বাংলাদেশে দুর্নীতিকে অনেকেই ‘চালাকি’র প্রতিভা মনে করে। যখনই কেউ সেই প্রতারণার শেকড়ে আঘাত করে, তখনই গর্জে ওঠে সুবিধাভোগীদের দল। ২০২৫ সালের ১২ মে—এই তারিখটি ইতিহাসে লেখা থাকবে, কারণ সেদিন সরকার এমন এক সিদ্ধান্ত নেয়, যা সত্যিকার অর্থেই দুর্নীতির দুর্গে কাঁপন ধরিয়ে দেয়।
ঘুসের সমুদ্র থেকে বেরিয়ে আসার প্রথম চেষ্টা
আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের শর্ত পূরণে এনবিআরের নীতি ও ব্যবস্থাপনা পৃথক্করণ অধ্যাদেশ জারির উদ্যোগ নেয় সরকার। এনবিআরের খসড়া বদলে কতিপয় প্রশাসন কর্মকর্তা নিজেদের স্বার্থে পরিবর্তন আনেন বলে রাজস্ব ভবনে আলোচনা শুরু হয়। বিষয়টি জানতে পেরে আয়কর ও কাস্টমস কর্মকর্তারা প্রতিবাদ করেন। আংশিক পরিবর্তন করা হলেও সন্তুষ্ট না হয়ে কর্মকর্তারা ঐক্যবদ্ধ হন। এ সময় বিভিন্ন স্বার্থান্বেষী মহল আন্দোলনে ঢুকে পড়লে তা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।
এদিকে দুর্নীতিবিরোধী অভিযানে এনবিআর চেয়ারম্যান বহু কর্মকর্তাকে চাকরিচ্যুত করেন। পদোন্নতিবঞ্চিত ও দুর্নীতিতে যুক্ত কতিপয় কর্মকর্তা আন্দোলনে সক্রিয় হন, চেয়ারম্যানকে অপসারণের দাবিও তোলেন। জুনিয়রদের মধ্যে গুজব ছড়িয়ে তাদের উদ্বিগ্ন করা হয়। অন্যদিকে বড় দুর্নীতিবাজ ব্যবসায়ী ও অর্থপাচারকারীদের বিরুদ্ধে এনবিআর চেয়ারম্যানের জিরো টলারেন্স ও বিপুল অডিট-উদ্ধারে শত শত কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের ফলে একশ্রেণির প্রভাবশালী ব্যবসায়ী ক্ষুব্ধ হন। তারাও এই আন্দোলনকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছেন।
কেন এত ভয়? কারণ এনবিআর আগে নিজেরাই কর নির্ধারণ করত, আবার নিজেরাই তা আদায় করত। আর এই স্ববিরোধী ক্ষমতার মাঝেই ছিল দুর্নীতির স্বর্ণখনি। ১০০ টাকার কর থেকে ২০ টাকা ঘুস দিয়ে ৩০ টাকায় নিষ্কৃতি—বাকি ৭০ টাকা গিলে খেত স্বল্পসংখ্যক সুবিধাভোগী চক্র। এটি শুধু ক্ষতিই করত না, দেশজুড়ে সৎ ব্যবসায়ীদের নিরুৎসাহিত করত এবং বৈধ আয়ের পথকে করাতের নিচে ফেলত।
সুবিধাভোগীদের চিৎকার, রাষ্ট্রের প্রতিবন্ধক
যখন ঘোষণা আসে ‘দুর্নীতি করলে চাকরি থাকবে না,’ তখন যেন নড়ে ওঠে পুরো প্রশাসনিক মহল। সচিবালয় পর্যন্ত আন্দোলনের আওয়াজ ওঠে। এ এক জ্বলন্ত প্রমাণ—যারা চিৎকার করছে, তারা নিজের দোষ ঢাকতে চায়। দুর্নীতির বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হলে শুধু নীতিগত সিদ্ধান্ত নিলেই হয় না, দরকার প্রশাসনিক দৃঢ়তা। আজ যখন সরকার সাহস করে সেই সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তখন জনতার সমর্থনই পারে তা বাস্তবায়ন করতে। এই মুহূর্তে যারা পথে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ করছে, তারা আদতে দেশকে নয়, নিজেদের ‘উপার্জনের’ পথ রক্ষা করতে নেমেছে। রাষ্ট্র যদি পিছিয়ে যায়, তাহলে আবার সেই আগের অন্ধকারেই আমরা ফিরব।
একজন সত্যিকারের যোদ্ধা
বর্তমান এনবিআর চেয়ারম্যান বাস্তবেই দুর্নীতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন। তিনি জানেন, ছোট একটা পরিবর্তনও কীভাবে পুরো ব্যবস্থায় আলোড়ন তোলে। ডিজিটাল পদ্ধতিতে আয়কর রিটার্ন বাধ্যতামূলক করে মাত্র ১০ মাসেই তিনি অতিরিক্ত ৯ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করেছেন। আগে যেখানে রিটার্ন জমা পড়ত মাত্র পাঁচ লাখ, এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৬ দশমিক ৪ লাখে। করদাতারা সার্কেলে না গেলে ঘুসের পথও বন্ধ। আর এই সাফল্যই আজ তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের মঞ্চ তৈরি করেছে। তার বিরুদ্ধে এখন যারা মাঠে নামছে, তারা কেউই সৎ উদ্দেশ্য নিয়ে আসেনি; বরং তারা চায় যেন পুরোনো পদ্ধতির ছত্রছায়ায় আবারও ঘুসের নদীতে ভেসে চলতে পারে। এই মুহূর্তে রাষ্ট্র যদি পিছিয়ে যায়, তাহলে এ যুদ্ধের পরাজয় হবে শুধু এক কর্মকর্তার ক্ষেত্রে, তা নয়; বরং পুরো জনগণের।
এনবিআরের অজ্ঞতায় জাতির ক্ষতি
ডেপুটেশনে দায়িত্ব পালনের সময় আমি নিজের চোখে দেখেছি—কীভাবে অজ্ঞতা, অনাগ্রহ ও দুর্নীতির কারণে বাংলাদেশ সরকার হারিয়েছে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব। ১৯৯৬-৯৭ অর্থবছরে মোবাইল অপারেটর গ্রামীণফোন, রবি (তৎকালীন আকটেল) এবং বাংলালিংক (তৎকালীন শেবা) যখন দেশে বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু করে, তখন সরকার তাদের প্রত্যেককে মাত্র ৯ কোটি টাকা করে লাইসেন্স ফি নির্ধারণ করে। অথচ একই সময়ে পাকিস্তান সরকার তাদের চারটি মোবাইল অপারেটরের কাছ থেকে ১ হাজার ৯০০ কোটি টাকা করে মোট ৭ হাজার ৬০০ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করে। এই ভয়াবহ বৈপরীত্যের পেছনে ছিল আমাদের নীতিনির্ধারকদের চরম অজ্ঞতা ও দুর্নীতিপূর্ণ মনোভাব। সংশ্লিষ্ট টেলি মন্ত্রী, যিনি একই সঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্বেও ছিলেন, তার কাছে এমনকি এই ধারণাটুকুও ছিল না যে, লাইসেন্স ফি নির্ধারণ মানেই রাজস্ব আদায়ের বড় সুযোগ !
যথাযথ উদ্যোগ, আন্তরিকতা ও তুলনামূলক তথ্য বিশ্লেষণ থাকলে বাংলাদেশও পাকিস্তানের মতো ৭ হাজার ৬০০ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করতে পারত, যা ১৯৯৬-৯৭ সালের জাতীয় বাজেটের (২৪ হাজার ৬০৩ কোটি টাকা) একটি বিশাল অংশ ছিল। পরে আমার একটি প্রতিবেদনের ভিত্তিতে তৎকালীন অর্থমন্ত্রী পাকিস্তানের অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং (২০০৪-০৫ সালে) জাতীয় সংসদে স্বীকার করেন, ‘শুধু অজ্ঞতা, উদাসীনতা ও স্বার্থান্বেষীদের কারণে আমরা মোবাইল লাইসেন্স ফি থেকে বিপুল রাজস্ব হারিয়েছি।’ (২০০৫ সালের ৩০ জুন ‘প্রথম আলো’, ‘নয়া দিগন্ত’, ‘দ্য ডেইলি স্টার’-সহ বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত হয়।) এটি শুধুই একটি উদাহরণ নয়, এটি প্রমাণ যে সঠিক পলিসি ও দেশাত্মবোধক জ্ঞান ছাড়া রাষ্ট্র কীভাবে আত্মঘাতী হতে পারে।
দুর্নীতি মানেই সর্বনাশ
জাপানের এক বাসচালক মাত্র সাত ডলার আত্মসাৎ করেছিল বলে তাকে চাকরিচ্যুত করে ৮৪ হাজার ডলার পেনশন কেটে নেওয়া হয়। বার্তাটি ছিল সোজাসাপ্টা—জনস্বার্থে আঘাত মানেই নিজের ভবিষ্যৎ ধ্বংস। আমাদের দেশেও এই নীতি অনুসরণ জরুরি। রাষ্ট্রীয় সম্পদ চুরি মানে দেশের স্কুলে বই পৌঁছায় না, হাসপাতালের ওষুধ শেষ হয়ে যায়, দরিদ্র পরিবার পায় না খাদ্যসাহায্য। দুর্নীতির প্রতিটি টাকাই যেন গরিবের পেটে লাথি।
চূড়ান্ত কথা : পিছিয়ে গেলে জাতি হারবে
আমাদের বহিঃশত্রুরা সরকারকে অস্থিতিশীল করার পাশাপাশি আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোয় বিপর্যয় আনতে চেষ্টা করছে। তাই আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর নীতি বহাল রাখার জন্য শক্তিশালী ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন এবং উপযুক্ত তদন্তের মাধ্যমে খুঁজে বের করা দরকার—কে বা কারা এর পেছনে ইন্ধন জোগাচ্ছে। দুর্নীতিবাজদের ধীরে ধীরে অপসারণ শুরু করার পাশাপাশি জাপানের মতোই দৃষ্টান্ত স্থাপন করার কোনো বিকল্প নেই।
আর যে এনবিআর চেয়ারম্যান দুর্নীতির শেকড় কাঁপাচ্ছেন, তাকেই বরং আরো শক্তিশালী করা উচিত। আর আমরা, জনগণ, যদি এই মুহূর্তে নীরব থাকি, তাহলে ইতিহাস আমাদের ক্ষমা করবে না। রাষ্ট্র যখন দুর্নীতিকে চ্যালেঞ্জ করে, তখন দুর্নীতিবাজেরা চিৎকার করে। কিন্তু আমাদের উত্তর হওয়া উচিত, ‘চিৎকার নয়, সাফাই নয়—রাষ্ট্র আগে, দুর্নীতিবাজেরা পরে।’
লেখক : সাবেক সহকারী নৌবাহিনী প্রধান ও উপ-উপাচার্য, বিইউপি
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

