বেসামরিক অভিযান নয়, সেনাবাহিনীর সক্ষমতা জরুরি

বেসামরিক অভিযান নয়, সেনাবাহিনীর সক্ষমতা জরুরি

বাংলাদেশ সেনাবাহিনী বেসামরিক প্রশাসনকে সহায়তা করার জন্য দীর্ঘ সময় সেনানিবাসের বাইরে মোতায়েন থেকে দায়িত্ব পালন করেছে। শুরুতে যে জরুরি পরিস্থিতির কারণে এই মোতায়েন প্রয়োজন হয়েছিল, তা বিবেচনায় রেখেও এর দীর্ঘ মেয়াদ এবং প্রভাব গভীরভাবে পর্যালোচনা করা জরুরি। একটি জাতীয় সেনাবাহিনী অনির্দিষ্টকাল সাধারণ আইনশৃঙ্খলা রক্ষার কাজে নিয়োজিত থাকলে তার প্রশিক্ষণ, অভিযানগত প্রস্তুতি, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতি এবং জনগণের সঙ্গে সম্পর্কের ওপর চাপ সৃষ্টি হতে পারে। সরকার ও সেনাবাহিনীর নেতৃত্বের এখন অগ্রাধিকার হওয়া উচিত বাহিনীর সক্ষমতা পুনরুদ্ধার, পেশাগত ভিত্তি সুদৃঢ় করা এবং স্বাভাবিক সামরিক কার্যক্রমে পূর্ণভাবে ফিরে যাওয়া। দেশব্যাপী এই মোতায়েন শুরু হয়েছিল ২০২৪ সালের জুলাইয়ে। ২০২৬ সালের ১৫ জুন দেশব্যাপী দায়িত্ব থেকে সেনাসদস্যদের প্রত্যাহার করা হয়; পরে একই মাসে ছয়টি জেলায় আবার সীমিত মোতায়েন করা হয়েছিল। ফলে প্রধান মোতায়েনের সময়কালকে ঠিক চব্বিশ মাসের পরিবর্তে প্রায় দুই বছর বলা অধিকতর যথাযথ। বাংলাদেশের ইতিহাসে একই ধরনের মোতায়েনের মধ্যে এটি দীর্ঘতম কি না, তা নিশ্চিত করতে আরও বিস্তৃত ঐতিহাসিক পর্যালোচনা প্রয়োজন। তবে এর ব্যতিক্রমী দীর্ঘ মেয়াদই উদ্বেগ ও মূল্যায়নের যথেষ্ট কারণ।

বিজ্ঞাপন

অপারেশন ক্লিন হার্টের মতো আরেকটি অভিযান নিয়ে আলোচনার প্রসঙ্গে ২০২৬ সালের ১ অক্টোবর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, যৌথ অভিযান চালানোর বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত হয়নি এবং ক্লিন হার্টের মতো অভিযানের পরিকল্পনাও নেই। তিনি বলেছেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলোর সমন্বিত কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে ও জোরদার করা হবে। সরকারের এই ব্যাখ্যা বিবেচনায় নিতে হবে। তবে এ নিয়ে জনপরিসরের আলোচনা সাধারণ অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার কাজে সেনাবাহিনীর ওপর নতুন করে নির্ভরশীল হওয়ার ঝুঁকি মূল্যায়নের সুযোগ তৈরি করেছে। মূল উদ্বেগটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ : দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালনের পর সেনাবাহিনীর প্রয়োজন এমন একটি নিরবচ্ছিন্ন সময়, যখন প্রশিক্ষণ পুনর্বিন্যাস, সরঞ্জাম রক্ষণাবেক্ষণ, যুদ্ধপ্রস্তুতি মূল্যায়ন এবং সদস্যদের ওপর সৃষ্ট চাপ মোকাবিলা করা যাবে। এটি জাতীয় প্রতিরক্ষার প্রশ্ন। দেশের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষাই সেনাবাহিনীর প্রধান দায়িত্ব। সেই দায়িত্ব থেকে বড় ধরনের বিচ্যুতির আগে বিবেচনা করতে হবে, এর ফলে কতটা সামরিক সক্ষমতা ও প্রস্তুতি ব্যয় হচ্ছে।

সামরিক পেশাদারিত্ব নিরবচ্ছিন্ন অনুশীলনের ওপর নির্ভরশীল। ব্যক্তিগত অস্ত্র পরিচালনার দক্ষতা, সম্মিলিত প্রশিক্ষণ, মাঠপর্যায়ের মহড়া, স্টাফ কার্যক্রম, যোগাযোগ, রসদ ব্যবস্থাপনা এবং বিভিন্ন অস্ত্র ও সার্ভিসের মধ্যে সমন্বয় অত্যন্ত প্রয়োজন। বেসামরিক প্রশাসনকে সহায়তার দায়িত্ব থেকে সংযম, সমন্বয় ও জনগণের সঙ্গে যোগাযোগের মূল্যবান অভিজ্ঞতা অর্জিত হতে পারে। কিন্তু তা সামরিক অভিযান পরিচালনার প্রস্তুতির বিকল্প নয়।

আইনশৃঙ্খলার কাজে ব্যস্ত একটি পদাতিক ইউনিট একই সঙ্গে গোলন্দাজ, ইঞ্জিনিয়ার্স, সাঁজোয়া ও অন্যান্য সহায়ক ইউনিটের সঙ্গে কার্যকরভাবে যুদ্ধ পরিচালনার প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ পাচ্ছে—এমন ধরে নেওয়া সঠিক হবে না। প্রশিক্ষণ ব্যাহত হওয়ার বিষয়টি শুধু তাত্ত্বিক আশঙ্কা নয়। ২০২৬ সালের মার্চে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিজেই স্বীকার করেছিলেন যে দীর্ঘ মাঠপর্যায়ের মোতায়েন সেনাবাহিনীর প্রশিক্ষণসূচি ব্যাহত করছে এবং অন্যান্য অভ্যন্তরীণ সমস্যাও সৃষ্টি করছে। এই বক্তব্য পরিকল্পিত পুনরুদ্ধার কর্মসূচির প্রয়োজনীয়তাকে আরো জোরালো করে। ইতোমধ্যে ব্যস্ত কর্মসূচিতে কয়েকটি প্রশিক্ষণ কার্যক্রম যোগ করলেই হারানো সময় ও দক্ষতা সব ক্ষেত্রে পূরণ হয় না। সম্মিলিত সক্ষমতা পুনর্গঠন এবং যথাযথ মূল্যায়নভিত্তিক মহড়ায় তা প্রমাণ করার জন্য ইউনিটগুলোর পর্যাপ্ত নিরবচ্ছিন্ন সময় প্রয়োজন।

সরকার ও সেনাবাহিনীর নেতৃত্বের উচিত মোতায়েনের প্রকৃত প্রভাব পরীক্ষা করা। সবকিছু স্বাভাবিক রয়েছে অথবা পুরো প্রতিষ্ঠান সমানভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে—কোনোটিই যাচাই ছাড়া ধরে নেওয়া উচিত নয়। বাহিনীজুড়ে শৃঙ্খলা, নৈতিক মূল্যবোধ কিংবা কমান্ডব্যবস্থার অবনতি হয়েছে—এমন বক্তব্যের সত্যতাকেও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। যথাযথ পদক্ষেপ হবে প্রশিক্ষণের ঘাটতি, শৃঙ্খলাজনিত ঘটনার প্রবণতা, সরঞ্জামের অবস্থা, সদস্যদের ক্লান্তি এবং অভিযানগত প্রস্তুতির সৎ ও পেশাগত মূল্যায়ন। ঝুঁকি স্বীকার করা জরুরি; কিন্তু দায়িত্ব পালনকারী সবাইকে ঢালাওভাবে অভিযুক্ত করা ন্যায়সংগত নয়। তবে দীর্ঘ মোতায়েন শৃঙ্খলার ওপর উল্লেখযোগ্য চাপ সৃষ্টি করতে পারে। বিচ্ছিন্ন বিভিন্ন স্থানে দায়িত্ব পালনকারী সৈনিকদের অপরিচিত বেসামরিক পরিস্থিতি, পরস্পরবিরোধী অনুরোধ এবং প্রভাব বা সহায়তাপ্রত্যাশী ব্যক্তিদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ সামলাতে হয়। এসব অবস্থায় তত্ত্বাবধান ও সুস্পষ্ট নির্দেশের গুরুত্ব আরো বেড়ে যায়। নিয়মিত কার্যক্রম দুর্বল হলে, ব্যতিক্রম বাড়তে থাকলে কিংবা অনানুষ্ঠানিক ব্যবস্থা স্বাভাবিক হিসেবে গ্রহণ করা হলে পেশাগত মান ধীরে ধীরে ক্ষয় হতে পারে। এসব ঝুঁকি সময়মতো শনাক্ত করে দৃঢ়ভাবে সংশোধন করতে হবে।

আনুষ্ঠানিক কমান্ডব্যবস্থা অক্ষুণ্ণ থাকলেও বাস্তবে তার কার্যক্রম জটিল হয়ে উঠতে পারে। বেসামরিক পরিবেশে নিয়োজিত কর্মকর্তাদের কাছে প্রশাসন, পুলিশ, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এবং স্থানীয় প্রভাবশালীদের বিভিন্ন অনুরোধ আসতে পারে। কিছু অনুরোধ বৈধ ও প্রয়োজনীয় হবে; অন্যগুলো অনুচিতও হতে পারে। দায়িত্বের সীমা সুস্পষ্ট না থাকলে অগ্রাধিকার ও কর্তৃত্ব সম্পর্কে বিভ্রান্তি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। বেসামরিক প্রশাসনের সঙ্গে সামরিক সমন্বয়ের নামে অনানুষ্ঠানিক রাজনৈতিক নির্দেশ যেন কখনো চেইন অব কমান্ডের মাধ্যমে দেওয়া আইনানুগ আদেশের স্থান দখল না করে। নৈতিক মান বজায় রাখার ক্ষেত্রেও ঝুঁকি রয়েছে। গ্রেপ্তার, তল্লাশি, সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ এবং অভিযুক্ত অপরাধীদের সঙ্গে যোগাযোগ সদস্যদের এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি করে, যেখানে ভয়, অর্থ ও স্বার্থের সংঘাত কাজ করে। অধিকাংশ সদস্য সততার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করলেও বিচ্ছিন্ন অসদাচরণ পুরো প্রতিষ্ঠানের ক্ষতি করতে পারে। তাই কার্যকর সুরক্ষাব্যবস্থা, দ্রুত তদন্ত এবং ধারাবাহিক জবাবদিহি অপরিহার্য। সামরিক পোশাক কখনো ব্যক্তিগত সুবিধা অর্জন, অন্যের বিরোধ নিষ্পত্তি কিংবা প্রভাবশালী কাউকে রক্ষা করার মাধ্যম হতে পারে না।

মনোবলের বিষয়টিও সমান গুরুত্বের দাবি রাখে। দীর্ঘ মোতায়েনের ফলে ছুটি ব্যাহত হওয়া, পরিবার থেকে বিচ্ছিন্নতা, অনিশ্চিত কর্মসূচি এবং সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যে দীর্ঘ সময় কাটানোর চাপ সৃষ্টি হতে পারে। সদস্যদের মনে হতে পারে, তাদের পেশাগত উন্নয়ন পিছিয়ে যাচ্ছে, অথচ দায়িত্ব ও প্রত্যাশা ক্রমাগত বাড়ছে। কর্মকর্তা ও সৈনিকদের প্রয়োজন বিশ্রাম, পূর্বানুমানযোগ্য নিয়মিত কার্যক্রম, প্রশিক্ষণের সুযোগ এবং তাদের মূল সামরিক দায়িত্ব যথাযথ গুরুত্ব পাচ্ছে—এমন আস্থা। সক্ষমতা পুনরুদ্ধারের উদ্যোগে সরঞ্জাম ও অভিযানগত প্রয়োজনের পাশাপাশি এসব মানবিক বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। দীর্ঘ আইনশৃঙ্খলা দায়িত্বের সময় সেনাবাহিনীর জনভাবমূর্তি বিশেষভাবে ঝুঁকির মুখে পড়ে। রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত সমাজে একটি গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে নেওয়া ব্যবস্থাকে অন্য গোষ্ঠীর প্রতি পক্ষপাত হিসেবে উপস্থাপন করা হতে পারে। গ্রেপ্তার করলে পক্ষপাতের অভিযোগ উঠতে পারে; সংযম দেখালে দুর্বলতা বলা হতে পারে। সৈনিকরা এমন বিরোধ ও নীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়তে পারেন, যা তারা সৃষ্টি করেননি কিংবা নির্ধারণও করেননি। এই পরিবেশে বারবার সম্পৃক্ততা একটি জাতীয় সেনাবাহিনীর জন্য অপরিহার্য বৃহত্তর জনআস্থাকে দুর্বল করার ঝুঁকি তৈরি করে।

অপরাধ দমনের অভিযানে সামরিক সম্পৃক্ততার পরিণতি সম্পর্কে অপারেশন ক্লিন হার্টের ইতিহাস সতর্কবার্তা দেয়। ২০০২-০৩ সালের ওই অভিযানের পর আটক ব্যক্তিদের প্রতি আচরণ এবং দায়মুক্তি দেওয়ার বিষয় নিয়ে গুরুতর বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছিল। ২০১৫ সালের রায়ে হাইকোর্ট দায়মুক্তির আইনকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করেন এবং ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের আইনগত প্রতিকার চাওয়ার সুযোগ দেন। এই অভিজ্ঞতা দেখায়, আইনানুগ আচরণ, বিচারিক তদারকি ও জবাবদিহির জায়গায় দায়মুক্তির প্রতিশ্রুতি বসানো যায় না। একই ধরনের কোনো উদ্যোগ বিবেচনার আগে সরকার ও সামরিক নেতৃত্বের এই পরিণতিগুলো গভীরভাবে অধ্যয়ন করা উচিত। কঠোর অপরাধবিরোধী অভিযান তাৎক্ষণিকভাবে সক্রিয়তার দৃশ্যমান ধারণা সৃষ্টি করতে পারে। কিন্তু স্থায়ী জননিরাপত্তা নির্ভর করে তদন্ত, প্রমাণ, মামলা পরিচালনা, ন্যায়বিচার এবং কার্যকর প্রতিষ্ঠানের ওপর। সামরিক মোতায়েন একা পুলিশের নেতৃত্ব, অপরাধ তদন্ত, সাক্ষীর সুরক্ষা কিংবা বিচারব্যবস্থার দুর্বলতা দূর করতে পারে না। বেসামরিক প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল থাকলে সেনাসদস্যদের প্রত্যাহারের পর একই সমস্যা আবার সামনে আসতে পারে। বারবার সেনাবাহিনীকে ডাকা এমন সংস্কার পিছিয়ে দিতে পারে, যা বাস্তবায়িত হলে সামরিক সহায়তার প্রয়োজনই কমে আসত।

সরকারের উচিত বেসামরিক আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার সক্ষমতা পুনর্গঠনকে জরুরি অগ্রাধিকার দেওয়া। পুলিশের প্রয়োজন যোগ্য নেতৃত্ব, পর্যাপ্ত সম্পদ, পেশাগত প্রশিক্ষণ এবং অনুচিত রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ থেকে সুরক্ষা। দুর্নীতি ও অসদাচরণের বিরুদ্ধে বিশ্বাসযোগ্য প্রক্রিয়ায় ব্যবস্থা নিতে হবে। তদন্তকারীদের এমন মামলা প্রস্তুত করার সক্ষমতা থাকতে হবে, যা আদালতের যাচাইয়ে টিকে থাকবে। কে গ্রেপ্তার হবে, কে তদন্ত এড়িয়ে যাবে কিংবা কার অভিযোগ গুরুত্ব পাবে—এসব রাজনৈতিক প্রভাবের ভিত্তিতে নির্ধারিত হওয়া চলবে না। সেনাবাহিনীর জন্য প্রতিটি ফরমেশন ও ইউনিটের প্রয়োজন অনুযায়ী সুসংগঠিত পুনরুদ্ধার কর্মসূচি গ্রহণ করা উচিত। এর মধ্যে প্রশিক্ষণচক্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা, সরঞ্জাম পরীক্ষা ও রক্ষণাবেক্ষণ, প্রয়োজনীয় সম্পদ পুনঃপূরণ, সদস্যদের কল্যাণ এবং প্রস্তুতির নিরপেক্ষ মূল্যায়ন অন্তর্ভুক্ত থাকবে। মোতায়েন থেকে অর্জিত শিক্ষাও সংরক্ষণ করতে হবে—বিশেষত আইনানুগ বলপ্রয়োগ, বেসামরিক সমন্বয় এবং কমান্ড তত্ত্বাবধানের বিষয়ে। ঘাটতি সংশোধন করতে হবে; মূল্যায়নকে সুবিধাজনক কাউকে দায়ী করার প্রক্রিয়ায় পরিণত করা যাবে না।

সাধারণ আইনশৃঙ্খলার উদ্দেশ্যে নতুন করে ব্যাপক বা দীর্ঘমেয়াদি সেনা মোতায়েন থেকে এখন বিরত থাকাই সরকারের নীতিগত অবস্থান হওয়া উচিত। যুদ্ধ ও বহিরাগত হুমকি মোকাবিলার প্রস্তুতি সেনাবাহিনীর প্রধান মনোযোগের বিষয় থাকবে। ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ কিংবা বেসামরিক সক্ষমতার ব্যতিক্রমী বিপর্যয়ের মতো প্রকৃত জাতীয় জরুরি পরিস্থিতিতে সামরিক সহায়তার প্রয়োজন হতে পারে। তবে এসব ব্যতিক্রমের যৌক্তিকতা কঠোরভাবে যাচাই করতে হবে; এগুলো যেন আবার নিয়মিত নির্ভরশীলতায় ফিরে যাওয়ার পথ না হয়। অনিবার্য মোতায়েনের ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য, সীমিত পরিসর, সুস্পষ্ট কর্তৃত্ব, নিয়মিত পর্যালোচনা এবং বাস্তবসম্মত প্রত্যাহার পরিকল্পনা থাকতে হবে। নতুন মোতায়েনের মূল্য সম্পর্কে সেনাবাহিনীর নেতৃত্বকে সরকারের কাছে অকপট পরামর্শ দিতে হবে।

অতিরিক্ত দায়িত্ব কখন প্রশিক্ষণ ব্যাহত করবে, সদস্যদের ক্লান্ত করবে কিংবা যুদ্ধপ্রস্তুতি কমিয়ে দেবে—তা ব্যাখ্যা করাও পেশাগত আনুগত্যের অংশ। সরকারকে সেই পরামর্শ গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করে বিকল্প ব্যবস্থা বিবেচনা করতে হবে। দায়িত্বশীল বেসামরিক নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রয়োজন তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত এবং সামরিক সক্ষমতার সুচিন্তিত ব্যবহার।

দেশের প্রয়োজন কার্যকর আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা এবং পেশাগতভাবে প্রস্তুত সেনাবাহিনী। দুটি লক্ষ্য একসঙ্গে অর্জন করতে হবে। প্রায় দুই বছর ব্যতিক্রমী দায়িত্ব পালনের পর অগ্রাধিকার হওয়া উচিত বেসামরিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করা এবং সামরিক ইউনিটগুলোকে সক্ষমতা পুনরুদ্ধারের প্রয়োজনীয় সময় ও সম্পদ দেওয়া। সরকারের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের ঘাটতির স্থায়ী সমাধান হিসেবে সেনাবাহিনীকে ব্যবহার করা উচিত নয়। প্রতিষ্ঠানের ওপর যে দীর্ঘ চাপ পড়েছে, তা জরুরি ও সৎ পর্যালোচনার যথেষ্ট কারণ। সরকার ও সেনাবাহিনীর নেতৃত্বকে সক্ষমতা পুনরুদ্ধারকে জাতীয় নিরাপত্তার প্রয়োজন হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। প্রশিক্ষণ, শৃঙ্খলা, নৈতিক মান, মনোবল ও জনআস্থা রক্ষা করা বাংলাদেশের নিরাপত্তা রক্ষারই অংশ। এখনকার সিদ্ধান্তগুলো এমন হতে হবে, যাতে প্রতিরক্ষার জন্য জাতি যখন সত্যিই সেনাবাহিনীকে প্রয়োজন মনে করবে, তখন একটি ঐক্যবদ্ধ, পর্যাপ্ত বিশ্রামপ্রাপ্ত, সুপ্রশিক্ষিত ও প্রস্তুত বাহিনীকে পায়।

hrmrokan@hotmail.com

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...