জুলাই বিপ্লব সংহত করার উপায়

আমিনুল মোহায়মেন

জুলাই বিপ্লব সংহত করার উপায়

জুলাই বিপ্লবকে ঘিরে একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন অনেক দিন ধরেই অনেকের মনে ঘুরপাক খাচ্ছে—এই বিপ্লব কি বেহাত হয়ে গেছে, নাকি ব্যর্থ হয়ে ধীরে ধীরে দেশ আগের অবস্থায় ফিরে যাচ্ছে? অনেকেরই মনে হচ্ছে, যে আকাঙ্ক্ষা ও প্রত্যাশা নিয়ে মানুষ রাজপথে নেমেছিল, জীবন দিয়েছিল, তার অনেকটাই যেন পুরোনো ক্ষমতা কাঠামোর মধ্যে হারিয়ে যাচ্ছে। এর কারণ ও সমাধান খুঁজতে গিয়ে আমরা সাধারণত রাজনীতি, দলীয় প্রতিযোগিতা কিংবা আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতি হাতড়াতে থাকি। এসব বিশ্লেষণ অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বাংলাদেশের দীর্ঘ সামাজিক-রাজনৈতিক ইতিহাস এবং এখানকার পটপরিবর্তনের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য অনেক সময় আলোচনার বাইরে থেকে যায়। অথচ সেই ইতিহাস বুঝতে পারলেই বোঝা যায়, কেন এ দেশে বিপ্লবের শক্তি নিঃশেষ হয় এবং কীভাবে তা দীর্ঘস্থায়ী করা সম্ভব।

বাংলার ইতিহাসের অন্যতম বড় রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ছিল বখতিয়ার খিলজির বাংলা বিজয়। বখতিয়ার খিলজির বাংলা বিজয়ের আগের সমাজবাস্তবতা বিখ্যাত ঔপন্যাসিক শওকত আলীর প্রদোষে প্রাকৃতজন উপন্যাসে অত্যন্ত জীবন্ত করে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। সে সময় সমাজের বিভিন্ন স্তরে অসন্তোষ জমা হচ্ছিল। বিশেষ করে, বৌদ্ধ ও নিম্নবর্ণের মানুষ প্রচণ্ড অত্যাচারের শিকার হচ্ছিল এবং তারা মুক্তির পথ খুঁজছিল। আবার মুসলিম শক্তিগুলো বিভিন্ন স্থানে ঘাঁটি গাড়ছিল, তাদের বাংলা আক্রমণের সম্ভাবনাও শোনা যাচ্ছিল। সে সময় এক ব্রাহ্মণ পণ্ডিত বিষয়টি বুঝতে পেরে তার বাল্যবন্ধু লক্ষ্মণ সেনের এক মন্ত্রীকে জানান। মন্ত্রী নির্বিকারভাবে উত্তর দেন—রাজা বদলাবে, কিন্তু নতুন শাসকদেরও তো দেশ চালাতে পুরোনো অভিজ্ঞ লোকদেরই প্রয়োজন হবে।

বিজ্ঞাপন

উপন্যাসের এ ঘটনাটি একটি গভীর রাজনৈতিক বাস্তবতার দিকে ইঙ্গিত করে। যখন ক্ষমতাবান গোষ্ঠী বুঝতে পারে যে রাজনৈতিক পরিবর্তন অনিবার্য, তখন তাদের একটি অংশ দ্রুত নতুন শক্তির সঙ্গে হাত মেলায়। ফলে শাসক বদলালেও প্রশাসনিক কাঠামো, অর্থনৈতিক প্রভাব, সামাজিক নেটওয়ার্ক এবং ক্ষমতার বহু স্তর প্রায় অপরিবর্তিত থেকে যায়। জনগণ অবাক হয়ে দেখে, লক্ষণ সেন পালিয়ে গেলেও তার আগের মন্ত্রী-পাইক-পেয়াদা অনেকেই ক্ষমতায় রয়ে গেছেন। ইতিহাসে দেখা যায়, বিপ্লবের পর সবচেয়ে দ্রুত অভিযোজিত হন পুরোনো ক্ষমতা কাঠামোর অংশীদাররাই। সুযোগ এলে তারাই আবার পুরোনো ব্যবস্থার পুনরুত্থানের ক্ষেত্র তৈরি করে।

বাংলা অঞ্চলে এই প্রবণতা বেশি দেখা যায়, কেননা, এখানে মানুষের মন পলিমাটির মতো নরম এবং তাতে কোনো দাগই দীর্ঘস্থায়ী হয় না। যে শক্তির বিরুদ্ধে একসময় তীব্র জনরোষ সৃষ্টি হয়, সময়ের ব্যবধানে সেই স্মৃতি অনেকটাই ম্লান হয়ে যায়। সংস্কৃতি, সাহিত্য, নাটক, চলচ্চিত্র এবং গণমাধ্যম যদি নতুন বয়ান নির্মাণ করে, তবে জনমতও দ্রুত বদলে যেতে পারে। বিশেষ করে, দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা কোনো শক্তি যদি সাংস্কৃতিক পরিসরে ব্যাপক বিনিয়োগ করে, তবে তাদের অতীত ভূমিকার মূল্যায়নও সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এখানে মানুষ বাস্তব ঘটনার চেয়ে কল্পনার রঙে আঁকা গল্প-উপন্যাস, নাটক-সিনেমা বেশি বিশ্বাস করে।

তাহলে কি বিপ্লবের জনআকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের কোনো পথ বা সম্ভাবনা নেই?

উত্তর হলো—পথ আছে। ইতিহাস থেকে সঠিক শিক্ষা নিলে বিপ্লবকে সংহত করা যাবে। যেভাবে বখতিয়ার খিলজির বিজয় সংহত হয়েছিল, একইভাবে অন্য বিপ্লবও সুসংহত হতে পারে। সে সময় রাতারাতি সবকিছু বদলে যায়নি। লক্ষণ সেনের পলায়নের পরও এখানে বর্ণপ্রথা ছিল, নিম্নবর্ণ ও দরিদ্রদের ওপর অত্যাচার, নির্যাতন, শাসন, শোষণ ছিল; কিন্তু সুফি, দরবেশ এবং অন্যান্য সামাজিক ও সাংস্কৃতিক শক্তির কাজের ক্ষেত্রে বাধা-নিষেধ উঠে গিয়েছিল। কিছু ক্ষেত্রে তারা রাষ্ট্রীয় আনুকূল্যও পেয়েছিলেন। ফলে কয়েক শতকের মধ্যে ধীরে ধীরে হলেও বাংলা অঞ্চলে গভীর সমাজ বিপ্লব সম্পন্ন হয়ে গিয়েছিল।

বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পুনর্নির্মাণের ক্ষেত্রেও এই তত্ত্বের সত্যতা লক্ষ করা যায়। স্বাধীনতার কয়েক বছরের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ও চেতনা ধীরে ধীরে জনজীবনের কেন্দ্র থেকে সরে গিয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী কয়েক দশকে সাহিত্যিক, চলচ্চিত্রকার, নাট্যকার, গবেষক ও শিল্পীরা মুক্তিযুদ্ধকে তাদের সৃষ্টিকর্মের কেন্দ্রে নিয়ে আসেন। বিশেষ করে, হ‍ুমায়ূন আহমেদের নাটক ও চলচ্চিত্র মুক্তিযুদ্ধকে নতুন প্রজন্মের আবেগ ও কল্পনার অংশ করে তোলে। একই সঙ্গে অসংখ্য লেখক, গবেষক ও সাংস্কৃতিককর্মীর প্রচেষ্টায় মুক্তিযুদ্ধ শুধু একটি ঐতিহাসিক ঘটনা নয়, একটি সামাজিক মূল্যবোধে পরিণত হয়।

এভাবেই জুলাই বিপ্লবের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে। যদি এটি শুধু একটি রাজনৈতিক ঘটনা হিসেবেই সীমাবদ্ধ থাকে, তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তার প্রভাব ক্ষীণ হয়ে যাবে। কিন্তু যদি এটি সাহিত্য, গবেষণা, চলচ্চিত্র, নাটক, সংগীত, পাঠ্যক্রম ও ইতিহাসচর্চার অংশ হয়ে ওঠে, তবে এর স্বপ্ন ও চেতনা সমাজের গভীরে প্রোথিত হবে।

পাশাপাশি জুলাইয়ের রাজনৈতিক শক্তিগুলো নিজেদের মধ্যকার সংঘাত পরিহার করতে হবে। রাজনীতির মাঠে এক দল অন্য দলের বিরোধিতা করবে, বিভিন্ন পর্যায়ের ক্ষমতা দখলের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকবে, কিন্তু তা যেন সংঘাতে পরিণত না হয়, সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে। এ ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেতা খুব ভালো ভূমিকা রাখছেন। অন্যদেরও উচিত তাদের অনুসরণ করা।

সবশেষে একটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। পরাজিত শক্তি ফিরে আসবে কি না, তা কিন্তু নির্ভর করছে বিপ্লব-পরবর্তী দুটি সরকারের সাফল্যের ওপর। বর্তমান নির্বাচিত সরকার সংকটের মুখে পড়ে এমন কাজ থেকে সবাইকে বিরত থাকতে হবে। পাশাপাশি অন্তর্বর্তী সরকারকে কালিমা মাখানোর প্রচেষ্টা থেকেও সরে আসতে হবে। বিপ্লব-পরবর্তী দুটি সরকারকে ব্যর্থ প্রমাণ করা গেলে বিকল্প নেই তত্ত্বই কিন্তু প্রতিষ্ঠিত হবে।

লেখক : কলামিস্ট

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন