একটি দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রাণশক্তি শুধু হাসপাতাল, অবকাঠামো কিংবা আধুনিক যন্ত্রপাতি নয়; বরং চিকিৎসক, নার্স এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের জ্ঞান, দক্ষতা, নৈতিকতা, পেশাদারত্ব এবং মানবিক মূল্যবোধে নিহিত। স্বাস্থ্য খাতের বহুমাত্রিক সমস্যার মধ্যে হাসপাতালের অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, ওষুধ ও শয্যার স্বল্পতা, দক্ষ জনবলের অভাব, রোগীর দুর্ভোগ, সেবায় বৈষম্য এবং প্রশাসনিক দুর্বলতা সবই গুরুত্বপূর্ণ। তবে এসব সমস্যাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে চিকিৎসা শিক্ষা ও স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার মান। তাই এ ব্যবস্থার মৌলিক উন্নয়ন ছাড়া স্বাস্থ্য খাতের অন্যান্য সমস্যার টেকসই সমাধান অর্জন করা অত্যন্ত কঠিন।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে চিকিৎসা শিক্ষার উন্নয়ন বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। এই বাজেটে স্বাস্থ্য খাতের বিভিন্ন বিষয়ের মধ্যে চিকিৎসা শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। দক্ষ ও মানবিক চিকিৎসক তৈরির লক্ষ্যে ২০৩০ সালের মধ্যে একটি আধুনিক ও যোগ্যতাভিত্তিক এমবিবিএস পাঠ্যক্রম চালু করতে অর্থায়নের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বিদ্যমান ও অব্যবহৃত অবকাঠামো ব্যবহার করে কয়েকটি আধুনিক চিকিৎসা প্রশিক্ষণ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার জন্যও আর্থিক ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এজন্য বাজেট প্রণয়নই যথেষ্ট নয়; বরাদ্দকৃত অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে সঠিক কর্মপরিকল্পনা এবং কার্যকর বাস্তবায়ন কৌশল প্রয়োজন। নয়তো বরাদ্দ থাকা সত্ত্বেও কাঙ্ক্ষিত সংস্কার বাস্তবায়িত হবে না।
এখন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্যশিক্ষা-সংশ্লিষ্ট বিভাগের দায়িত্ব হলো কার্যকর পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা, যাতে পরিকল্পনার দুর্বলতা কিংবা বাস্তবায়নের ধীরগতির কারণে মেয়াদ শেষে বরাদ্দ দেওয়া অর্থ অব্যবহৃত না থাকে। এ পরিস্থিতি তৈরি হলে চিকিৎসা শিক্ষার উন্নয়নে প্রত্যাশিত অগ্রগতি অর্জিত হবে না। এই প্রেক্ষাপটে চিকিৎসা শিক্ষা সংস্কারের বিষয়ে কয়েকটি নীতিগত প্রস্তাব উপস্থাপন করা হলো।
১. রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা প্রদানের সক্ষমতা অর্জন
ক. ঐতিহ্যগত ক্লিনিক্যাল পদ্ধতির পুনঃপ্রতিষ্ঠা : আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে রোগ নির্ণয়ের একটি সুপ্রতিষ্ঠিত ক্লিনিক্যাল অনুক্রম রয়েছে। এ অনুক্রমের প্রথম ধাপ হলো রোগীর রোগ-সম্পর্কিত ইতিহাস (Clinical History) নেওয়া; দ্বিতীয় ধাপ শারীরিক পরীক্ষা; তৃতীয় ধাপে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে সম্ভাব্য রোগনির্ণয় (Provisional Diagnosis) করা হয় এবং সবশেষে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে সেই রোগ শনাক্ত করা হয়। এই ক্লিনিক্যাল পদ্ধতিই চিকিৎসা শিক্ষার ভিত্তি।
কিন্তু বাস্তবে অনেক চিকিৎসা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এই মৌলিক ক্লিনিক্যাল পদ্ধতির চর্চা আগের তুলনায় দুর্বল হয়ে পড়েছে। পাঠ্যক্রমে বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত থাকলেও ব্যবহারিক প্রশিক্ষণে এর যথাযথ প্রয়োগ সব ক্ষেত্রে নিশ্চিত করা যায় না। ফলে অনেক চিকিৎসক রোগীর ইতিহাস ও শারীরিক পরীক্ষার তুলনায় পরীক্ষাগার-নির্ভর সিদ্ধান্তের ওপর ক্রমবর্ধমানভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়ছেন।
একসময় রোগীর সঙ্গে বিস্তারিত কথা বলা, শারীরিক পরীক্ষা সম্পন্ন করা এবং তার ভিত্তিতে সীমিত ও প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে রোগ নির্ণয়ে পৌঁছানোর মধ্যেই একজন দক্ষ চিকিৎসকের পরিচয় নিহিত ছিল। বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রেই এই অনুক্রম অনুসরণ করা হয় না। রোগীর প্রাথমিক অভিযোগ শোনার পরই একাধিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা নির্ধারণ করা হয় এবং পরবর্তী সময়ে পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে চিকিৎসা পরিকল্পনা করা হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রাথমিক পর্যায়েই উচ্চমূল্যের মলিকিউলার বা জিনগত পরীক্ষাও বিবেচনা করা হয়, যদিও অধিকাংশ রোগীর ক্ষেত্রে তার প্রয়োজন হয় না।
খ. মেডিকেল ডকুমেন্টেশন : অধিকাংশ হাসপাতালের রোগীর মেডিকেল রেকর্ড বা চিকিৎসা নথি পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, অনেক ক্ষেত্রেই রোগীর পূর্ণাঙ্গ রোগনির্ণয়, চিকিৎসা পরিকল্পনা, ওষুধ পরিবর্তনের কারণ কিংবা চিকিৎসা-সংক্রান্ত সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা যথাযথভাবে লিপিবদ্ধ থাকে না। এই ধরনের অসম্পূর্ণ নথিবদ্ধকরণ শুধু চিকিৎসার ধারাবাহিকতাকেই ব্যাহত করে না, বরং রোগীর নিরাপত্তা, আইনগত জবাবদিহিতা এবং গবেষণার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। যথাযথ মেডিকেল রেকর্ড (ডকুমেন্টেশন) রোগীর নিরাপত্তা, চিকিৎসার ধারাবাহিকতা, সমন্বিত চিকিৎসা, চিকিৎসার মান মূল্যায়ন, আইনগত জবাবদিহিতা এবং চিকিৎসা গবেষণার ভিত্তি। তাই মেডিকেল রেকর্ড লেখার কাজকে চিকিৎসা শিক্ষার শুরু থেকেই একটি অপরিহার্য দক্ষতা হিসেবে শেখাতে হবে এবং ব্যবহারিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে এর চর্চা নিশ্চিত করতে হবে।
গ. চিকিৎসা প্রশিক্ষণ : আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সমসাময়িক গাইডলাইন অনুসরণ, প্রমাণভিত্তিক চিকিৎসা প্রয়োগ এবং সমালোচনামূলক চিন্তাশক্তির ভিত্তিতে ক্লিনিক্যাল সিদ্ধান্ত গ্রহণ—এ সবই একটি কার্যকর চিকিৎসা প্রশিক্ষণের মূল লক্ষ্য। এ ধরনের দক্ষতা কেবল পাঠ্যপুস্তক অধ্যয়নের মাধ্যমে অর্জিত হয় না; সুসংগঠিত ও তত্ত্বাবধানে থাকা ক্লিনিক্যাল প্রশিক্ষণের মাধ্যমেই তা বিকশিত হয়। বাংলাদেশের আর্থসামাজিক বাস্তবতা, রোগের প্রকৃতি এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা বিবেচনায় নিয়ে আন্তর্জাতিক গাইডলাইন যথাযথভাবে প্রয়োগ করার যোগ্যতা চিকিৎসকদের অর্জন করতে হবে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে দেশীয় বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ জাতীয় ক্লিনিক্যাল গাইডলাইন প্রণয়ন ও হালনাগাদ করার জন্যও দক্ষতা গড়ে তুলতে হবে।
বর্তমানে দেশের অনেক মেডিকেল কলেজ ও বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে এ ধরনের প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য পর্যাপ্ত দক্ষ প্রশিক্ষক নেই। তাই জাতীয় পর্যায়ে শিক্ষক ও প্রশিক্ষক উন্নয়নের একটি দীর্ঘমেয়াদি কর্মসূচি গ্রহণ করা জরুরি। প্রয়োজনে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতায় অভিজ্ঞ প্রশিক্ষকদের সম্পৃক্ত করে দেশের শীর্ষস্থানীয় মেডিকেল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রশিক্ষক প্রশিক্ষণ কর্মসূচি পরিচালনা করা যেতে পারে। পরবর্তী সময়ে এই প্রশিক্ষকরাই দেশব্যাপী মানসম্মত চিকিৎসা প্রশিক্ষণ সম্প্রসারণে নেতৃত্ব দেবেন।
দেশে অনেক সময় চিকিৎসা প্রশিক্ষণ বলতে কেবল প্রযুক্তিগত বা কারিগরি দক্ষতা অর্জনকেই বোঝানো হয়; যেমন অস্ত্রোপচারের কৌশল, বিভিন্ন যন্ত্রপাতি পরিচালনা, অথবা নির্দিষ্ট কোনো প্রক্রিয়া সম্পাদনের দক্ষতা। এসব দক্ষতা গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু চিকিৎসা প্রশিক্ষণের সম্পূর্ণ রূপ নয়। চিকিৎসা এখন আর একক ব্যক্তির পেশা নয়; এটি একটি দলভিত্তিক কার্যক্রম। ফলে সমন্বিত সিদ্ধান্ত গ্রহণ, বহুবিষয়ক আলোচনায় অংশগ্রহণ এবং বিভিন্ন স্বাস্থ্যপেশাজীবীর সঙ্গে কার্যকরভাবে কাজ করার সক্ষমতা চিকিৎসা প্রশিক্ষণের অপরিহার্য উপাদান। এই দক্ষতা স্বল্পমেয়াদি কোনো প্রশিক্ষণে অর্জন করা সম্ভব নয়; চিকিৎসা শিক্ষার শুরু থেকেই ধারাবাহিক অনুশীলনের মাধ্যমে তা গড়ে তুলতে হয়।
২. চিকিৎসা শিক্ষাক্রমে পেশাদারত্ব, নৈতিকতা অন্তর্ভুক্তকরণ
একজন ক্লিনিক্যালি দক্ষ চিকিৎসকের পরিচয় শুধু রোগ নির্ণয়, অস্ত্রোপচার, ওষুধ প্রয়োগ বা আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের সক্ষমতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। একজন প্রকৃত চিকিৎসক রোগীর কথা মনোযোগ দিয়ে শোনেন, তার শারীরিক, মানসিক, পারিবারিক ও আর্থসামাজিক বাস্তবতা বোঝার চেষ্টা করেন এবং সম্মান, সহমর্মিতা ও মানবিকতার সঙ্গে চিকিৎসাসেবা প্রদান করেন। রোগী ও তার পরিবারের সঙ্গে সহজ, বোধগম্য ও আন্তরিক ভাষায় চিকিৎসা পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করাও চিকিৎসকের মৌলিক পেশাগত দায়িত্ব।
চিকিৎসা-নৈতিকতার শিক্ষায় চিকিৎসার যথার্থতা এবং নিরর্থক চিকিৎসার ধারণা অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। ভবিষ্যৎ চিকিৎসকদের এমনভাবে প্রশিক্ষিত করতে হবে, যাতে তারা বৈজ্ঞানিক প্রমাণ, রোগীর সামগ্রিক শারীরিক অবস্থা, সম্ভাব্য চিকিৎসালাভের বাস্তবসম্মত সুযোগ, রোগীর মূল্যবোধ ও ইচ্ছা এবং পরিবারের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে চিকিৎসা-সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারেন।
বিশেষ করে এমন পরিস্থিতিতে, যেখানে নিবিড় পরিচর্যা, লাইফ সাপোর্ট, অথবা ভেন্টিলেটরি সহায়তা রোগীর আরোগ্য, জীবনমান কিংবা দীর্ঘমেয়াদি ফলাফলে অর্থবহ উন্নতির সম্ভাবনা সৃষ্টি করে না, সেখানে অপ্রয়োজনীয় ও নিষ্ফল চিকিৎসা পরিহার করে রোগীর মর্যাদা, স্বাচ্ছন্দ্য এবং উপশমমূলক সেবাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার নৈতিক ও পেশাগত সক্ষমতা গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে নিবিড় পরিচর্যা সুবিধার ন্যায্য ব্যবহার নিশ্চিত করার জন্য স্বচ্ছ, বৈজ্ঞানিক এবং নৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের শিক্ষা চিকিৎসা শিক্ষার অংশ হতে হবে।
চিকিৎসা শিক্ষাক্রমে চিকিৎসা-নৈতিকতা ও বায়োএথিক্সের পাশাপাশি মেডিকেল হিউম্যানিটিজ, আচরণবিজ্ঞান, রোগীর অধিকার এবং রোগীকেন্দ্রিক সেবা-বিষয়ক বাধ্যতামূলক পাঠদান, ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ এবং দক্ষতা মূল্যায়ন অন্তর্ভুক্ত করা উচিত।
৩. চিকিৎসকদের নিবন্ধন নবায়ন ও পেশাগত উন্নয়ন
চিকিৎসা শিক্ষার দীর্ঘদিনের ঘাটতি স্বল্প সময়ে পূরণ সম্ভব নয়। স্নাতক পর্যায়ের শিক্ষাক্রম, ইন্টার্নশিপ এবং স্নাতকোত্তর প্রশিক্ষণে যে সংস্কার প্রয়োজন, তার সুফল পেতে কয়েক বছর সময় লাগবে। তাই স্বাস্থ্যব্যবস্থা পুনর্গঠনের শুরু থেকেই বর্তমানে কর্মরত চিকিৎসকদের জ্ঞান, দক্ষতা এবং পেশাগত সক্ষমতা ধারাবাহিকভাবে হালনাগাদ রাখার জন্য একটি কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলা দরকার। এ লক্ষ্যে চিকিৎসকদের নিবন্ধন নবায়নের সঙ্গে ‘Continuing Medical Education (CME)’ এবং ‘Continuing Professional Development (CPD)’-এ অংশগ্রহণ বাধ্যতামূলক করা উচিত। এর মাধ্যমে চিকিৎসাবিজ্ঞানের নতুন জ্ঞান, হালনাগাদ ক্লিনিক্যাল গাইডলাইন, রোগীর নিরাপত্তা, চিকিৎসা-নৈতিকতা, কার্যকর যোগাযোগ, ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবা এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় দক্ষতার ধারাবাহিক উন্নয়ন করা সম্ভব হবে।
তবে শুধু CME-এর নির্ধারিত ঘণ্টা পূরণ করাই যথেষ্ট নয়। CPD-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হওয়া উচিত চিকিৎসকের নিজস্ব কর্মপরিবেশভিত্তিক শিক্ষা। যেমন, ক্লিনিক্যাল অডিট, জটিল রোগীর কেস পর্যালোচনা, মৃত্যু-পর্যালোচনা, রোগীর মতামত, গবেষণা, শিক্ষকতা এবং মানোন্নয়ন কার্যক্রমও CPD-এর স্বীকৃত উপাদান হতে পারে।
৪. রোগীকেন্দ্রিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের দক্ষতা
রোগীর সঙ্গে কার্যকর যোগাযোগ আধুনিক চিকিৎসাসেবার একটি মৌলিক ক্লিনিক্যাল দক্ষতা এবং রোগীকেন্দ্রিক স্বাস্থ্যসেবার অন্যতম ভিত্তি। একজন ক্লিনিক্যালি দক্ষ চিকিৎসক এমনভাবে প্রশিক্ষিত হবেন, যাতে তিনি রোগী ও তার পরিবারের সঙ্গে সহমর্মিতাপূর্ণ, সম্মানজনক, সামাজিকভাবে সংবেদনশীল এবং সহজবোধ্য ভাষায় যোগাযোগ করতে পারেন। রোগীর শারীরিক সমস্যার পাশাপাশি তার মানসিক অবস্থা, সামাজিক বাস্তবতা, সাংস্কৃতিক বিশ্বাস, ধর্মীয় মূল্যবোধ এবং আর্থিক সামর্থ্য বিবেচনায় রেখে চিকিৎসা-সংক্রান্ত আলোচনা পরিচালনা করার যোগ্যতাও তার অর্জন করতে হবে।
কাউন্সেলিং চিকিৎসাসেবার অবিচ্ছেদ্য অংশ। জীবনযাত্রার পরিবর্তন, দীর্ঘমেয়াদি ওষুধ সেবন, টিকাদান, রক্তদান, থ্যালাসেমিয়া ও অন্যান্য বংশগত রোগ প্রতিরোধ, চিকিৎসকের পরামর্শ ঠিকভাবে মেনে চলা, মানসিক স্বাস্থ্য, পুনর্বাসন এবং উপশমমূলক সেবা, এসব বিষয়ে রোগী ও পরিবারকে পরামর্শদানের প্রশিক্ষণ শিক্ষায় অন্তর্ভুক্ত করা উচিত।
আধুনিক চিকিৎসাসেবা একটি আন্তঃপেশাগত দলগত কার্যক্রম। ফলে চিকিৎসক, নার্স, ফার্মাসিস্ট, ফিজিওথেরাপিস্ট, ল্যাবরেটরি বিজ্ঞানী, প্যারামেডিক এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যপেশাজীবীর সঙ্গে সমন্বিত যোগাযোগ চিকিৎসা শিক্ষার অপরিহার্য অংশ হওয়া উচিত। এর মাধ্যমে চিকিৎসাগত ত্রুটি হ্রাস পাবে এবং সেবার ধারাবাহিকতা নিশ্চিত হবে।
৫. প্রতিরোধ, পুনর্বাসন এবং উপশমমূলক সেবার সক্ষমতা অর্জন
দুর্ঘটনা, স্ট্রোক, দীর্ঘস্থায়ী রোগ, জন্মগত অসুস্থতা অথবা গুরুতর আঘাতের ফলে কর্মক্ষমতা হারানো ব্যক্তিদের জন্য পুনর্বাসন চিকিৎসা (Rehabilitation Medicine) আধুনিক স্বাস্থ্যসেবার একটি অপরিহার্য অংশ। ভবিষ্যৎ চিকিৎসকদের এমনভাবে প্রশিক্ষিত করতে হবে, যাতে তারা পুনর্বাসনকে চিকিৎসার সমাপ্তি নয়, বরং রোগীর আবার স্বাভাবিক জীবন, পরিবার এবং কর্মক্ষেত্রে ফিরে যাওয়ার ধারাবাহিক প্রক্রিয়া হিসেবে বিবেচনা করেন।
যেসব রোগ সম্পূর্ণ নিরাময়যোগ্য নয়, সেসব ক্ষেত্রেও চিকিৎসকের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। ক্যানসার, অগ্রসর অঙ্গ বিকলতা, স্নায়বিক ক্ষয়জনিত রোগ এবং অন্যান্য জীবনসীমাবদ্ধ (Life-limiting) অসুস্থতায় আক্রান্ত রোগীদের ক্ষেত্রে ব্যথা ও অন্যান্য উপসর্গ নিয়ন্ত্রণ, মানসিক সহায়তা, সামাজিক সমর্থন এবং প্রয়োজনে আধ্যাত্মিক সহায়তা প্রদানও চিকিৎসার অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গিই উপশমমূলক সেবার মূল ভিত্তি।
চিকিৎসা শিক্ষায় প্রতিরোধ, পুনর্বাসন এবং উপশমমূলক সেবাকে পৃথক ও বিচ্ছিন্ন বিষয় হিসেবে নয়; বরং সমন্বিত রোগীকেন্দ্রিক চিকিৎসার অংশ হিসেবে শিক্ষা দিতে হবে। এ লক্ষ্যে তাত্ত্বিক পাঠদানের পাশাপাশি ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ, সম্প্রদায়ভিত্তিক শিক্ষা এবং আন্তঃপেশাগত শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করা উচিত।
৬. চিকিৎসা-গবেষণা শক্তিশালী করা
প্রত্যেক চিকিৎসকের গবেষক হওয়া প্রয়োজন নেই; তবে প্রত্যেক চিকিৎসকের গবেষণা সম্পর্কে যথেষ্ট জ্ঞান থাকা দরকার।
শিক্ষার্থীদের স্নাতক পর্যায় থেকেই গবেষণার মৌলিক নীতি, গবেষণা-নৈতিকতা, বৈজ্ঞানিক লেখালেখি, তথ্য বিশ্লেষণ, সাহিত্য পর্যালোচনা এবং বৈজ্ঞানিক উপস্থাপনার ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ দেওয়া উচিত। গবেষণাকে পাঠ্যক্রমের একটি বিচ্ছিন্ন উপাদান হিসেবে নয়; বরং চিকিৎসা শিক্ষার অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
৭. যোগ্যতাসম্পন্ন শিক্ষক-স্বল্পতা ও নিম্নমানের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান
চিকিৎসা শিক্ষার মানোন্নয়নের প্রধান শর্ত হলো পর্যাপ্তসংখ্যক দক্ষ শিক্ষক নিশ্চিত করা। যোগ্য শিক্ষকের স্বল্পতা চিকিৎসা শিক্ষার গুণগত উন্নয়নের বড় প্রতিবন্ধকতা। তাই জাতীয় পর্যায়ে দীর্ঘমেয়াদি শিক্ষক উন্নয়ন ও নিয়োগের পরিকল্পনা নিতে হবে এবং বর্তমান শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।
দেশের বিভিন্ন মেডিকেল কলেজকে একটি সমন্বিত ডিজিটাল শিক্ষা নেটওয়ার্কের আওতায় এনে অভিজ্ঞ শিক্ষকেরা কেন্দ্রীয়ভাবে অনলাইন বা হাইব্রিড পদ্ধতিতে লেকচার, কেস-ভিত্তিক আলোচনা, জার্নাল ক্লাব, সেমিনার এবং ক্লিনিক্যাল কনফারেন্স পরিচালনা করতে পারেন। উন্নত বিশ্বের বহু প্রতিষ্ঠানে ব্যবহৃত দূরশিক্ষণ, ভার্চুয়াল শ্রেণিকক্ষ এবং টেলি-এডুকেশন পদ্ধতি অনুসরণ করে সীমিত শিক্ষকসম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা সম্ভব। তবে এ ধরনের প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা কখনোই রোগীর শয্যাপাশে হাতে-কলমে ক্লিনিক্যাল প্রশিক্ষণের বিকল্প হতে পারে না; বরং এটি শিক্ষক-স্বল্পতা দূরীকরণ এবং শিক্ষার মান উন্নয়নের একটি কার্যকর পরিপূরক ব্যবস্থা হিসেবে ব্যবহৃত হওয়া উচিত।
বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার ভবিষ্যৎ মূলত নির্ভর করবে আমরা কেমন চিকিৎসক তৈরি করি তার ওপর। চিকিৎসা শিক্ষা কেবল একটি একাডেমিক কার্যক্রম নয়; এটি এমন একটি দায়িত্ব, যার মাধ্যমে দেশের জনগণের জন্য নিরাপদ, মানবিক এবং মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবার ভিত্তি তৈরি করা যায়। চিকিৎসা শিক্ষা সংস্কার জাতীয় স্বাস্থ্যব্যবস্থা শক্তিশালী করার অন্যতম প্রধান পূর্বশর্ত। একই সঙ্গে চিকিৎসা শিক্ষা সংস্কারকে কেবল শিক্ষাক্রম পরিবর্তনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না। শিক্ষক উন্নয়ন, গবেষণা, চিকিৎসা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গুণগত মান নিশ্চিতকরণ, স্বীকৃতি ব্যবস্থা, কার্যকর মূল্যায়ন, নিবন্ধন নবায়ন এবং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা—এসব উপাদানকে একটি সমন্বিত কাঠামোর মধ্যে বিবেচনা করতে হবে।
লেখক: সাবেক অধ্যাপক, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়; সাবেক চিকিৎসক, রক্তরোগ ও বোন ম্যারো ট্রান্সপ্ল্যান্ট বিভাগ, কিং ফয়সাল স্পেশালিস্ট হাসপাতাল, রিয়াদ
manzur.morshed@gmail.com
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

