আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

দেশকে বদলাতে ভোটের জাগরণ

আলফাজ আনাম

দেশকে বদলাতে ভোটের জাগরণ

ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মাধ্যমে যে ইতিহাস রচিত হয়েছিল, তার প্রথম ধাপ অতিক্রম করল বাংলাদেশ। এক নীরব ভোটবিপ্লবের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক অভিযাত্রা শুরু হলো। ভোটের মাধ্যমে এমন অভূতপূর্ব গণজাগরণ এ দেশের মানুষ আগে কখনো দেখেনি। অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসের শাসনে দেশের মানুষের মধ্যে আস্থা ফিরে এসেছিল যে, একটি সুষ্ঠু, অবাধ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন হবে। ড. মুহাম্মদ ইউনূস যেদিন বলেছিলেন, ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি সময়ে নির্বাচন হবে এবং সেই নির্বাচন হবে উৎসবমুখর, সেদিন নির্বাচনের ট্রেনে ওঠে দেশ। তার সেই কথা আজ সত্য বলে প্রমাণিত হয়েছে। নির্বাচনের ছুটি ঘোষিত হওয়ার পর থেকে মানুষ যেভাবে দল বেঁধে বাস, ট্রেন ও লঞ্চে করে ভোটের টানে গ্রামে ছুটছে, তাতে প্রমাণিত হয়, এ দেশের মানুষ কতটা অধীর আগ্রহে পরিবর্তনের জন্য অপেক্ষা করছিল।

সকাল ৭টার মধ্যেই মানুষ ভোটকেন্দ্রগুলোয় হাজির হয়েছেন। উৎসবের আমেজে ভোট দিয়েছেন। বাংলাদেশের মানুষ তার মতামতের ভিত্তিতে সরকার নির্বাচনের ব্যাপারে কতটা আগ্রহী ও সতর্ক, তার প্রমাণ পাওয়া যায় ভোটের দীর্ঘ লাইন থেকে।

বিজ্ঞাপন

এবারের নির্বাচনে যারাই বিজয়ী হোক না কেন, তাদের মনে রাখতে হবে—এই ভোট শুধু ক্ষমতা পরিবর্তনের জন্য নয়, দেশকে বদলানোর জন্য। হাসিনার দেড় দশকের শাসনে মানুষ দেখেছে রাষ্ট্র কীভাবে তাদের অধিকার হরণ করেছে। নিপীড়নের মাধ্যমে মানুষের জীবন অতিষ্ঠ করে তুলেছিল। দুর্নীতি, অর্থ পাচার আর মাস্তানতন্ত্রের সঙ্গে সমাজের শিক্ষিত সমাজ জড়িয়ে পড়েছিল। দেশের অলিগার্ক শ্রেণি রাষ্ট্রকে বানিয়েছিল টাকা বানানোর মেশিন।

হাসিনার দুঃশাসনের বিরুদ্ধে ছাত্ররা যখন রাস্তায় নেমে এসেছিল, তখন এই নিম্ন আয়ের মানুষরাই প্রথম তাদের পাশে দাঁড়িয়েছিল। আমরা অভ্যুত্থানের সময় ছাত্রদের পাশে দাঁড়িয়ে রিকশাচালকদের মিছিল দেখেছি। দেশের অভিজাত শ্রেণি রাষ্ট্রের পুরোনো কাঠামো বহাল রেখে লুটপাটতন্ত্র কায়েম রাখতে চেয়েছে। কিন্তু সমাজের নিম্ন-মধ্যবিত্ত ও দরিদ্র শ্রেণি রাষ্ট্র মেরামতের দায়িত্ব বুঝে নিতে চাইছে। ভোটের জন্য ফজরের পর থেকে দীর্ঘ সারি প্রমাণ করে, এ দেশের মানুষ তাদের অধিকার বুঝে নিতে অনড়। ১৪০০ শহীদের আত্মত্যাগ তাদের মনে জাগরূক হয়ে আছে। রক্তাক্ত অভ্যুত্থান এ দেশের মানুষের রাজনৈতিক চিন্তার জগতে বিরাট এক পরিবর্তন এনে দিয়েছে। জাতিকে বিভক্ত করার বিভাজনের রাজনীতিতে তারা আর ফিরে যেতে চায় না। সাধারণ মানুষের এই স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের মাধ্যমে রাজনৈতিক দলগুলোকে এই বার্তা দিতে চাইছে—জনগণের অধিকার হরণের যেকোনো প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে মানুষ সজাগ আছে। প্রয়োজনে আবার তারা রাজপথে নেমে আসবে।

ড. মুহাম্মদ ইউনূস নির্বাচনের এক দিন আগে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে এ বিষয়টি খুব স্পষ্ট করে বলেছেন—এবারের নির্বাচন শুধু আরেকটি নিয়মিত নির্বাচন নয়; এটি একটি গণঅভ্যুত্থানের পর দেশের প্রথম জাতীয় নির্বাচন। দীর্ঘ সময় ধরে জমে থাকা ক্ষোভ, বৈষম্য, বঞ্চনা ও অবিচারের বিরুদ্ধে জনগণের যে জাগরণ আমরা দেখেছি, এই নির্বাচন তার সাংবিধানিক প্রকাশ। রাজপথের সেই দাবি আজ আপনাদের ব্যালটের মাধ্যমে উচ্চারিত হতে যাচ্ছে। তাই এই নির্বাচন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক যাত্রায় একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক।

এই নির্বাচনের মাধ্যমে আমরা শুধু জনপ্রতিনিধি নির্বাচন করছি না; একই সঙ্গে আমরা সিদ্ধান্ত নিচ্ছি, বাংলাদেশ কোন পথে এগোবে। আমরা কি একটি বৈষম্যহীন, ন্যায়ভিত্তিক ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র গড়তে পারব, নাকি আবার পুরোনো ক্ষমতাকেন্দ্রিক ও অনিয়ন্ত্রিত বৃত্তে ফিরে যাব—এই প্রশ্নের উত্তর দেবে জনগণের রায়।

এই অভ্যুত্থান যে বাংলাদেশকে কতটা বদলে দিয়েছে, তার প্রমাণ পাওয়া যায় ১০ বছরের এক শিশুর প্রধান উপদেষ্টাকে লেখা চিঠি থেকে। গাজীপুর থেকে রাফা প্রধান উপদেষ্টাকে লিখেছে, ‘আমার পরামর্শ হলো, আমি এ দেশের মাটি ও বাতাসের মাঝে নিরাপদভাবে বেঁচে থাকার পরিবেশ ভবিষ্যৎ বাংলাদেশে দেখতে চাই। এ রকম একটি ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ গড়তে নীতিনির্ধারক তৈরির নির্বাচন অনুষ্ঠিত করুন। Ñরাফা, গাজীপুর; বয়স : ১০ বছর।’

এই নির্বাচনের মাধ্যমে আরো একটি বিষয় আজ প্রমাণিত হলো—ছাত্র-জনতা অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে বেছে নিয়ে ভুল করেনি। ভারতপন্থি সুশীল সমাজ অব্যাহতভাবে ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও অন্তর্বর্তী সরকারের বিরুদ্ধে অসত্য প্রচার চালিয়েছে। বলা হয়েছে, তিনি ক্ষমতা আঁকড়ে রাখতে চান। এমন প্রচারও চালানো হয়েছে যে নির্বাচন কখনো হবে না, সংস্কারের নামে কালক্ষেপণ করা হচ্ছে।

এ ধরনের প্রচারের ফাঁদে রাজনৈতিক দলগুলোও পড়েছিল। বিশেষ করে, জাতীয়তাবাদী দল বিভিন্ন সময় সরকারের কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি করেছে। এমনকি ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে নোংরাভাবে আক্রমণও করা হয়েছে।

কিন্তু ড. মুহাম্মদ ইউনূস কথা রেখেছেন। সত্যিই এক উৎসবমুখর নির্বাচনের আয়োজন করেছেন। এ দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ তার ওপর আস্থা রেখেছিল। ড. ইউনূস তার আঠারো মাসের শাসনে এ দেশের মানুষের আত্মমর্যাদা ফিরিয়ে এনেছেন। আধিপত্যবাদী শক্তির ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করে কীভাবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে হয়, তার পথ দেখিয়ে দিয়েছেন। সত্য কথা হলো, দেশের মানুষও তাকে তার প্রতিদান দিয়েছে।

অন্তর্বর্তী সরকারের নানা সিদ্ধান্ত নিয়ে ক্ষোভ-বিক্ষোভ হয়েছে, কিন্তু মানুষ কখনো ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে বলেননি—আপনি চলে যান। এ দেশের মানুষ তাকে শুধু একটি নির্বাচন আয়োজনের জন্য স্মরণ করবে না; তাকে স্মরণ করবে তিনি রাষ্ট্র পরিচালনার কিছু মাপকাঠি নির্ধারণ করে দিয়েছেন বলে।

একটি সত্যিকার স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র নাগরিকদের সঙ্গে কেমন আচরণ করে, তার কিছু উদাহরণ তিনি রেখে গেছেন। একটি স্বাধীন রাষ্ট্রে মতপ্রকাশের অধিকার কতটা সুরক্ষিত রাখা হয়, তার মানদণ্ডও তিনি দেখিয়েছেন।

সুষ্ঠু, সুশৃঙ্খল ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনে সশস্ত্র বাহিনী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। বাংলাদেশে এ পর্যন্ত যে কয়েকটি নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে, তাতে সশস্ত্র বাহিনীর প্রশংসনীয় ভূমিকা ছিল। যদিও হাসিনার ফ্যাসিবাদী শাসনে নির্বাচন ঘিরে সশস্ত্র বাহিনীকে দুষ্কর্মে ব্যবহার করার অভিযোগ রয়েছে। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের শেষদিকে এসে জনতার পক্ষে সশস্ত্র বাহিনীর অবস্থান যেমন তার পতন ত্বরান্বিত করেছিল, তেমনি দেশের স্বার্থে এবারের নির্বাচনেও সশস্ত্র বাহিনী দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করেছে বলে মনে করা যায়।

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের বিপ্লবের পর বাংলাদেশের মানুষ মনে করে, শুধু সরকার পরিবর্তনই যথেষ্ট নয়; বরং রাষ্ট্রীয় কাঠামোর সংস্কার প্রয়োজন। বাংলাদেশে ‘ভোটবিপ্লব’ এখন আর শুধু একটি রাজনৈতিক স্লোগান নয়; এটি জনগণের এমন এক আকাঙ্ক্ষা, যেখানে প্রতিটি ভোট হবে অর্থবহ এবং প্রতিটি নাগরিকের কণ্ঠস্বর প্রতিফলিত হবে রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণে।

দুর্ভাগ্যজনক দিক হলো, বাংলাদেশের মূলধারার গণমাধ্যম গণতান্ত্রিক উত্তরণে ভয়াবহভাবে ব্যর্থ হয়েছে। ঘৃণা, বিভেদ ও বিভাজন ছড়ানোর কাজে এসব গণমাধ্যম ব্যবহার করা হচ্ছে। গণতন্ত্রে গণমাধ্যমকে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও প্রভাবশালী শক্তি হিসেবে ধরা হয়, তাই একে বলা হয় ফোর্থ এস্টেট। কিন্তু আমরা দেখছি, মূলধারার গণমাধ্যম রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নিয়ে গুজব ও ভুয়া খবর ছড়িয়ে উত্তেজনা সৃষ্টির চেষ্টা করছে।

নির্বাচনের আগের রাতে দেশের কয়েকটি গণমাধ্যম রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্বের মাধ্যমে নানা ধরনের প্রোপাগাণ্ডামূলক খবর পরিবেশন করেছে। বাস্তবতা হলো, দেশের মূলধারার গণমাধ্যম ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের বিপরীতে দাঁড়িয়েছিল। আন্দোলন ও সংগ্রামকে সন্ত্রাসী তৎপরতা হিসেবে তুলে ধরেছিল। তারা ছিল তৎকালীন ক্ষমতাসীনদের মুখপাত্র। এখন সময়ের পরিক্রমায় আবার সেই ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়ার চেষ্টা করছে।

সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে পলাতক ফ্যাসিস্টদের এ দেশের রাজনীতিতে ফিরে আসার পথ চিরতরে রুদ্ধ হলো। রাজনীতিতে শূন্যতা দ্রুত পূরণ হয়। আওয়ামী লীগের সমর্থকরাও আগামী দিনে দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিলীন হয়ে যাবে। আওয়ামী লীগের এই রাজনৈতিক মৃত্যু থেকে দেশের সকল রাজনৈতিক দলকে শিক্ষা নিতে হবে। ভারতের এজেন্ডা বাস্তবায়নের রাজনীতিকে এ দেশের মানুষ আর কখনো মেনে নেবে না। এই সীমারেখা যদি কোনো রাজনৈতিক দল অতিক্রম করে, তার পরিণতি আওয়ামী লীগের মতো হবে।

১৪০০ মানুষের রক্ত আর ২০ হাজারের মানুষের পঙ্গুত্বের বিনিময়ে দেশের মানুষ যে অধিকার অর্জন করেছিল, সেই অধিকার ইতোমধ্যে প্রয়োগ করেছে। আবরার, ফাহাদ থেকে আবু সাঈদ, মুগ্ধ আর ওসমান হাদিরা যে বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন, সেই বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় দেশের মানুষের প্রথম ধাপের পরীক্ষা শেষ হলো। নির্বাচনে বিপুল উপস্থিতি ও তরুণদের আগ্রহ প্রমাণ করে, এ দেশের মানুষ পরিবর্তন চান। তারা এক নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখছেন।

নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে যে দলই সরকার গঠন করুক না কেন, যদি তারা কাঙ্ক্ষিত সংস্কার আনতে ব্যর্থ হয়, এই মানুষরা দ্রুত রাজপথে নেমে আসবেন। গণঅভ্যুত্থানের প্রথম সাফল্য হলো দেশের মানুষ অধিকারসচেতন হয়েছেন। পুরানো ধারার রাজনীতি এখন অচল। সেই পথে চললে বিপর্যয় অনিবার্য হয়ে উঠবে।

লেখক: সহযোগী সম্পাদক, আমার দেশ

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন