আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

সংস্কার না দ্রুত নির্বাচন

মাহমুদুল হাসান

সংস্কার না  দ্রুত নির্বাচন

বাংলাদেশ বর্তমানে এক গভীর অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার কমে মাত্র ৪ দশমিক ২২ শতাংশে নেমে এসেছে, যা গত এক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন। ২০২৬ সালে স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণ সামনে রেখে অর্থনৈতিক চাপ ক্রমেই বাড়ছে। শুল্কমুক্ত সুবিধা হারানোর ফলে পণ্য রপ্তানিতে নতুন চ্যালেঞ্জ আসবে অথচ গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক অংশীদারদের সঙ্গে এখনো কোনো দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তি হয়নি। এর পাশাপাশি দেশে বেকারত্বের হার বৃদ্ধি পাচ্ছে, বৈদেশিক বিনিয়োগ কমছে এবং রাজস্ব আদায়ের অবস্থাও আশানুরূপ নয়। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাব, অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত দুর্বলতা এবং আওয়ামী শাসনামলে ব্যাপক লুটপাট ও অর্থ পাচারের ফলে এ সংকট আরো গভীর হয়েছে। তবে এ সংকট কাটিয়ে ওঠার জন্য এখন সবচেয়ে জরুরি হলো রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, যা বর্তমান পরিস্থিতি উত্তরণের প্রথম ধাপ হিসেবে কার্যকর সমাধান হতে পারে। বিএনপিসহ যেসব দল দ্রুত নির্বাচন আয়োজনের দাবি করছে, তাদের এ অবস্থান বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। কারণ, এই মুহূর্তে নির্বাচন আয়োজন করা দেশের অর্থনীতির ওপর আরো বড় চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

বিজ্ঞাপন

নির্বাচন একটি ব্যয়বহুল প্রক্রিয়া, যার ফলে বর্তমান অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে এত বিশাল ব্যয়ভার বহন করা দেশের জন্য অত্যন্ত কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। নির্বাচনী প্রচারণা, নিরাপত্তাব্যবস্থা ও নির্বাচন পরিচালনার জন্য বিপুল অর্থের প্রয়োজন হবে, যা অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করবে। এর ফলে ব্যবসা-বাণিজ্য, উৎপাদন ও বিনিয়োগ ব্যাহত হতে পারে, যা সামগ্রিকভাবে প্রবৃদ্ধির হারকে আরো নিম্নমুখী করবে। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা সর্বাধিক গুরুত্ব পাওয়া উচিত। এই সংকটপূর্ণ সময়ে নির্বাচনী ব্যয় ও রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি করা জাতীয় অর্থনীতির জন্য ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে।

দ্রুত নির্বাচন আয়োজনের আরেকটি প্রধান ঝুঁকি হলো রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা। স্বৈরাচারী সরকারের অধীনে দীর্ঘদিন থাকা প্রশাসন ও নিরাপত্তা বাহিনী এখনো নিরপেক্ষ হয়ে ওঠেনি। ফলে দ্রুত নির্বাচন মানেই সংঘর্ষ, সহিংসতা ও ভোট ডাকাতির মতো ঘটনাকে আমন্ত্রণ জানানো। ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালের নির্বাচন থেকে আমরা দেখেছি, কীভাবে রাজনৈতিক সহিংসতা, সংঘর্ষ ও ভোট কারচুপির ঘটনা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। এ ধরনের পরিস্থিতি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে নষ্ট করার পাশাপাশি অর্থনীতিকেও দুর্বল করবে। এই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে নির্বাচন আয়োজনের আগে প্রয়োজনীয় সংস্কার বাস্তবায়ন করা জরুরি।

বর্তমান পরিস্থিতিতে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের পরিবেশ নিশ্চিত করতে প্রশাসনিক, নিরাপত্তাব্যবস্থা ও নির্বাচন কমিশনের কাঠামোগত সংস্কার অপরিহার্য। প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করা, নির্বাচন কমিশনের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক আস্থা সৃষ্টি করাই হবে এ সংস্কারের মূল লক্ষ্য। স্থানীয় সরকার নির্বাচন ধাপে ধাপে আয়োজন করা যেতে পারে, যা জাতীয় নির্বাচনের জন্য একটি শক্ত ভিত্তি গড়ে তুলবে। স্থানীয় নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হলে নির্বাচন কমিশনের দক্ষতা ও নিরপেক্ষতা সম্পর্কে জনগণের মধ্যে আস্থা তৈরি হবে এবং জাতীয় নির্বাচনের চাপও কমে আসবে।

আগামী জাতীয় নির্বাচনে প্রধান দুই রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর অবস্থান এবং কার্যক্রম পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বিএনপি দ্রুত নির্বাচনের দাবি করায় দলটি দেশের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার চেয়ে নিজেদের স্বার্থকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। দলটির নেতাদের ধারণা, যত দ্রুত নির্বাচন হবে, তত দ্রুত তারা ক্ষমতায় ফিরে আসতে পারবে। অথচ যদি তারা সত্যিই দেশের গণতন্ত্র ও উন্নয়নের কথা ভাবতেন, তাহলে তারা বিভিন্ন রাষ্ট্রের বিভিন্ন সেক্টরে প্রয়োজনীয় সংস্কারের দাবি জানিয়ে তা বাস্তবায়নে বর্তমান সরকারকে সার্বিক সহযোগিতা করতেন। কিন্তু তারা সে পথে না গিয়ে অনবরত শুধু দ্রুত নির্বাচনের দাবি তুলে বক্তৃতা-বিবৃতি দিচ্ছেন।

বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক সংকট উত্তরণে দ্রুত নির্বাচন আয়োজন কোনো সমাধান নয়, বরং রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা সৃষ্টি করাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ। স্থানীয় সরকারের কিছু নির্বাচন আয়োজনের মাধ্যমে ধাপে ধাপে জাতীয় নির্বাচনের পথে এগিয়ে যাওয়া যেতে পারে, যা ভবিষ্যতে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করতে সহায়ক হবে।

লেখক : পিএইচডি গবেষক, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

ইমেইল : hasanjuir@gmail.com

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন