বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে কিছু ব্যক্তিত্ব আছেন, যাদের প্রভাব সময়ের সীমা অতিক্রম করে। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান তাদের অন্যতম। স্বাধীনতার ঘোষক হিসেবে তার পরিচয় যেমন ইতিহাসে স্থায়ী হয়ে আছে, তেমনি বাংলাদেশের বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক দল গঠনের ক্ষেত্রেও তার অবদান অনস্বীকার্য।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বা বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী এলেই একটি প্রশ্ন নতুন করে আলোচনায় আসে-কীভাবে একজন সেনা কর্মকর্তা দেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক দলগুলোর একটির প্রতিষ্ঠাতা হলেন? এর উত্তর খুঁজতে হলে ফিরে যেতে হবে ১৯৭৫-৭৮ সালের অস্থির সময়ের দিকে।
১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ছিল রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল। রাজনৈতিক দলগুলো বিভক্ত। জনগণের মধ্যে অনিশ্চয়তা প্রবল। এই বাস্তবতায় জিয়াউর রহমান ধীরে ধীরে জাতীয় নেতৃত্বের কেন্দ্রে উঠে আসেন।
শুরুতে তিনি নিজেকে রাজনীতিবিদ হিসেবে পরিচয় দেননি। তিনি নিজেকে সৈনিক বলেছেন। কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনার বাস্তবতা তাকে বুঝিয়ে দেয় যে কেবল প্রশাসনিক বা সামরিক কাঠামো দিয়ে একটি রাষ্ট্রকে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়। প্রয়োজন রাজনৈতিক ভিত্তি, জনসমর্থন এবং একটি সুসংগঠিত জাতীয় কর্মসূচি।
এই উপলব্ধি থেকেই ১৯৭৭ সালে তিনি ১৯ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করেন। সেখানে অর্থনৈতিক উন্নয়ন, উৎপাদন বৃদ্ধি, গ্রামীণ উন্নয়ন এবং আত্মনির্ভরতার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। বাংলাদেশের রাজনীতিতে এটি ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়। কারণ স্বাধীনতার পর প্রথমবারের মতো উন্নয়নকে রাজনৈতিক কর্মসূচির কেন্দ্রবিন্দুতে আনা হয়েছিল।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অনেকেই মনে করেন, জিয়াউর রহমানের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল বাস্তববাদ। তিনি বুঝেছিলেন, একটি কার্যকর রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম ছাড়া রাষ্ট্র পরিচালনা দীর্ঘমেয়াদে সম্ভব নয়। সে কারণেই তিনি একদিকে বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তিকে একত্রিত করার উদ্যোগ নেন, অন্যদিকে নিজের আদর্শ ও কর্মসূচিভিত্তিক একটি রাজনৈতিক দল গঠনের প্রস্তুতি শুরু করেন।
প্রথম ধাপ ছিল জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক দল বা জাগদল। কিন্তু জাগদল প্রত্যাশিত সাড়া সৃষ্টি করতে পারেনি। তখন আরও বিস্তৃত ও শক্তিশালী রাজনৈতিক সংগঠন গঠনের প্রয়োজন দেখা দেয়। সেই প্রয়োজন থেকেই জন্ম নেয় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি।
১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপির আত্মপ্রকাশ ঘটে। দলটির নামও দিয়েছিলেন জিয়াউর রহমান নিজেই। এটি কেবল একটি রাজনৈতিক দল ছিল না; বরং বিভিন্ন পেশা, শ্রেণি ও মতের মানুষের জন্য একটি জাতীয় প্ল্যাটফর্ম হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা করা হয়েছিল।
বিএনপির জন্মের ইতিহাস নিয়ে নানা আলোচনা রয়েছে। কিন্তু একটি বিষয় অস্বীকার করার সুযোগ নেই। দলটি প্রতিষ্ঠার পর খুব অল্প সময়ের মধ্যেই দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়। কোনো কৃত্রিম কাঠামো দিয়ে এমন সাফল্য অর্জন সম্ভব নয়। জনগণের সমর্থন ছাড়া কোনো রাজনৈতিক দল দীর্ঘদিন টিকে থাকতে পারে না।
জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক উত্থানের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল তার জনগণের কাছে যাওয়ার কৌশল। তিনি শহরের রাজনৈতিক অঙ্গনে সীমাবদ্ধ থাকেননি। গ্রামে গেছেন। প্রত্যন্ত অঞ্চলে গেছেন। সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলেছেন। তাদের সমস্যার কথা শুনেছেন।
রাজনীতিতে জনসংযোগের গুরুত্ব তিনি গভীরভাবে উপলব্ধি করেছিলেন। বক্তা হিসেবে তিনি হয়তো জন্মগতভাবে আকর্ষণীয় ছিলেন না। কিন্তু মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের মাধ্যমে তিনি জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন। বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এটি ছিল একটি নতুন মাত্রা।
বিশিষ্ট গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ তার গবেষণায় দেখিয়েছেন, জিয়াউর রহমান রাজনৈতিক সংগঠন গঠনের ক্ষেত্রে ধাপে ধাপে অগ্রসর হয়েছিলেন। তিনি হঠাৎ করে কোনো সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেননি। বরং বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতা, পেশাজীবী, বুদ্ধিজীবী ও প্রশাসনিক ব্যক্তিত্বের সঙ্গে যোগাযোগ করে একটি বিস্তৃত ভিত্তি তৈরির চেষ্টা করেছিলেন।
এখানেই তার রাজনৈতিক দূরদর্শিতা স্পষ্ট হয়। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য জাতীয় ঐকমত্য প্রয়োজন। সেই কারণে বিএনপির মধ্যে বিভিন্ন মত ও পটভূমির মানুষকে জায়গা দেওয়া হয়েছিল।
আজ বিএনপির সমালোচকরা প্রায়ই দলটির জন্মপর্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। কিন্তু রাজনীতির চূড়ান্ত বিচার হয় জনগণের আদালতে। বিএনপি সেই পরীক্ষায় বহুবার উত্তীর্ণ হয়েছে। ১৯৯১ সালে জনগণের ভোটে সরকার গঠন করেছে। ২০০১ সালেও নির্বাচনে বিজয়ী হয়েছে। আবার দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক প্রাসঙ্গিকতা ধরে রেখেছে।
আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, ১৯৯৬ সালের জাতীয় সংসদে বিএনপি বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ বিরোধী দল হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছে। গণতন্ত্রে শক্তিশালী বিরোধী দলের উপস্থিতি একটি বড় সম্পদ। বিএনপি সেই ভূমিকাও পালন করেছে।
বিশ্ব রাজনীতির ইতিহাসে সামরিক শাসকদের উদাহরণ কম নয়। কিন্তু তাদের অধিকাংশই ক্ষমতাকে দীর্ঘস্থায়ী করার পথ বেছে নিয়েছেন। জিয়াউর রহমানের ক্ষেত্রে চিত্রটি ভিন্ন। তিনি রাজনৈতিক দল গঠন করেছেন, নির্বাচন আয়োজন করেছেন এবং বহুদলীয় রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র তৈরি করেছেন। এ কারণেই তার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার নিয়ে আলোচনা আজও প্রাসঙ্গিক।
অর্থনীতির ক্ষেত্রেও তার অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, গ্রামীণ উন্নয়ন, স্বনির্ভরতা এবং বেসরকারি খাতের বিকাশে তিনি গুরুত্ব দিয়েছিলেন। পরবর্তীকালে তৈরি পোশাক শিল্পের বিকাশ, প্রবাসী আয়ের সম্প্রসারণ এবং উদ্যোক্তা শ্রেণির উত্থানের পেছনে তার সময়কার নীতিগত পরিবর্তনের প্রভাব নিয়ে অর্থনীতিবিদদের মধ্যে বিস্তৃত আলোচনা রয়েছে।
রাজনৈতিক বিজ্ঞানীরা প্রায়ই বলেন, একটি রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হয় তার রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর শক্তির ওপর। জিয়াউর রহমানের সবচেয়ে বড় অবদান সম্ভবত এখানেই। তিনি এমন একটি রাজনৈতিক ধারা প্রতিষ্ঠা করেন, যা রাষ্ট্র, জাতীয়তাবাদ, উন্নয়ন ও গণতন্ত্রকে একই কাঠামোর মধ্যে দেখতে চেয়েছিল।
চার দশকেরও বেশি সময় পরও বিএনপি বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক শক্তি। দলটির প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক উত্তরাধিকারও তাই সমানভাবে আলোচিত। ইতিহাসের সব চরিত্রের মতো তার কাজ নিয়েও গবেষণা হবে, বিতর্ক হবে, মূল্যায়ন হবে। সেটাই স্বাভাবিক।
তবে একটি সত্য অস্বীকার করার উপায় নেই। একজন সৈনিক থেকে রাষ্ট্রনায়ক হয়ে ওঠার যে যাত্রা তিনি সম্পন্ন করেছিলেন, তা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। জাগদল থেকে বিএনপি-এ ছিল শুধু একটি দলের জন্মের গল্প নয়। এটি ছিল একটি নতুন রাজনৈতিক ধারার উত্থানের গল্প। আর সেই গল্পের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান।
লেখক: সাবেক সাধারণ সম্পাদক, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

