শাবিপ্রবি উপাচার্য

শিক্ষকরা জাতি গঠনের মূল কারিগর, বিশ্ব শিক্ষক দিবসে বিনম্র শ্রদ্ধা

শিক্ষকরা জাতি গঠনের মূল কারিগর, বিশ্ব শিক্ষক দিবসে বিনম্র শ্রদ্ধা
শাবিপ্রবি উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. খায়রুল ইসলাম। ছবি: সংগৃহীত

বিশ্ব শিক্ষক দিবস উপলক্ষ্যে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের পক্ষ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মানিত শিক্ষকবৃন্দসহ দেশ-বিদেশের সকল শ্রদ্ধেয় শিক্ষককে জানাই আমার আন্তরিক শুভেচ্ছা ও গভীর শ্রদ্ধা।

বিজ্ঞাপন

শিক্ষা মানুষের অর্জিত সর্বশ্রেষ্ঠ ধন, আর শিক্ষকেরা হলেন সেই মানবোন্নয়ন প্রক্রিয়ার মূল কারিগর। শিক্ষকতা কেবল একটি পেশা নয়; এটি মানুষ গড়ার, জ্ঞানচর্চার এবং একটি আলোকিত ও মানবিক সমাজ বিনির্মাণের মহান দায়িত্ব। একজন প্রকৃত শিক্ষক কেবল পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান অর্জনে সহায়তা করেন না, বরং তার প্রজ্ঞা, নৈতিকতা ও মূল্যবোধের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মননে চিন্তার স্বাধীনতা, সততা ও যুক্তিবোধের বীজ রোপণ করেন। তিনি শিক্ষার্থীদের ভেতরে প্রশ্ন করার সাহস জাগান, সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানোর শিক্ষা দেন এবং দেশ ও সমাজের প্রতি দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠতে অনুপ্রাণিত করেন। চিকিৎসক, প্রকৌশলী, প্রশাসক কিংবা গবেষক সকল সাফল্যের নেপথ্যে থাকেন শিক্ষকের নীরব অবদান। তাই শিক্ষকরা হলেন জাতির মেধা, মনন ও ভবিষ্যৎ নির্মাণের মূল স্থপতি।

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় শুরু থেকেই বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, গবেষণা ও উদ্ভাবনী কার্যক্রমে দেশের অগ্রণী প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের এই অভাবনীয় সাফল্য ও আন্তর্জাতিক সুনাম অর্জনের নেপথ্যে রয়েছে সম্মানিত শিক্ষকবৃন্দের মেধা, নিষ্ঠা ও নিরলস পরিশ্রম। নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও তাদের এই আত্মত্যাগ ও নিরবচ্ছিন্ন সাধনা শাবিপ্রবিকে প্রতিনিয়ত নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাচ্ছে। শিক্ষক-শিক্ষার্থীর পারস্পরিক শ্রদ্ধা, আস্থা ও সহযোগিতার মধ্য দিয়েই আমাদের এই বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা ও গবেষণায় বিশ্বমানের উৎকর্ষ অর্জন করবে বলে আমি বিশ্বাস করি।

প্রতিবছর ৫ অক্টোবর বিশ্বজুড়ে পালিত বিশ্ব শিক্ষক দিবস আমাদের থেমে গিয়ে ভাবার সুযোগ দেয় যাদের হাত ধরে আমরা অক্ষর চিনেছি, তাদের প্রতি আমাদের দায়িত্ব কতখানি। শিক্ষকের মর্যাদা কেবল আনুষ্ঠানিক বাকপটুতা বা শুভেচ্ছাবার্তায় সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না; এর জন্য প্রয়োজন সহায়ক কর্মপরিবেশ, উপযুক্ত গবেষণার সুযোগ, পেশাগত স্বাধীনতা ও সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত করা।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিএনপি সরকারের বিভিন্ন মেয়াদে শিক্ষক ও শিক্ষা খাতে নেওয়া কিছু উদ্যোগ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বিশেষ করে বেসরকারি শিক্ষকদের রাষ্ট্রীয় বেতন সহায়তার আওতায় আনা, এমপিও ব্যবস্থার সম্প্রসারণ, শিক্ষকদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধি, শিক্ষা অবকাঠামো উন্নয়ন, প্রাথমিক শিক্ষা সম্প্রসারণ এবং বর্তমানে শিক্ষা সংস্কারের বিভিন্ন পরিকল্পনা।

সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার প্রথম সরকারের সময়ে এমপিও সহায়তা ৮০ শতাংশে এবং পরবর্তী বিএনপি সরকারের সময়ে তা শতভাগ মূল বেতনে উন্নীত হয়।

সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার দ্বিতীয় মেয়াদে প্রাথমিক শিক্ষার বিস্তারেও বড় প্রকল্প নেওয়া হয়। ২০০৪ সালে দ্বিতীয় প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচি বা পিইডিপি-২ চালু করা হয়। প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকার এই কর্মসূচিতে ৩৫ হাজার শিক্ষক নিয়োগ এবং ৩০ হাজার নতুন শ্রেণিকক্ষ নির্মাণে ব্যয় হয়। এ ছাড়া প্রাথমিক ও গণশিক্ষা বিভাগকে পূর্ণাঙ্গ মন্ত্রণালয়ে উন্নীত করা, বিনা মূল্যে প্রাথমিক ও মেয়েদের শিক্ষা, উপবৃত্তি এবং ঝরে পড়া রোধে বিভিন্ন কর্মসূচির কথাও সে সময়ের সরকারি উদ্যোগের অংশ ছিল।

২০২৬-এ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে শিক্ষা খাতে সরকারি বরাদ্দ জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য ঘোষণা করেন। এর সঙ্গে শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়ন এবং অবকাঠামো সম্প্রসারণের বিষয়ও যুক্ত করা হয়।

শিক্ষকদের অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ এ বছর থেকে ১০০ গুণী শিক্ষককে ১ লাখ টাকা করে সম্মাননা দেওয়ার ব্যবস্থা, যা আগে ১২ জনকে দেওয়া হতো ২ লাখ টাকা করে। তার অংশ হিসেবে শাবিপ্রবি থেকে দুই শিক্ষক জাতীয় পর্যায়ে 'গুণী শিক্ষক সম্মাননা'র জন্য নির্বাচিত হয়েছেন। তারা হলেন, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ড. মো. হাবিবুল আহসান এবং বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আব্দুর রহিম (মরণোত্তর)।

এছাড়া, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের গুণগত মানোন্নয়নে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) কর্তৃক ‘ইউনিভার্সিটি টিচার্স ট্রেনিং একাডেমি’ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ অত্যন্ত প্রশংসনীয়।

একটি সুশিক্ষিত, প্রগতিশীল ও মানবিক সমাজ গঠনে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সর্বদা বদ্ধপরিকর। শাবিপ্রবিতে শিক্ষক যেন পূর্ণ মর্যাদার সঙ্গে পাঠদান ও গবেষণা পরিচালনা করতে পারেন এবং শিক্ষার্থী যেন মুক্তচিন্তার মাধ্যমে জ্ঞানার্জন করতে পারে, সেই সহায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করতে আমরা নিরলস কাজ করে যাচ্ছি।

আসুন, এই বিশেষ দিনে আমরা কেবল শিক্ষকদের স্মরণ না করে, তাদের ন্যায়সংগত অধিকার ও মর্যাদা সুরক্ষার নতুন অঙ্গীকার গ্রহণ করি। শিক্ষকসমাজের মর্যাদা যত সুসংহত হবে, আমাদের শিক্ষার ভিত্তি তত শক্তিশালী হবে।

আমি বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিশ্বের সকল শিক্ষকবৃন্দের সুস্বাস্থ্য, দীর্ঘায়ু, নিরবচ্ছিন্ন সমৃদ্ধি ও উত্তরোত্তর সাফল্য কামনা করছি।

লেখক: অধ্যাপক ড. মো. খায়রুল ইসলাম

ভাইস চ্যান্সেলর, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট।

এআরবি

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...