শিক্ষায় বরাদ্দ : উচ্চ মুনাফার দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ

মো. হাবিবুল্লাহ বাহার

শিক্ষায় বরাদ্দ : উচ্চ মুনাফার দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ

একটি রাষ্ট্রের মেরুদণ্ড যদি শিক্ষা হয়, তবে সেই মেরুদণ্ডের পুষ্টি জোগায় অর্থায়ন বা বাজেট। প্রতিবছর বাজেট ঘোষণার সময় আমাদের দেশে শিক্ষা খাতের বরাদ্দ নিয়ে তুমুল আলোচনা হয়। কিন্তু দিনশেষে প্রাপ্তির খাতাটি আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের তুলনায় বেশ অপূর্ণই থেকে যায়। আমরা আজকাল সেতু, মেট্রোরেল বা টানেলের মতো দৃশ্যমান ভৌত অবকাঠামোর উন্নয়ন দেখছি। কিন্তু একটি জাতির ‘অদৃশ্য অবকাঠামো’ বা মেধা ও মনন গড়ার প্রধান কারিগর হলো শিক্ষা। তাই আগামীর বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দৃশ্যমান কাঠামোর পাশাপাশি এই অদৃশ্য অবকাঠামো বিনির্মাণে শিক্ষা খাতের বাজেট বরাদ্দ বৃদ্ধি এখন সবচেয়ে জোরালো দাবি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ইউনেসকো এবং আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) মতে, একটি উন্নয়নশীল দেশের টেকসই অগ্রগতির জন্য জিডিপির অন্তত ৪ থেকে ৬ শতাংশ অথবা বাজেটের ১৫ থেকে ২০ শতাংশ শিক্ষা খাতে বরাদ্দ থাকা বাঞ্ছনীয়। দুর্ভাগ্যবশত, এক দশক ধরে বাংলাদেশের শিক্ষায় এই বরাদ্দ জিডিপির ২ শতাংশের বৃত্তেই ঘুরপাক খাচ্ছে। দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিবেশী দেশ নেপাল, ভুটান, এমনকি মালদ্বীপও জিডিপির অনুপাতে আমাদের চেয়ে শিক্ষায় অনেক বেশি বরাদ্দ রাখে। যখন একটি রাষ্ট্র তার সম্পদের খুব নগণ্য অংশ মেধা তৈরিতে ব্যয় করে, তখন দীর্ঘ মেয়াদে সেই রাষ্ট্র ‘মেধাশূন্যতা’ বা ‘ব্রেইন ড্রেইন’-এর মতো চরম সংকটের শিকার হবে—সেটি স্বাভাবিক।

বিজ্ঞাপন

বরাদ্দের এই দৈন্যদশার পাশাপাশি রয়েছে ব্যয়ের খাত নিয়ে কাঠামোগত দুর্বলতা। বর্তমানে আমাদের শিক্ষা বাজেটের সিংহভাগই ব্যয় হচ্ছে ভবন নির্মাণ, আসবাবপত্র ক্রয় এবং বেতন-ভাতার মতো খাতে। শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়নের মূল চালিকাশক্তি গবেষণা, শিক্ষক প্রশিক্ষণ এবং উন্নত ল্যাবরেটরি স্থাপনে বরাদ্দ একেবারেই নামমাত্র। অথচ জিপিএ ৫-এর মোড়কে বন্দি শিক্ষাব্যবস্থা দিয়ে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা সম্ভব নয়; আমাদের প্রয়োজন প্রকৃত দক্ষ জনশক্তি। অন্যদিকে, আর্থিক ও সামাজিক সংকটের কারণে মেধাবী গ্র্যাজুয়েটদের শিক্ষকতা পেশায় আকৃষ্ট করতে পারছি না। শিক্ষকদের জন্য সম্মানজনক স্বতন্ত্র বেতন-কাঠামো এবং গবেষণার পর্যাপ্ত সুযোগ নিশ্চিত না করলে শিক্ষার এই গুণগত রূপান্তর কখনোই সম্ভব হবে না।

বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের চিত্রটি আরো হতাশাজনক। বিশ্বের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর র‍্যাংকিংয়ে আমাদের অবস্থান তলানিতে থাকার প্রধান কারণ ‘গবেষণা ফান্ডের অপ্রতুলতা’। উন্নত বিশ্বে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যেখানে নতুন জ্ঞান সৃষ্টির সূতিকাগার, সেখানে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অনেকটা ‘সার্টিফিকেট বিতরণ কেন্দ্রে’ পরিণত হয়েছে। বাজেট স্বল্পতায় আধুনিক ল্যাবরেটরি গড়ে না ওঠায় কৃষি, জলবায়ু বা জনস্বাস্থ্যের মতো আমাদের নিজস্ব সংকটগুলোর সমাধানেও বিদেশি বিশেষজ্ঞদের দ্বারস্থ হতে হয়। এটি দীর্ঘ মেয়াদে দেশের জন্য চরম আর্থিক ক্ষতির কারণ। তাই উচ্চশিক্ষায় গবেষণায় বরাদ্দ বাড়ানো খুবই জরুরি এবং এটি স্বনির্ভর জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গড়ার প্রাথমিক শর্ত।

বাংলাদেশ বর্তমানে ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’ বা জনসংখ্যাগত বোনাসকালের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। অর্থাৎ, আমাদের কর্মক্ষম তরুণ জনসংখ্যা এখন সবচেয়ে বেশি। কিন্তু চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের এই যুগে অটোমেশন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) প্রভাবে অদক্ষ শ্রমিকের বৈশ্বিক চাহিদা দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। এই বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠীকে যদি কারিগরি ও প্রযুক্তিগত শিক্ষায় দক্ষ করে গড়ে তোলা না যায়, তবে এই আশীর্বাদটিই অচিরেই ‘ডেমোগ্রাফিক বার্ডেন’ বা বোঝারূপে আবির্ভূত হবে। প্রচলিত গতানুগতিক শিক্ষাব্যবস্থা দিয়ে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা সম্ভব হবে না; এর জন্য প্রয়োজন ‘স্কিল-বেসড’ কারিকুলাম এবং আধুনিক ল্যাব সুবিধায় বিশাল মাত্রার বিনিয়োগ।

শিক্ষা খাতে অপর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ দেশের ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে বৈষম্যের পাহাড় তৈরি করছে। বিত্তবানের সন্তানরা উচ্চমূল্যে বেসরকারি বা বিদেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষা কিনছে আর সাধারণ ও সুবিধাবঞ্চিত পরিবারের সন্তানরা বাধ্য হচ্ছে মানহীন বা রুগণ অবকাঠামোর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়তে। বিশেষ করে, গ্রাম ও শহরের শিক্ষাব্যবস্থার এই বিস্তর ব্যবধান কমানোর জন্য বাজেটে বিশেষ বরাদ্দ প্রয়োজন। প্রান্তিক পর্যায়ে শিক্ষার মান উন্নত করতে না পারলে সর্বজনীন ও সমতাভিত্তিক সমাজ গঠনের যে সাংবিধানিক অঙ্গীকার আমাদের রয়েছে, তা শুধু কাগুজে বুলি হয়েই থাকবে।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো শুধু পাঠদানের কেন্দ্র নয়, বরং এটি শিক্ষার্থীদের শারীরিক, মানসিক ও সাংস্কৃতিক বিকাশেরও প্রধান চারণভূমি। পর্যাপ্ত বাজেটের অভাবে দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় খেলাধুলার মাঠ, উন্নত লাইব্রেরি এবং সাংস্কৃতিক চর্চার সুযোগ আজ সংকুচিত হয়ে আসছে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় যে ধরনের সাপোর্ট সিস্টেম থাকা প্রয়োজন, অর্থাভাবে তার কোনো উদ্যোগই চোখে পড়ে না। পুঁথিগত বিদ্যার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের মুক্তচিন্তার বিকাশ এবং সুস্থ ধারার নেতৃত্ব ও সাংস্কৃতিক চর্চা নিশ্চিত করতে বাজেটে ছাত্রকল্যাণ খাতেও সুনির্দিষ্ট বরাদ্দ রাখা অত্যাবশ্যক।

শিক্ষার ‘রিটার্ন অন ইনভেস্টমেন্ট’ বা বিনিয়োগের ফেরত অন্য যেকোনো খাতের চেয়ে বেশি। বিশ্বব্যাংকের গবেষণায় দেখা গেছে, শিক্ষার মান বাড়লে একটি দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার বহুগুণে ত্বরান্বিত হয়। একজন শিক্ষিত ও দক্ষ নাগরিক সারাজীবনে অর্থনীতিতে যে অবদান রাখেন, তা তার পেছনে রাষ্ট্রের ব্যয়ের তুলনায় অনেক বেশি। তাই শিক্ষা খাতের এই বরাদ্দকে নিছক ‘খরচ’ হিসেবে না দেখে, একে ‘উচ্চ মুনাফার দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ’ হিসেবে দেখা উচিত। তবে শুধু টাকার অঙ্ক বাড়ালেই হবে না, দুর্নীতি ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমিয়ে প্রতিটি পয়সার সঠিক ব্যবহার বা ‘বাস্তবায়ন সক্ষমতা’ নিশ্চিত করাও সমান জরুরি।

ভবিষ্যতের স্মার্ট ও উন্নত বাংলাদেশ গড়তে এসব সংকট সমাধান করে ‘মেধাবী ও দক্ষ জনশক্তির দেশ’ হওয়ার স্বপ্ন দেখতে হবে। আর সেই স্বপ্নের একমাত্র সারথি হলো মানসম্মত শিক্ষা। নতুন সরকারের আসন্ন বাজেটে এবং রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাগুলোয় শিক্ষা খাতকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়াই হবে অধিক যৌক্তিক ও প্রকৃত দেশপ্রেমের পরিচায়ক। আমাদের মনে রাখতে হবে, শুধু অন্ধকারে বাতি জ্বালিয়ে দেওয়াই সমাধান নয়, বাতি তৈরি করতে শেখানোটাও হলো আসল উন্নয়ন।

লেখক : নির্বাহী সদস্য, শহীদ জিয়াউর রহমান হল সংসদ, রাকসু

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন