চাঁদের পর মঙ্গল গ্রহের হাতছানি

সৈয়দ-আবদাল-আহমদ
সৈয়দ আবদাল আহমদ

চাঁদের পর মঙ্গল গ্রহের হাতছানি

চলতি মাসের শুরুতে বিজ্ঞান জগৎকে আলোড়িত এবং চমকে দিয়েছে এক অবিস্মরণীয় ঘটনা। সেটি হলো অর্ধ শতাব্দী পর মানুষ আবার চাঁদের দোরগোড়া থেকে ঘুরে এলো। নাসার নতুন চন্দ্রাভিযান আর্টেমিস-২ মিশনে যান চার নভোচারী রিড ওয়াইজম্যান, ভিক্টর গ্লোভার, ক্রিস্টিনা কচ এবং জেরেমি হ্যানসেন। তারা অবশ্য চাঁদের বুকে পা রাখেননি, চাঁদের চারপাশ বা কক্ষপথ ঘুরে নিরাপদে পৃথিবীতে ফিরে আসেন। ১৯৭২ সালে ‘অ্যাপোলো-১৭’ মিশন শেষ হওয়ার ৫৩ বছর পর মানুষের আবার চাঁদের কাছে যাওয়া। ফলে নতুন এই চন্দ্রাভিযান আর্টেমিস-২ বিজ্ঞানমনস্ক মানুষের মধ্যে দারুণ কৌতূহল এবং উদ্দীপনার সৃষ্টি করে।

চার নভোচারীকে নিয়ে আর্টেমিস-২ পহেলা এপ্রিল চাঁদের দেশের উদ্দেশ্যে পাড়ি জমায়। এটি ছিল দশ দিনের একটা মহাকাশ ভ্রমণ। ফ্লোরিডার কেনেডি স্পেস সেন্টারের লঞ্চ প্যাড ৩৯ বি থেকে এটি যাত্রা শুরু করে। শক্তিশালী এসএলএস (স্পেস লঞ্চ সিস্টেম) রকেটের সাহায্যে উৎক্ষেপণ করা হয়। ওরিয়ন ক্যাপসুল বা মহাকাশ যানে ছিলেন নভোচারীরা। এর ডাক নাম ‘ইন্টেগ্রিটি।’ রকেট এসএলএস লম্বায় ছিল প্রায় ৩২২.৪ ফুট এবং উৎক্ষেপণের সময় ৮.৮ মিলিয়ন পাউন্ড শক্তি উৎপন্ন করে।

বিজ্ঞাপন

দশ দিনের চন্দ্রাভিযান শেষে নভোচারীরা ১০ এপ্রিল পৃথিবীতে ফিরে আসেন। ওরিয়ন ক্যাপসুলটি চাঁদ থেকে ঘণ্টায় প্রায় ৪০ হাজার কি. মি. বেগে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করে। এ সময় ঘর্ষণের ফলে এর বাইরের তাপমাত্রা প্রায় ২ হাজার ৮শ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছে ছিল যা এর শক্তিশালী ‘হিট শিল্ড’ সফলভাবে মোকাবিলা করে। অবতরণের শেষ ধাপে তিনটি বিশাল প্যারাসুট ব্যবহার করে গতি কমিয়ে আনা হয়। এরপর মহাকাশ যানটি ক্যালিফোর্নিয়ার সান ডিয়েগো উপকূলে প্রশান্ত মহাসাগরের নীল পানিতে সফলভাবে অবতরণ বা ‘স্প্ল্যাশডাউন’ করে। মার্কিন নৌবাহিনীর জাহাজ ইউএসএস জন পি ‘মুরথা’ ঘটনাস্থলে পৌঁছে নভোচারী ও মহাকাশ যানকে উদ্ধার করে নিয়ে আসে।

নভোচারীদের রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা

চাঁদের দেশে ‘আর্টেমিস-২’-এর দশ দিনের মিশনে চার নভোচারী রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা নিয়ে পৃথিবীতে ফিরেছেন। এই মিশনে চাঁদের ভূ-তাত্ত্বিক পর্যবেক্ষণ, মহাকাশ বিকিরণের প্রভাব পরীক্ষা এবং ওরিয়ন মহাকাশযানের সক্ষমতা যাচাই করা হয়েছে। গভীর মহাকাশ অন্বেষণে এটা নতুন যুগের সৃষ্টি করেছে।

২০২৬ সালের ৬ এপ্রিল আর্টেমিস-২ মিশনের নভোচারীরা পৃথিবী থেকে প্রায় ৪ লাখ ৬ হাজার ৭৭১ কিলোমিটার (২ লাখ ৫২ হাজার ৭৯৯ মাইল) দূরত্বে পৌঁছান। এটি এখন পর্যন্ত মানুষের ইতিহাসে পৃথিবী থেকে সবচেয়ে বেশি দূরে যাওয়ার নতুন রেকর্ড যা ১৯৭০ সালে অ্যাপোলো ১৩-এর করা রেকর্ডকেও ছাড়িয়ে যায়।

নভোচারীরা খালি চোখে চাঁদের অন্ধকার দিকের (Far Side) কিছু অংশ দেখার সুযোগ পান যা আগে কখনো মানুষের চোখের সামনে আসেনি। তারা ৫৩ মিনিটব্যাপী একটি বিরল সূর্যগ্রহণও প্রত্যক্ষ করেন। চাঁদের দিগন্তে পৃথিবীর অস্ত যাওয়ার দৃশ্য বা ‘আর্থসেট’ এবং চন্দ্রপৃষ্ঠের উল্কাপাতের উজ্জ্বল ঝলক অবলোকন করেছেন। কমান্ডার রিড ওয়াইজম্যান এ দৃশ্যের ছবি তুলেছেন, যা অ্যাপোলো মিশনের বিখ্যাত ‘আর্থরাইজ’ ছবির কথা মনে করিয়ে দেয়।

এই মিশনের অন্যতম প্রধান বৈজ্ঞানিক লক্ষ্য ছিল গভীর মহাকাশের বিকিরণ (Deep Space Radiantion) মানুষের শরীরে কেমন প্রভাব ফেলে তা পরীক্ষা করা। নভোচারীরা একই সঙ্গে বিজ্ঞানী এবং গবেষণার বিষয় হিসেবে কাজ করেছেন, যেখানে পাঁচটি ভিন্ন গবেষণার মাধ্যমে তাদের শারীরিক ও মানসিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। মিশনের শেষ দিকে নভোচারীরা ধোঁয়া শনাক্তকারী অ্যালার্ম বেজে ওঠা, কম্পিউটারের যান্ত্রিক ত্রুটি এবং টয়লেটের সমস্যার মতো কিছু অপ্রত্যাশিত চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছিলেন যা তারা সাফল্যের সঙ্গে সামাল দেন। এছাড়া ‘ওরিয়ন’ মহাকাশযানটির ‘হিট-শিল্ড’ বা তাপ প্রতিরোধক ব্যবস্থার পারফরম্যান্স নিয়ে বিজ্ঞানীদের উদ্বেগ থাকলেও তা সফলভাবে কাজ করেছে। ওরিয়ন মহাকাশযান ইঞ্জিনিয়ারদের প্রত্যাশার চেয়েও বেশি পারফরম্যান্স দেখিয়েছে। অভিযানের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অংশ ছিল পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ। ১০ এপ্রিল ওরিয়ন ক্যাপসুলটি ঘণ্টায় প্রায় ২৫ হাজার মাইল বেগে বায়ুমণ্ডলে আঘাত হানে। তীব্র ঘর্ষণে ক্যাপসুলের বাইরের তাপমাত্রা ২ হাজার ৮শ’ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছায়। এ সময় দীর্ঘ সময় মহাকাশে মানুষের টিকে থাকার জন্য মিশনের প্রয়োজনীয় লাইফ সাপোর্ট সিস্টেম এবং ম্যানুয়েল নেভিগেশন সিস্টেমগুলো সফলভাবে পরীক্ষা করা হয়েছে এবং সেগুলো ঠিক ছিল।

মিশনের সময় নভোচারীরা চাঁদের একটি গর্তের নাম কমান্ডার রিজ ওয়াইজম্যানের প্রয়াত স্ত্রী ‘ক্যারল’-এর নামে উৎসর্গ করেছেন। মিশনের সফলতাকে ২০২৮ সালে চাঁদে মানুষের পা রাখার পথে একটি বিশাল ধাপ হিসেবে উল্লেখ করে বলা হয়েছে, নাসার এই মিশন ‘বিশাল এক সাফল্য’ যা আগামী বছরগুলোতে চাঁদে মানুষের স্থায়ী বসতি এবং ভবিষ্যতে মঙ্গল অভিযানের পথ সুগম করবে।

চার নভোচারীর মধ্যে পাইলট ভিক্টর গ্লোভারের অভিজ্ঞতার কথাগুলো সবচেয়ে বেশি সাড়া ফেলেছে। গ্লোভার তার অভিজ্ঞতাকে ‘জাদুকরী’ বলে বর্ণনা করেছেন। ৬ এপ্রিল ২০২৬ যখন তারা চাঁদের উল্টো পাশে ছিলেন এবং পৃথিবীর সঙ্গে তাদের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন ছিল, তখন তিনি সবচেয়ে রোমাঞ্চিতবোধ করেন। চাঁদের দিগন্ত থেকে পৃথিবীর উদয় হওয়া (আর্থ রাইজ) দেখে তিনি বলেছিলেন, ‘মহাকাশ থেকে আমাদের নীল গ্রহটি এত শান্ত ও সুন্দর দেখায় যে, তা ভাষায় প্রকাশ করা অসম্ভব।’

চাঁদের কক্ষপথে সেই শিহরণ

মিশনের দশটি দিন ছিল উৎকণ্ঠা আর বিস্ময়ে ঘেরা। চাঁদের অন্ধকার পিঠ (Far Side) পেরিয়ে যখন নভোচারীরা প্রথম পৃথিবীর উদয় (আর্থ রাইজ) দেখেছিলেন, তাদের অভিজ্ঞতায় বার বার উঠে এসেছে মহাশূন্যের সেই গভীর নিস্তব্ধতা আর দূরে দেখা আমাদের মায়াবি পৃথিবীর কথা। মিশন চলাকালীন নভোচারীরা জানিয়েছিলেন, চাঁদের মধ্যাকর্ষণ বল অনুভব করা এবং পৃথিবীর সঙ্গে রেডিও সিগন্যালের সাময়িক বিচ্ছিন্নতা ছিল এক অদ্ভুত শিহরণ জাগানিয়া অভিজ্ঞতা। ওরিয়ন ক্যাপসুলের ছোট জানালা দিয়ে চাঁদের ধূসর পৃষ্ঠ আর গহ্বরগুলোকে খুব কাছ থেকে দেখা ছিল তাদের জীবনের শ্রেষ্ঠ পাওয়া। ভিক্টর গ্লোভারের ভাষায় ‘এটি কেবল বিজ্ঞানের জয় নয়, এটি আমাদের ঘরকে নতুন করে চেনার এক সুযোগ।’

নভোচারীরা প্রত্যেকেই তাদের ব্যক্তিগত অনুভূতি প্রকাশ করেছেন। মিশন কমান্ডার রিড ওয়াইজম্যান চাঁদ থেকে পৃথিবীর রূপ দেখে অভিভূত হয়ে বলেন, ‘মানুষ হওয়া একটি বিশেষ ব্যাপার, আর এই পৃথিবী নামক গ্রহে থাকা আরো বেশি বিশেষ কিছু। আমাদের নীল গ্রহটি প্রতিটি উচ্চতা থেকেই অসম্ভব সুন্দর।’

পাইলট ভিক্টর গ্লোভার মহাকাশের অসীম শূন্যতায় ভালোবাসা ও ঐক্যের বার্তা দিয়ে বলেন, ‘মহাবিশ্বের রহস্য উন্মোচনে সঙ্গে সঙ্গে আমি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় রহস্যটির কথা মনে করিয়ে দিতে চাই— তা হলো ‘ভালোবাসা।’ আমরা চাঁদ থেকে আপনাদের সবাইকে ভালোবাসি।’

মিশন স্পেশালিস্ট ক্রিস্টিনা কোচ অসীম অন্ধকার মহাকাশে পৃথিবীকে একটা ‘লাইফবোট’ হিসেবে তুলনা করে বলেন, ‘একটি ক্রু বা দল যেমন সুন্দরভাবে একে অপরের সঙ্গে যুক্ত থাকে, আমার উপলব্ধি হলো—পুরো পৃথিবীই আসলে একটি বিশাল ক্রু। আমরা অজানাকে খুঁজব, নতুন জাহাজ গড়ব, গবেষণা চালাব, কিন্তু দিন শেষে আমরা সব সময় এই পৃথিবীকে এবং একে অপরকেই বেছে নেব।’

মিশন স্পেশালিস্ট জেরেমি হ্যানসেন পুরো অভিযানের মানবিক দিকটি তুলে ধরে বলেন, ‘আমরা অনেক দূরে গিয়েছি ঠিকই কিন্তু আমরা কখনোই পৃথিবীকে ছেড়ে যাইনি। এই মিশনটি আসলে আমাদের সবার।’ মিশনের একটি বিশেষ স্লোগান যা চার নভোচারী মিলে দিয়েছিলেন, তা পুরো বিশ্বের নজর কেড়েছে। সেটা হচ্ছে ‘আমরা প্রস্তুত (কোচ), আমরা যাচ্ছি (হ্যানসেন), চাঁদের উদ্দেশ্যে (গ্লোভার)— পুরো মানবজাতির জন্য (ওয়াইজম্যান)।’

আর্টেমিস-২ মিশনের চার নভোচারী ও পুতুল রাইজ
আর্টেমিস-২ মিশনের চার নভোচারী ও পুতুল রাইজ

নাসার আর্টেমিস মিশন কী, নভোচারীদের পরিচয় ও কর্মকাণ্ড

অর্ধ শতাব্দীরও বেশি সময় পর মানুষকে চাঁদে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা ২০১৯ সালে নতুন করে চন্দ্রাভিযানের এক বিশাল পরিকল্পনা গ্রহণ করে। এই পরিকল্পনার নাম ‘আর্টেমিস মিশন।’ ১৯৭২ সালের অ্যাপোলো-১৭ মিশন শেষ হওয়ার পর এটিই নাসার বড় উদ্যোগ। এই পরিকল্পনায় নভোচারীরা ২০২৮ সালে আবার চাঁদের বুকে পা রাখবেন।

তবে আর্টেমিস মিশনের মূল লক্ষ্য শুধু চাঁদের মাটিতে পা রাখা বা ঘুরে আসা নয়। নাসা এই কর্মসূচির মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি এবং টেকসই মহাকাশ অভিযানের একটি ভিত্তি তৈরি করতে চায়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে চাঁদে একটি ‘স্থায়ী ঘাঁটি’ বা ‘বেস ক্যাম্প’ এবং চাঁদের কক্ষপথে ‘গেটওয়ে’ নামক একটি মহাকাশ স্টেশন স্থাপন করা। একই সঙ্গে চাঁদে থাকার অভিজ্ঞতা ও নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে ভবিষ্যতে ‘মঙ্গল গ্রহে’ মানুষ পাঠানোর চূড়ান্ত প্রস্তুতি নেওয়া, যা আর্টেমিস মিশনের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য।

আর্টেমিস মিশনের মাধ্যমে নভোচারীরা চাঁদে নামার পর এবার শুধু সেখানে হাঁটাহাঁটি কিংবা চাঁদের মাটি বা নুড়ি পাথর কুড়িয়ে আনবেন না। চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে বরফ ও অন্যান্য খনিজ সম্পদের খোঁজ করবেন এবং গভীর মহাকাশে তেজস্ক্রিয়তার প্রভাব নিয়ে গবেষণাও চালাবেন।

অ্যাপোলোর ৬টি সফল মিশনের (১৯৬১-১৯৭২) সব কটির ক্ষেত্রেই নভোচারীরা চাঁদের বিষুবীয় অঞ্চলের (ইকুইটরিয়াল রিজিয়ন) কাছাকাছি এবং পৃথিবীর দিকে মুখ করে থাকা সম্মুখভাগে (নিয়ার সাইড) নেমেছিলেন। যেমন অ্যাপোলো-১১ মিশন নেমেছিল ‘শান্তি সাগর’ বা Mare Tranquillitatis’ এলাকায়। এর কারণ পৃথিবীর দিকে মুখ করে থাকা চাঁদের পৃষ্ঠটিতে নভোচারীদের সঙ্গে রেডিও যোগাযোগ সহজ ছিল। এলাকাটি সমতল ছিল যা তৎকালীন প্রযুক্তিতে নিরাপদ অবতরণের জন্য প্রয়োজন ছিল। তাছাড়া অবতরণের সময় দিনের আলো ও তাপমাত্রার ভারসাম্য বজায় রাখা সহজ ছিল।

নতুন চন্দ্রাভিযান আর্টেমিস মিশনের লক্ষ্য হলো চাঁদের দক্ষিণ মেরু (South Pole)। আর্টেমিস-৩ ও আর্টেমিস-৪ এর জন্য নাসা ইতোমধ্যে দক্ষিণ মেরুর ‘শাকলটন ক্রেটার’র নিকটবর্তী অঞ্চলসহ ৯টি সম্ভাব্য এলাকা নির্ধারণ করেছে। এই এলাকাগুলো চিহ্নিত করার কারণ হচ্ছে দক্ষিণ মেরুর স্থায়ী অন্ধকার গর্তগুলোতে জমানো বরফ থাকার খুব সম্ভাবনা রয়েছে। এই বরফ থেকে পানীয় জল এবং রকেট জ্বালানি (অক্সিজেন ও হাইড্রোজেন) তৈরি করা সম্ভব। চাঁদের এই এলাকায় এমন কিছু উঁচু স্থান রয়েছে, যেখানে প্রায় সব সময় সূর্যালোক থাকে। ফলে সূর্যালোক থেকে সৌরশক্তির মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য এটি উৎকৃষ্ট স্থান। চাঁদে প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকার অভিজ্ঞতা ভবিষ্যতে মঙ্গলগ্রহে মানুষ পাঠানোর পথে বড় ধাপ হিসেবে কাজ করবে। এছাড়া দক্ষিণ মেরুর মাটি ও পাথর চাঁদের ইতিহাসের অনেক প্রাচীন তথ্য বহন করছে যা আগে কখনো পরীক্ষা করা হয়নি।

সহজ কথায় অ্যাপোলো ছিল কেবল চাঁদে যাওয়ার একটি ‘প্রতিযোগিতা।’ কিন্তু আর্টেমিস মিশন হলো চাঁদে স্থায়ীভাবে বসবাসের একটি বৈজ্ঞানিক প্রচেষ্টা।

নতুন চন্দ্রাভিযানের নাম ‘আর্টেমিস’ রাখা সম্পর্কে নাসার তথ্যে বলা হয়, এটা মূলত গ্রিক পুরাণের অনুপ্রেরণা। নাসার আগের চন্দ্রাভিযানের নাম ছিল ‘অ্যাপোলো।’ গ্রিক পুরাণ অনুসারে আর্টেমিস হলেন গ্রিক দেবতা অ্যাপোলোর যমজ বোন। যেহেতু নতুন এই মিশন অ্যাপোলোর পরবর্তী ধাপ, তাই যমজ সম্পর্কের ভিত্তিতেই ‘আর্টেমিস’ নাম রাখা। গ্রিক পুরাণে আর্টেমিস হলেন চাঁদের দেবী বা চন্দ্রদেবী। চাঁদে যাওয়ার মিশন হওয়ায় চন্দ্রদেবীর এই নাম ব্যবহার করা হয়েছে। নাসা এই মিশনের মাধ্যমে প্রথম কোনো নারীকে চাঁদে পাঠানোর পরিকল্পনা করেছে। আর্টেমিস যেহেতু একজন নারী, তাই এই মিশনটি চন্দ্রাভিযানে নারীদের অগ্রযাত্রার প্রতীক হিসেবে দেখা হচ্ছে। আগেই বলেছি, নাসা চায় চাঁদে দীর্ঘ সময় থাকার জন্য একটি ‘বেস ক্যাম্প’ বা স্থায়ী গবেষণা কেন্দ্র তৈরি করতে। যদিও আর্টেমিস মিশনের আসল লক্ষ্য মঙ্গলগ্রহে যাওয়ার একটি মহড়া। চাঁদে দীর্ঘদিন থাকার অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে মানুষ ভবিষ্যতে আরো দূরের গ্রহে যাওয়ার সাহস পাবে।

এই মিশনে নাসার শক্তিশালী রকেট এসএলএস (Space Lunch system) এবং নভোচারীদের জন্য আধুনিক ‘ওরিয়ন’ মহাকাশযান ব্যবহার করা হয়। আর্টেমিস-১ মিশনটি ২০২২ সালে চন্দ্রাভিযানে যায়। এটি ছিল মানুষবিহীন একটি পরীক্ষামূলক ফ্লাইট যা সফলভাবে চাঁদের কক্ষপথ ঘুরে পৃথিবীতে ফিরে আসে।

আর্টেমিস-২ মিশনটি চারজন নভোচারী নিয়ে ২০২৬ সালের ১ এপ্রিল থেকে ১০ এপ্রিল পর্যন্ত দশদিন চাঁদের কক্ষপথে ঘুরে এসেছে, তবে তারা চাঁদে নামেননি।

আর্টেমিস-৩ ও ৪ মিশনের মাধ্যমে ২০২৮ সাল নাগাদ নভোচারীরা সরাসরি চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে অবতরণ করবেন এবং সেখানে গবেষণা চালাবেন। এই মিশনগুলোর সাফল্যের মাধ্যমেই আমাদের জন্য মহাকাশ ভ্রমণের এক নতুন যুগের সূচনা হতে যাচ্ছে।

চাঁদের দেশ থেকে ফিরে আসা আর্টেমিস-২ মিশনটির কমান্ডার বা দলনেতা ছিলেন রিড ওয়াইজম্যান। তিনি মার্কিন নৌবাহিনীর একজন অভিজ্ঞ টেস্ট পাইলট। এর আগে তিনি মহাকাশ স্টেশনে ১৬৫ দিন কাটিয়ে আসেন। তার নেতৃত্বে ‘ওরিয়ন’ মহাকাশ যানটি পৃথিবী থেকে রেকর্ড পরিমাণ দূরত্ব ২ লাখ ৫২ হাজার ৭৫৬ মাইল অতিক্রম করে পৃথিবীতে ফিরে আসে।

আর্টেমিস-২ মিশনের পাইলট ছিলেন মার্কিন নৌবাহিনীর ফাইটার পাইলট ভিক্টর গ্লোভার। তিনি চাঁদে ভ্রমণকারী প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ ব্যক্তি। মহাকাশযানটির চালানোর প্রধান দায়িত্বে ছিলেন তিনি। ভিক্টর গ্লোভার যখন চাঁদের উল্টো পিঠ থেকে সূর্যগ্রহণ দেখেছিলেন, তখন সেই দৃশ্য দেখে উচ্ছ্বসিত হয়ে বলেছিলেন, ‘আমরা যেন কোনো সায়েন্স ফিকশন বা বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনির রাজ্যে চলে এসেছি।’

আর্টেমিস-২ মিশন স্পেশালিস্ট ছিলেন ক্রিস্টিনা কচ। তিনি একজন পেশাদার ইঞ্জিনিয়ার এবং চাঁদে যাওয়া প্রথম নারী। মহাকাশে দীর্ঘতম সময় ৩২৮ দিন কাটানোর রেকর্ডটি তার দখলে। এই মিশনে তিনি ওরিয়ন মহাকাশযানের বিভিন্ন যন্ত্রপাতি ও সিস্টেম তদারকি করেছেন।

আর্টেমিস-২ আরেক মিশন স্পেশালিস্ট ছিলেন জেরেমি হ্যানসেন। তিনি কানাডিয়ান স্পেস এজেন্সির একজন নভোচারী এবং প্রথম অ-মার্কিন নাগরিক, যিনি চাঁদের মিশনে অংশ নিয়েছেন। এটি ছিল তার প্রথম মহাকাশযাত্রা। জেরেমি এই অভিযানে বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং চাঁদের পৃষ্ঠের অসাধারণ সব ছবি তোলার কাজে বড় ভূমিকা রেখেছেন।

চন্দ্রাভিযানে আর্টেমিস মিশন কখন শুরু হয়

নাসা আর্টেমিস চন্দ্রাভিযানের পরিকল্পনা ঘোষণা দেয় ২০১৯ সালের মে মাসে। এই অভিযানের মূল লক্ষ্য হলো ১৯৭২ সালের পর পুনরায় মানুষকে চাঁদে পাঠানো এবং সেখানে একটি দীর্ঘমেয়াদি মানব উপস্থিতি নিশ্চিত করা। ২০২৫ সাল নাগাদ আর্টেমিস প্রকল্পের মোট খরচ ধরা হয় ৯৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ১০ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা। ২০২৮ সালে চন্দ্রপৃষ্ঠে অবতরণ পর্যন্ত এই খরচ ১০০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে। আর্টেমিস প্রকল্পের প্রতিটি রকেট উৎক্ষেপণের (এসএলএস রকেট ও ওরিয়ন মহাকাশযান) জন্য প্রায় ৪ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার খরচ হবে।

মহাকাশে নভোচারীদের খাবার-দাবার ঘুম, ব্যায়াম

ওরিয়ন মহাকাশযানে রান্নার কোনো ব্যবস্থা ছিল না, তাই তাদের খাবার আগে থেকে তৈরি করা ছিল। তারা মূলত ‘ফ্রিজ ড্রাইড’ (পানি শুকিয়ে নেওয়া) খাবার খেয়েছেন। এই খাবার হচ্ছে মুরগির মাংস, সবজি, পাস্তা এবং চিংড়ির ককটেল। খাওয়ার আগে এগুলো গরম পানিতে ভিজিয়ে নিতে হয়। স্ন্যাকসের মধ্যে তাদের প্রিয় ছিল বাদাম, চকলেট এবং ফলের রস। মহাকাশে স্বাদ কমে যায় বলে তারা খাবারে অনেক সময় ঝাঁঝালো সস বা মসলা যোগ করতেন। নভোচারীদের প্রশ্রাব ও ঘাম একটি বিশেষ যন্ত্রের মাধ্যমে পরিশ্রুত করে আবার খাওয়ার উপযোগী বিশুদ্ধ পানিতে রূপান্তর করা হয়।

মহাকাশে ভ্রমণের সময় নভোচারীদের প্রতিদিন নিয়ম করে ব্যায়াম করতে হয়েছে। কারণ মহাকাশে অভিকর্ষ বল না থাকায় শরীরের পেশি ও হাড় দুর্বল হয়ে যায়। তাই আর্টেমিস-২ মিশনে নভোচারীরা ১০ দিনই প্রতিদিন দেড় থেকে দুই ঘণ্টা করে ব্যায়াম করেছেন যাতে তাদের পৃথিবীতে ফেরার পর সুস্থভাবে হাঁটতে কোনো অসুবিধা না হয়।

মহাকাশে মধ্যাকর্ষণ না থাকায় টয়লেট করা বা ঘুমানো বেশ অদ্ভুত এবং মজার অভিজ্ঞতা। মহাকাশে সাধারণত টয়লেট কাজ করে না। কারণ পানি নিচে পড়ে না, বরং ভেসে বেড়ায়। তাই নাসা একটি বিশেষ টয়লেট ব্যবহার করে যা অনেকটা ‘ভ্যাকুয়াম ক্লিনার’-এর মতো কাজ করে। নভোচারীরা যখন টয়লেটে বসেন, তখন একটি শক্তিশালী বাতাস (Suction) বর্জ্য পদার্থগুলোকে টেনে একটি ট্যাঙ্কে নিয়ে যায়। প্রশ্রাব করার জন্য একটি বিশেষ ফানেল বা পাইপ থাকে। এই তরলকে পরে রিসাইকেল করে বিশুদ্ধ পানি তৈরি করা হয়। কঠিন বর্জ্য একটি আলাদা ব্যাগে জমা হয় যা শুকিয়ে ফেলা হয় এবং পরে পৃথিবীতে ফেরার সময় আবর্জনা হিসেবে পুড়িয়ে ফেলার জন্য।

মহাকাশযানে কোনো বিছানা বা বালিশ ছিল না। কারণ শুয়ে পড়লে শরীর ভেসে যাবে। তাই নভোচারীরা অদ্ভুতভাবে ঘুমান। দেয়ালের সঙ্গে আটকানো একটি বিশেষ ‘স্লিপিং ব্যাগ’-এর ভেতর ঢুকে চেইন আটকে দেন। এতে তারা ঘুমের মধ্যে মহাকাশযানের দেয়ালে ধাক্কা খান না। যেহেতু সেখানে উপর-নিচ নেই, তাই তারা দেয়াল, ছাদ বা মেঝের সঙ্গে ব্যাগ আটকে যে কোনো দিকে মুখ করে ঘুমাতে পারেন। মহাকাশযানের ভেতরের যন্ত্রপাতি সব সময় শব্দ করে, তাই শান্তিতে ঘুমানোর জন্য তারা কানে প্লাগ এবং চোখে অন্ধকার মাস্ক ব্যবহার করেন। এই দশদিনে নভোচারীরা ঘুমের সময়সূচি খুব কঠোরভাবে মেনে চলেছেন যাতে তারা সব সময় সজাগ ও কর্মক্ষম থাকেন।

নভোচারীরা সব সময় স্পেসস্যুট পরিহিত অবস্থায় ছিলেন না। রকেট উৎক্ষেপণ, বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ এবং জরুরি অবস্থায় ওরিয়ন ক্রু সার্ভাইভাল সিস্টেম (ওসিএসএস) ‍স্যুটগুলো পরিধান করেন। মহাকাশযানের ভেতরে থাকার সময় তারা আরামদায়ক পোশাক পড়েন। স্পেসস্যুট জরুরি ব্যাকআপ-এর জন্য। কোনো কারণে যদি মহাকাশযানে বায়ুর চাপ কমে যায়, তখন এই স্যুট নভোচারীদের টানা ৬ দিন পর্যন্ত জীবিত রাখতে সক্ষম।

আর্টেমিস-২ উৎক্ষেপণ ও প্রশান্ত মহাসাগরে মহাকাশযানের অবতরণ
আর্টেমিস-২ উৎক্ষেপণ ও প্রশান্ত মহাসাগরে মহাকাশযানের অবতরণ

নভোচারীদের সঙ্গে থাকা পুতুল

আর্টেমিস-২ মিশনে নভোচারীদের সঙ্গে থাকা পুতুলটির নাম ‘রাইজ।’ এটি মূলত একটি ‘জিরো-গ্রাভিটি ইন্ডিকেটর’ হিসেবে কাজ করেছে যা মহাকাশযানটি ওজনহীনতায় পৌঁছালে ভাসতে শুরু করার মাধ্যমে নভোচারীদের সংকেত দেয়। এটি চাঁদের মতো দেখতে সাদা রঙের হাসি মুখের নরম পুতুল। নীল ও সবুজ রঙের ক্যাপ মাথায়। নকশাটি ১৯৬৮ সালের অ্যাপোলো-৮ মিশনে তোলা বিখ্যাত আর্থরাইজ ছবির আদলে তৈরি। ক্যালিফোর্নিয়ার মাউন্ট ভিউ-এর ৮ বছরের স্কুল ছাত্র লুকাস ইয়ে এর নকশা করেছে। ২,৬০০টিরও বেশি নকশার মধ্য থেকে এটি বাছাই করা হয়েছে।

মঙ্গলগ্রহের হাতছানি

মানুষের কাছে মঙ্গলগ্রহ বরাবরই এক রহস্যময় এবং রোমাঞ্চকর আকর্ষণের বিষয়। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতি এই লাল গ্রহে বসতি

স্থাপনের স্বপ্নকে দিন দিন আরো বাস্তবমুখী করে তুলছে। পৃথিবীর বিকল্প হিসেবে বিজ্ঞানীরা এখন মঙ্গলগ্রহকে বেছে নেওয়ার স্বপ্ন দেখছেন। নাসার আর্টেমিস মিশনের লক্ষ্য তাই শুধু চাঁদ নয়, মঙ্গলগ্রহও । মঙ্গলে কোনো সময় প্রাণের অস্তিত্ব ছিল কিনা বা ভবিষ্যতে সেখানে মানুষ বেঁচে থাকতে পারবে কিনা তা নিয়ে নাসা এবং বিভিন্ন মহাকাশ সংস্থা নিরন্তর গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছে। মঙ্গলে পৌঁছানোর লক্ষ্যকে সামনে রেখেই নতুন নতুন রকেট প্রযুক্তি যেমন স্পেসএক্স এবং জীবনরক্ষাকারী প্রযুক্তির বিকাশ ঘটছে।

মঙ্গলগ্রহ নিয়ে মানুষের যে কৌতূহল সেটা বহু বছর আগে থেকেই। ১৯৬০-এর দশকেই মঙ্গলগ্রহে অভিযানের প্রচেষ্টা শুরু হয়। এখন পর্যন্ত মঙ্গলগ্রহ অভিমুখে ৬০টিরও বেশি মহাকাশযান পাঠানো হয়েছে। তবে এর মধ্যে সফলতার হার ৫০ শতাংশ। ৩০টির মতো অভিযান সফলভাবে শেষ হয়েছে। মঙ্গলগ্রহে সফল অভিযানগুলোর মধ্যে ১৯৬৫ সালে ‘মেরিনার ৪’ মঙ্গলে প্রথম সফল ‘ফ্লাইবাই’ যা গ্রহটির প্রথম ক্লোজআপ ছবি পাঠায়। ১৯৭১ সালে ‘মেরিনার ৯’ প্রথম মহাকাশযান যা মঙ্গলের কক্ষপথে প্রবেশ করে এবং গ্রহটিকে প্রদক্ষিণ করে। ১৯৭৬ সালে ‘ভাইকিং ১ ও ২’ মঙ্গলের পৃষ্ঠে প্রথম পুরোপুরি সফল ল্যান্ডার। ১৯৯৭ সালে ‘মার্স পাথফাইন্ডার’ ও ‘সোজার্নার’ মঙ্গলের বুকে চালানো প্রথম ছোট আকারের রোভার। ২০০৪ সালে ‘স্পিরিট ও অপরচুনিটি’ এই যমজ রোভার মঙ্গলের পানির উপস্থিতির প্রমাণ দেয়। ২০১২ সালে ‘কিওরিসিটি’ মঙ্গলের পরিবেশ এক সময় প্রাণ ধারণের উপযোগী ছিল কিনা তা নিয়ে বিশাল সাফল্য অর্জন করে। ২০২১ সালে ‘পারসিভিয়ারেন্স রোভার’ মঙ্গলে যায়। বর্তমানে এটি মঙ্গলে প্রাণের জীবাস্ম খুঁজছে এবং পাথর সংগ্রহ করছে। মঙ্গল অভিযানের সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো গ্রহটিতে এক সময় প্রবাহমান তরল পানি থাকার প্রমাণ পাওয়া। এছাড়া মঙ্গলের উপরিভাগের বিশাল মানচিত্র তৈরি, বায়ুমণ্ডলের রহস্যভেদ এবং সম্প্রতি মঙ্গলের মাটিতে হেলিকপ্টার ‘ইনজেনুইটি’ উড্ডয়ন এক অবিস্মরণীয় অর্জন। সর্বশেষ বিজ্ঞানীরা মঙ্গলের উত্তর গোলার্ধে একটি উপকূলীয় মহাদেশী তাক (Coastorl Shelf) খুঁজে পেয়েছেন যা প্রমাণ করে মঙ্গলের এক-তৃতীয়াংশ এক সময় বিশাল সাগরে ঢাকা ছিল। পারসিভিয়ারেন্স রোভার মঙ্গলের জেজেরো ক্রেটারে প্রাচীন তরঙ্গের চিহ্নযুক্ত সৈকত এবং পাথর খুঁজে পেয়েছে যা সেখানে পানির দীর্ঘস্থায়ী উপস্থিতির সম্ভাবনা বাড়িয়ে দিয়েছে। মঙ্গলের মাটিতে আরো জটিল জৈব অণু এবং চাবাকিয়া জলপ্রপাতের মতো স্থানে প্রাণের অনুকূল রাসায়নিক বিক্রিয়ার চিহ্ন পাওয়া গেছে।

চাঁদের-পর-মঙ্গল-গ্রহের-হাতছানি-3

চলতি বছরের শেষের দিকে পৃথিবী ও মঙ্গল যখন সবচেয়ে কাছাকাছি আসবে, তখন ৫টি মানুষশূন্য স্টারশিপ মঙ্গলে পাঠানোর পরিকল্পনা রয়েছে ইলন মাস্কের ‘স্পেসএক্সের’। ইলন মাস্ক মনে করেন এর সাফল্যের সম্ভাবনা প্রায় ৫০ শতাংশ। চলতি বছর (২০২৬) রোবটিক মিশনগুলো সফলভাবে মঙ্গলের মাটিতে নামতে পারে, তবে ২০২৯ থেকে ২০৩১ সালের মধ্যে প্রথম মানববাহী মিশন মঙ্গলের পানে রওয়ানা হতে পারে। যদিও মঙ্গলে যাওয়ার আগে মহাকাশে (পৃথিবীর কক্ষপথে) এক মহাকাশযান থেকে অন্য মহাকাশযানে জ্বালানি স্থানান্তর করার প্রযুক্তি আয়ত্ত করা সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ইলন মাস্ক ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, তার স্পেসএক্স বর্তমানে মঙ্গল অভিযানের চেয়ে নাসার চন্দ্রাভিযানকে (Lunar Missions) বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। এরপর স্পেসএক্স মঙ্গল অভিযানে যুক্ত হবে।

নভোচারীদের সঙ্গে থাকা পুতুল

আর্টেমিস-২ মিশনে নভোচারীদের সঙ্গে থাকা পুতুলটির নাম ‘রাইজ।’ এটি মূলত একটি ‘জিরো-গ্রাভিটি ইন্ডিকেটর’ হিসেবে কাজ করেছে যা মহাকাশযানটি ওজনহীনতায় পৌঁছালে ভাসতে শুরু করার মাধ্যমে নভোচারীদের সংকেত দেয়। এটি চাঁদের মতো দেখতে সাদা রঙের হাসি মুখের নরম পুতুল। নীল ও সবুজ রঙের ক্যাপ মাথায়। নকশাটি ১৯৬৮ সালের অ্যাপোলো-৮ মিশনে তোলা বিখ্যাত আর্থরাইজ ছবির আদলে তৈরি। ক্যালিফোর্নিয়ার মাউন্ট ভিউ-এর ৮ বছরের স্কুল ছাত্র লুকাস ইয়ে এর নকশা করেছে। ২,৬০০টিরও বেশি নকশার মধ্য থেকে এটি বাছাই করা হয়েছে।

তথ্যসূত্র : নাসা, বিবিসি, সিএনএন, আল জাজিরা, নেচার ও সায়েন্স সাময়িকী, নিউইয়র্ক টাইমস।

লেখক : নির্বাহী সম্পাদক, আমার দেশ

abdal62@gmail.com

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ

এলাকার খবর
Loading...