শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের স্মৃতিকাতর কিন্তু গৌরবময় স্মৃতিধন্য দিনগুলো এগিয়ে আসছে আমাদের সামনে। সেইসঙ্গে মনে করিয়ে দিচ্ছে একজন নিবেদিতপ্রাণ শহীদের স্বপ্ন ও কর্মপ্রেরণার কথা। বুকের গভীরে এক অলৌকিক দেশপ্রেম নিয়ে জিয়াউর রহমান বারবার বাংলাদেশের সংকটপূর্ণ মুহূর্তে আবির্ভূত হয়েছেন। তার কর্মস্পৃহা তাকে দিয়ে দেশ ও জাতির জন্য তৈরি করে দিয়েছিল বিশাল ক্ষেত্র। সদ্য স্বাধীন একটি দেশ তখন অসংখ্য সমস্যায় পীড়িত, জর্জরিত। অর্থনীতি, বৈদেশিক সম্পর্ক বিষয়ে নীতিনির্ধারণ, সাধারণ মানুষের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি ও উন্নয়ন—এ সবকিছুই ছিল তার চিন্তার আওতায়। এদিক থেকে তিনি ছিলেন অত্যন্ত সজাগ ও আশাবাদী। জাতির জীবনে বেশ কয়েকটি দুর্ঘটনায় মানুষ যখন আশাহত-বিভ্রান্ত, তখন জিয়াউর রহমান বাস্তব কর্মস্পৃহা নিয়ে মানুষের সামনে উপস্থিত হন। বাঁধাধরা প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক ও সামাজিক বিষয়গুলো নিয়ে সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা দেওয়ার জন্য তিনি প্রস্তুত ছিলেন। কৃষিক্ষেত্রে খাল খনন এবং উঠানে বাগান করার জন্য তিনি সাধারণ মানুষকে অনুপ্রাণিত করেন। প্রথমত, দেশের আইনশৃঙ্খলার ক্ষেত্রে লক্ষণীয় পরিবর্তন আসে। স্বাধীনতার যুদ্ধ ও যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশ তখন বন্যা, খাদ্যাভাব ও দুর্ভিক্ষের পীড়নে সারা বিশ্বের করুণা ও সমালোচনার মুখে পড়েছিল। কিন্তু প্রচণ্ড প্রাণশক্তির সাহায্যে জিয়াউর রহমান প্রতিটি ক্ষেত্রে সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দেন। দেশকে অবমাননার হাত থেকে রক্ষার জন্য তার পন্থা ছিল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে যাওয়া এবং তাদের কাছে তার শুভ প্রয়াসগুলো পৌঁছে দেওয়া। সাধারণ মানুষের জীবনে অনেক নিয়মতান্ত্রিকতা, যা আগে ছিল অনুপস্থিত, সেগুলোর আবির্ভাব তখন লক্ষ করেছি। রিকশার নিচে রাত্রিকালীন চলাচলের সময়ে হ্যারিকেন ঝোলানো এবং ছোট-বড় সবার গায়ে জামাকাপড় দেখে পরিবর্তনটা এত সুস্পষ্ট আশা-আনন্দ এনেছিল যে, অবশ্যই উল্লেখ করার প্রয়োজন। কারণ যে দেশ চুয়াত্তর থেকে নানা পীড়ন ও দুর্ভিক্ষের কামড়ে ম্রিয়মাণ ছিল—দেখেছিলাম সেই দেশই ছিয়াত্তরে সুস্পষ্ট গঠনমূলক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যেন অন্য রকম হয়ে ওঠার প্রস্তুতি নিচ্ছিল।
পরিবর্তন বলতে আমি বলতে চাই সেই স্বপ্নের কথা, যা বুকে নিয়ে অসংখ্য তরুণ প্রাণ দিয়েছিল। জনসাধারণের সর্বস্তরের সার্বিক যুদ্ধের মধ্য দিয়ে যে স্বাধীনতা আমরা পেয়েছি, তা সারা দেশের নগরে-বন্দরে ও গ্রামেগঞ্জে জীবনযাত্রায় আনবে আশার আলো—এটাই আমাদের কাম্য ছিল। কিন্তু সাধারণ মানুষ পড়ে গেল অদ্ভুত জটিল এক আবর্তে। তাই ক্রমাগত হানাহানি, প্রাকৃতিক বিপর্যয় ও পুঁজিবাদী গোষ্ঠীর নানারূপ সংকটের ফলে পরিবেশের অবনতির সামনে জিয়াউর রহমানের চ্যালেঞ্জ ছিল সবার জন্যই আকাঙ্ক্ষার বিষয়। কৃষক অনুভব করেন নতুন কাজের দিন সমাগত। শিক্ষাব্যবস্থা ও নতুন কুঁড়ির সাংস্কৃতিক প্রেরণা, গ্রাম-গ্রামান্তরে পল্লি বিদ্যুতায়ন, জনসাধারণের জন্য গণশিক্ষার আয়োজন—এসবের মধ্য দিয়ে এক নতুন জীবনচেতনার প্রবাহ দেখা যায় সবার মধ্যে। বেশকিছু নতুন বিষয় নিয়ে কাজ শুরু করেন জিয়াউর রহমান। গণশিক্ষা, নতুন কুঁড়ি, শিশু হাসপাতাল ও নারীর পেশাগত বিস্তৃত কর্মপন্থা ছাড়াও শিশুদের নিজস্ব জগৎ শিশু একাডেমি, শিল্পকলা একাডেমি, জাতীয় জাদুঘর ও জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র বিস্তৃততর কার্যক্রম নিয়ে চলতে শুরু করে। ফিল্ম আর্কাইভ নিয়েও কাজ শুরু হয় তার প্রেরণাতেই।
সমাজের সর্বস্তরের মানুষকে নিয়ে কাজ করতে গিয়ে নারীর কথাও নতুন করে ভাবেন তিনি। মা, মাটি ও মানুষ নিয়ে ভাবতে গিয়ে তিনি নারীর যে শক্তি, তার যোগ্যতার মূল্যায়নের কথা ভাবেন। যে নারী অতীতে যুদ্ধ করেছে, রাজ্য শাসন করেছে, সংসার রক্ষা করেছে, প্রয়োজনে যেকোনো ত্যাগ স্বীকারে এগিয়ে এসেছে—তাকে শুধু সীমাবদ্ধতার মধ্যে আবদ্ধ রাখা সংগত নয়। এ সত্য তিনি উপলব্ধি করেন। নারীর ক্ষমতাকে সুযোগ দিয়ে বৃহত্তর কর্মক্ষেত্রে নিয়োজিত করার প্রয়োজনে এই প্রত্যয় থেকে কর্মবলয়ের আওতায় নারীর অবস্থান নিশ্চিত করেন। এ দেশের জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক নারী। তার দীর্ঘ কর্মতৎপরতার কথা আমরা জানি, কিন্তু স্বভাবগত শৈথিল্যের কারণে আমরা নারীর ভূমিকার যথাযথ মূল্যায়ন করিনি। তা ছাড়া সামাজিক দায়বদ্ধতা, কুসংস্কার ও অশিক্ষায় এ দেশের নারীর প্রাপ্য বা অধিকার, যা মনুষ্যত্বের ধর্ম, তা পায়নি। বিশাল অচলায়তনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছেন বেগম রোকেয়া, নওয়াব ফয়েজুন্নেসা, শামসুন নাহার মাহমুদ ও অনেক মহীয়সী নারী, তবুও কর্মক্ষেত্রে নারীর সীমাবদ্ধতা ছিল, যা স্বাধীন বাংলাদেশের অগ্রযাত্রায় এক মস্ত বাধা। সেই নারীর কর্মক্ষেত্রের বিষয়টি গভীর গুরুত্বের সঙ্গে প্রত্যক্ষ করেন জিয়া। সাধারণভাবে মেয়েরা প্রশাসনিক ক্ষেত্রে বেশি অগ্রসর ছিল না। বাঁধাধরা কিছু পেশায় কাজ করাই ছিল সাধারণ প্রবণতা। জিয়াউর রহমান মেয়েদের পুলিশ বাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করেন। আনসার বাহিনী ও পুলিশ বাহিনী ছাড়াও প্রশাসনে ও সামরিক বাহিনীতে তিনি মেয়েদের অন্তর্ভুক্ত করার সুযোগ সৃষ্টির উদ্যোগ নেন। এর জন্য সৃষ্টি করা হয় মহিলা মন্ত্রণালয়। শিক্ষা ক্ষেত্রে মেয়েরা দীর্ঘদিন ধরে সম্পৃক্ত। সেক্ষেত্রে প্রাইমারি পর্যায়ে মেয়েদের জন্য ব্যাপক সুযোগ সৃষ্টি করা হয়। ধীরে ধীরে পেশাগত বৈচিত্র্যপূর্ণ অভিজ্ঞতা অর্জনের ক্ষেত্রে মেয়েদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ সৃষ্টি হয়। রাজনীতির জটিল কার্যক্রমে নারীর ভূমিকা দীর্ঘদিনের। জিয়াউর রহমানের সৃষ্ট মহিলা মন্ত্রণালয় পরিচালনা এবং সচিব পর্যায়ে দক্ষতা অর্জনের ফলে নারীর ক্ষমতায়নের ব্যাপক ক্ষেত্রটি বিপুল উদ্দীপনা সৃষ্টি করে।
আজকে সমাজের সব ক্ষেত্রে নারীর সফল পদচারণা লক্ষ করে আমরা গর্বিত। কিন্তু এর গোড়াপত্তনে কাজ করেছে জিয়াউর রহমানের দূরদর্শী চিন্তাধারা। সংসদে নারী সদস্যের আসনসংখ্যা ১৫ থেকে ৩০-এ উন্নীত করে তিনি নারীর ভূমিকাকে জোরালো হয়ে ওঠার সুযোগ করে দেন। এসব কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে গ্রামাঞ্চলে পরবর্তীকালে নারীদের মাধ্যমে সমবায়, হাঁস-মুরগি পালন, মৎস্য চাষ, গরুর খামার এবং ক্ষুদ্রঋণের ব্যবহার সমাজের চেহারা বদলে দেওয়ার সুবর্ণ সুযোগ সৃষ্টি করে। এসব কার্যক্রম নারীর কর্মক্ষমতার প্রতি গভীর সম্মান বোধ এনে দেয়। আমার মনে পড়ে, পরিবারে নারীর প্রতি অবিচার হলে নারী যেন সুবিচার পায়, আইন সহায়তা পায়, সে চিন্তা কাজে লাগাতে পরবর্তী প্রশাসন যথেষ্ট সজাগ ছিল। জিয়াউর রহমান যে ১৯ দফা কর্মসূচি দিয়েছিলেন, তার অনেকগুলোই নারীর অধিকার, সামাজিক সম্মান নিশ্চিতকরণ ও নারী-পুরুষের সামাজিক অবস্থানকে চিহ্নিত করেছে।
মানুষ হিসেবে তার সৌম্য তেজস্বিতার মধ্যে বাস করত এমন স্বপ্নচারী উন্নত চিত্ত। দেশ ও জাতিকে তিনি বড় ভালোবাসতেন; চাইতেন পৃথিবীর মানচিত্রে বাংলাদেশের গৌরব তুলে ধরতে। কাজের ক্ষেত্রে ছিলেন নিরলস ও কঠোর নিয়মতান্ত্রিক। বিশ্বের রাজনীতিবিদদের মধ্যে অর্জন করেছেন শ্রদ্ধা ও সম্মান। বিশ্বের নানা দেশে তিনি তুলে ধরেছেন বাংলাদেশের গৌরব ও কঠোর উন্নয়ন প্রয়াসের চিত্র।
এতসব কর্মকাণ্ডে তিনি নারীর পরিচয়কে দিয়েছেন প্রাপ্য মর্যাদা। খুলে দিয়েছেন অপার সম্ভাবনার দুয়ার। বিশাল বিশ্বের সফল অংশীদার হোক তার দেশ, এই ছিল তার স্বপ্ন। যখন তিনি গ্রামীণ ঘরে ঘরে যেতেন, কারও উঠানে বসতেন, জানতে চাইতেন, ‘মা, উঠানে লাউয়ের মাচা আর লেবুর গাছ নেই কেন?’ এক বৃদ্ধা জননীকে বলেছিলেন, ‘পরের বারে এসে গাছের লেবুর শরবত খাব।’ সেই গ্রামীণ নারী জিয়ার মৃত্যুর পরে রাজপথে এসে দাঁড়িয়ে কেবলই অপেক্ষা করে থাকতেন—‘কবে তিনি আসবেন, আর স্নেহ সম্ভাষণে প্রাণ জুড়িয়ে দেবেন।’
দুর্ভাগ্য এই দেশের যে, সে তার প্রকৃত দেশপ্রেমিক সন্তানকে রক্ষা করতে পারল না।
জীবনের শেষ দিনটি পর্যন্ত দেশ ও জাতির কল্যাণে নিবেদিত সেই স্নেহের কমলকে হারিয়েছে এই দেশ। কিন্তু তার স্বপ্ন, স্মৃতি, কল্যাণ চিন্তা ও কর্মপ্রেরণা রয়ে গেছে তার উত্তরসূরিদের মধ্যে। উত্তর প্রজন্মকে তাই জানাতে হবে প্রকৃত ইতিহাস। তার কাছে এ জাতি ও দেশ অনেক ঋণে ঋণী। সেই ঋণ যেন তারই মতো কর্মী গড়ে তুলতে পারে, তবেই এ দেশ পাবে সার্থকতা।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

