আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

আধিপত্য প্রতিষ্ঠায় ক্রিকেটকে অস্ত্র বানিয়েছে ভারত

আর্কপ্রভো হাজরা

আধিপত্য প্রতিষ্ঠায় ক্রিকেটকে অস্ত্র বানিয়েছে ভারত

দক্ষিণ এশিয়ায় ক্রিকেট শুধুই একটি খেলা নয়, এটি একটি প্রাথমিক যোগাযোগের কূটনৈতিক চ্যানেল বা মাধ্যমও। কয়েক দশক ধরেই খেলাটি এই অঞ্চলের ভূরাজনৈতিক স্বাস্থ্যের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য ব্যারোমিটার হিসেবে কাজ করে আসছে। আনুষ্ঠানিক কূটনীতি স্থবির হয়ে পড়লেও এই খেলা উপমহাদেশকে সব সময়ই একত্র করে রাখে। কিন্তু ভারত সম্প্রতি ক্রিকেটকে তার সফট পাওয়ার হাতিয়ার থেকে আঞ্চলিক আধিপত্যের একটি ভোঁতা হাতিয়ারে রূপান্তরিত করেছে।

পাকিস্তানের ঐতিহাসিক শত্রুতার কারণে ভারতের ‘ক্রিকেট জবরদস্তি’র এই কৌশল শুধু ইসলামাবাদের ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ রাখা হলে তার কারণ বোধগম্য হতো। কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে একই শাস্তিমূলক খেলার কৌশল প্রয়োগ করা, বিশেষ করে ভারতের প্রতিবেশী দেশগুলোয় যখন অস্থিরতা বিরাজ করছে, তখন ন্যূনতম দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে এটি দূরদর্শিতার অভাবকেই প্রতিফলিত করে এবং সবচেয়ে খারাপ দিক থেকে বিবেচনা করলে এটি দিল্লির একটি মারাত্মক ভুল পদক্ষেপ। গত মাসে দুই দেশের রাষ্ট্রদূতদের পাল্টাপাল্টি তলব এবং নয়াদিল্লি ও ঢাকায় কূটনৈতিক মিশনগুলোকে সহিংস লক্ষ্যবস্তু করার পর গত এক মাসে দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের চরম অবনতি ঘটে। এর পরই ভারত বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ক্রিকেটকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

বিজ্ঞাপন

ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড (বিসিসিআই) সম্প্রতি ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগের (আইপিএল) একটি ফ্র্যাঞ্চাইজিকে তাদের সদ্য দলে নেওয়া বাংলাদেশি ক্রিকেটার মোস্তাফিজুর রহমানকে বাদ দেওয়ার নির্দেশ দেয়। এই পদক্ষেপ কোনো বিবেচনাতেই ক্রীড়াসুলভ সিদ্ধান্ত ছিল না; বরং বাংলাদেশে সংখ্যালঘু ধর্মীয় জনগোষ্ঠীর সদস্যদের ওপর হামলার বিষয়ে রাজনৈতিক উদ্বেগের কারণে তা নেওয়া হয়েছে। ঢাকা থেকেও দ্রুত এর প্রতিশোধ নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের আসন্ন টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ম্যাচগুলো ভারত থেকে শ্রীলঙ্কায় স্থানান্তরের অনুরোধ করে, যা কার্যকরভাবে একটি ক্রীড়া অনুষ্ঠান বয়কটের সূচনা করেছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ সরকার দেশে আইপিএলের সব সম্প্রচার নিষিদ্ধ করে এই বিরোধকে আরো বাড়িয়ে দিয়েছে।

আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (আইসিসি) বিসিবির ভেন্যু পরিবর্তনের অনুরোধে যখন প্রাথমিকভাবে দ্বিধাগ্রস্ত ছিল, তখন ভারতে প্রচলিত ধারণা ছিল এটাই যে, বাংলাদেশের প্রতিরোধ শুধু তাদের নিজেদেরই ক্ষতি করবে, কারণ বিসিবি জানে যে, তারা বিসিসিআইয়ের আর্থিক শক্তির বিরুদ্ধে এক অজেয় লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়েছে। এতে বাংলাদেশের ক্রিকেট স্বল্পমেয়াদি বাণিজ্যিক ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারে, অন্যদিকে, ভারতকে ভূরাজনৈতিক মূল্য দিতে হবে অনেক বেশি। এটি এমন একটি প্রতিবেশীকে নিশ্চিতভাবে দূরে ঠেলে দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করছে, যা ইতোমধ্যেই নয়াদিল্লির কৌশলগত কক্ষপথ বা বলয় থেকে দূরে সরে যাচ্ছে।

এসব ঘটনা বিপজ্জনক যে, প্রবণতার প্রতিফলন ঘটাচ্ছে আর তা হলোÑভারতের সফট পাওয়ার বা নরম শক্তিকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা। ভারতীয় রাজনৈতিক শক্তিগুলোর বিসিসিআইকে পররাষ্ট্রনীতির কাজে লাগানোর সফল ইতিহাস রয়েছে। বৈরী সম্পর্কের কারণে প্রতিপক্ষ হিসেবে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ক্রিকেটকে বিচ্ছিন্ন করার ভারতীয় কৌশল কার্যকর প্রমাণিত হয়েছিল। কিন্তু ভারতের ‘প্রতিবেশী প্রথম’ নীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার বাংলাদেশকে একই আলোকে চিত্রিত করা গুরুতর সমস্যা তৈরি করবে।

ভারত প্রথমবারের মতো বিচ্ছিন্নতাবাদী ক্রিকেট নীতিমালা গ্রহণ করে সেই সময় থেকে বর্তমানে এই অঞ্চলের জোট কাঠামো ব্যাপকভাবে পরিবর্তিত হয়েছে। বাংলাদেশ কোনো বিচ্ছিন্ন বা একঘরে রাষ্ট্র নয়, যাকে চাপ দিয়ে নিজের আয়ত্তে রাখা যাবে বরং একটি জটিল পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলা একটি স্বাধীন মধ্যমশক্তির দেশ। মাঠে ঢাকাকে অপমান করে নয়াদিল্লি জোটবদ্ধ থাকার নীতিকে উৎসাহিত করছে না, এটি বরং বিচ্ছিন্নতাকেই আরো ত্বরান্বিত করছে।

ঢাকা দীর্ঘদিন ধরে প্রতিবেশীদের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার, কিন্তু ২০২৪ সালে বাংলাদেশে গণঅভ্যুত্থানের পর থেকে রাজনৈতিক শৃঙ্খলার পরিবর্তন ঢাকা এবং নয়াদিল্লির মধ্যে সম্পর্ককে ঘোলাটে করে তুলেছে। ভারতের জবরদস্তিমূলক মনোভাব এমন একটি শূন্যতা তৈরি করেছে, যা পূরণ করতে এই অঞ্চলের অন্যান্য খেলোয়াড়রা আগ্রহী।

নয়াদিল্লি এই অঞ্চলে বেইজিংয়ের শক্ত অর্থনৈতিক অবস্থান তৈরির বিরুদ্ধে পাল্টা পদক্ষেপ নিতে বহু বছর ধরেই সাংস্কৃতিক সম্প্রীতি এবং ভৌগোলিক নৈকট্যকে ব্যবহারের চেষ্টা করেছে। ভারত যদি স্বেচ্ছায় বাংলাদেশের সঙ্গে সাংস্কৃতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে, বিশেষ করে ক্রিকেটে, তাহলে বাংলাদেশের পৃষ্ঠপোষক হিসেবে চীনের ভূমিকা দৃঢ় করার ক্ষেত্রটি তারা নিজেরাই উন্মুক্ত করে দেবে। ভারতীয় পররাষ্ট্রনীতি একই সঙ্গে পাকিস্তানের জন্যও যে সুযোগ তৈরি করে, তা আরো উদ্বেগজনক। ভারতের আচরণে বাংলাদেশ যদি নিজেকে নিপীড়িত বোধ করে, তখন সে স্বাভাবিকভাবেই ইসলামাবাদের দিকে আরো বেশি এগিয়ে যাবে। ঢাকা ও ইসলামাবাদের মধ্যে সম্পর্ক উষ্ণায়ন এখন আর দূরবর্তী কোনো সম্ভাবনা নয়, বরং দুই দেশের সম্পর্ক এখন নয়াদিল্লির পররাষ্ট্রনীতির জন্য ক্রমবর্ধমান উদ্বেগের বিষয়।

ঢাকা ও ইসলামাবাদের মধ্যে সম্পর্ক কূটনৈতিক শুভেচ্ছাবার্তা থেকে ক্রমে কঠোর প্রতিরক্ষা সহযোগিতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। চলতি মাসের শুরুতে বাংলাদেশের বিমানবাহিনী প্রধান হাসান মাহমুদ খানের ইসলামাবাদ সফরের পর এ সম্পর্কে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলো ইঙ্গিত দেয় যে, বাংলাদেশ পাকিস্তান থেকে জেএফ-১৭ থান্ডার বিমান কেনার আলোচনা করছে। ক্রিকেটকে বলপ্রয়োগের হাতিয়ারে পরিণত করে ভারত অসাবধানবশত সেই অক্ষটিকেই শক্তিশালী করছে, যেটাকে তারা কয়েক দশক ধরে ভেঙে ফেলার চেষ্টা করে আসছে।

এই কূটনৈতিক ভাঙনের ট্র্যাজেডি হলো এটাই যে, ভারতের এসব কর্মকাণ্ড তাদের নিজস্ব উচ্চস্তরের কৌশলের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। বিসিসিআইয়ের পদক্ষেপের মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে নয়াদিল্লি ঢাকার সঙ্গে সম্পর্ক স্থিতিশীল করার একটি বাস্তবসম্মত ইচ্ছার ইঙ্গিত দিয়েছিল। ডিসেম্বরে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর শোক জানাতে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের ঢাকায় যাওয়াকে ফেব্রুয়ারির গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনের আগে বিরোধীদের সঙ্গে দিল্লির যোগাযোগের ইচ্ছার প্রদর্শন হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছিল।

কিন্তু বিসিসিআইয়ের শাস্তিমূলক পদক্ষেপ এই প্রচারকে যথেষ্টই দুর্বল করে দিয়েছে। মোস্তাফিজুর রহমানের মতো জাতীয় ক্রীড়া আইকনের প্রতি ভারতের অপমান মন্ত্রী পর্যায়ের সফরের চেয়ে অনেক বেশি প্রতিধ্বনিত হয়েছে সংবাদমাধ্যমে। এই পরিস্থিতি একটি উদ্বেগজনক প্রশ্নও উত্থাপন করে যে, ভারতের পররাষ্ট্রনীতি কোন নীতির ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে? মনে হচ্ছে অভ্যন্তরীণ জনপ্রিয়তা অর্জনের ধারণা কৌশলগত যুক্তির ওপর ক্রমেই প্রাধান্য পাচ্ছে। প্রতিবেশীদের ভারতবিরোধী মনোভাবের বিরুদ্ধে কঠোর আচরণ করে অভ্যন্তরীণ জনগোষ্ঠীকে সন্তুষ্ট করার প্রয়োজনীয়তা ভারতের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থকে নষ্ট করছে। বিসিসিআইয়ের নির্দেশ ঢাকার আচরণ পরিবর্তনের চেয়ে বরং ভারতের অভ্যন্তরে রাজনৈতিক বক্তব্যকে সন্তুষ্ট করতে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

ঢাকার সঙ্গে সম্পর্ক পুনরুদ্ধারের জন্য নয়াদিল্লিকে জরুরিভাবে তার আঞ্চলিক পররাষ্ট্রনীতি থেকে অভ্যন্তরীণ তোষণ কৌশলগুলো আলাদা করতে হবে। ক্রিকেট দীর্ঘকাল ধরে দক্ষিণ এশিয়ায় কূটনৈতিক বর্শার ধারালো প্রান্ত, তবে তা নতুন ক্ষত তৈরির জন্য নয়, বরং ক্ষত সেলাই করার একটি হাতিয়ার। ভারত কৌশলগত নোঙর হিসেবে বাংলাদেশকে কোনোভাবেই হারাতে পারে না। ভারতের এ ধরনের যেকোনো পদক্ষেপ তার নিজের বাড়ির উঠোনে আরো বিচ্ছিন্নতা তৈরি করবে। আর এটা মিত্রদের দ্বারা নয়, বরং দিল্লির নিজের তৈরি করা বিভক্তিমূলক কারণগুলোর জন্যই ঘটবে।

দ্য ইন্টারপ্রিটার থেকে ভাষান্তর : মোতালেব জামালী

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন