রাষ্ট্রবিজ্ঞানে সেফঅলজিক্যাল স্টাডি (Psephological Study) বা নির্বাচন সমীক্ষা নামে একটি বিষয় আছে। এর মাধ্যমে নির্বাচনি আচরণ, রাজনৈতিক দলের প্রচার কৌশল ও নির্বাচনকেন্দ্রিক জনমনসমীক্ষা বিষয়ে অধ্যয়ন ও গবেষণা পরিচালনা করা হয়। উন্নত গণতন্ত্রে বিষয়টি প্রাতিষ্ঠানিকতা লাভ করেছে। বাংলাদেশের মতো অনুন্নত গণতন্ত্রে এ নিয়ে তেমন কোনো আলাপচারিতা নেই। তবে রাজনৈতিক সংস্কৃতি বলতে যা বোঝানো হয়, তার একটি অংশ হিসেবে নির্বাচন সমীক্ষা জনপ্রিয় হয়ে আসছে। অনেকে ভোটাচার বলে নির্বাচন যুদ্ধের গল্পকথা বলতে চান। এ সময় আমরা একটি নির্বাচন যুদ্ধ অতিক্রম করছি। নির্বাচন ক্ষাণিকটা দূরে হলেও নির্বাচনের উত্তাপ উত্তেজনা অনুভব করছি আমরা। ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি যে নির্বাচনটি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, তা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্মাণের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনটি কারণে এটি আমাদের কাছে তাৎপর্যপূর্ণ। প্রথমত, ১৭ বছর পর বাংলাদেশের জনগণ সত্যিকার অর্থে তাদের মতামত জ্ঞাপনের একটি সুযোগ লাভ করেছে। দ্বিতীয়ত, ২০২৪ সালের রক্তাক্ত গণঅভ্যুত্থানের পর জনগণ আকাঙ্ক্ষায় এ নির্বাচনটি ভবিষ্যৎ নির্ধারক হয়ে উঠেছে। তৃতীয়ত, রাজনৈতিক দলগুলো তাদের জনসমর্থনের প্রদর্শনীর জন্য একটি উত্তম প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হয়েছে। আর এসব কিছুর মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে দেশে অবাধ ও নিরঙ্কুশ গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা। পশ্চিমারা এসব দেশের গণতন্ত্রকে ওয়ান ডে ডিমোক্রেসি (One Day Democracy) বলে অভিহিত করে থাকে। একটি নির্দিষ্ট সময়ের পর জনগণ শুধু নির্ধারিত ভোটের দিন তাদের মতামত জ্ঞাপনের তথা গণতন্ত্র অনুশীলনের সুযোগ লাভ করে। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয়, বাংলাদেশের জনগণ বিগত তিনটি নির্বাচনে এই একদিনের গণতন্ত্রও উপভোগ করতে পারেনি। তবে গণতন্ত্রের দৃশ্যমান আনুষ্ঠানিকতা বর্তমান ছিল। পতিত শাসক দলের দ্বিতীয় ব্যক্তিত্ব কাউয়া কাদের নির্বাচনকে খেলা বলে অভিহিত করেছিলেন। খেলাও যদি হয়, তাহলে তো তার কিছু নিয়মকানুন, রীতিনীতি, বিষয়-আশয় অবশিষ্ট থাকে। কিন্তু তারা নির্লজ্জের মতো নির্বাচনকে নির্বাসনে পাঠিয়েছে। পতিত হওয়ার পর তারাই এখন ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক’ নির্বাচনের নামে আওয়ামী অংশগ্রহণের ধোঁয়া তুলছে।
যুদ্ধজয়ের পর শত্রুর অনুপস্থিতিতে একটা অনুকূল পরিবেশ বিরাজ করে। প্রবল পরাক্রমশালী শত্রুকে বিতাড়ন করার পর সেনা সৈন্যরা আয়েশে-আমোদে মেতে ওঠে। ইতিহাসে এ রকম অনেক প্রমাণ আছে যে, সে সুযোগে শত্রু প্রতি-আক্রমণ করেছে এবং জয়ী হয়েছে। বাংলাদেশের ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানকে আসলেই জনযুদ্ধ বলে অভিহিত করা যায়। জনযুদ্ধের যে মিত্র শক্তিগুলো ছিল, যারা একে অন্যের হাতে হাত মিলিয়ে, বুকে বুক মিলিয়ে যুদ্ধের জন্য রক্ত ঢেলে দিয়েছে, বিস্ময়করভাবে আজ তারা একে অন্যের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে দাঁড়িয়েছে। নির্বাচন বা গণতন্ত্রের যুদ্ধে প্রতিযোগিতা, প্রতিদ্বন্দ্বিতা অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু অস্বাভাবিক হচ্ছে এটিকে শত্রুতা মনে করা। শত্রুর বিনাশের জন্য পক্ষ-প্রতিপক্ষ নানা ধরনের ছল-বল ও কলাকৌশল প্রদর্শন করে। ইংরেজি প্রবাদটা এ রকম যে, অ্যানিথিং অ্যান্ড এভরিথিং ইজ ফেয়ার ইন লাভ অ্যান্ড ওয়ার (anything and everything is fair in love and war)। মারি ওড়ি পারি যে কৌশলে। সেটি শত্রুর ভাষা হতে পারে, কিন্তু গণতন্ত্রের ভাষা নয়। গণতন্ত্রের সেই চিরায়ত ডিমোক্রেসি ইফ দ্য পিপল, ফর দ্য পিপল, বাই দ্য পিপল (Democracy if the people for the people by the people) যদি সত্য হয়, তাহলে জনগণের বাইরে অন্যকিছু চিন্তা করার অবকাশ থাকে না। যদি সবকিছু হয় জনগণের জন্য, তাহলে জনগণের অবাধ রায় গ্রহণে আমাদের অসুবিধা কোথায়। অসুবিধা তখনই হয়, যখন শেখ হাসিনার মতো সবাইকে মীরজাফর মনে করা হয়। সে একাই সিরাজউদ্দৌলা আর সবাই বিশ্বাসঘাতকÑএটিতে কোনো গণতন্ত্রের মনোভাব হতে পারে না। ২০২৪ সালের এই রক্তস্রোতের পরও যদি এই মানসিকতা বহাল থাকে, তাহলে দেশের ভবিষ্যৎ গণতন্ত্র নিশ্চয়ই নিরাপদ নয়।
অবশেষে গত ২২ জানুয়ারি থেকে নির্বাচনি প্রচারণা শুরু হয়েছে। প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস যেমনটি আশা করেন, অর্থাৎ উৎসব উৎসব আমেজে নির্বাচনটি অনুষ্ঠিত হবে, জনগণের আশাও তাই। কয়েক দিন ধরে দেশের রাজনৈতিক নেতারা ভোটের লড়াইয়ে লিপ্ত রয়েছেন। ‘টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া রূপসা থেকে পাথরিয়া’ চসে বেড়াচ্ছেন তারা। জনসভা, পথসভা ও ঘরোয়া সভায় ব্যস্ত আছেন তারা। কথার ফুলঝুড়ি ঝরানোর চেষ্টা করছেন তারা। প্রতিশ্রুতির পর প্রতিশ্রুতি, ওয়াদার পর ওয়াদা করে জনতুষ্টিতে ব্যস্ত তারা। এসবই স্বাভাবিক। কিন্তু আমরা দেখছি, প্রতিদ্বন্দ্বী দল, গোষ্ঠী ও ব্যক্তিকে আক্রমণ করে কথা বলছেন তারা। পরস্পরকে ঘায়েল করতে অভিযোগ পাল্টা অভিযোগ তুলছেন তারা। তাদের কোনো কোনো বক্তব্য আক্রমণাত্মকও বলা যায়। গত সপ্তাহের এসব প্রবণতা ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহল বলছে, সামনের দিনগুলোয় আক্রমণের প্রবণতা আরো প্রবল হতে পারে। আগে যে দুই দল ছিল একে অপরের মিত্র, তারা এখন একে অপরের বিরুদ্ধে শত্রুর মতো কথা বলছে। সেই শত্রুরা তাদের যে ভাষায়, যে বিষয়ে, যে কৌশলে আক্রমণ করতÑতারাও সেভাবে করছে। অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের সঙ্গে সঙ্গে বহিঃস্থ দ্বন্দ্বও পরিলক্ষিত হচ্ছে। যে ফ্যাসিবাদ পরাজিত করেছেন তারা, নিজেরাই এখন একে অপরকে ‘নব্য ফ্যাসিবা’ বলে অভিহিত করছেন। মুক্তিযুদ্ধ এখন আর কোনো বিরোধের বিষয় হতে পারে না। ধর্ম কোনো বিভেদের কারণ হতে পারে না। সুশাসন কোনো প্রশ্নস্বাপেক্ষ বিষয় নয়। অথচ এসব ঘিরেই দুপক্ষের বাগযুদ্ধ দেখছে এ দেশের মানুষ। ‘শতফুল ফুটতে দেওয়া’ই হচ্ছে বহুদলীয় গণতন্ত্র। প্রতিটি দলই পৃথকভাবে তাদের রাজনৈতিক ও আদর্শগত কর্মসূচি ধারণ করে। সুতরাং তাদের রাজনৈতিক কর্মসূচি, আদর্শগত অবস্থান ও নির্বাচন প্রতিশ্রুতি হবে ভিন্ন ভিন্ন। জনগণকে কনভিন্স করানোর জন্য তারা নানা প্রতিশ্রুতি দেবেন, কৌশল অবলম্বন করবেন এবং পরিকল্পনার কথা বলবেনÑসবই সুন্দর, কিন্তু অসুন্দর হলো সংঘাত। ইতোমধ্যে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সংঘাত-সন্ত্রাস ও সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। সবাই উদ্বীগ্ন এসব যেন সীমালঙ্ঘন না করে। সেখানে সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হচ্ছে রাজনৈতিক নেতৃত্বের। স্থানীয়ভাবে রাজনৈতিক সৎভাব ও সুসম্পর্ক বজায় রাখার দায়িত্ব স্থানীয় নেতৃত্বের। আর কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের দায়িত্ব হলো তার কথা ও কাজের মাধ্যমে সংঘাত ও শত্রুতা যেন সারা দেশে ছড়িয়ে না পড়ে। নেতৃত্বের এসব সংঘাতের মধ্যেও আমরা নেতা নেত্রীদের থেকে ভালো কথাও শুনছি, এটা অস্বীকার করা যাবে না। তারা নেতাকর্মীদের সুন্দর শোভন আচরণের পরামর্শ দিচ্ছেন। মানুষের স্বভাব হচ্ছে খারাপটাকে সহজে গ্রহণ করা। তাই নেতাদের ভালো কথায় কাজ হয় না। মন্দ কথার ইঙ্গিতে তোলপাড় হয়ে যায়।
নির্বাচনব্যবস্থা গণতন্ত্রের একটি বড় নির্ধারক। রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা গণতন্ত্রের অনেক দোষাবলি ও সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও এর অনুকূলে মতামত দেন এই জন্য যে, জনগণের মতামতের ভিত্তিতে এটি পরিচালিত হয়। গণতন্ত্র শুধু একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থাই (পলিটিক্যাল সিস্টেম) নয়, বরং গণতন্ত্র হচ্ছে একটি জীবন পদ্ধতি (আ ওয়ে অব লাইফ)। গণতন্ত্র তথা নির্বাচন সফল করতে হলে আমাদের অবশ্যই গণতন্ত্রের ভালো দিকগুলো চর্চা করতে হবে। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও পরিচর্যার বিষয়। তাৎক্ষণিকভাবে নির্বাচন অবাধ, নিরপেক্ষ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য করার জন্য গণতন্ত্রের যে বিষয়াবলি ধারণ করা আমাদের কর্তব্য, তা হচ্ছেÑ১. সহিষ্ণুতা : নির্বাচন মুহূর্তে সহিষ্ণুতা হচ্ছে প্রথম ও প্রধান শর্ত। মানুষ স্বভাবতই প্রশংসা প্রশস্তি শুনতে চায়। সমালোচনাকে কেউ সহজে সহ্য করতে পারে না। অথচ নির্বাচন সফল ও সার্থক করতে হলে অন্যের মতকে অবশ্যই সহ্য করতে হবে। এই গুণটি ব্যক্তি থেকে গোষ্ঠী তথা দল পর্যন্ত প্রসারিত। দল বা দলীয় নেতা যদি কর্মীদের সহিষ্ণু হওয়ার শিক্ষা না দেন, তাহলে কর্মী সাধারণরা যুক্তির বদলে শক্তির অনুশীলন করেন। আওয়ামী লীগের মতো রাজনৈতিক দলের প্রথম থেকেই দুর্নাম ছিল যে, তারা যুক্তিতে মুক্তি খোঁজে না, বরং শক্তিতে মুক্তি খোঁজে। আর এটাই ফ্যাসিবাদী প্রবণতা। ফ্যাসিবাদ কোনো বায়োবীয় বিষয় নয়। এটি হচ্ছে আচার-আচরণ ও কথাবার্তা চালচলনে অসহিষ্ণু অবস্থা। ২. সহমর্মিতা : সহমর্মিতা হলো অন্যের দুঃখ, কষ্ট বা পরিস্থিতি বোঝার এবং সেই অনুযায়ী সহানুভূতি প্রদর্শনের ক্ষমতা। নির্বাচন বা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় সহমর্মিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রার্থী, রাজনৈতিক দল এবং নাগরিকসেবার জন্য এটি প্রযোজ্য। একজন প্রার্থী যদি ভোটারদের সমস্যার প্রতি সহমর্মী না হন, তাদের বাস্তব অভিজ্ঞতা বোঝার চেষ্টা না করেন, তাহলে ভোট প্রক্রিয়ায় জনগণের আস্থা সৃষ্টি সম্ভব নয়। সহমর্মিতা মানুষকে ন্যায়পরায়ণ সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে এবং রাজনৈতিক সহমত ও সমঝোতার পরিবেশ গড়ে তোলে। নির্বাচনি প্রতিদ্বন্দ্বী বা দলের মধ্যে সহমর্মিতা থাকলে সংবেদনশীল বিষয়গুলো নিয়ে অযথা দ্বন্দ্ব বা সংঘাতও কমে। নির্বাচন শান্তিপূর্ণ ও স্বাভাবিক করার জন্য আমাদের জনগণকে আরো যেসব গুণাবলির দিকে নজর দিতে হবে তা হলোÑ৩. ন্যায়পরায়ণতা : নির্বাচন গ্রহণযোগ্য ও অবাধ করতে হলে ন্যায়পরায়ণতা অপরিহার্য। ভোটার, প্রার্থী এবং রাজনৈতিক দলÑসবাইকে ন্যায়পরায়ণ হতে হবে। ভোট গণনা, প্রার্থী যাচাই, নির্বাচন কমিশনের কার্যক্রমÑসবকিছুতে ন্যায়পরায়ণতা নিশ্চিত করতে হবে। ন্যায়পরায়ণতা মানুষকে আস্থা দেয়, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখে এবং দীর্ঘ মেয়াদে গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করে। ৪. নৈতিক দায়িত্ববোধ : নির্বাচনি প্রক্রিয়ায় নৈতিকতা অপরিহার্য। ভোটার হিসেবে দায়িত্ব পালন, সৎ আচরণ এবং প্রতিশ্রুতিবদ্ধ প্রচারণা এই নৈতিক দায়িত্ববোধের অংশ। যখন নাগরিকরা নৈতিকভাবে সচেতন হয়, তখন প্রার্থী ও দলও নৈতিকভাবে পরিচালিত হয়। এটি দীর্ঘ মেয়াদে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিকে সুসংহত করে। ৫. সক্রিয় নাগরিক অংশগ্রহণ : গণতন্ত্র শুধু ভোট দেওয়ার মাধ্যমে নয়, সক্রিয় নাগরিক অংশগ্রহণের মাধ্যমে শক্তিশালী হয়। জনসচেতনতা বৃদ্ধি, রাজনৈতিক আলোচনা, ভোট প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণÑএসব কর্মকাণ্ড ভোটারদের রাজনৈতিক শিক্ষার অংশ এবং নীতি প্রণয়নের প্রভাব বিস্তারের মাধ্যম।
অতএব, আসন্ন নির্বাচন কেন্দ্র করে যে উত্তাপ ও উত্তেজনার আবহ দেশে ছড়িয়ে পড়েছে, তাকে যদি আমরা নিয়ন্ত্রণ করতে না পারি, তাহলে তা গণতান্ত্রিক অভিযাত্রাকে বিপন্ন করে তুলতে পারে। গণতন্ত্র প্রতিযোগিতার নাম বটে, কিন্তু সেই প্রতিযোগিতা যদি শত্রুতায় রূপ নেয়, যদি রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা ঘৃণা ও প্রতিশোধপরায়ণতায় পর্যবসিত হয়, তাহলে তার পরিণতি কখনোই শুভ হয় না। ইতিহাস আমাদের শিখিয়েছে যে সমাজ সংযম হারায়, সে সমাজ শেষ পর্যন্ত নিজের অর্জনকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলে। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অভিজ্ঞতাও আমাদের সেই শিক্ষাই দেয়।
গণতন্ত্র শুধু ব্যালট বাক্সের ভেতরে সীমাবদ্ধ নয়; এটি মানুষের আচরণে, কথাবার্তায়, রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধে প্রতিফলিত হয়। জনগণের রায়কে মেনে নেওয়ার মানসিকতা, বিরুদ্ধ মতকে সহ্য করার ক্ষমতা, প্রতিদ্বন্দ্বীর মানবিক মর্যাদা স্বীকার করা এসবই গণতন্ত্রের মৌলিক ভিত্তি। নির্বাচন উৎসবমুখর ও অর্থবহ করতে হলে রাজনৈতিক দল, নেতৃত্ব এবং নাগরিক সমাজÑসবাইকে এই মূল্যবোধ ধারণ করতে হবে। উত্তেজনার বদলে সহিষ্ণুতা, আক্রমণের বদলে যুক্তি, বিদ্বেষের বদলে সহমর্মিতা যদি আমাদের রাজনৈতিক চর্চায় স্থান পায়, তবেই গণতন্ত্র সত্যিকার অর্থে শক্ত ভিত পাবে।
একটি রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থানের পর জাতি আজ যে সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, সেখানে দায়িত্ব আরো বেশি। বিজয়ের উচ্ছ্বাস যেন আত্মতুষ্টিতে পরিণত না হয়, প্রতিপক্ষকে নিশ্চিহ্ন করার আকাঙ্ক্ষা যেন নতুন করে বিভাজনের রাজনীতি জন্ম না দেয় সে বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। রাজনৈতিক শক্তিগুলোর পারস্পরিক সম্পর্ক যদি বৈরিতার পথে এগিয়ে যায়, তবে ক্ষতবিক্ষত হবে শুধু দল নয়, পুরো রাষ্ট্রকাঠামোই। সেজন্যই এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সংযম, বিচক্ষণতা এবং দূরদর্শী নেতৃত্ব।
এই নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণ যে তাদের মতামত প্রকাশের ঐতিহাসিক সুযোগ পেয়েছে, সেটিকে হালকাভাবে নেওয়ার অবকাশ নেই। জনগণের রায়ই শেষ কথা এই সত্যকে হৃদয়ে ধারণ করাই হচ্ছে গণতন্ত্রের আসল পরীক্ষা। যে দল জিতবে তাকে বিনয়ী হতে হবে আর যে দল হারবে, তাকে সাংবিধানিক ও শান্তিপূর্ণ পথে বিরোধিতার ভূমিকা পালন করতে হবে। ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়Ñএই উপলব্ধিই একটি পরিপক্ব গণতান্ত্রিক সমাজের পরিচয় বহন করে।
সবশেষে বলা যায়, বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে আজকের রাজনৈতিক আচরণ ও নাগরিক মনোভাবের ওপর। উত্তাপ-উত্তেজনার রাজনীতি থেকে সরে এসে যদি আমরা সহিষ্ণুতা-সহমর্মিতার রাজনীতির পথে হাঁটতে পারি, তবে এই নির্বাচন শুধু একটি সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনের ঘটনাই হবে না এটি হয়ে উঠবে জাতীয় পুনর্গঠনের একটি মাইলফলক। গণতন্ত্রকে বাঁচাতে হলে আমাদের সবাইকে নেতা, কর্মী ও সাধারণ নাগরিককে একযোগে সেই সংস্কৃতি নির্মাণ করতে হবে, যেখানে প্রতিযোগিতা থাকবে, কিন্তু ঘৃণা থাকবে না; মতভেদ থাকবে, কিন্তু সহিংসতা থাকবে না; লড়াই থাকবে, কিন্তু তা হবে যুক্তি ও আদর্শের-শত্রুতার নয়।
লেখক: রাজনীতি বিশ্লেষক, সাবেক অধ্যাপক, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

