তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন যে সরকারটি গঠিত হয়েছে, তা প্রায় দেড় যুগের এক ফ্যাসিস্ট শাসনের নানা কলঙ্ক ও কুফলযুক্ত উত্তরাধিকার বহন করছে। ২০০৮-এর নির্বাচনটি ছিল আরেক কলঙ্কিত ‘১/১১’-এর ফসল। ওই নির্বাচনটি কেমনভাবে পাতানো ছিল, তা তখনই অর্থাৎ তাৎক্ষণিক বুঝতে পারেননি দেশের মানুষ। এরপর ২০২৪-এর ৫ আগস্ট, যাকে ৩৬ জুলাই হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়, নতুন আরেকটি শাসনকাল অর্থাৎ অন্তর্বর্তী সরকার পেয়েছিল বাংলাদেশ। এই পরিস্থিতিতে ‘সুপার মেজরিটি’ নিয়ে নতুন সরকারটির সামনের চ্যালেঞ্জগুলো সম্পর্কে আলোচনা করা প্রয়োজন। সঙ্গে সঙ্গে ওই বিষয়গুলোও আলোচনা করা জরুরি যে, কি নির্বাচনি অঙ্গীকার এবং অঙ্গীকারের আড়ালে কি প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল নির্বাচনের আগে।
বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দুটি বিষয়কে দেখা যায়, এক. ফ্যাসিস্ট আমলের আইনশৃঙ্খলা, আর্থিকসহ সামগ্রিক জঞ্জাল, দুই. নির্বাচনে দেওয়া অঙ্গীকার ও প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন। এর বাইরেও এ দলের বড় বড় নেতা কে কী বলেছেন নির্বাচন সামনে রেখে এবং নিষিদ্ধ দলকে কোন কোন শর্তে নির্বাচনে ভোট পাওয়ার গুপ্ত বা লুকানো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডও এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হবে নিরীক্ষা ও পর্যালোচনার স্বার্থে। কারণ বাংলাদেশের মতো প্রান্তিকসীমার বা স্বল্পমাত্রার গণতান্ত্রিক দেশে ‘গোপন রাজনৈতিক সমন্বয় বা জোটবদ্ধতাও’ গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে চিহ্নিত করতে হবে। কারণ ক্ষমতাসীনতার তত্ত্ব অনুযায়ী এসব বিষয় একে একে সামনে আসবে ভবিষ্যতের দিনগুলোয়।
বাংলাদেশের গণতন্ত্র এবং এর সরকারটিকে সবসময় ‘রোলার কোস্টারের’ (বিনোদন পার্কের জনপ্রিয় উঁচু-নিচু, খাড়া, বাঁকা পথের রোমাঞ্চকর যাত্রার) চড়ে থাকতে হয়। তবে এটা মোটেই রোমাঞ্চকর তো নয়ই; বরং উল্টো এবং প্রায়ই বিপজ্জনক ও প্রতিনিয়ত পরীক্ষার মুখোমুখি হওয়ার।
এমতাবস্থায় ‘সুপার মেজরিটি’, যাকে অনেকে বিশেষ মাত্রার সংখ্যাগরিষ্ঠতা বলে উল্লেখ করেন, তা কতটা আশীর্বাদ, সে বিষয়টিকে বিবেচনায় নিতে হবে। এই সুপার মেজরিটি অটোমেটিক বা সহজাতভাবে অসম রাজনৈতিক খেলার মাঠে পরিণত করে দেয়। অথবা নিজেরা তেমনটা করে ফেলে। আর এখানে জবাবদিহিবিহীন স্বচ্ছতাহীন পরিবেশ তৈরি করে দিতে পারে, যা নেতার ইচ্ছায় কর্ম বা সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রলুব্ধ করবে। এখানে আমি, আমার এক বা একবাদিতা বা ক্ষমতার সার্বিক ‘পুঞ্জীভবন’ গড়ে উঠতে পারে এর হাতছানিও থাকবে সবসময়। কিন্তু কোনোক্রমেই ওই পথে বা ফাঁদে পা দেওয়া উচিত হবে না। সঠিক মাত্রার বা মোটামুটি গণতন্ত্রে ব্যক্তি রাষ্ট্রের চেয়ে বড় নয়। এখানে ‘আমাদের’ অর্থাৎ ‘একক বনাম সবার’Ñএই দ্বন্দ্বের পথকেও প্রসারিত করে। সুপার মেজরিটি বা অতিসংখ্যাগরিষ্ঠতার ফলে গণতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ, ভারসাম্য রক্ষার জন্য বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। সঠিক এবং ক্যারিসম্যাটিক নেতৃত্ব ছাড়া এ পথ থেকে নিস্তার পাওয়া খুবই কঠিন।
এ কথা মনে রাখা প্রয়োজন, সুপার মেজরিটির বা অতিসংখ্যাগরিষ্ঠতার ঠিক অত্যন্ত কাছাকাছি অবস্থান করে একনায়কতান্ত্রিক শাসন। সিদ্ধান্তে ভুল হলেই মহাবিপদ।
এখন কথা উঠতে পারে, জনগণ চেয়েছে তাই। এখানে জনগণকে এ জন্য সাধুবাদ। এতকালের ফ্যাসিস্ট শাসনের পর জনগণের আকাঙ্ক্ষা নিশ্চয়ই এবং অবশ্যই আকাশচুম্বী থাকবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু বিপত্তিটা হচ্ছে এখানে যে, আশাবাদ এবং প্রাপ্যতার বিস্তর ফারাক বলে দুর্বিপাক বা অনাকাঙ্ক্ষিত ব্যবস্থা ঘটতে বাধ্য। এমনিতেই রাজনীতি বিজ্ঞানে দুটো কথা আছেÑএক. বিজয়ী সবটুকু কেড়ে নেয় (Winner takes all), দুই. রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ নির্মূল বা বিনাশ (Political elemination) উদ্যোগ। নির্মূল বা বিনাশ উদ্যোগ এবং এর কিছু বাস্তবায়ন ইতোমধ্যেই বিদ্যমান। এই নির্মূল বা বিনাশ উদ্যোগকে কেন্দ্র থেকে বাধা দিলেও তা থামানো কঠিন হলেও থামাতে হবে, না পারাটা বিপজ্জনক।
কঠিন এই কারণে যে, এক শ্রেণির মানুষ আছেন, তারা চাটুকার। এদের বিদ্যমানতা সব সরকারের বা আমলে। ১৪০০ শতকে নিকোলো ম্যাকিয়াভেলি বলেছেন, ‘চাটুকারদের অবস্থান ব্যাপক ও বিস্তৃত। শাসক যদি বিচক্ষণ দূরদৃষ্টিসম্পন্ন না হন, তাহলে তিনি চাটুকারদের হাতে সহজেই ঘায়েল হতে পারেন। ম্যাকিয়াভেলি চাটুকারদের অত্যন্ত নিম্নমানের বলে মন্তব্য করেছেন। নিকোলো ম্যাকিয়াভেলি, দ্য প্রিনস, (বাংলা অনুবাদ), মুক্তচিন্তা প্রকাশনী, পৃষ্ঠা : ৯৪)
সুপার মেজরিটিতে আরো যেসব বিপজ্জনক প্রবণতা এই সরকারকে মোকাবিলা করতে হতে পারে, তা হচ্ছেÑরাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ওপরে বিজয়ীর হস্তক্ষেপ, আইন ও বিচার বিভাগকে ব্যবহার করে প্রতিপক্ষকে হয়রানি, কেন্দ্রীয় এবং স্থানীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের মতামতকে উপেক্ষা করা। সবচেয়ে বেশি বিপজ্জনক যে বিষয়টি হচ্ছে, কেন্দ্রীয় পর্যায়ে নিয়ন্ত্রণ করা না হলে ‘ক্ষমতাসীনদের প্রতি ভয়ের বা ভীতির মনোভাব সৃষ্টি হতে পারে’। বাংলাদেশে এই প্রবণতা নতুন কিছু নয়।
বাংলাদেশের মতো স্বল্পমাত্রার বা গণতন্ত্রের প্রান্তিকীকরণের পরিস্থিতিতে এক-একজন সংসদ সদস্য বা এমপি একেকটি ‘পাওয়ার সেন্টার,’ যাকে ক্ষমতার আধা আনুষ্ঠানিক ক্ষমতার কেন্দ্র (Semi power centres of power) হিসেবে গণ্য করা যায়। তবে প্রত্যেক সংসদ সদস্যের ক্ষমতার আনুষ্ঠানিক কেন্দ্রের (Formal centres of power) কার্যক্রমকে সামাল দেওয়ার মতো কার্যকর ব্যবস্থা ক্ষমতাসীন বিএনপির আছে কি না, না থাকলে এখনই কর্মকৌশল নির্ধারণ করতে হবে। এর বাইরেও অসংখ্য ক্ষমতার অনানুষ্ঠানিক কেন্দ্র (Informal centres of power) গড়ে উঠেছে এবং ভবিষ্যতে আরো উঠবে। এসব ক্ষমতার কেন্দ্রের কার্যক্রম কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হবে, তা নিশ্চিত করতে হবে।
এই লেখার এই পর্বে সরকারের অর্থনৈতিক, আইনশৃঙ্খলাসহ অন্যান্য বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনায় যাব না। ভবিষ্যতে সেসব বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনার জোর ইচ্ছা রইল। এ লেখাটিতে নতুন সরকারের অন্তর্গত এবং বহিরাঙ্গের রাজনৈতিক যেসব সমস্যাবলি সামনে আসতে পারে, সেসব দিকেই নজর দিতে চাই ।
ভোটভীতি সিন্ড্রোম
২০২৬-এর ফেব্রুয়ারির নির্বাচন বিবেচনায় রেখে আরেকটি বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন। ২০০৮-এর পাতানো নির্বাচন, ২০১৪, ২০১৮, ২০২৪-এর জোরজবরদস্তি চাপিয়ে দেওয়া নির্বাচনÑবাংলাদেশের জনমনে ভোটভীতি সিন্ড্রোম তৈরি করেছে। ভোটভয় বা ভীতি সিন্ড্রোম হচ্ছেÑভোট প্রদানকে বা এর সঠিক ফলপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে মানুষের অর্থাৎ ভোটারদের মনে এবং তাদের মধ্যে তৈরি হওয়া মানসিক উদ্বেগ, আতঙ্ক, অনিশ্চয়তা, সহিংসতার মনস্তত্ত্ব এবং সঙ্গে সঙ্গে ভোটের ফল বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি দেখতে না পাওয়া। এটি রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, সহিংসতা বা ভোট প্রদানের ভীতি তৈরি করে এবং এমন পরিস্থিতি গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে তীব্র অবিশ্বাসের কারণে পুরো জনগণের মধ্যে সৃষ্ট মনস্তাত্ত্বিক ভীতিপ্রদ পরিস্থিতির জন্ম দেয়। এটিও গণতন্ত্র সবল সজীব করার বদলে রাজনীতির নামে পেশিশক্তি, ফলাফল নিজের মতো তৈরি করাÑসর্বোপরি পুরো রাষ্ট্রযন্ত্রের কাছে মূল যে শক্তি, অর্থাৎ জনগণ তীব্র অসহায়ত্ববোধে আচ্ছন্ন হয়। আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষে Kirk Waldorf-এর নেতৃত্বে একদল মনস্তত্ত্ববিদ এশীয় দেশগুলোর ওপরে দীর্ঘ সমীক্ষা শেষে এই সিদ্ধান্তমূলক তত্ত্বে পৌঁছালো যে, এমন পরিস্থিতি নির্বাচনি সংস্কৃতি অর্থাৎ গণতন্ত্রের জন্য মারাত্মক বিপজ্জনক।
ব্যবসায়ীদের উত্থান
বাংলাদেশের নির্বাচনের ইতিহাস পর্যালোচনায় একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে গেছে যে, রাজনীতি আর সাধারণ মানুষের হাতে নেই। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে যেখানে আইনজীবী, শিক্ষকসহ মোটামুটি মধ্যবিত্তের মধ্যে ছিল, তা এখন ধনিক শ্রেণি এবং অভিজাতদের হাতে ও ব্যবসায়ীদের হাতে চলে গেছে। ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪-এর ফ্যাসিস্ট সরকারের সময়ে ব্যবসায়ীদের সংসদ সদস্য হওয়ার হার যথাক্রমে ৫৯ শতাংশ, ৬২ শতাংশ এবং ৬৭ শতাংশ ছিল, তাকে ব্যতিক্রম হিসেবে দেখা যেতে পারে। ২০০৮-এর বিশেষ কারসাজির নির্বাচনেও ছিল ৫৭ শতাংশ। ১৯৭৩-এর নির্বাচনে পূর্ণমাত্রার ব্যবসায়ী ছিলেন ১৩ শতাংশ অর্থাৎ ছোট ও মাঝারি সব মিলিয়ে ১৮ শতাংশ। ১৯৭৯ সালে ছিল ৩৪ শতাংশ, ১৯৯১ ছিল ৩৮ শতাংশ, ৯৬-এ ৪২ দশমিক ৫ শতাংশ, ২০০১-এ ৫৮ শতাংশ। ২০২৬-এ ৫৯ শতাংশ। এই নির্বাচনে ১৭৪ জন ব্যবসায়ী নির্বাচিত হয়েছেন এবং এর মধ্যে বিএনপির ১৪৫ জন, ৬৮ জন জামায়াত বিজয়ীর মধ্যে ২০ জন ব্যবসায়ী। আর এনসিপির দুজন। এসব তথ্য টিআইবিসহ বিভিন্ন সূত্রে প্রাপ্ত। টিআইবি নির্বাচনের আগে যে তথ্য দিয়েছিল, তাতে দেখা যায়, বিএনপির ৫৯ দশমিক ৪১ শতাংশ প্রার্থী ঋণগ্রস্ত অর্থাৎ রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নিয়েছেন। অর্থাৎ যেসব ব্যক্তি প্রার্থী হওয়ার জন্য মনোনয়ন পেয়েছেন, তাদের মধ্যে ঋণখেলাপি বা ঋণগ্রহীতাদের কাছে বিভিন্ন সংস্থা বা ব্যাংকের অর্থাৎ রাষ্ট্রের মোট পাওনা ১৭ হাজার ৪৭১ কোটি টাকা।
২০২৬-এর ৬ জানুয়ারি দৈনিক সমকাল যে তথ্য দিয়েছে, তাতে বিএনপির ১৭০ জন ব্যবসায়ী নির্বাচনে কোটিপতি ২২৩ জন প্রার্থী নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন। এর মধ্যে বিএনপিতে শতকোটি টাকার ঊর্ধ্বে রয়েছে সাতজন। সবচেয়ে বেশি সম্পদ রয়েছে বিএনপির আবদুল আউয়াল মিন্টুর এবং তার স্ত্রীর স্থাবর, অস্থাবর মিলিয়ে সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৬১২ কোটি টাকা।
এখানে মনে রাখতে হবে, এই তথ্য যতটা কমিয়ে বলা যায়, এর ভিত্তিতেই প্রার্থীরা তথ্য দেন এবং এটা প্রমাণিত সত্য। কাজেই বিএনপি এখন কোটিপতিদের দলে পরিণত হয়েছে এবং জাতীয় সংসদটিও আর সাধারণ মানুষের জন্য কোটিপতি অভিজাত শ্রেণির দখলে। কাজেই এক কথায় এ কথাটি বলা চলে যে, নতুন সরকারকে এই ধনিক শ্রেণির ‘ডিকটেশন বা হুকুম’ ‘ডিজায়ার বা ইচ্ছা ও আকাঙ্ক্ষাকে’ প্রাধান্য সীমিত করতে হবে। এ কথাটি বলতে হবেই যে, সাধারণ মানুষের ঐক্য থাকুক বা না থাকুক, ধনিক ও অভিজাত শ্রেণির অদৃশ্য এক বন্ধন এবং ঐক্য থাকে। এ ক্ষেত্রে নিকোলো ম্যাকিয়াভেলি বলেন, অভিজাত শ্রেণির শাসকদের চারপাশে সবসময় তার সমান বা সহমত ও মতামত প্রকাশকারী মানুষ ঘিরে থাকে। যে কারণে তাদের নিয়ন্ত্রণে রাখা কিংবা পক্ষে আনা কঠিন হয়ে পড়ে।
এ অবস্থায় সুপার মেজরিটি অথবা বিপুল ব্যবধানের বা একচেটিয়া জয়প্রাপ্ত দলটির ক্ষেত্রে ক্ষমতার প্রকৃত প্রতিযোগিতার পরিবর্তে শুধু বৈধতা অর্জনের আচার বা আনুষ্ঠানিকতা হিসেবে ক্ষমতাকে ব্যবহার করার প্রবণতা কাজ করতে পারে। এটা যে এ দেশে হয়নি বা এমন উদাহরণ নেই, তা নয়। স্বাভাবিক যে প্রবণতা থাকে, তাতে সুপার মেজরিটিকে কাজে লাগিয়ে প্রতিযোগিতামূলক ব্যবস্থার পরিবর্তে একদলীয় কেন্দ্রিকতার ব্যবস্থায় চলে যাওয়ার নজির রয়েছে। সে সম্পর্কে তারেক রহমানকে সজাগ থাকতে হবে। আর তা না হলে বিরোধীদলীয় বাস্তবতায় থাকে বটে কিন্তু কোনো কার্যকারিতা থাকে না। এতে কার্যত গণতন্ত্র বিপন্ন হয়। এটা উত্তরণের জন্য প্রয়োজন যোগ্য, প্রজ্ঞাবান নেতৃত্বের। বিষয়টি তিনি ও তার দল ভেবে দেখবেন।
অতি শক্তিশালী বনাম দুর্বলের সম্পর্ক
এমন পরিস্থিতিতে প্রয়োজন অন্তর্ভুক্তিমূলক (ইনক্লুসিভ) ব্যবস্থার মাধ্যমে বিরোধী দলকে অগ্রাধিকার দিয়ে কার্যকর পার্লামেন্ট প্রতিষ্ঠা এবং এর ক্ষেত্র প্রস্তুত করা। এ কথা মনে রাখতে হবে যে, নতুবা রাজনৈতিক অঙ্গন হবে সবল বনাম দুর্বলের। নির্বাচন অন্তর্ভুক্তিমূলক হলো কি নাÑতা আসল বিষয় নয়। পার্লামেন্টে বা জাতীয় সংসদে এই ব্যবস্থা হতে হবে এবং তা জরুরি। এখানে রাজনৈতিক বিনাশ মানসিকতায় হীতে বিপরীত হতে বাধ্য। রাজনীতি বিজ্ঞানে একটি কথা চালু আছে, যাকে বলা হয়, Patron-Client অর্থাৎ শক্তিশালী পৃষ্ঠপোষক পক্ষ এবং নিম্নমর্যাদার পক্ষ। এদের সম্পর্কটা হয় এমন যে, নিম্নমর্যাদার পক্ষ শুধু আনুষ্ঠানিকতায়, লোকদেখানো এবং প্রতিদানের মানসিকতায় বিদ্যমান থাকে। অথচ একটি বিরোধী দল বা পক্ষ যত ছোট বা দুর্বল হোক না কেন, তাকে মূল ধারা এবং প্রক্রিয়ায় শামিল করতে হবে। একটি স্থায়ী সুসম্পর্ক, সংহতি এবং আনুষ্ঠানিক কাঠামোগত ব্যবস্থায় নিয়ে আসতে হবে। মনে রাখতে হবে, তারাও একটি বিশাল জনগোষ্ঠীর ভোট পেয়ে এসেছেন। জাতীয় নীতিকৌশল, আন্তর্জাতিক সম্পর্কবিষয়ক যেকোনো চুক্তি কিংবা যেকোনো দুর্যোগ, সংকট মোকাবিলায় একসঙ্গে কাজ করতে পারার নাম ‘জাতীয় ঐক্য’। আশা করি, বর্তমান জাতীয় সংসদে এ রকমটি হবে না। যদিও জুলাই সনদে এর যৎসামান্য অগ্রগতি হয়েছে। মনে রাখতে হবে, বিরোধী দল নয়, পারস্পরিক সুসম্পর্ক থাকবে, যাতে থাকবে ঐকতান, সমন্বয় এবং মিলেমিশে কাজ করার সম্পর্ক। যদিও প্রান্তিক বা স্বল্পমাত্রার গণতান্ত্রিক দেশে এটি বিরল। সমালোচনা যেমনই হোক বড় দলের নেতাকে তা গঠনমূলক মানসিকতায় গ্রহণ করতে হবে।
আমলাতন্ত্র
বিদ্যমান আমলাতন্ত্রের সঙ্গে সবসময়ই অভিজাত শাসক এবং শাসকশ্রেণির সুসম্পর্ক বজায় থাকে। অর্থাৎ ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকার হিসেবে আমলাতন্ত্র যে কোনো ঔপনিবেশিক শক্তিশাসিত দেশের বিপদ হিসেবে চিহ্নিত করা চলে। এরা বিদ্যমান কাঠামোর বিপক্ষের শক্তি এবং জোটবদ্ধ। ব্রিটিশ উপনিবেশের তারা ছিল দালাল শ্রেণি। এরপর যত অগণতান্ত্রিক শাসন যেমন : ১৯৫৮-এর আইয়ুবের সামরিক শাসনে তারা ছিল জুনিয়র পার্টনার। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে যতগুলো গণআন্দোলন এবং ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানে তাদের ভূমিকা ছিল নেতিবাচক। ১৯৭০-এ আইয়ুবের পর জেনারেল ইয়াহিয়ার শাসনকে বৈধ করার জন্য যারপরনাই চেষ্টা ছিল তাদের পক্ষ থেকে। ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে স্বল্পসংখ্যক আমলাছাড়া বাকিরা সবাই পাকিস্তান সরকারের চাকরি করেছে আনন্দচিত্তে। এই তারাই আবার ১৯৭২ সালে এসে মিশে যায় মুক্তিযোদ্ধাদের কাতারে। বাংলাদেশে যত অঘটন ঘটেছে, তার বিরোধিতা তো তারা করেইনি, বরং জনগণের বিপক্ষে দাঁড়িয়ে এরশাদের স্বৈরশাসন, ১/১১ এবং ফ্যাসিবাদের সর্বোচ্চ সুবিধাভোগী এই শ্রেণিটি নিজেদের সুপিরিয়র বা ঊর্ধ্বতন শ্রেণি হিসেবে মনে করে থাকে। সবসময় সাধারণ মানুষকে মনে করে অধস্তন।
আমলাদের সম্পর্কে আন্তোনিও গ্রামসির মন্তব্য হচ্ছে, ‘আমলাতন্ত্র সবচেয়ে বিপজ্জনক লুকিয়ে থাকা রক্ষণশীল শক্তি। গণসদস্যদের থেকে নিজেদের স্বাধীন মনে করা আমলাতন্ত্র যদি একটি আঁটসাঁট চক্র গড়ে তুলতে পারে, তাহলে (রাজনৈতিক) দল হয়ে উঠে খাপছাড়া অতীতমুখী। প্রচণ্ড সংকটের সময়ে দল তার সামাজিক বিষয় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। সমস্যাগুলো ছেড়ে যায় মাঝ আকাশে।’ (তথ্য সূত্র : আন্তোনিও গ্রামসি : রাষ্ট্র ও জনসমাজ, গ্রন্থিক প্রকাশনী, নভেম্বর ২০২১, পৃষ্ঠা : ১৯)
সুপার মেজরিটি পাওয়া দলকে বিশেষ করে, আমলাতন্ত্রকে কীভাবে তিনি মোকাবিলা করবেন, সে সম্পর্ক এবং কৌশল কী হবে, দলের প্রধান ও প্রধানমন্ত্রীকে তা ভেবে দেখতে হবে গভীরভাবে। ভেবে দেখতে হবে অন্যসব বিষয়কেও। কারণ ‘বিজয়ের অনেক পিতা, পরাজিত একজন এতিম’।
লেখাটি শেষ করতে চাই জ্য জা রুশোর একটি বিখ্যাত উক্তি দিয়ে। রুশো তার The social contract-এ বলেছেন, জনকল্যাণকর কার্যক্রমের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা আমরা যত সংকীর্ণ মনে করি, ঠিক তা নয়। এই সম্ভাবনা বাধাগ্রস্ত বা সংকীর্ণ হয় আমাদেরই দোষত্রুটি, পক্ষপাতিত্ব এবং আন্তরিকতার কারণে।
লেখক : গবেষক এবং বিশ্লেষক
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

