বছর তিন-চাইর আগে কলিকাতার এক ভদ্রমহিলা তার ইউটিউব ভিডিওতে দাবি করলেন যে, অস্ট্রেলিয়া আছিল পাণ্ডবদের অস্ত্রালয়। তার মতে, সংস্কৃত ‘অস্ত্রালয়’ কথাটা থাইকাই ‘অস্ট্রেলিয়া’ দেশের নামটা আসছে। তিনি এমনকি ‘অস্ত্রালয়’ শব্দটা মুখে মুখে উচ্চারণ কইরা বুঝাইতে চাইছেন কীভাবে সংস্কৃত ‘অস্ত্রালয়’ থাইকা ‘অস্ট্রেলিয়া’ নামটা তৈয়ার হইছে। মহিলার এই মূর্খামি-ছ্যাবলামি নিয়া কলিকাতার লোকেরাই বেশ ঠাট্টা-টিটকারি করছে। একজন তো মশকরা কইরা লেখছিলেন যে, মহিলার কথাই ঠিক, অস্ট্রেলিয়া দেশটা পাণ্ডবদের অস্ত্রালয়, এখন ভারতের উচিত অস্ট্রেলিয়া দখল কইরা নেয়া।
এইগুলা নিয়া ঠাট্টা-টিটকারি করলেও সাংস্কৃতিক দিক থাইকা বিষয়টা কিন্তু বিপদজনক। কারণ, কেবল কলিকাতায় নয়, এই দেশেও কিছু মানুষ আছে যারা মনে করে আমাদের ভাষার সব শব্দ সংস্কৃত থাইকা আসছে। তাই বাংলা ভাষায় চালু দুনিয়ার তাবত নাম, আমেরিকা, উগান্ডা, নেপচুন, ব্ল্যাকহোল, ঢেঁকি, কুলা, কৈ মাছ, মাগুর মাছ যাই হোক না কেন, সেইটারে কোন না কোন সংস্কৃত শব্দের সাথে মিলায়া বলবে এই শব্দটা ‘অমুক’ সংস্কৃত শব্দ থাইকা আসছে। বাংলা ভাষার শব্দগুলারে সংস্কৃত শব্দের বিবর্তন হিসাবে দেখানোর একটা যুক্তিবিরহিত উন্মাদনা এদের মধ্যে আছে। এরা যেহেতু ভাষা বিবর্তনের স্বাভাবিক নিয়মগুলা জানে না, যেহেতু জানে না সংস্কৃত ভাষাটা কোনকালে কোন জনগোষ্ঠীর মুখের ভাষা আছিল না, ইতিহাসের দিকটা পড়ার আগ্রহও বোধ করে না, তাই কেবল সংস্কৃত ভাষার বড়ত্বের ধারণা থাইকা সব শব্দরে সংস্কৃতের দিকে টাইনা নিয়া যায়। এইটারে বৈষ্ণব সাহিত্য বিচারে বলে ‘দাস্যভাব’, আমরা বলি গোলামি মনোভাব।
এই দেশের একদলের মানুষের মধ্যে ‘সংস্কৃত ভাষা’র প্রতি অহেতুক ‘দাস্যভাব’-এর জন্ম কীভাবে কখন হইল, সেইটার বিস্তারিত তাত্ত্বিক-প্রামাণিক ব্যাখ্যা বিভিন্ন লেখায় দিছি। এইখানে কেবল আমাদের জাতীয় ইতিহাসে আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ নাম ‘গাঙাড়িডি’ বা ‘গাঙাড়ি’ থাইকা কীভাবে এই ‘দাস্যভাব’ বা গোলামি মনোভাবের মারফত বিকৃত ‘গঙ্গাঋদ্ধি’ নাম-শব্দের জন্ম হইল, সেই বিষয়টা নিয়া আলাপ করব।
অতি প্রাচীনকালে যে অঞ্চলটারে ‘গাঙাড়ি’ বা ‘গাঙারিডি’ নামে ডাকা হইত, পরবর্তীতে সেই এলাকাসহ আরো বড় অঞ্চল নিয়া ‘বঙ্গ’ নামের দেশ পরিচিতি পায়। ‘বঙ্গ’ নাম কেমনে হইল, সেইটা নিয়া একটা কাহিনি চালু আছে যে, নূহ নবীর ছেলের নাম হাম, হামের ছেলে হিন্দ এবং হিন্দের ছেলে বঙ। এই ‘বঙ’ লোকটা এইখানে আইসা বসত করেন এবং তার নামে দেশটার নাম হয় ‘বঙ্গ’। আবার বিশ্বাসী হিন্দুরা মনে করে সুদেষ্ণা নামের এক রানির বাচ্চা-কাচ্চা হয় না বিধায় তার স্বামী দীর্ঘতমা নামের এক ঋষিরে অনুরোধ করেন তার রানির গর্ভে বাচ্চা উৎপাদনের জন্য। তো, রাজার নির্দেশে ঋষি দীর্ঘতমা সুষ্ণোর সাথে শারীরিকভাবে মিলিত হয়ে তার গর্ভে পাঁচটা ছেলে পয়দা কইরা দেন। এক ছেলের নাম ছিল ‘বঙ্গ’। তার নামে এই দেশের নাম হয় ‘বঙ্গ’। অবশ্য এইসব কিসসা-কাহিনিরে ইতিহাস বলা যাবে না। আমরা বলতেও চাই না।
ইতিহাসের নিরিখে বলা যায় বঙ্গ বেশ প্রাচীন নাম। খ্রিষ্টীয় তিন শতকে তৈরি ভারতের সাঁচীর স্তূপে এবং চার শতকে তৈরি দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তর লোহার খাম্বালেখ-তে দেশ হিসাবে ‘বঙ্গ’ নামের উল্লেখ পাওয়া গেছে। এর আগে বঙ্গ নাম ছিল কি না জানা যায় না। এর পাঁচ-ছয়শ বছর আগে, অর্থাৎ খিষ্টপূর্ব চার শতক থাইকা খ্রিষ্টীয় দুই শতক পর্যন্ত গ্রিক লেখকদের লেখা থাইকা জানা যায়, তখন সেই অঞ্চলটা ‘গাঙ্গারিডি’/‘গাঙ্গে’ নামে পরিচিত আছিল। এইটা নিয়াই কথা বলতে চাইতেছি।
‘বঙ্গ’ নামের আগে যে এই অঞ্চলটার নাম আছিল ‘গাঙ্গারিডি’/‘গাঙ্গে’, সেইটা আমরা জানতে পারি উনিশ শতকে, প্রাচীন গ্রিকদের লেখার খোঁজ পাওয়ার পর। গ্রিক ইতিহাস লেখক মেগাস্থিনিস (৩৫০-২৯০ খ্রি.পূ.) ‘ইন্ডিকা’ বইয়ে সর্বপ্রথম একটা দেশের নাম হিসাবে ‘গাঙারিডি’ নামের উল্লেখ করেন। ইন্ডিকা বইটি পাওয়া যায় নাই। পরের সময়ের লেখকদের লেখা থাইকা এই কথা আমরা জানতে পারি। মেগাস্থিনিসের পরে ডিওডোরাস (খ্রি.পূ. প্রথম শতক), প্লিনি (খ্রি. প্রথম শতক), টলেমি (দ্বিতীয় শতক), প্লুটার্ক (প্রথম-দ্বিতীয় শতক) তাদের লেখায় গঙ্গা নদীর শেষ মাথায় ‘গাঙ্গাড়িডি’ নামের একটা দেশের কথা বলছেন। উনিশ শতকের লেখকরা এই কথা জানার পর শুরু হয় কোন অঞ্চলটারে ‘গাঙ্গাড়িডি’ বলা হইত, সেইটার আনুমানিক ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ। সাথে সাথে ‘গাঙ্গাড়িডি’ শব্দটা কোন সংস্কৃত শব্দ থাইকা আসছে, সেইটার ব্যাখ্যাও চলতে থাকে।
বাংলাদেশের ইতিহাসের হিন্দুত্ববাদী বয়ান তৈরির মূল কারিগর বঙ্কিমচন্দ্র এইখানেও অগ্রদূতের ভূমিকা পালন করেন। বিবিধ প্রবন্ধ (দ্বিতীয় খণ্ড) বইয়ের ‘বাঙ্গালার কলঙ্ক’ প্রবন্ধে তিনি লেখেন যে, প্রাচীন ‘গাঙ্গাড়িডি’ দেশের পুব সীমানা হইল গঙ্গা নদী। তার অর্থ গঙ্গার পশ্চিম পাশটা ‘গাঙ্গাড়িডি’ দেশ। অর্থাৎ, রাঢ় অঞ্চলটাই ‘গাঙ্গাড়িডি’। এইভাবে ‘গাঙ্গারিডি’ দেশটারে ভারতের হুগলি গাঙের মোহনার থাইকা পুব দিকের কিছু অঞ্চল অর্থাৎ কলিকাতার দক্ষিণ থাইকা আরম্ভ কইরা দক্ষিণ-পুবদিকে বাংলাদেশের কিছু জায়গাসহ সাগরপাড়ের অঞ্চলটা ‘গাঙ্গাড়িডি’ ছিল বইলা বয়ান তৈরি করা হয়। আর ব্যাখ্যা দেয়া হয় দেশটার নাম আছিল ‘গঙ্গাঋদ্ধি’ অর্থাৎ, গঙ্গা দ্বারা সমৃদ্ধ কিংবা গঙ্গা হৃদয়ে যে দেশের। কাজেই, গঙ্গাঋদ্ধি নাম বিকৃত হয়া ‘গাঙ্গাড়িডি’ হইছে।
আমরা আগে বলছি যে, মেগাস্থিনিসের পরে অনেক গ্রিক লেখকই ‘গাঙ্গাড়িডি’ সম্পর্কে বলছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে পরিষ্কার বিবরণ পাওয়া যায় প্লিনির লেখায়। প্লিনি তার ‘ন্যাচারাল হিস্ট্রি’ বইয়ে লেখছেন যে, দক্ষিণে গিয়া গঙ্গা পাঁচটা শাখায় ভাগ হইছে। প্লিনীর উল্লিখিত পাঁচ শাখার নামগুলার মধ্যে মেঘনা নামটা চিনা যায়, বাকিগুলা এখনকার নামের সাথে মিলে না। প্লিনী লেখছেন যে, গঙ্গার এই পাঁচ শাখার বিশাল এলাকা নিয়া ‘গাঙ্গাড়িডি’ দেশটার অবস্থান। মেঘনা থাইকা শুরু কইরা পশ্চিম দিকে বর্তমান বাংলাদেশের শেষ সীমানার মধ্যে গঙ্গা, অর্থাৎ পদ্মার পাঁচটা শাখা পাওয়া যাইতেছে। সুতরাং প্লিনীর বিবরণ অনুযায়ী বলা যায় ‘গাঙ্গাড়িডি’ দেশটা আছিল বাংলাদেশের দক্ষিণ অঞ্চলÑভোলা থাইকা আরম্ভ কইরা সুন্দরবন পর্যন্ত, আর উপ্রের দিকে হয়তো খুলনা যশোহর-ফরিদপুরের পুরাটা। এর সপক্ষে আরেকটা জোরদার প্রমাণ হইল ফরিদপুরের কোটালিপাড়ায় পাওয়া গেছে প্রাচীন যুগের রাজবংশের বিবরণ লেখা তামার পাত।
আবার প্লিনী লেখছেন পাটলিপুত্র, অর্থাৎ পাটনা থাইকা ‘গাঙ্গাড়িডি’র দূরত্ব ১০৬৪ কিলোমিটারের মতো। দূরত্বের হিসাবেও দেখা যায় ‘গাঙ্গাড়িডি’ ছিল প্রাচীন ফরিদপুর-বরিশাল অঞ্চল। অথচ প্লিনীর লেখায় উল্লিখিত মেঘনা নদীর প্রসঙ্গ ও দূরত্বের হিসাব গোপন কইরা পশ্চিবঙ্গের রাঢ় অঞ্চলরে ‘গাঙ্গাড়িডি’ দাবি করছেন বঙ্কিম। এরপর থাইকা বঙ্কিমের মতোই প্রচার পায়। আমাদের দেশের একদল লেখক বিনা জিজ্ঞাসায় সেইটাই মাইনা নিছেন।
এইবার ‘গাঙ্গাড়িডি’ নামের বিষয়টা নিয়া কথা বলি। বঙ্কিমচন্দ্র লেখছেন বর্তমান রাঢ় অঞ্চলটাই ছিল ‘গাঙ্গাড়িডি’ রাজ্য। আর আদিতে তার নাম ছিল ‘গঙ্গারাষ্ট্র’। এই ‘গঙ্গারাষ্ট্র’ শব্দটা পরিবর্তিত হয়া গ্রিকদের সময়ে ‘গঙ্গাড়িডি’ রূপ ধরছে। বঙ্কিমের এই ব্যাখার পর যথারীতি ‘গাঙ্গাড়িডি’ শব্দের উৎস নিয়া ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ চলতে থাকে। কেউ বলেন শব্দটা আছিল ‘গঙ্গাহৃদি’, অর্থাৎ যে দেশের হৃদয়ে গঙ্গা নদী আছে। কেউ কেউ বলেন মূল শব্দটা আছিল ‘গঙ্গাঋদ্ধি’, অর্থাৎ গঙ্গা নদী যে দেশকে ঋদ্ধ করছে। সাবেক প্রধান বিচারপতি ও প্রধান উপদেষ্টা মরহুম হাবিবুর রহমানও এই ব্যাখা দিছেন তার ‘গঙ্গাঋদ্ধি থেকে বাংলাদেশ’ বইয়ে।
লক্ষ করা দরকার এইসব ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের পিছে দুইটা মনোভাব কাজ করছে। এক. ‘গাঙ্গাড়িডি’ নামের দেশটার মানুষ তার দেশের নাম খুঁইজা পায় নাই, অন্য দেশের মানুষের ভাষা থাইকা নাম কর্জ কইরা আনতে হইছে। দুই. সেই নাম আনতে হইছে সংস্কৃত ভাষা থাইকা। অর্থাৎ, সেই সংস্কৃতমুখী মনোভাব। তিন. তেইশশত বছর আগের মানুষ ‘গঙ্গা হৃদয়ে যাহার’ টাইপের চিন্তা কইরা তার দেশের নাম দিছে। রীতিমত কষ্টকল্পনার বিষয়!
আমরা প্রথমে এই বিষয়ে একটা ঐতিহাসিক প্রামাণিক তথ্য তুইলা ধরতে চাই। মেগাস্থিনিস যখন ‘গাঙ্গাড়িডি’ নামটা উল্লেখ করছেন, তখন সংস্কৃত ভাষা ভারতে চালু আছিলÑএমন কোনো ঐতিহাসিক প্রমাণ নাই। এই ভাষার সবচেয়ে প্রাচীন নমুনা হইতেছে পশ্চিম চীনের জিনজিয়ান-উইঘুর অঞ্চলের কিজিল গুহায় পাওয়া বিখ্যাত স্পিৎজার পাণ্ডুলিপিতে কিছু লেখা, যেটা খ্রিষ্টীয় দ্বিতীয় শতকের। সংস্কৃত ভাষার সবচেয়ে পুরানা খুদাই লেখা হইল খ্রিষ্টীয় প্রথম শতকের ‘অযোধ্যা খুদাইলেখা’। অশোক (খ্রি,পূ. তৃতীয় শতক)-এর খুদাই লেখাগুলা গ্রিক, আরামীয় ও প্রাকৃত ভাষায় লেখা, একটাও সংস্কৃত ভাষায় নাই। এইটা হইল একটা অকাট্য প্রমাণ যে, খ্রিষ্টীয় প্রথম শতকের আগে সংস্কৃত ভাষার ব্যবহারের নামগন্ধও পাওয়া যাইতেছে না। অথচ এরও তিনশ বছর আগে মেগাস্থিনিসের লেখা ‘গাঙ্গাড়িডি’ দেশনাম সংস্কৃত ভাষা থাইকা কেমনে আসে, তখন যে ভাষার প্রামাণিক অস্তিত্বই নাই!
ভাষার উপ্রে জবরদস্তি শুরু হয় পনের-ষোল শতকে উপনিবেশ কায়েম হওয়ার পর। এর আগে একটা দেশের মানুষ নিজ দেশরে চিনতো নিজের ভাষায়, এইটাই স্বাভাবিক। অথচ এই দেশের একদল মানুষের সেই দাস্যমনোভাবের কারণে এই স্বাভাবিক চিন্তাটা করতে পারেন না যে, ‘গাঙ্গাড়িডি’ নামটা গাঙ্গাড়িডি দেশটার মানুষেরই দেয়া নাম। এই নামের আরেকটা রূপ থাকার দরকার নাই, অন্য শব্দ থাইকা বিবর্তিত হয়া আসার প্রয়োজন নাই।
আসলে বাংলা ভাষার ‘গাঙাড়ি’ শব্দটাই গ্রিকদের লেখায় ‘গাঙারিডি’তে পরিণত হইছে। গাঙের পাড়ের বিস্তীর্ণ উঁচা চর এলাকারে ‘গাঙাড়ি’ বলে। বাংলায় ‘আড়’, ‘আড়া’ বা ‘আড়ি’ শব্দের অর্থ হইল উঁচা জায়গা। মরুভূমিতে বাতাসে বালু জইমা যে বিস্তীর্ণ উঁচা জায়গা তৈয়ার হয়, সেইটারে বলে ‘বালিয়াড়ি’। একইভাবে গাঙের পাড়ের উঁচা জায়গারে বলে ‘গাঙাড়ি’।
দুই-আড়াই হাজার বছর আগে বরিশাল, ফরিদপুর, খুলনা ছিল অজস্র গাঙ আর বিলজলায় ভরা এলাকা। তার ফাঁকে ফাঁকে উঁচা জায়গায় মানুষের বসতি গইড়া উঠে। এই উঁচা জায়গাগুলারে বলত ‘গাঙাড়ি’। আরেকটু উজানের মানুষরা হয়তো তাদেরকে ‘গাঙাড়ি’ এলাকার মানুষ হিসাবে পরিচয় দিত। এইভাবে প্রথমে গোটা অঞ্চলটা ‘গাঙাড়ি’ নামে পরিচিতি পায়, এক সময় সেইটা গোটা দেশের নাম হিসাবে চালু হয়া যায়। ‘গাঙারি’ শব্দের নানা রূপ এখনো জায়গার নাম হিসাবে চালু আছে। যেমন, ক্ষেতলাল উপজেলার বড়াইল ইউনিয়নের গাংগাইর গ্রাম, পাবনার আটঘরিয়ায় গাঙাড়ির বিল, যার উত্তরে এখনো গাঙ রয়া গেছে। শরীয়তপুরে গাঙাড়ির ব্রিজ।
গাঙপাড়ে বসবাসের কারণে গাঙাড়ি নামে পরিচিত হওয়ার উদাহরণ ভারতেও আছে। যেমন, ভারতের উত্তরপ্রদেশে গাঙাড়ি গোত্রের ব্রাহ্মণ আছে, যারা মধ্যযুগে নদীর উপত্যকায় বসত গইড়া তোলে। নদীর উপত্যকা মানে গাঙাড়ি। সেইজন্য তাদের নাম হয় গাঙাড়ি ব্রাহ্মণ।
‘গাঙ’ একটা অতিরক্ষণশীল আদি শব্দ। ভাষাবিজ্ঞান বলে ‘মা, বাবা, ভাই, বোন’দেরকে যে নামে সম্বোধন করা হয়, সেইগুলা একেবারে প্রথম দিককার শব্দ। এইরকম ২৩টা শব্দ চিহ্নিত করছেন ভাষাবিজ্ঞানীরা, যেগুলো পনের হাজার বছর ধইরা চলতেছে ধারণা করা হয়। এইগুলা বদলায় না। এইজন্য এই জাতীয় শব্দরে কয় অতিরক্ষণশীল (আলট্রা কনজারভেটিভ) শব্দ। ২৩-এর পরের অতিরক্ষণশীল শব্দের মধ্যে ‘প্রবাহিত হওয়া’ বা ‘বয়ে যাওয়া’ বুঝাইতে যে শব্দ লাগে, সেইটাও আছে। বাংলা ভাষায় সেই শব্দ হইল ‘গাঙ’। কাজেই ‘গাঙ’ বাংলা ভাষার প্রথম দিককার শব্দ। তখন মানুষ অল্পকিছু শব্দ দিয়া ভাব বিনিময় করতো। আরো বহুশত বছর পরে এনিমিটিজমের পর্যায়ে মানুষ কোন প্রাকৃতিক সৃষ্টি বা ঘটনার মধ্যে অদেখা অসীম শক্তি জড়ায়া আছে বইলা কল্পনা করতে শুরু করে। যেমন, বড় কোনো গাঙের পানির প্রচণ্ড গড়ানের পিছনে সে একটা অদৃশ্য-অসীম শক্তির কল্পনা করতে আরম্ভ করল এবং এক পর্যায়ে বিশ্বাস করতে শুরু করলো যে, এই গাঙ আসলে একজন দেবতা বা দেবি। এইভাবেই ‘গাঙ’ শব্দ থাইকা গাঙ দেবি বা গঙ্গা দেবির কল্পনার জন্ম হইছে। এইখানে ‘গাঙ’ শব্দটাই মূল শব্দ।
গঙ্গা বা পদ্মা গাঙের পাঁচ শাখা তথা মেঘনা থাইকা পশ্চিমে খুলনা পর্যন্ত বিশাল অঞ্চলটাই ‘গাঙাড়ি’ নামে পরিচিত হয়। এটিই গ্রিকদের ইতিহাসের ‘গাঙারিডি’ দেশ। এই দেশের আছিল বিশাল সেনাবাহিনী, যার ভয়ে আলেকজান্ডার আর পুবদিকে আসেন নাই। এইরকম একটা শক্তিশালী জাতির নিজের ভাষা, সংস্কৃতি, দর্শনচিন্তা সবই আছিল। সেই ভাষায় তাদের দেশের নাম হইছিল ‘গাঙারি’, গ্রিকরা যেইটারে ‘গাঙারিডি’ হিসাবে উল্লেখ করছেন। প্রায় আড়াই হাজার বছরের ভাঙ্গাগড়ার মধ্য দিয়ে ‘গাঙারি’ থাইকা সৃষ্টি হইছে আজকের বাংলাদেশ।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

