আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

ইরানে মার্কিন হামলার প্রভাব কী হবে?

আলি আ গারেহ দাঘি

ইরানে মার্কিন হামলার প্রভাব কী হবে?

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা দেশ দুটিকে তাদের মধ্যে সংঘাতের আগুন দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠা থেকে বর্তমানে সামান্য দূরে সরিয়ে রেখেছে। মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক বাহিনীর ব্যাপক সমাবেশ এবং ট্রাম্প প্রশাসনের গানবোট ডিপ্লোমেসি বা নৌশক্তির সুস্পষ্ট প্রদর্শনীর মাধ্যমে পররাষ্ট্রনীতির লক্ষ্য বাস্তবায়নের চেষ্টা যুদ্ধের ঝুঁকি অনেকটাই বাড়িয়ে দিয়েছে, যা ইরান এবং এই অঞ্চলকে প্রাস করবে। এ ধরনের একটি যুদ্ধের সুদূরপ্রসারী আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক মূল্যও রয়েছে।

ইরানে বিক্ষোভকারীদের ওপর সরকারের সাম্প্রতিক দমন-পীড়নের পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করেন, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে অপসারণের সময় এসেছে। এরপরই তার প্রশাসন বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন এবং সহায়ক যুদ্ধবিমান, থাড এবং প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থাসহ অতিরিক্ত বিমান প্রতিরক্ষা সরঞ্জামসহ ব্যাপক সামরিক শক্তি মোতায়েন করে মধ্যপ্রাচ্যে। একই সঙ্গে ট্রাম্প হুমকি দিয়েছেন, ইরান যদি তার পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তিতে রাজি না হয়, তাহলে দেশটিতে পরবর্তী মার্কিন আক্রমণটি হবে গত জুনে পারমাণবিক স্থাপনাগুলোয় হামলার চেয়ে আরো বেশি ভয়াবহ।

বিজ্ঞাপন

যুক্তরাষ্ট্রের দাবি হচ্ছে, একটি অনুকূল চুক্তির জন্য ইরানকে তার পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি এবং ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ধ্বংস এবং তার আঞ্চলিক প্রভাব প্রত্যাহার করতে হবে। এ ধরনের সর্বোচ্চ দাবি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার প্রতি ইরানের অবিশ্বাসকে বাড়িয়ে দেবে এবং দুই দেশের মধ্যে চুক্তিকে অসম্ভব করে তুলবে। ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা ও বৈদেশিক নীতি কমিশনের সদস্য আলাউদ্দিন বোরুজেরদি গত সোমবার স্পষ্ট করেই বলেছেন, বেসামরিক পারমাণবিক সক্ষমতা অর্জন এবং ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ক্ষমতা তেহরানের জন্য একটি ‘রেডলাইন’ বা ‘লাল রেখা’।

দুই দেশের পাল্টাপাল্টি এই মনোভাব তাদের মধ্যে স্থায়ী কূটনৈতিক অচলাবস্থার ইঙ্গিত না দিলেও তেহরান যুক্তরাষ্ট্রের এসব দাবিকে ইরানে সরকার পরিবর্তনের সম্ভাব্য হুমকি হিসেবে বিবেচনা করে। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসন এবং ইসরাইলের কট্টরপন্থিরা তাদের এই দাবিগুলো ইরানের কাছে বারবার তুলে ধরছে এবং তা মেনে নিতে চাপ দিচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে মার্কিন হামলা ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের জন্য একটি ‘অস্তিত্বগত হুমকি’।

ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো সামরিক পদক্ষেপের প্রভাব মূলত আক্রমণের ধরন, মাত্রা এবং লক্ষ্যবস্তুর ওপর নির্ভর করবে, যা শুধু ইরানে নয়, সমগ্র অঞ্চলজুড়ে এবং বিশ্বব্যাপী একটি গুরুতর সংকটের সৃষ্টি করতে পারে। ট্রাম্প ইরানের সীমিত লক্ষ্যবস্তুতে সামরিক অভিযানের পক্ষে, যার মাধ্যমে সম্ভবত দেশটির শীর্ষ নেতৃত্বকে অপসারণের পাশাপাশি ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের সামরিক ঘাঁটি, আইআরজিসির নিয়ন্ত্রণাধীন আধাসামরিক বাহিনী বাসিজ ইউনিট এবং থানাগুলোয় টার্গেট করা হবে। কারণ এগুলোকে যুক্তরাষ্ট্র বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলি চালানোর জন্য দায়ী হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

তবে বিশ্লেষকরা মনে করেন, সামরিক উপায়ে ইরানে শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন আনার যেকোনো মার্কিন চেষ্টা অভ্যন্তরীণ এবং আঞ্চলিকভাবে বিপজ্জনক পরিণতি ডেকে আনবে। ইরানে আক্রমণ দেশটির বর্তমান শাসকদের ক্ষমতাকে আরো সংহত করতে পারে। অথবা এটি আইআরজিসির পূর্ণ ক্ষমতা দখলের পথ প্রশস্ত করবে অথবা ইরানকে অভ্যন্তরীণ সংঘাতের দিকেও নিয়ে যেতে পারে।

গত বছরের জুন মাসের মতো ইরানে আবার আক্রমণ করা হলে দেশটির জনগণ তাদের জাতীয় পতাকার নিচে সমবেত হতে পারে এবং বিভিন্ন কারণে শাসন পরিবর্তন প্রত্যাখ্যান করতে পারে। কারণ, ইরানি জনগণ সিরিয়া এবং লিবিয়ার মতো পরিস্থিতিকে ভয় পায়, যেখানে রাষ্ট্রের পতন ঘটবে। দ্বিতীয়ত, পরিবর্তনের নেতৃত্ব দিতে পারে, এমন কোনো বিশ্বাসযোগ্য মধ্যপন্থি বিরোধী দল নেই ইরানে। তৃতীয়ত, শক্তিশালী আর্থসামাজিক-রাজনৈতিক সংহতি রয়েছে ইরানে। বর্তমানে দেশটির রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান, সামরিক বাহিনী এবং আইআরজিসি খুবই সুসংগঠিত।

মার্কিন হামলার কারণে ইরানে শাসনের উত্তরাধিকার সংকট নিয়ে আলোচনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের শূন্যতা তৈরির পাশাপাশি শাসনব্যবস্থার মধ্যে প্রতিযোগিতা আরো গভীর হবে। এই পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান এবং সামরিক-নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর মধ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধি পাবে। আইআরজিসির হাতে পূর্ণ ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হওয়ার কারণে ইরান সামরিক বাহিনীর নেতৃত্বাধীন একটি রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে।

যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরাইল ইরানকে ভূরাজনৈতিকভাবে দুর্বল করার জন্য দেশটিতে গৃহযুদ্ধের উসকানি দেওয়ার চেষ্টাও করতে পারে। টেক্সাসের রিপাবলিকান সিনেটর টেড ক্রুজের মতো কিছু মার্কিন কর্মকর্তা গত মাসে ইরানি বিক্ষোভকারীদের অস্ত্র দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। এটি সহজেই ইরানের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোয় সম্প্রসারিত হতে পারে। বর্তমানে ইরানে এমন অনেক গোষ্ঠী আছে, যারা দেশটির সরকারের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত। যুক্তরাষ্ট্র এসব গোষ্ঠীর সঙ্গে যোগাযোগ করে তাদের সশস্ত্র সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার উৎসাহিত দিতে পারে।

এসব গোষ্ঠীর মধ্যে আছে মুজাহিদিন-ই খালক (এমইকে), যাকে আগে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ‘সন্ত্রাসী’ সংগঠন হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছিল। এছাড়া আছে সশস্ত্র কুর্দি গোষ্ঠী পার্টি অব ফ্রি লাইফ অব কুর্দিস্তান (পিজেএকে) যারা ইরানের পশ্চিম কুর্দিস্তান প্রদেশে নিজেদের শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে চায়। আরো আছে আরব জাতীয়তাবাদী আন্দোলন আল-আহওয়াজিয়া, যা ইরানের দক্ষিণ-পশ্চিমের তেলসমৃদ্ধ খুজেস্তান প্রদেশের বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনকে সমর্থন করে। এই তালিকায় আরো আছে সশস্ত্র গোষ্ঠী জাইশ আল-আদল (জুন্দাল্লাহ), যা দক্ষিণ-পূর্ব ইরানে সক্রিয় রয়েছে এবং উত্তর-পশ্চিমে আছে প্যান-তুর্কি গোষ্ঠী, যারা তুরস্ক, আজারবাইজান এবং ইরানে থাকা তুর্কি জনগোষ্ঠীকে ঐক্যবদ্ধ করার চেষ্টা করছে।

ইরানের বিরুদ্ধে ওয়াশিংটনের ক্রমাগত উত্তেজনাপূর্ণ বক্তব্য এবং সরকার পরিবর্তনের অভিযানের ট্র্যাক রেকর্ডের মুখোমুখি হয়ে তেহরান একটি তথাকথিত পাগলাটে কৌশল গ্রহণ করেছে। এই কৌশলে ইরানের পক্ষ থেকে একই সঙ্গে সমঝোতা এবং সংঘাতÑ দুই ধরনের সংকেত দেওয়া হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রকে। ইরানের শীর্ষ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনি গত সোমবার দেওয়া এক ভাষণে যুক্তরাষ্ট্রকে সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, ইরানে হামলা ‘আঞ্চলিক যুদ্ধ’ ডেকে আনবে। একই সঙ্গে আবার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় বসার একটি কাঠামো প্রতিষ্ঠার জন্য তেহরানের উন্মুক্ত মনোভাবও প্রদর্শন করছে।

কিন্তু ইরান ইতোমধ্যেই এটা স্পষ্ট করে দিয়েছে, হামলা হলে তারা প্রতিশোধ নেবে, যার মধ্যে আছে এই অঞ্চলে তাদের মিত্র শক্তির মাধ্যমে হামলা যা ইসরাইল এবং উপসাগরীয় দেশগুলো একটি বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাতের দিকে ঠেলে দেবে। এতে পুরো অঞ্চলে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা এবং অর্থনৈতিক দুর্বলতা দেখা দেবে। এর ফলে উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে মূলধন পাচার হতে পারে এবং ইউরোপে শরণার্থী এবং অভিবাসীদের প্রবাহ বেড়ে যেতে পারে।

তাছাড়া, ইরান যদি হরমুজ প্রণালি বা উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি অবকাঠামো ও জাহাজ চলাচলে আক্রমণ করে তাহলে বিশ্বব্যাপী তেল এবং গ্যাসের দাম ও বাজারে অস্থিরতা বৃদ্ধি পাবে, উচ্চ জ্বালানি খরচের কারণে মুদ্রাস্ফীতির চাপ বাড়বে এবং ভঙ্গুর অর্থনীতির ওপর বিরূপ প্রভাব পড়বে, যা অভিবাসনের চাপকে আরো বাড়িয়ে দেবে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে ইরানে মার্কিন হামলা শুধু ইরানের জন্যই নয়, সমগ্র অঞ্চলের জন্যও ঝুঁকি তৈরি করবে। মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাস প্রমাণ করে, একবার কোনো সংঘাত শুরু হলে তা দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে এবং অপ্রত্যাশিত উপায়ে পুরো অঞ্চলকে অস্থিতিশীল করে তোলে।

আলজাজিরা থেকে ভাষান্তর : মোতালেব জামালী

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ

এলাকার খবর
Loading...