কোচিং যখন সমান্তরাল শিক্ষাব্যবস্থা

কোচিং যখন সমান্তরাল শিক্ষাব্যবস্থা

বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা আজ এক নীরব কিন্তু গভীর সংকটের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে। এ সংকটের অন্যতম বড় প্রকাশ হলো কোচিংনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থা। একসময় কোচিং ছিল কিছু দুর্বল শিক্ষার্থীর সহায়তার একটি মাধ্যম। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় এটি এখন প্রায় সমগ্র শিক্ষাব্যবস্থার সমান্তরাল একটি কাঠামোতে পরিণত হয়েছে। আজ অনেক শিক্ষার্থী, এমনকি মেধাবীরাও মনে করেনÑকোচিং ছাড়া ভালো ফল সম্ভব নয়। বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষ যেন শুধু আনুষ্ঠানিকতা আর প্রকৃত শিক্ষা হয় কোচিং সেন্টারে। এটি শুধু শিক্ষাব্যবস্থার ব্যর্থতার প্রতীক নয়; বরং সামাজিক বৈষম্য, মানসিক চাপ এবং শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।

কোথাও কোথাও শ্রেণিকক্ষের শিক্ষার মান এমন পর্যায়ে নেমে গেছে যে অভিভাবকরা বাধ্য হয়ে কোচিংয়ের দ্বারস্থ হন। আমাদের পরীক্ষাকেন্দ্রিক শিক্ষাব্যবস্থা কোচিং ব্যবসাকে উৎসাহিত করছে। সৃজনশীল চিন্তা, গবেষণা, সমস্যা সমাধান কিংবা বিশ্লেষণী দক্ষতার পরিবর্তে পরীক্ষায় বেশি নম্বর পাওয়াই যখন শিক্ষার প্রধান লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়, তখন কোচিং প্রতিষ্ঠানগুলো সেই চাহিদাকে পুঁজি করে।

বিজ্ঞাপন

বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল ও প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির তীব্র প্রতিযোগিতা শিক্ষার্থীদের কোচিংমুখী করছে। সীমিত আসনের বিপরীতে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর প্রতিযোগিতা কোচিংকে প্রায় বাধ্যতামূলক করে তুলেছে। চতুর্থত, অভিভাবকদের সামাজিক মানসিকতাও একটি বড় কারণ। অনেক অভিভাবক মনে করেন, সন্তান যত বেশি কোচিং করবে, তত বেশি সফল হবে। ফলে শিশুদের শৈশব, খেলাধুলা ও সৃজনশীল বিকাশ উপেক্ষিত হচ্ছে।

কিছু অসাধু শিক্ষক নিজেরাই কোচিংকে উৎসাহিত করেন। কোথাও কোথাও শ্রেণিকক্ষে পর্যাপ্ত গুরুত্ব না দিয়ে ব্যক্তিগত কোচিংয়ে বেশি সময় দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।

কোচিংয়ে সাধারণত সম্ভাব্য প্রশ্ন, সাজেশন এবং পরীক্ষাকৌশলের ওপর জোর দেওয়া হয়। ফলে শিক্ষার্থীরা বিষয় বুঝে শেখার পরিবর্তে পরীক্ষা পাসের কৌশল শিখে।

শিক্ষার্থীরা চরম মানসিক চাপের মধ্যে পড়ে। সকাল থেকে বিদ্যালয়, বিকালে একাধিক কোচিং, রাতে ব্যক্তিগত পড়াশোনা—এই চক্রে তারা শারীরিক ও মানসিকভাবে ক্লান্ত হয়ে পড়ে। খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, বই পড়া কিংবা পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ কমে যায়।

কোচিং শিক্ষাকে ব্যয়বহুল করে তুলেছে। নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য এটি বড় আর্থিক চাপ। অনেক পরিবার সন্তানের কোচিং খরচ চালাতে ঋণ পর্যন্ত নেয়। কোচিংনির্ভরতা শিক্ষার্থীর আত্মনির্ভরশীলতা নষ্ট করে। সে নিজের উদ্যোগে শেখার পরিবর্তে সবসময় নির্দেশনা ও সাজেশনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।

কোচিং সমাজে বৈষম্য তৈরি করছে। শিক্ষা হওয়া উচিত সমতার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার। কিন্তু কোচিংনির্ভর ব্যবস্থা সেই সমতার ভিত্তিকেই দুর্বল করছে। যেসব পরিবারের আর্থিক সামর্থ্য বেশি, তারা উন্নত কোচিং, ব্যক্তিগত শিক্ষক, অনলাইন কোর্স এবং বিভিন্ন শিক্ষা সহায়তা গ্রহণ করতে পারে। অন্যদিকে দরিদ্র পরিবারের শিক্ষার্থীরা এসব সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়। ফলে একই বিদ্যালয়ের দুই শিক্ষার্থীর মধ্যে সুযোগের বৈষম্য তৈরি হয়।

একটি কার্যকর শিক্ষাব্যবস্থায় শ্রেণিকক্ষই হবে শিক্ষার প্রধান কেন্দ্র। কোচিং কখনো বিদ্যালয়ের বিকল্প হতে পারে না। শিক্ষককে শুধু বক্তা নয়, বরং শেখার সহযাত্রী হিসেবে কাজ করতে হবে। প্রতিটি ক্লাস পরিকল্পিত হতে হবে। মাল্টিমিডিয়া, স্মার্ট বোর্ড, ল্যাব, গ্রন্থাগার এবং তথ্যপ্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। উপস্থিতি, শেখার ফল এবং ধারাবাহিক মূল্যায়নের মাধ্যমে দুর্বল শিক্ষার্থীদের অতিরিক্ত সহায়তা বিদ্যালয়ের ভেতরেই দিতে হবে।

বিদ্যালয়ে নিয়মিত রেমিডিয়াল ক্লাস, বিষয়ভিত্তিক সহায়ক ক্লাস এবং পরামর্শ সেশন চালু করা গেলে কোচিংয়ের প্রয়োজন অনেকাংশে কমে যাবে।

শিক্ষকদের সময়মতো পাঠদান, আন্তরিকতা, বিষয়ভিত্তিক দক্ষতা এবং আধুনিক শিক্ষণ-পদ্ধতির ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। নিয়মিত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাদের দক্ষতা বাড়াতে হবে। কোনো শিক্ষক যেন শ্রেণিকক্ষের পরিবর্তে কোচিংকে অগ্রাধিকার না দেন, সে বিষয়ে কঠোর নৈতিক ও প্রশাসনিক অবস্থান প্রয়োজন। একই সঙ্গে শিক্ষকদের মর্যাদা, পেশাগত নিরাপত্তা এবং গবেষণার সুযোগও বাড়াতে হবে।

সরকারকে শুধু কোচিং বন্ধের নির্দেশ দিলেই চলবে না; বরং কোচিংয়ের প্রয়োজনীয়তা কমিয়ে আনতে হবে। বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষক নিয়োগে শতভাগ স্বচ্ছতা ও যোগ্যতার ভিত্তি নিশ্চিত করতে হবে। নিয়মিত শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও পেশাগত উন্নয়নের ব্যবস্থা করতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ, ল্যাবরেটরি, গ্রন্থাগার, ডিজিটাল সরঞ্জাম এবং শিক্ষাসামগ্রী নিশ্চিত করতে হবে।

পরীক্ষা ও মূল্যায়ন ব্যবস্থায় মৌলিক পরিবর্তন আনতে হবে। অনেক সময় অভিভাবকের অতি প্রত্যাশাই শিক্ষার্থীদের অপ্রয়োজনীয় কোচিংয়ের দিকে ঠেলে দেয়।

অভিভাবকদের বুঝতে হবে, সন্তানের সার্বিক বিকাশ শুধু জিপিএ বা ভর্তি পরীক্ষার ফলাফলের ওপর নির্ভর করে না। তার মানসিক স্বাস্থ্য, নৈতিক শিক্ষা, সৃজনশীলতা, খেলাধুলা, সাহিত্যচর্চা এবং সামাজিক দক্ষতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। সন্তানকে সারাদিন কোচিংয়ে ব্যস্ত না রেখে নিয়মিত বিদ্যালয়ে পাঠানো, ঘরে পড়াশোনার উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করা এবং শিক্ষকের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা প্রয়োজন।

কোচিংকে কখনো শিক্ষার্থীর নিজের মেধার বিকল্প মনে করা উচিত নয়। আত্মবিশ্বাস, অধ্যবসায় এবং নিয়মিত অনুশীলনই দীর্ঘমেয়াদি সাফল্যের মূল চাবিকাঠি।

প্রযুক্তির ইতিবাচক ব্যবহার ডিজিটাল যুগে প্রযুক্তিকে কোচিংয়ের বিকল্প শিক্ষাসহায়ক হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে। বিদ্যালয়ভিত্তিক ডিজিটাল কনটেন্ট, অনলাইন ক্লাস, ভিডিও লেকচার, ওপেন এডুকেশনাল রিসোর্স এবং ভার্চুয়াল লার্নিং প্ল্যাটফর্ম শিক্ষার্থীদের জন্য সমান সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে। তবে প্রযুক্তি যেন নতুন বৈষম্য সৃষ্টি না করে, সেদিকেও নজর রাখতে হবে। প্রত্যন্ত অঞ্চলেও ইন্টারনেট ও ডিজিটাল সুবিধা নিশ্চিত করা জরুরি।

শিক্ষাকে বাণিজ্য নয়, মানবসম্পদ উন্নয়নের মাধ্যম হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। কোচিং ব্যবসার ক্রমবর্ধমান বিস্তার আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে শিক্ষা ধীরে ধীরে বাজারনির্ভর পণ্যে পরিণত হচ্ছে।

কোচিংনির্ভরতা কোনো একক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সৃষ্টি নয়; এটি আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতার বহিঃপ্রকাশ। তাই এর সমাধানও হতে হবে সমন্বিত। আমরা যদি সত্যিই একটি জ্ঞানভিত্তিক, বৈষম্যহীন ও দক্ষ বাংলাদেশ গড়তে চাই, তবে শিক্ষাব্যবস্থাকে কোচিংনির্ভরতা থেকে মুক্ত করে বিদ্যালয়ভিত্তিক শিক্ষার মর্যাদা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতেই হবে। সেটিই হবে শিক্ষার প্রকৃত সংস্কার এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি আমাদের সবচেয়ে বড় দায়বদ্ধতা।

লেখক : উপাচার্য, নওগাঁ বিশ্ববিদ্যালয়

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন