আন্তর্জাতিক নারী দিবস প্রতি বছর ৮ মার্চ সারা বিশ্বে পালন করা হয়। এ দিনটি শুধু নারীদের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের জন্য নয়, বরং নারীর ক্ষমতায়ন, অধিকার এবং সমাজে নারীর ভূমিকা নিয়ে সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে পালিত হয়। নারীর অবদান এবং সংগ্রামের ইতিহাসকে স্মরণ করে তাদের অধিকার আদায়ের প্রচেষ্টা সারা বিশ্বেই অব্যাহত রয়েছে। বাংলাদেশেও নারীর ক্ষমতায়ন নিয়ে গত কয়েক দশকে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে, তবে এখনো বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ রয়েছে যা নারীদের সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক জীবনে বাধা সৃষ্টি করছে।
বাংলাদেশে নারীর ক্ষমতায়ন একটি দীর্ঘ সংগ্রামের ফলস্বরূপ। দেশের ইতিহাসে নারীরা বিভিন্ন আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। স্বাধীনতার পর, বাংলাদেশে নারীদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং কর্মক্ষেত্রে অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি হয়। ১৯৭২ সালে ‘বাংলাদেশ পুনর্বাসন বোর্ড’ প্রতিষ্ঠিত হয়, যার উদ্দেশ্য ছিল মুক্তিযুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত নারীদের পুনর্বাসন এবং তাদের সামাজিক অবস্থান উন্নত করা। একই সঙ্গে, নারীর প্রতি সহিংসতা রোধে নানান আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়, যার মধ্যে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, এসিড সন্ত্রাস প্রতিরোধ আইন এবং বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন অন্তর্ভুক্ত।
বিশ্বব্যাপী নারীর ক্ষমতায়ন সূচক অনুযায়ী, বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় শীর্ষে রয়েছে, তবে পুরুষের তুলনায় নারীর অংশগ্রহণ এখনো সীমিত। ২০২৪ সালে প্রকাশিত বিশ্ব ইকোনমিক ফোরামের রিপোর্ট অনুযায়ী, বাংলাদেশের নারীরা শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং কর্মক্ষেত্রে পুরুষদের তুলনায় কিছুটা পিছিয়ে থাকলেও, নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণের হার অন্যান্য দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর তুলনায় তুলনামূলকভাবে ভালো। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৮৫ জন নারী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হন ৭ জন। নানা বাধা-বিপত্তি অতিক্রম করে নারীদের নির্বাচনে অংশগ্রহণ এবং সফলতা অর্জন রাজনীতিতে বিশেষ গুরুত্ব রাখে। নারীদের কর্মসংস্থানেও উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। ২০২০ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, নারীদের শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের হার ৪২.৭% পর্যন্ত পৌঁছেছে। তবে, এর বেশিরভাগ নারী এখনো অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করছেন, যেখানে তাদের নিরাপত্তা এবং স্বীকৃতি নিশ্চিত করা হয়নি।
নারীর ক্ষমতায়ন শুধুমাত্র একটি সামাজিক বিষয় নয়, এটি একটি রাষ্ট্রের উন্নতি ও সমৃদ্ধির মাপকাঠি। বাংলাদেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, শিক্ষা এবং স্বাস্থ্য খাতে নারীর ক্ষমতায়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
রাজনীতিতে— বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নারীর অবস্থান অনেকদূর এগিয়েছে, তবে অনেক চ্যালেঞ্জ এখনো অতিক্রম করতে বাকি। বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া দেশের শীর্ষ রাজনৈতিক পদে অধিষ্ঠিত হয়ে প্রমাণ করেছেন যে, নারীরা রাজনীতিতে নেতৃত্ব দিতে সক্ষম। কিন্তু, নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন তবু সমাজের পিতৃতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ। জাতীয় সংসদে বর্তমানে নারীদের জন্য সংরক্ষিত আসন রয়েছে, তবে সেসব আসনে নির্বাচিত নারীদের ক্ষমতা এখনও পুরুষদের তুলনায় সীমিত। তাই নারী প্রার্থীদের জন্য রাজনৈতিক পদে উন্নতির সুযোগ বাড়ানোর জন্য আরো কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ প্রয়োজন।
বাংলাদেশে নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হলেও এখনো তা অনেক ক্ষেত্রেই অসম্পূর্ণ। বর্তমানে বাংলাদেশের মোট শ্রমশক্তির প্রায় ৪২% নারী, তবে অধিকাংশ নারী অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মরত। অর্থাৎ, তারা স্বীকৃত কর্মক্ষেত্রে নিরাপদ ও ভালো বেতনের কাজ পায় না। নারীদের জন্য শিল্প, প্রযুক্তি এবং অন্যান্য পেশার ক্ষেত্রে দক্ষতা বৃদ্ধির প্রয়োজন, যাতে তারা পুরুষদের সঙ্গে সমানভাবে প্রতিযোগিতা করতে সক্ষম হয়। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে নারী উদ্যোক্তা হিসেবে অংশগ্রহণের হার মাত্র ৭%। নারীদের জন্য নিরাপদ কর্মক্ষেত্র, সমান মজুরি এবং সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা করা অত্যন্ত জরুরি। নারীর পেশাগত জীবনে অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়ানো, নারী-পুরুষের আয় বৈষম্য কমানো এবং নারী শ্রমিকদের জন্য সামাজিক সুরক্ষা প্রোগ্রাম চালু করা নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নকে ত্বরান্বিত করবে।
স্বাস্থ্য খাতে নারীর ক্ষমতায়ন, বিশেষত প্রজনন স্বাস্থ্য এবং মাতৃস্বাস্থ্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিক। বাংলাদেশে নারীদের স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণের সুযোগ ক্রমে বেড়েছে, তবে এখনো অনেক নারী স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত। জাতিসংঘের মতে, বাংলাদেশে এখনো মাতৃমৃত্যু হার অনেক বেশি, যা নারীর স্বাস্থ্য খাতের অবস্থা উন্নত করার জন্য চ্যালেঞ্জ। নারীদের জন্য বিশেষ স্বাস্থ্য সেবা যেমন প্রজনন স্বাস্থ্য, পুষ্টি এবং মাতৃস্বাস্থ্য ক্ষেত্রে ব্যাপক কর্মসূচি চালু করা দরকার। নারীদের স্বাস্থ্যসেবা এবং যে কোনো ধরনের স্বাস্থ্য সমস্যায় দ্রুত সেবা পেতে স্বয়ংসম্পূর্ণতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ করে গ্রামীণ অঞ্চলের নারীরা এখনো স্বাস্থ্যসেবা সঠিকভাবে পাচ্ছেন না। এর ফলে মাতৃমৃত্যু হার এবং স্বাস্থ্যজনিত অন্যান্য সমস্যা বেড়েছে। নারীদের জন্য স্বাস্থ্য শিক্ষা এবং তাদের সুস্বাস্থ্যের অধিকার রক্ষায় সরকার ও বেসরকারি সংস্থাগুলোকে আরো সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে।
শিক্ষা একটি শক্তিশালী হাতিয়ার, যা নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে সাহায্য করে। বর্তমানে বাংলাদেশে নারী শিক্ষার হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, তবে এটি কিছু সমস্যা সমাধান করার জন্য যথেষ্ট নয়। মাতৃমৃত্যুহার, শিশুমৃত্যুহার আগের থেকে কমলেও বর্তমান বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশে এই হার তুলনামূলক বেশিই রয়েছে। এ কারণে বর্তমানে নারীদের জীবনব্যাপী স্বাস্থ্যগত সমস্যা অনেক বেড়ে যাচ্ছে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকারকে নারীদের স্বাস্থ্যসেবার প্রতি অগ্রাধিকার দিয়ে প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা কার্ড চালু করা উচিত যেখানে দরিদ্র নারী জনগোষ্ঠী বিভিন্ন হাসপাতালে গেলে বিনামূল্যে চিকিৎসা সুবিধা পেতে পারেন। ফ্যামিলি কার্ড যেমন নারীকে অর্থনৈতিক ও খাদ্য নিরাপত্তাসহ অন্যান্য সুবিধা দিতে পারবে তেমনিভাবে নারীদের জন্য হেলথ কার্ড অন্তর্ভুক্ত করা উচিত।
নারীশিক্ষার উন্নয়নের লক্ষ্যে বেগম খালেদা জিয়ার অবদান অনস্বীকার্য। তিনি উপবৃত্তি কার্যক্রম চালু করার কারণে নারীদের যে শিক্ষার বৈষম্য ছিল তা অনেকাংশেই কমে এসেছে। শিক্ষা ক্ষেত্রেই প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও কলেজ পর্যায়ে নারী ও পুরুষের সমতা অর্জিত হয়েছে। কোথাও কোথাও নারীরা শিক্ষা ক্ষেত্রে পুরুষদের তুলনায় এগিয়ে আছে যা নিঃসন্দেহে বেগম খালেদা জিয়ার অবদানের কারণে সম্ভব হয়েছে। উচ্চশিক্ষা, কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষায় নারীদের অংশগ্রহণ বর্তমানে তুলনামূলক অনেক পিছিয়ে রয়েছে। ফলে, নারী শিক্ষার সুযোগ বাড়ানো, বিশেষ করে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল এবং গণিত ক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি করা, নারীর ক্ষমতায়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে। তবে, শুধু বিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া বা শিক্ষাগত যোগ্যতা অর্জনই নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করে না। বরং, সেই শিক্ষা জীবনের সব ক্ষেত্রেই নারীর উন্নতি ঘটাতে সক্ষম হওয়া উচিত। নারীদের শিক্ষা লাভের জন্য সমাজের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি ও সংস্কৃতি দূর করতে হবে, যাতে তারা সব স্তরে কাজ করতে সক্ষম হয়।
নারী ক্ষমতায়নে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবন্ধকতা হলো দেশের প্রচলিত সামাজিক কাঠামো। বাংলাদেশ একটি পিতৃতান্ত্রিক সমাজ, যেখানে পুরুষদের থেকে নারীদের অধিকার ও সুযোগ কম দেওয়া হয়। পরিবারের বাইরে নারীদের কাজের পরিবেশ এবং পারিবারিক সহিংসতা অন্যতম প্রধান সমস্যা। নারীরা যে কাজটি করছেন তা প্রায়ই সমাজে তুচ্ছ এবং তাদের পরিশ্রমকে মূল্যায়ন করা হয় না। বেশকিছু অঞ্চলে পুরুষতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং সাংস্কৃতিক রীতিনীতির কারণে নারীরা তাদের সমান অধিকার অর্জন করতে পারেন না। নারীদের বিরুদ্ধে সহিংসতা, যেমন যৌন হয়রানি এবং বুলিং এখনো এক বড় চ্যালেঞ্জ।
নারীদের প্রতি সহিংসতা এবং বৈষম্য রোধে আইনের কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। এজন্য প্রয়োজন রাষ্ট্র; সমাজসহ সব নাগরিকের এগিয়ে আসা। নারীরা নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হলে তারা সমাজের উন্নয়ন এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করবে। তাই, আমাদের সবার সমন্বিত প্রচেষ্টায় নারীর সমান অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করতে হবে, যা কেবল নারীদের জন্য নয়, দেশেরও উন্নয়নের জন্য তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
লেখক : সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

