মব বা দঙ্গল: বয়ানের রাজনীতি

দিলশানা পারুল

দিলশানা পারুল

মব বা দঙ্গল: বয়ানের রাজনীতি

রাজনীতিতে ঘটনা শুধু ঘটে না, ঘটনার একটা বয়ানও তৈরি হয়। অনেক সময় কী ঘটেছে, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায় ঘটনাটা কীভাবে বলা হচ্ছে। কে বলছে, কোন শব্দ ব্যবহার করছে, কোন ছবিটা সামনে আনছে, কোন অংশটা চেপে যাচ্ছে, কাকে অপরাধী আর কাকে ভুক্তভোগী বানাচ্ছে—এই সবকিছু মিলেই তৈরি হয় রাজনৈতিক বয়ান।

রাজনৈতিক বয়ান আসলে একটা সংগঠিত রাজনৈতিক গল্প। রাষ্ট্র, রাজনৈতিক দল, মিডিয়া কিংবা ক্ষমতাবান কোনো গোষ্ঠী একটা ঘটনা, আন্দোলন বা জনগোষ্ঠীকে এই গল্পের ভেতর দিয়ে নির্দিষ্ট অর্থ দেয়। বয়ান শুধু বলে না—কী ঘটেছে। আস্তে আস্তে আমাদের বলে দেয়—কে ভালো, কে খারাপ; কে নাগরিক, কে দুষ্কৃতকারী; কে ভিকটিম, কে অপরাধী; কে রাষ্ট্রের জন্য হুমকি এবং রাষ্ট্রের কোন পদক্ষেপটা আমাদের মেনে নেওয়া উচিত।

বিজ্ঞাপন

একই ঘটনাকে বলা যায়, ‘হাজার হাজার মানুষ অধিকার আদায়ের দাবিতে রাস্তায় নেমেছে।’ আবার বলা যায়, ‘উচ্ছৃঙ্খল মব শহরে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেছে।’

ঘটনা মোটামুটি একই। কিন্তু রাজনৈতিক অর্থ এক নয়।

প্রথম বাক্যে মানুষগুলোর রাজনৈতিক সত্তা আছে। তারা নাগরিক, তাদের দাবি আছে, রাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের দরকষাকষি আছে। দ্বিতীয় বাক্যে তারা আর নাগরিক না; তারা ‘মব’—একটা আবেগপ্রবণ, অযৌক্তিক, বিপজ্জনক এবং প্রায় নামহীন জনসমষ্টি।

তখন প্রশ্নটা আর থাকে না—‘মানুষগুলো রাস্তায় নামল কেন?’

প্রশ্নটা হয়ে যায়—‘এদের নিয়ন্ত্রণ করা হবে কীভাবে?’

এইখানেই বয়ানের ক্ষমতা।

‘প্রতিবাদকারী’র বদলে যদি প্রতিদিন শুনতে থাকেন ‘দুষ্কৃতকারী’, তারপর ‘উগ্রবাদী’, ‘রাষ্ট্রবিরোধী’, শেষে ‘সন্ত্রাসী’—একসময় একই মানুষের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় বলপ্রয়োগও যৌক্তিক মনে হতে পারে।

এই জায়গায় ‘মব’ খুব শক্তিশালী একটা শব্দ।

‘Mob’ শব্দটিরও একটা ঔপনিবেশিক ইতিহাস আছে। শব্দটা এসেছে mobile vulgus থেকে—মোটামুটি অর্থে চঞ্চল সাধারণ জনতা। শুরু থেকেই শব্দটার ভেতরে একটা শ্রেণিগত অবজ্ঞা ছিল। শিক্ষিত এলিট হলো যুক্তিবোধসম্পন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তি, আর রাস্তায় নামা সাধারণ মানুষ হলো আবেগপ্রবণ, অযৌক্তিক ভিড়।

ভারতীয় উপমহাদেশে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র কৃষকের বিদ্রোহ, শ্রমিক আন্দোলন, ধর্মীয় জমায়েত কিংবা শাসনবিরোধী প্রতিরোধকে প্রায়ই ‘mob’, ‘riotous crowd’, ‘unlawful assembly’ বা ‘seditious gathering’ হিসেবে বর্ণনা করেছে।

কেন?

কারণ কাউকে বিদ্রোহী বললে প্রশ্ন আসে—‘সে বিদ্রোহ করছে কেন?’

কৃষকের প্রতিরোধ বললে প্রশ্ন আসে—‘কৃষকের অভিযোগ কী?’

কিন্তু ‘মব’ বললে এসব প্রশ্ন আর করতে হয় না। মবের কোনো রাজনৈতিক চেতনা নেই, অভিযোগ নেই, ইতিহাস নেই; মব শুধু বিশৃঙ্খলা করে। ফলে রাষ্ট্রের কাজও সহজ—আইনশৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা।

স্বাধীনতার পরেও এই ভাষা পুরোপুরি মরে যায়নি। রাষ্ট্র বদলেছে, পতাকা বদলেছে, শাসক বদলেছে; কিন্তু রাজনীতিকে ‘আইনশৃঙ্খলার সমস্যা’ হিসেবে দেখার অভ্যাস থেকে গেছে।

বাংলাদেশে ‘মব’ শব্দটার আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যবহার আছে। এখানে মব শুধু প্রতিবাদের রাজনৈতিক বৈধতা কমায় না, অনেক সময় অপরাধের দায়কেও নামহীন করে দেয়।

বিভিন্ন সাম্প্রদায়িক হামলার সংবাদে আমরা দেখি—‘উত্তেজিত জনতা হামলা করেছে’, ‘বিক্ষুব্ধ মুসল্লিদের হামলা’, ‘উগ্র জনতা’, ‘দুষ্কৃতকারীদের হামলা’।

কিন্তু পরে অনেক সময় দেখা যায়, এই ‘উত্তেজিত জনতা’ আকাশ থেকে নামেনি।

কেউ গুজব ছড়িয়েছে।

কেউ সভা ডেকেছে।

কেউ মাইকিং করেছে।

কেউ লোক জড়ো করেছে।

কেউ লক্ষ্যবস্তু চিনিয়ে দিয়েছে।

কেউ রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক সুবিধা পেয়েছে।

কেউ ব্যক্তিগত শত্রুতা মিটিয়েছে।

কিন্তু সামনে থেকে যায় একটা শব্দ—‘মব’।

নাসিরনগরের ২০১৬ সালের ঘটনাকে ধরুন। প্রাথমিক বয়ান ছিল খুব সরল—ফেসবুকে ধর্ম অবমাননা, মানুষের ক্ষোভ, এরপর হিন্দু বাড়ি ও মন্দিরে হামলা।

অর্থাৎ, ধর্ম অবমাননা → ক্ষোভ → মব হামলা।

কিন্তু পরবর্তী আলোচনায় স্থানীয় রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব, ক্ষমতার লড়াই এবং রাজনৈতিক ব্যক্তিদের ভূমিকার অভিযোগও সামনে আসে। ধর্মীয় আবেগ অবশ্যই ছিল। কিন্তু সেটাই কি পুরো ঘটনার একমাত্র ব্যাখ্যা?

তাহলে প্রশ্ন হলো—ঘটনার নাম শুধু ‘ধর্মীয় মব হামলা’ হবে কেন?

মব সামনে ছিল। ঠিক আছে। কিন্তু মবকে সংগঠিত করল কে?

এই প্রশ্নটা বাদ দিলে ক্ষমতার রাজনৈতিক অংশটাই বাদ পড়ে যায়। কারণ মব নিজে গুজব বানায় না, মাইক ভাড়া করে না, গাড়িতে লোক আনে না, কোন বাড়িতে আগে হামলা হবে সেটাও নিজে ঠিক করে না।

এই কাজগুলোর জন্য সংগঠক লাগে। আর সংগঠক থাকলে দায়ও থাকে।

একইভাবে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা দেখলেই যদি আমরা উদ্দেশ্যকে শুধু ধর্মীয় ধরে নিই, তাহলে জমি দখল, সম্পত্তির স্বার্থ, স্থানীয় ক্ষমতা এবং ব্যক্তিগত শত্রুতার মতো স্তরগুলো হারিয়ে ফেলি।

তাই রাজনৈতিক বিশ্লেষণের আসল প্রশ্ন হলো—‘আপনি প্রশ্ন করা কোথায় থামাচ্ছেন?’

‘মব করেছে’—এইখানে?

নাকি এরপরও জিজ্ঞেস করবেন—

কে গুজব বানালো?

কে ছড়াল?

কে মানুষ জড়ো করল?

কারা লক্ষ্যবস্তু ঠিক করল?

হামলার পরে লাভটা কার হলো?

পুলিশ আগে জানত কি না?

প্রশাসন ঠেকাল না কেন?

‘মব’ শব্দটার সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক এইখানেই। এটা দায়কে প্রথমে সমষ্টিগত করে, তারপর নামহীন করে।

কে হামলা করেছে?

মব।

মব কে?

অজ্ঞাত মানুষ।

এভাবে অপরাধের দায় ছড়িয়ে যায়, পাতলা হয়ে যায়। শেষে কারো ঘাড়েই ঠিকমতো থাকে না।

একজন রাজনৈতিক নেতা, পুলিশ কর্মকর্তা বা জমি দখলকারীর কাছে জবাবদিহি চাওয়া যায়। কিন্তু ‘মব’-এর কাছে জবাবদিহি চাইবেন কীভাবে? মব তো আগামীকাল আর থাকবে না।

এই আলোচনাটা বর্তমান বাংলাদেশে আরো গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আমরা একটা বড় গণঅভ্যুত্থানের পরের সমাজ দেখছি।

অভ্যুত্থানের সময় রাস্তায় নামা সবাই কোনো রাজনৈতিক দলের ব্যানারে ছিল না। সবাই একই রকম রাজনৈতিকভাবে সচেতন ছিল না।

এই মানুষের একটা অংশ ছিল আবেগপ্রবণ জনতা। কিন্তু সেই আবেগই তখন সমষ্টিগত প্রতিরোধশক্তিতে পরিণত হয়েছিল। এই সংগঠিত মানুষের শক্তিই রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ করেছিল।

এখানেই বর্তমান সময়ের বড় দ্বন্দ্ব।

পুলিশ, ডিজিএফআই, র‌্যাব এবং অন্যান্য নিরাপত্তা সংস্থাসহ রাষ্ট্রের যেসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে গুম, নির্যাতন ও প্রাণঘাতী দমন ছাড়াও নানা গুরুতর অভিযোগ ছিল, সেসব প্রতিষ্ঠানের কাঠামোগত সংস্কারের প্রশ্ন এখনো রয়ে গেছে।

রাষ্ট্রের আইন আছে, অস্ত্র আছে, গোয়েন্দা কাঠামো আছে এবং প্রশাসনিক ক্ষমতা আছে। কিন্তু বিপরীতে সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্তভাবে সমবেত হওয়ার ক্ষমতাকে আমরা খুব দ্রুত ‘মব’ বলে অবৈধ করে ফেলছি।

কোনো সমাবেশ যদি প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলের ব্যানারে না হয়, সামনে পরিচিত বুদ্ধিজীবী না থাকে, ভাষা যথেষ্ট ‘পরিশীলিত’ না হয়, দাবি শহুরে মধ্যবিত্তের পরিচিত ভাষায় না আসে—তাহলে তাদের ‘মব’ বলা সহজ হয়ে যায়।

আমরা ‘সচেতন নাগরিকের প্রতিবাদ’ পছন্দ করি। প্ল্যাকার্ড থাকবে, ভাষা সুন্দর হবে, পরিচিত মুখ থাকবে, স্লোগান আমাদের রুচির মধ্যে থাকবে—তখন সেটা ‘নাগরিক সমাজের প্রতিবাদ’।

কিন্তু কৃষক নিজের ভাষায় ক্ষোভ প্রকাশ করলে? শ্রমিক আবেগের বশে রাস্তায় নামলে? কোনো মা সন্তানের জন্য চিৎকার করলে? যে মানুষ রাষ্ট্রের সঙ্গে দরকষাকষির ‘ভদ্র’ ভাষা জানে না?

তার সমাবেশ খুব দ্রুত আমাদের চোখে ‘মব’ হয়ে যায়।

এই দৃষ্টিভঙ্গির ভেতরে শ্রেণিগত বিচার আছে। আর এই বিচার নতুন নয়; এর শিকড় ঔপনিবেশিক রাজনীতিতে।

তবে একটা বিষয় পরিষ্কার—এই যুক্তির অর্থ হত্যা, গণপিটুনি, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট, সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা বা বাড়িঘর ভাঙচুরকে বৈধতা দেওয়া নয়।

অপরাধ অপরাধই।

কিন্তু অপরাধের বিচার করার নামে সব ধরনের অসংগঠিত জনসমাবেশের রাজনৈতিক বৈধতা কেড়ে নেওয়াও বিপজ্জনক। কারণ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার বিপরীতে জনগণের শেষ শক্তি অনেক সময় তাদের একসঙ্গে দাঁড়ানোর ক্ষমতা।

প্রত্যেক spontaneous gathering-কে ‘মব’, প্রত্যেক অস্বস্তিকর প্রতিবাদকে ‘দঙ্গল’, প্রত্যেক অচেনা জনতাকে ‘দুষ্কৃতকারী’ বলতে বলতে যদি সেই ক্ষমতাটাকেই আমরা সন্দেহের বস্তু বানাই, তাহলে রাষ্ট্রের সামনে শেষ পর্যন্ত থাকবে শুধু বিচ্ছিন্ন, একা নাগরিক।

তাই প্রশ্নটা শুধু ভাষার নয়। এটা ক্ষমতার ভারসাম্যের প্রশ্ন।

‘মব’ বা ‘দঙ্গল’ বয়ানের পেছনে তাই আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—‘এই নামহীন জনতার পেছনে ক্ষমতার নির্দিষ্ট মুখগুলো কারা?’

‘মবের কোনো মুখ নেই’—এই ধারণাটাই রাজনৈতিকভাবে সবচেয়ে সমস্যাজনক।

আমরা যদি সামনের হাজারটা মুখ দেখি, কিন্তু পেছনের পাঁচটা মুখ না দেখি, তাহলে আমরা ঘটনা দেখলাম—অপরাধের রাজনীতিটা বুঝলাম না।

অপরাধীর বদলে একটা নামহীন জনসমষ্টি দায় নেয়। ক্ষমতা অদৃশ্য হয়ে যায়। আর ঠিক এইখানেই বয়ানের রাজনীতি কাজ করে।

মব শুধু রাস্তায় তৈরি হয় না—মব তৈরি হয় ভাষাতেও।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন