনুপ্রাণিত হয়ে বাংলার জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ‘মোসলেম ভারত’-এ প্রকাশিত তাঁর বিখ্যাত ‘বিদ্রোহী’ কবিতায় লেখেন :
‘ভূলোক দ্যুলোক গোলক ভেদিয়া,
খোদার আসন ‘আরশ’ ছেদিয়া,
উঠিয়াছি চির-বিস্ময় আমি বিশ্ববিধাতৃর!’
তাঁর স্থান-কাল অনুযায়ী যে কাব্যিক ভাষা তিনি ব্যবহার করেন, তার প্রেক্ষিতানুযায়ী অর্থ না বুঝতে পেরে কেউ কেউ কবির এখানে বলা এ কথাকে খোদ খোদার বিরুদ্ধে বিদ্রোহাত্মক মনে করেছেন। আসলে তা মোটেই এমন নয়। বরং কথাটির অর্থ তার উলটো। কবিতাটি যদি আসলেই খোদার বিরুদ্ধে বিদ্রোহাত্মক হতো, তাহলে এক শতাব্দী আগের চরম রক্ষণশীল বঙ্গীয় মুসলিম সমাজের প্রতিনিধিত্বশীল সাহিত্য পত্রিকা ‘মোসলেম ভারত’-এর দাড়ি-টুপিওয়ালা একপর্যায়ের মাদরাসা শিক্ষক, সম্পাদক মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক, মলাটে মসজিদ আঁকা তাঁর ওই ‘মোসলেম’ পত্রিকায় তা প্রকাশ করতেন না।
বাংলার জাতীয় কবির ওই কথার অর্থ হলো, প্রায় নিশ্চিতই, ‘বিধাতৃ’, ‘খোদার’ ‘চির-বিস্ময়’ সৃষ্টি তাঁর সর্বোচ্চ, সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টি ‘আশরাফুল মখলুকাত’ হিসেবে সৃষ্ট মানুষ, খোদারই আমন্ত্রণ তথা তাঁর ইচ্ছায়, খোদার নৈকট্যে সৃষ্ট জগতের সর্বোচ্চ পর্যায়েরও উপরে উঠে, খোদার সাক্ষাৎ সস্নেহ সান্নিধ্যে পৌঁছে যেতে সক্ষম।
‘মেরাজের’ কাহিনির এটিই সর্বোচ্চ শিক্ষা, সম্ভবত।
স্রষ্টার সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টিরূপ মানবের সৃষ্ট জগতের সর্বোচ্চ পর্যায়েরও উপরে উঠে খোদার ওই সাক্ষাৎ সপ্রেম সান্নিধ্যে পৌঁছে সৃষ্ট জগতে তার সর্বোচ্চ স্থান অধিকার ও রক্ষার অন্তরায় হয় যা কিছু, স্রষ্টারই অভিপ্রায়ের প্রতিপক্ষে, সৃষ্টির সৃষ্ট অন্যায়, অবিচার, শ্রেণি ও বর্ণভেদ, জুলুম অত্যাচার, শোষণ, সাম্রাজ্যবাদ, উপনিবেশবাদ, আধিপত্যবাদ, স্বৈরাচার—সে সবকিছুরই প্রতিপক্ষে বিদ্রোহও সে শিক্ষার অংশ।
বিদ্রোহী কাজী নজরুল ইসলামের বিদ্রোহও সম্ভবত মেরাজের ওই শিক্ষায়ই অনুপ্রাণিত। মেরাজের ঘটনা ও শিক্ষা দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েই জর্মন জাতীয় কবি ‘মোহাম্মদ’ নামক তাঁর বিখ্যাত কাব্য, আর জর্মন দার্শনিক তাঁর বিশ্ববিখ্যাত ‘সুপারম্যান’-এর ধারণা রচনা করেন বলে প্রতীয়মান।
নিজেদেরই বার্ষিক উদযাপনের পার্বণ হিসেবে আপন করে নেওয়া, এই মহাপার্বণে বাঙালি জাতি সেই শিক্ষায়ই পুনর্বার অনুপ্রাণিত হোক।
লেখক : প্রফেসর ড. আহমদ আনিসুর রহমান, যুক্তরাষ্ট্রের এমআইটি, হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় বিজ্ঞান কেন্দ্র ও অস্ট্রেলিয়ার সুইনবার্ন ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজিতে বৈজ্ঞানিক গবেষণা পদ্ধতিসহ বিভিন্ন বিষয়ে উচ্চশিক্ষা লাভ ও গবেষণাপূর্বক পিএইচডি অর্জন করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় আর মদিনায় বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিশ্বের বহু উচ্চশিক্ষা কেন্দ্রে শিক্ষকতা বা গবেষণা করেছেন।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


গাজায় ইসরাইলি হামলায় নিহত ১০