এই মুহূর্তে বিশ্বে সবচেয়ে বেশি আলোচিত প্রযুক্তি হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (Artificial Intelligence—AI)। বিশ্ব এখন এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে প্রবেশ করেছে। শিল্পবিপ্লব, বিদ্যুৎ কিংবা ইন্টারনেট যেমন একসময় সভ্যতার গতিপথ বদলে দিয়েছিল, এআইও ঠিক তেমনি আমাদের অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং রাষ্ট্র পরিচালনার ধরনকে আমূল পরিবর্তন করার পথে নিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশে এআই নিয়ে আলোচনার শুরুতেই যে প্রশ্নটি সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হয়, সেটি হলো—‘এআই এলে কি মানুষের চাকরি থাকবে?’
এই প্রশ্নটি কিন্তু মোটেই অমূলক নয়।
তবে এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্ন আছে, যা আমরা খুব কমই করি—এআইকে আমরা কীভাবে ব্যবহার করতে চাই? মানুষের বিকল্প হিসেবে, নাকি মানুষের সক্ষমতা বাড়ানোর হাতিয়ার হিসেবে?
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই প্রশ্নের উত্তর আমাদের খুঁজে বের করতে হবে, যা আমাদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে সাহায্য করবে।
বাংলাদেশ একটি শ্রমনির্ভর অর্থনীতির দেশ। আমাদের তৈরি পোশাকশিল্প, কৃষি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প উদ্যোগ, নির্মাণশিল্প, পরিবহন এবং সেবা খাত—সবই মূলত মানুষের শ্রমের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। কোটি কোটি মানুষের কর্মসংস্থান এই খাতগুলোর সঙ্গে যুক্ত। আবার প্রতিবছর লাখ লাখ তরুণ নতুন করে শ্রমবাজারে প্রবেশ করছেন। তাদের অনেকেই অদক্ষ বা স্বল্পদক্ষ। অন্যদিকে আমাদের অন্যতম প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা এখনো অন্যদের তুলনায় সস্তা শ্রম।
এই বাস্তবতায় উন্নত বিশ্বের মতো অন্ধভাবে পূর্ণ স্বয়ংক্রিয়তার (Full Automation) পথে হাঁটা আমাদের জন্য অর্থনৈতিকভাবে যেমন যৌক্তিক নয়, তেমনি সামাজিকভাবেও ঝুঁকিপূর্ণ।
বাংলাদেশের জন্য এআইয়ের দর্শন তাই ভিন্ন হওয়া উচিত। আমাদের মূলনীতি হওয়া উচিত ‘Automation’ নয়, ‘Augmentation’; অর্থাৎ মানুষের জায়গা দখল নয়, বরং মানুষের দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি।
একটি সহজ উদাহরণ ধরা যাক। বাংলাদেশের একটি পোশাক কারখানায় একজন কোয়ালিটি সুপারভাইজারকে প্রতিদিন হাজার হাজার পণ্য পরীক্ষা করতে হয়। দীর্ঘ সময় একই কাজ করতে গিয়ে ভুল হওয়াই স্বাভাবিক। সেখানে এআইভিত্তিক ভিশন সিস্টেম মুহূর্তেই ত্রুটিপূর্ণ পণ্য শনাক্ত করতে পারে। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে সুপারভাইজারের আর প্রয়োজন নেই। বরং তিনি এখন আরো বড় পরিসরে উৎপাদন তদারকি করতে পারবেন, সিদ্ধান্ত দ্রুত নিতে পারবেন এবং মান নিয়ন্ত্রণে আরো কার্যকর ভূমিকা পালন করবেন। প্রযুক্তি তাকে প্রতিস্থাপন করেনি; বরং তার সক্ষমতাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
কৃষিতেও একই চিত্র। বাংলাদেশের কৃষক আবহাওয়ার অনিশ্চয়তা, রোগবালাই এবং বাজারদরের ওঠানামার সঙ্গে প্রতিনিয়ত লড়াই করেন। যদি একজন কৃষক মোবাইল ফোনে একটি ছবি তুলে তাৎক্ষণিকভাবে জানতে পারেন তার ফসলে কী রোগ হয়েছে, কতটুকু সার বা কীটনাশক প্রয়োজন, কিংবা আগামী সপ্তাহের আবহাওয়া তার সিদ্ধান্তকে কীভাবে প্রভাবিত করবে, তাহলে সেটি শুধু প্রযুক্তির ব্যবহার নয়; এটি কৃষকের জ্ঞান ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতাকে শক্তিশালী করা।
স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা এবং সরকারি প্রশাসনেও এআইয়ের সম্ভাবনা একই ধরনের। বাংলাদেশের মতো জনবহুল দেশে চিকিৎসকের ঘাটতি, শিক্ষকের ওপর অতিরিক্ত চাপ এবং সরকারি সেবার জটিলতা—এসব সমস্যার সমাধানে এআই কার্যকর সহায়ক হতে পারে।
তবে শুরুতেই একটি বিষয় পরিষ্কার হওয়া জরুরি—এআই সিদ্ধান্ত দেবে না; এআই সিদ্ধান্ত গ্রহণকে আরো তথ্যভিত্তিক, দ্রুত এবং নির্ভুল করবে।
এখানেই বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত প্রশ্নটি আসে। আমরা কি এআইকে শুধু খরচ কমানোর প্রযুক্তি হিসেবে দেখব, নাকি উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর প্রযুক্তি হিসেবে?
যদি কোনো প্রতিষ্ঠান এআই ব্যবহার করে শুধু কর্মী ছাঁটাইয়ের মাধ্যমে ব্যয় কমানোর চিন্তা করে, তাহলে স্বল্প মেয়াদে কিছু আর্থিক সুবিধা পেলেও দীর্ঘ মেয়াদে দেশের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কারণ, কর্মসংস্থান কমলে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমবে, অভ্যন্তরীণ বাজার সংকুচিত হবে এবং সামাজিক বৈষম্য বাড়বে।
অন্যদিকে যদি একই প্রযুক্তি ব্যবহার করে কর্মীদের নতুন দক্ষতা শেখানো হয়, উৎপাদন বাড়ানো হয়, অপচয় কমানো হয় এবং উচ্চমূল্যের পণ্য উৎপাদন করা হয়, তাহলে প্রতিষ্ঠান, কর্মী এবং রাষ্ট্র—তিন পক্ষই লাভবান হবে। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল অর্থনীতির জন্য দ্বিতীয় পথটিই অধিক যুক্তিযুক্ত বলে আমি মনে করি।
তবে বাংলাদেশে এআই বাস্তবায়নের সবচেয়ে বড় বাধা প্রযুক্তি নয়; মানুষের দক্ষতা। বর্তমানে দেশে এআই বিশেষজ্ঞ, ডেটা বিজ্ঞানী, ভাষা প্রযুক্তি গবেষক এবং এআই নীতিনির্ধারণে দক্ষ জনবলের সংখ্যা এখনো অনেক সীমিত। আরো বড় সমস্যা হলো, অধিকাংশ কর্মজীবী মানুষ এখনো জানেন না আগামীতে এআই তাদের জন্য বড় হুমকি, নাকি বড় ধরনের সুযোগ।
এ কারণে আমাদের দেশে এআই বাস্তবায়নের প্রতিটি পরিকল্পনার সঙ্গে কর্মীদের ‘Reskilling’ এবং ‘Upskilling’-কে বাধ্যতামূলক অংশ করতে হবে। একজন হিসাবরক্ষককে এআইচালিত সফটওয়্যার ব্যবহার শেখাতে হবে, একজন কৃষি কর্মকর্তাকে এআইনির্ভর কৃষি বিশ্লেষণ বোঝাতে হবে, একজন শিক্ষককে এআইভিত্তিক ব্যক্তিকেন্দ্রিক শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে পরিচিত করতে হবে। প্রযুক্তির সঙ্গে মানুষকে এগিয়ে না নিলে এই প্রযুক্তিই একসময় বাংলাদেশের সমাজে বৈষম্যের নতুন উৎস হয়ে দাঁড়াবে।
বাংলাদেশের জন্য আরেকটি বড় অগ্রাধিকার হওয়া উচিত বাংলাভাষাভিত্তিক এআই সিস্টেম উন্নয়ন। বিশ্বের অধিকাংশ এআই মডেল এখনো ইংরেজিকেন্দ্রিক। অথচ আমাদের দেশের বিপুল জনগোষ্ঠী বাংলা ভাষায় তথ্য গ্রহণ করে। তাই বাংলা ভাষার উচ্চমানের ডেটাসেট, ভাষা মডেল, স্পিচ রিকগনিশন, অপটিক্যাল ক্যারেক্টার রিকগনিশন (ওসিআর) এবং ভাষা নিয়ে গবেষণায় বিনিয়োগ এখন জাতীয় প্রয়োজন হিসেবে দেখতে হবে।
একই সঙ্গে এআই ব্যবহারে নৈতিকতা, তথ্যের গোপনীয়তা, সাইবার নিরাপত্তা এবং জবাবদিহির বিষয়গুলোও সমান গুরুত্ব পেতে হবে। মানুষের ব্যক্তিগত তথ্য, আর্থিক লেনদেন কিংবা স্বাস্থ্যসংক্রান্ত তথ্য এআই ব্যবস্থায় ব্যবহৃত হলে তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্র ও প্রতিষ্ঠানের যৌথ দায়িত্ব। প্রযুক্তির ওপর মানুষের আস্থা তৈরি না হলে এআইয়ের সম্ভাবনাও কখনোই পূর্ণতা পাবে না।
বাংলাদেশের সামনে আজ একটি বিরল সুযোগ রয়েছে। উন্নত বিশ্বের শিল্পবিপ্লব আমরা দেখেছি, ডিজিটাল বিপ্লবেও কিছুটা পিছিয়ে ছিলাম। কিন্তু এআই বিপ্লবের শুরুতে আমরা এখনো অংশগ্রহণ করার সুযোগ পাচ্ছি। এই সুযোগ কাজে লাগাতে হলে আমাদের এমন একটি জাতীয় কৌশল প্রয়োজন, যেখানে প্রযুক্তি, শিক্ষা, শিল্পনীতি, শ্রমনীতি এবং মানবসম্পদ উন্নয়ন—সবকিছুকে একসূত্রে গাঁথা হবে। এআইকে শুধু প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের বিষয় হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, শিল্প, অর্থনীতি, কর্মসংস্থান এবং জাতীয় উন্নয়ন কৌশলের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে নিতে হবে।
আমাদের মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার মানুষ। এই মানুষকে অপ্রয়োজনীয় করে তোলার জন্য নয়, আরো দক্ষ, আরো সৃজনশীল এবং আরো উৎপাদনশীল করে তোলার জন্যই এআইয়ের ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। যে প্রযুক্তি মানুষের আয় বাড়ায়, সিদ্ধান্তকে উন্নত করে, নতুন দক্ষতা তৈরি করে এবং নতুন উদ্ভাবনের সুযোগ সৃষ্টি করেÑসেই প্রযুক্তিই একটি দেশের প্রকৃত উন্নয়নের সহযাত্রী হতে পারে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই নতুন যুগে বাংলাদেশের সাফল্য নির্ভর করবে আমরা এআই কত দ্রুত গ্রহণ করছি তার ওপর নয়; বরং কতটা প্রজ্ঞার সঙ্গে, কতটা মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিতে এবং কতটা অন্তর্ভুক্তিমূলকভাবে তা বাস্তবায়ন করছি তার ওপর।
বাংলাদেশের জন্য তাই এআইয়ের সবচেয়ে উপযুক্ত সংজ্ঞা হতে পারে—এটি কোনো চাকরি কেড়ে নেওয়ার প্রযুক্তি নয়; এটি মানুষের মেধা, দক্ষতা ও সম্ভাবনাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেওয়ার প্রযুক্তি। যদি আমরা এই দর্শনকে আমাদের প্রযুক্তি, সরকারসহ সব অংশীজনের নীতিনির্ধারণের কেন্দ্রে রাখতে পারি, তবে এআই শুধু আমাদের অর্থনীতিকেই বদলে দেবে না; ত্বরান্বিত করবে আমাদের দেশের উন্নয়ন।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

