আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের প্রশ্ন

মোহাম্মদ ইব্রাহিম রুপম

নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের প্রশ্ন

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন দেশের জন্য এক গভীর তাৎপর্যপূর্ণ সন্ধিক্ষণ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। টানা দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে চলমান রাজনৈতিক সংকট, মত প্রকাশ ও বিরোধী রাজনীতির ওপর দমন–পীড়ন এবং অংশগ্রহণহীন ও প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনের অভিজ্ঞতার পর জনগণ এখন একটি সত্যিকারের ফ্যাসিবাদমুক্ত, অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের প্রত্যাশায় প্রহর গুনছে। এই নির্বাচনকে ঘিরে কেবল ক্ষমতা পরিবর্তনের আশা নয়, বরং গণতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠা, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর বিশ্বাসযোগ্যতা পুনরুদ্ধার এবং জনগণের ভোটাধিকার কার্যকরভাবে প্রয়োগের আকাঙ্ক্ষা জড়িয়ে আছে। ফলে আসন্ন এই নির্বাচন শুধু একটি নির্ধারিত সময়সূচির বিষয় নয়; এটি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ কোন পথে অগ্রসর হবে, তা নির্ধারণের সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পৃক্ত।

প্রাথমিক পর্যায়ে অনেকের ধারণা ছিল, বিএনপি নির্বাচনের জন্য সাংগঠনিক ও রাজনৈতিকভাবে সম্পূর্ণভাবে প্রস্তুত নয়। দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান দীর্ঘ সময় প্রবাসে অবস্থান করায় মাঠপর্যায়ের নেতৃত্বে অনিশ্চয়তা লক্ষ করা গেছে এবং দেশে ফিরতে দেরি হওয়াকে কেন্দ্র করে ধারণা করা হচ্ছিল, বিএনপি কৌশলগতভাবে নির্বাচন পেছানোর সিদ্ধান্ত নিতে পারে।

বিজ্ঞাপন

কিন্তু সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে সেই ধারণা অনেকটাই পরিবর্তিত হয়েছে। গত দেড় বছরে বিএনপির অভ্যন্তরীণ শুদ্ধি অভিযান, সাংগঠনিক পুনর্গঠন এবং কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের দৃঢ়তা নতুনভাবে দৃশ্যমান হয়েছে। তবে একই সময়ে বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, ভূমিদখল, প্রভাববিস্তার ও প্রশাসনিক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে, যা দলটির জনসমর্থন ও নৈতিক অবস্থানকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তারেক রহমান প্রায় সাত হাজার নেতাকর্মীকে বহিষ্কার করে দলীয় শৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন, যা বিএনপির ভেতরে নিয়ন্ত্রণ ও শাসনব্যবস্থাকে সুসংহত করার ইঙ্গিত দেয়।

অন্যদিকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী তুলনামূলকভাবে ভিন্ন ও দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক কৌশল অনুসরণ করছে। তারা সরাসরি ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতির পরিবর্তে সমাজভিত্তিক রাজনীতি ও কল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডকে অগ্রাধিকার দিয়ে জনগণের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করার চেষ্টা করছেন। মানবিক সহায়তা, শিক্ষা কার্যক্রম এবং বিভিন্ন সামাজিক উদ্যোগের মাধ্যমে তারা একটি ইতিবাচক ও দায়িত্বশীল রাজনৈতিক ভাবমূর্তি গড়ে তুলতে সচেষ্ট হয়েছে।

সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো—নির্বাচনি প্রস্তুতির ক্ষেত্রে জামায়াতে ইসলামী অনেক আগেই সুসংগঠিতভাবে এগিয়ে যায়। প্রায় ৩০০ আসনে প্রার্থী চূড়ান্ত করে তারা দীর্ঘ সময় ধরে মাঠপর্যায়ে ধারাবাহিক প্রচারণা, সংগঠন সম্প্রসারণ ও ভোটারদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ বজায় রেখে কাজ করে যাচ্ছে। এই দীর্ঘমেয়াদি ও পরিকল্পিত প্রস্তুতি রাজনৈতিক বাস্তবতায় তাদের একটি সুসংহত, শৃঙ্খলাবদ্ধ ও সংগঠিত অবস্থানকে স্পষ্টভাবে নির্দেশ করে এবং নির্বাচনি প্রচারণায় বিএনপির তুলনায় জামায়াতে ইসলামীকে অনেকটা এগিয়ে রেখেছে।

নির্বাচনি প্রক্রিয়ায় বিএনপির কিছু সম্ভাব্য প্রার্থীর বিরুদ্ধে ঋণখেলাপি ও দ্বৈত নাগরিকত্ব-সংক্রান্ত অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও তাদের মনোনয়ন বাতিল না হওয়ার বিষয়টি প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা নিয়ে নতুন করে সন্দেহের জন্ম দিয়েছে। নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা এখানে কতটা স্বাধীন ও সাহসী—সে প্রশ্নও সামনে চলে এসেছে।

আঞ্চলিক রাজনীতির প্রেক্ষাপটেও সাম্প্রতিক পরিস্থিতি বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আনুষ্ঠানিক শোকবার্তা, ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সঙ্গে তারেক রহমানের একান্ত বৈঠক এবং পরবর্তী সময়ে ভারতের পররাষ্ট্র সচিবের প্রণয় ভার্মার সাক্ষাৎ--এই ধারাবাহিক কূটনৈতিক যোগাযোগকে অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক নিছক সৌজন্য সাক্ষাৎ হিসেবে দেখছেন না, বরং এগুলো একটি সুস্পষ্ট রাজনৈতিক ইঙ্গিত বহন করছে বলে তাদের ধারণা।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ভারতের প্রভাবশালী কয়েকটি গণমাধ্যমে ধারাবাহিকভাবে বিএনপিবান্ধব বয়ানের উপস্থিতি, যা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে আঞ্চলিক প্রভাব ও আগ্রহের বিষয়টিকে আরো দৃশ্যমান করে তুলেছে। একই সময়ে দেশের ভেতরেও ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত বা তার দোসর হিসেবে পরিচিত কিছু দলকানা গণমাধ্যম একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক পক্ষে অবস্থান নিয়ে বয়ান নির্মাণে সক্রিয় ভূমিকা রাখছে। এসব অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক সমর্থনের সমন্বিত চিত্র রাজনৈতিক ভারসাম্য ও নির্বাচনি ন্যায্যতা নিয়ে নতুন করে গভীর প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও নির্ণায়ক বিষয় হয়ে দাঁড়ায় ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’। একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করতে কেবল ভোটের দিন শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় থাকাই যথেষ্ট নয়; বরং প্রয়োজন সব দলের জন্য সমান প্রচারণার সুযোগ, প্রশাসনের দৃশ্যমান নিরপেক্ষতা, নিরাপত্তা বাহিনীর দলনিরপেক্ষ ও পেশাদার ভূমিকা এবং নির্বাচন কমিশনের কার্যকর ও প্রশ্নাতীত স্বাধীনতা। এসব উপাদান অনুপস্থিত থাকলে নির্বাচন গণতন্ত্রের প্রতিফলন না হয়ে কেবল একটি আনুষ্ঠানিক ও প্রক্রিয়াগত আয়োজনেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে।

এই বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও ১১ দলীয় জোটের সামনে একটি কঠিন, কিন্তু অনিবার্য ও বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্তের মুহূর্ত উপস্থিত হয়েছে। যদি নির্বাচনি পরিবেশে প্রকৃত লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত না হয়, তবে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেও বিজয় অর্জনের সম্ভাবনা কার্যত শূন্যের কোঠায় নেমে আসবে। অতীত অভিজ্ঞতা, বিশেষত ২০০৮ সালের নির্বাচন ঘিরে ওঠা বিতর্ক আজও রাজনৈতিক অঙ্গনে একটি স্পষ্ট সতর্কসংকেত হিসেবে বিবেচিত হয়, যেখানে নির্বাচন প্রকৌশলের মাধ্যমে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ফলাফল পূর্বনির্ধারিতভাবে নিশ্চিত করা হয়েছিল।

সুতরাং বর্তমান বাস্তবতায় সবচেয়ে যৌক্তিক ও দায়িত্বশীল পথ হলো, নির্বাচনে অংশগ্রহণের আগে একটি প্রকৃত লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করার জন্য জোরালো ও ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গড়ে তোলা। প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা ও রাজনৈতিক সমতার নিশ্চয়তা ছাড়া নির্বাচনে অংশ নেওয়া মানে অসম প্রতিযোগিতাকে বৈধতা দেওয়া।

সবশেষে বলা যায়, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন শুধু ক্ষমতা পরিবর্তনের প্রশ্ন নয়; এটি বাংলাদেশের গণতন্ত্র, সার্বভৌমত্ব ও রাজনৈতিক ভবিষ্যতের প্রশ্ন। অতএব বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় সবচেয়ে যুক্তিসংগত ও দায়িত্বশীল পথ হলো—নির্বাচনের আগে জোরালো ও সুসংগঠিত আন্দোলনের মাধ্যমে একটি প্রকৃত ও কার্যকর লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করা। নির্বাচন কমিশন, প্রশাসন ও নিরাপত্তা বাহিনীর নিরপেক্ষতা যদি স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান ও বিশ্বাসযোগ্যভাবে প্রতিষ্ঠিত না হয়, তাহলে কেবল নির্বাচনি প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করাই গণতন্ত্রকে সুরক্ষা দেয় না; বরং এমন অসম ও বৈষম্যমূলক প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া রাজনৈতিক প্রক্রিয়াকে বৈধতা দেওয়ার ঝুঁকি সৃষ্টি করে, যা শেষ পর্যন্ত গণতন্ত্রের মূল চেতনার পরিপন্থী হয়ে দাঁড়ায়।

লেখক : সহকারী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান

ইটিই বিভাগ, আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন