কিছুদিন হলো ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন শেষ হয়েছে। চব্বিশের জুলাই বিপ্লবের পর দেশের মানুষের মধ্যে একটি ইতিবাচক পরিবর্তনের আশা তৈরি হয়েছে। রাজনৈতিক নিপীড়ন ও অর্থনৈতিক শোষণের জাঁতাকল থেকে মুক্তির জন্য মানুষের মনে তীব্র আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে। এর আগেও বহুবার রাজনৈতিক পরিবর্তন এসেছিল, কিন্তু মানুষের ভাগ্যের উন্নতি সেভাবে হয়নি; বরং শোষণ ও বৈষম্যের মাত্রা অনেক সময় বেড়েছে। দেশের ব্যক্তি খাতের আপাতবিকাশ ও সাফল্যে শহর-নগরে কোথাও কোথাও গতি, প্রবৃদ্ধি আর সেবার মান বাড়লেও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনমানের দৃশ্যমান উন্নতি লক্ষণীয় হয়নি। এখনো দেশের এক-চতুর্থাংশের বেশি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করছেন। পিপিআরসি’র সাম্প্রতিক গবেষণায় উঠে এসেছে, দেশে এখন দারিদদ্র্যের হার প্রায় ২৮ শতাংশ। সরকারি হিসাবেই ২০২২ সালে এই হার ছিল ১৮ দশমিক ৭। দারিদ্র্য বৃদ্ধির এই চিত্র আমাদের উদ্বিগ্ন করে। দারিদ্র্যের পাশাপাশি অতিদারিদ্র্যের হারও বেড়েছে। সরকারি হিসাবে ২০২২ সালে অতিদারিদ্র্যের হার ছিল ৫ দশমিক ৬। তিন বছর পর এসে অতিদারিদ্র্যের হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৩৫-এ। বাংলাদেশে দারিদ্র্য হ্রাসের হার টেকসই করা যাচ্ছে না। প্রবৃদ্ধির সাফল্য যেমন সবার কাছে পৌঁছাচ্ছে না, তেমনি বিভিন্ন দুর্যোগে দারিদ্র্য আবার বেড়েও যায়। বিগত সরকারের শেষ সময়ে অর্থনীতিতে যে বিশৃঙ্খল অবস্থা ও লুটপাট চলছিল, তা জনজীবনে মারাত্মক বিরূপ প্রভাব ফেলছে। জুলাই বিপ্লবের পর সামষ্টিক অর্থনীতিতে কিছুটা স্বস্তি ফিরে এলেও পুরোপুরি স্থিতিশীল নয়। নতুন সরকারের উদ্যোগগুলো আশা করি সফলতা দেখাবে।
দেশে সম্পদ ও আয়ের বৈষম্য বেশ প্রকট এবং সাম্প্রতিক বছরগুলোয় এটি আরো বেড়েছে। ২০২৬ সালের ‘ওয়ার্ল্ড ইনইকুয়ালিটি রিপোর্ট’ এবং বিভিন্ন আর্থিক সংস্থার তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশে শীর্ষ এক শতাংশ ধনীর হাতে দেশের মোট সম্পদের প্রায় ২৪ শতাংশ পুঞ্জীভূত। দেশের সবচেয়ে ধনী ১০ শতাংশ মানুষের দখলে রয়েছে মোট সম্পদের ৫৮ শতাংশ। বিপরীতে দেশের দরিদ্রতম ৫০ শতাংশ মানুষের হাতে রয়েছে মোট সম্পদের মাত্র ৪ দশমিক ৭ শতাংশ। জাতীয় আয়ের প্রায় ৪১ শতাংশ অর্জন করে ওপরের ১০ শতাংশ উচ্চবিত্ত মানুষ, যেখানে নিচের ৫০ শতাংশ মানুষ পায় মাত্র ১৯ শতাংশ। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মুদ্রাস্ফীতি ও স্থবির মজুরির কারণে স্বল্প আয়ের মানুষ অর্থনৈতিক চাপে রয়েছে, যার ফলে গিনি সূচক গত কয়েক বছরে বেড়েছে। দেশের করব্যবস্থা মূলত পরোক্ষ কর বা ভ্যাটনির্ভর, যা দরিদ্রদের ওপর বেশি চাপ সৃষ্টি করে। সরাসরি আয়করের তুলনায় ধনীদের জন্য উত্তরাধিকার বা সম্পদ করের অভাব এই বৈষম্যকে আরো স্থায়ী করছে। গ্রামীণ এলাকায় নিম্নমানের শিক্ষা এবং কর্মসংস্থানের অভাব নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য ওপরে ওঠার সুযোগ কমিয়ে দিচ্ছে। সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশে গত এক দশকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হলেও এর সুফল সাধারণ মানুষের তুলনায় উচ্চবিত্তদের কাছে বেশি পৌঁছেছে।
অপরদিকে সরকার সুবিধাবঞ্চিত মানুষদের জন্য যে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী কর্মসূচি চালু রেখেছে, তার পরিমাণ জিডিপি-ও মাত্র ২ দশমিক ৫ শতাংশ। কিন্তু এটা অনেকটাই সত্য, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ও দুর্নীতির কারণে প্রকৃত অভাবীরা ওই কর্মসূচির সুবিধা কমই পেয়ে থাকে। একইভাবে বিভিন্ন খাতে সরকার যেসব ভতুর্কি দিয়ে থাকে, তা থেকেও সুবিধা পায় ধনীরা। ঋণখেলাপিরা প্রায় সবাই ধনী এবং ঋণ পরিশোধের পুনঃতফসিলীকরণ সুবিধাও তারাই পায়। যেসব কারণে বৈষম্য বৃদ্ধি পায়, সেগুলোর প্রতিকারের জন্য কার্যকর কর্মসূচির অভাব থাকলেও সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী কর্মসূচির আওতায় দেশে দীর্ঘদিন থেকে বিভিন্ন প্রকল্প চালু আছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে—ভিজিডি, ভিজিএফ, কর্মসংস্থান প্রকল্প, ওএমএস, বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা, ত্রাণ ও পুনবার্সন প্রকল্প এবং শিক্ষার্থীদের জন্য বৃত্তি কর্মসূচি। বাংলাদেশে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী কর্মসূচি মূলত দরিদ্র এবং সমাজের সুবিধাবঞ্চিত পরিবারগুলোর কল্যাণে কাজ করার কথা। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেট এবং সাম্প্রতিক সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এই কর্মসূচিগুলোকে আরো আধুনিক ও জনবান্ধব করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। সাধারণ বয়স্কদের জন্য মাসিক ভাতা ৭০০ টাকা এবং ৯০ বছরের ঊর্ধ্বে ব্যক্তিদের জন্য এই হার এক হাজার টাকা। বিধবা ও স্বামী নিগৃহীতার মাসিক ভাতা ৭০০ টাকা। প্রতিবন্ধী ভাতা মাসিক ৯০০ টাকা। চলতি বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে মোট বরাদ্দ রাখা হয়েছে প্রায় ১ দশমিক ১৭ লাখ কোটি টাকা। সমস্যা হচ্ছে, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির বাজেটের একটি বড় অংশ (প্রায় ৪৫ শতাংশ ) সরকারি কর্মচারীদের পেনশন এবং কৃষি ভর্তুকিতে ব্যয় হয়, যা সরাসরি দরিদ্রদের সহায়তায় কম কাজে আসে। এছাড়া প্রকৃত দরিদ্রদের সঠিক তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা এবং শহরাঞ্চলে কাভারেজ বাড়ানো এখনো একটি বড় চ্যালেঞ্জ। ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে জাতীয় বেতনকাঠামোর প্রজ্ঞাপন জারি করে যখন সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা এক লাফে প্রায় দ্বিগুণ করা হয়েছিল, সে ক্ষেত্রে সম্প্রতি বেতনকাঠামো আবারও দ্বিগুণ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এটি হয়তো নবনির্বাচিত সরকার বাস্তবায়ন করবে; কিন্তু এর বিপরীতে টাকার অঙ্কে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ অনেকটা কচ্ছপগতিতে বাড়ছে। নগদ সহায়তা, খাদ্যসহায়তা ও কর্মসৃজন, বৃত্তি, বিশেষ সহায়তা, বিশেষ জনগোষ্ঠীর জন্য সহায়তা, উন্নয়ন কর্মকাণ্ড প্রভৃতি বিষয়ে সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনী খাতের আওতায় ১১৫টি বিষয় বা কর্মসূচি রয়েছে। বাস্তবায়নের দায়িত্বে রয়েছে ২৪টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগ। খাদ্যনিরাপত্তা ও কর্মসৃজন কর্মসূচিতে থাকছে ১১টি বিষয়। এছাড়া বৃত্তি বাবদ ছয়টি, নগদ ও খাদ্যসহায়তা-সংক্রান্ত ১৭টি, ঋণসহায়তার দুটি, বিশেষ সম্প্রদায় ও জনগোষ্ঠীর ১৩টি, বিভিন্ন তহবিল ও কর্মসূচির ৯টি এবং ৩৪টি উন্নয়ন কর্মসূচি বাবদ বরাদ্দ রাখা হয়েছে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে। পর্যালোচনায় দেখা যাচ্ছে, মোট জিডিপি ২ শতাংশ থেকে ২ দশমিক ৫ শতাংশ ব্যয় বরাদ্দ করে বলে যে দাবি করা হয়ে থাকে, প্রকৃতপক্ষে তা সঠিক নয়। সাবসিডি বাদ দিলে প্রকৃত বরাদ্দ হার জিডিপির মাত্র ১ দশমিক ৩২ শতাংশ! সরকারের এসব কর্মসূচি হতদরিদ্রের হার কমাতে কিছুটা সাহায্য করলেও প্রকৃতপক্ষে অর্থনৈতিক বৈষম্য হ্রাসকরণে এর তেমন কোনো অবদান নেই। সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী কর্মসূচির জন্য বরাদ্দের পরিমাণ এতটাই কম যে, তা দিয়ে ন্যূনতম চাহিদা পূরণ, এমনকি খাবারের ব্যবস্থা করাও সম্ভব হয় না। যতটুকু হয়, সেটাও সময়মতো পাওয়া যায় না।
সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী কর্মসূচির জন্য বরাদ্দের পরিমাণ বৃদ্ধির কথা বিবেচনা করতে গেলেই সরকারকে অন্য খাতের বরাদ্দ কমাতে হয়। কারণ দেশের রাজস্ব আয়ের পরিমাণ সন্তোষজনক নয়। এখানেই সরকারকে একটি গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ করতে পারি। সেটি হচ্ছে ইসলামি সামাজিক অর্থায়নকে রাজস্বের একটি উৎস হিসেবে গ্রহণ করা। ২০২২ সালের সমীক্ষা অনুযায়ী, বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম সমাজ থেকে প্রতি বছর কমপক্ষে এক লাখ কোটি টাকা জাকাত সংগ্রহ করা যেতে পারে। এই সংখ্যাটি সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী কর্মসূচির জন্য সরকারি বরাদ্দের সমান বা তারও বেশি। পাশাপাশি ইসলামিক সামাজিক অর্থনীতির অন্যান্য উপাদান তথা ওয়াক্ফ, উশর, ফিতরা, সাদাকাহ, মোহরানা বিকশিত করা গেলে এটি হবে স্বয়ংসম্পূর্ণ। বাংলাদেশের অধিবাসীদের ৯০ শতাংশ মুসলমান হওয়া সত্ত্বেও এখানে জাকাত আদায় ও বিতরণ সঠিকভাবে হচ্ছে না। নীতিনির্ধারকদের কাছেও অর্থব্যবস্থার অংশ হিসেবে জাকাত কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে ওঠেনি। সরকার ২০২৩ সালে কিছু সংশোধন ও পরিমার্জন করে একটি নতুন জাকাত আইন প্রণয়ন করেছে। কিন্তু আইনটি দেশে জাকাত প্রতিষ্ঠার জন্য যথেষ্ট নয়। এ আইনে অনেক কিছুই স্পষ্ট নেই। জাকাত ও ট্যাক্স বিশেষত ব্যবসায়িক জাকাত নিয়ে কোনো স্পষ্টতা নেই। বর্তমান ট্যাক্স পদ্ধতিতে ব্যবসায়িক জাকাত স্বীকৃত নয়। ফলে ব্যবসায়িক জাকাত বিকশিত হতে পারছে না। এ বিষয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলগুলোরও দায়িত্ব আছে। দলগুলোর নেতৃত্ব রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক রূপরেখা নিয়ে মাসের পর মাস দ্বন্দ্বে লিপ্ত হলেও জনগণের অর্থনৈতিক সমস্যার বিষয়ে সীমাহীন উদাসীনতা দেখিয়ে এসেছে। রয়েছে চিন্তার সক্ষমতার বিষয়টিও। দারিদ্র্য বিমোচনে রাজনৈতিক দলগুলোর কর্মসূচি ও নীতি-পরিকল্পনা কী, সেটা জানার অধিকার নিশ্চয়ই নাগরিকদের আছে। আমরা চাই রাজনৈতিক দলগুলো বিশেষত নতুন সরকার দারিদ্র্য বিমোচনের অন্যতম উৎস হিসেবে জাকাত ও ইসলামি সামাজিক অর্থায়নকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবেন। জাকাত ও হারাম উপার্জন সর্বদা বিপরীত মেরুতে অবস্থান করে। দেশে যদি জাকাতদাতার সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পায়, তবে অবৈধ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ক্রমান্বয়ে কমে আসবে। মজুতদারি, অতিরিক্ত মুনাফা আদায় এবং জনগণের সম্পদের অপব্যবহার কমবে। অবৈধ সুযোগ নেওয়ার মানসিকতা লোপ পাবে। দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির উত্তরণ ঘটবে।
লেখক : জাকাতভিত্তিক উন্নয়নকর্মী
wknsohel86@gmail.com
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


ইরানে স্থল অভিযান হবে পশ্চিমাদের আত্মহত্যা