আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

বাংলাদেশের জনগণের মনোভাব ভারতকে বুঝতে হবে

জালাল উদ্দিন ওমর

বাংলাদেশের জনগণের মনোভাব ভারতকে বুঝতে হবে

ছাত্র-জনতার তীব্র গণআন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনা ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পদত্যাগ করে ভারতে পালিয়ে যান এবং বর্তমানে সেখানেই অবস্থান করছেন। এর মাধ্যমে শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের টানা সাড়ে ১৫ বছরের দোর্দণ্ডপ্রতাপ শাসনের অবসান ঘটে। বাংলাদেশে রচিত হয় এক অবিশ্বাস্য ও অকল্পনীয় ইতিহাস।

২০২৪ সালের ৮ আগস্ট নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে প্রধান করে একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। তারা বর্তমানে প্রয়োজনীয় সংস্কার সম্পন্ন করে একটি নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের লক্ষ্যে কাজ করছেন। আওয়ামী লীগ সরকারের পতন এবং শেখ হাসিনার পলায়নের মধ্য দিয়ে সরকারের সঙ্গে ভারতের যে অতিমাত্রার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল, তারও অবসান ঘটে।

বিজ্ঞাপন

আওয়ামী লীগ ২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত টানা সাড়ে ১৫ বছর ক্ষমতায় ছিল। এর আগে ১৯৯৬ সালের ২৩ জুন থেকে ২০০১ সালের ১৫ জুলাই পর্যন্ত পাঁচ বছর তারা ক্ষমতায় ছিল। উভয় সময়েই শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। আবার ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর স্বাধীনতা অর্জনের পর থেকে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট পর্যন্ত আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রক্ষমতায় ছিল; তখন শেখ মুজিবুর রহমান প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতি ছিলেন।

আওয়ামী লীগ শাসনামলে ভারত ও বাংলাদেশ সবসময় নিজেদের মধ্যে ভালো সম্পর্কের কথা বলেছে এবং পরস্পরকে বিশ্বস্ত বন্ধু হিসেবে তুলে ধরেছে। এমনকি এই সম্পর্ককে তারা বিশ্বে ‘রোল মডেল’ হিসেবেও প্রচার করেছে। কিন্তু আওয়ামী লীগের পতনের পর ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক আর কখনোই সেই রকম হবে না।

আওয়ামী লীগ শাসনামলে বাংলাদেশ সবসময় ভারতের অন্ধ আনুগত্য ও স্বার্থ রক্ষা করেছে। আওয়ামী লীগ সরকার ভারতের সব চাওয়াই পূরণ করেছে, ভারতের অন্যায় কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে কখনো প্রতিবাদ করেনি বরং সবসময় ভারতের পক্ষেই অবস্থান নিয়েছে। শেখ হাসিনা নিজেই বলেছেন, বাংলাদেশ ভারতকে যা দিয়েছে, তা ভারত চিরদিন মনে রাখবে। অথচ বাস্তবে ভারত বাংলাদেশকে তার ন্যায্য প্রাপ্য কিছুই দেয়নি।

ভারত সবসময় আওয়ামী লীগকে সমর্থন দিয়েছে। ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনে ভারত সরাসরি আওয়ামী লীগের পক্ষে অবস্থান নেয় এবং বিভিন্নভাবে তাদের ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখতে সহযোগিতা করে। ভারত কখনোই বাংলাদেশের জনগণ, গণতন্ত্র ও ভোটাধিকারের পক্ষে কথা বলেনি। ভারতের সহযোগিতায় আওয়ামী লীগ নির্বাচনব্যবস্থা ধ্বংস করেছে এবং ভোটারবিহীন নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা ধরে রেখেছে। ভারতের একনিষ্ঠ সমর্থন ছাড়া আওয়ামী লীগের পক্ষে টানা ক্ষমতায় থাকা সম্ভব হতো না—এ বিশ্বাস বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষের।

আওয়ামী লীগ শাসনামলে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে একাধিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। এসব চুক্তির সব কটিতেই ভারতের স্বার্থ প্রাধান্য পেয়েছে—চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর ব্যবহার, বাংলাদেশের নদীপথ ও ভূখণ্ড ব্যবহার করে ভারতের রেল চলাচলের অনুমতি ইত্যাদি। কিন্তু তিস্তা নদীর পানিবণ্টন নিয়ে ভারত আজও কোনো চুক্তি করেনি। বরং বর্ষাকালে অতিরিক্ত পানি ছেড়ে দিয়ে বাংলাদেশকে বন্যায় ডুবিয়েছে এবং শুষ্ক মৌসুমে পানি আটকে রেখে খরায় মারছে। সীমান্তে বাংলাদেশি হত্যাও বন্ধ করেনি ভারত। দুই দেশের মধ্যে ৪,০৯৮ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্তে বিএসএফ কর্তৃক বাংলাদেশি হত্যা নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। শেখ হাসিনাকে ভারতে আশ্রয় দেওয়া বাংলাদেশের মানুষ ভালোভাবে গ্রহণ করেনি—এই সত্য ভারতকে মেনে নিতেই হবে।

ভারত একটি বৃহৎ রাষ্ট্র এবং বাংলাদেশের প্রতিবেশী। ছোট হলেও ভৌগোলিক কারণে বাংলাদেশের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। বাংলাদেশের দুই পাশেই ভারত—একদিকে পশ্চিম ও দক্ষিণ ভারত, অন্যদিকে উত্তর-পূর্ব ভারতের ‘সেভেন সিস্টার্স’ নামে পরিচিত সাতটি রাজ্য। ভারতের মূল ভূখণ্ড ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের যোগাযোগের প্রধান পথ হলো বাংলাদেশ ও নেপালের মাঝখানে অবস্থিত ২০-২২ কিলোমিটার দীর্ঘ শিলিগুড়ি করিডোর, যা ‘চিকেন নেক’ নামে পরিচিত।

কলকাতা থেকে বাংলাদেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করে আগরতলায় যেতে মাত্র ৩০০ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করতে হয় অথচ আসাম হয়ে যেতে হলে প্রায় ১ হাজার ৫০০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হয়। এতে সময়, পরিবহন ব্যয় ও পণ্যের দাম বেড়ে যায়। এ কারণেই ভারত বাংলাদেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করে রেল যোগাযোগ ও বন্দর সুবিধা চায়। কিন্তু বাংলাদেশের ওপর দিয়ে রেল চলাচল বা চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর ব্যবহারের অনুমতি দিলে দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও অর্থনীতি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। অথচ বাংলাদেশ-নেপাল যোগাযোগের জন্য চিকেন নেক ব্যবহারের অনুমতি ভারত বাংলাদেশকে দেয়নি। এই দ্বিমুখী নীতি বাংলাদেশের জনগণ গ্রহণ করেনি।

বাংলাদেশ একটি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ। ঐতিহাসিকভাবেই এখানে বিভিন্ন ধর্মের মানুষ শান্তিপূর্ণভাবে একসঙ্গে বসবাস করে আসছে। সবাই নিজ নিজ ধর্ম স্বাধীনভাবে পালন করছে। মসজিদ, মন্দির, গির্জা ও প্যাগোডা—সবই বাংলাদেশে নিরাপদ। অথচ ভারত সবসময় বাংলাদেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর নির্যাতনের অভিযোগ তোলে, যা কখনোই প্রমাণিত হয়নি। ভারতের কিছু মিডিয়া, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী ও রাজনীতিবিদ পরিকল্পিতভাবে এ নিয়ে মিথ্যা প্রচারণা চালায়।

বাংলাদেশে প্রায় ১৫ শতাংশ অমুসলিম জনগোষ্ঠী বসবাস করে। মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান এবং চাকমা, মারমা, গারো, মুরংসহ বিভিন্ন আদিবাসী সম্প্রদায় মিলেমিশে শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করছে। আমরা সবাই বাংলাদেশি। কিন্তু ভারত সবসময় শুধু একটি সম্প্রদায়ের স্বার্থের কথা বলে, যা তাকে সর্বজনীন রাষ্ট্রের বদলে নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর প্রতিনিধি হিসেবে উপস্থাপন করে। ভারতের এই আচরণ বাংলাদেশের মানুষ মেনে নেয়নি; এমনকি অনেক হিন্দুও ভারতের এই নীতিকে সমর্থন করে না। এই বাস্তবতা ভারতকে বুঝতে হবে।

বাংলাদেশ সবসময় ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ ও সহযোগিতামূলক সম্পর্ক চায়। তবে সেই সম্পর্ক হতে হবে সমতার ভিত্তিতে। ভারত একটি বড় রাষ্ট্র—তার দায়িত্বও বেশি। কিন্তু ভারত সবসময় বাংলাদেশের জনগণের বদলে আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পর্ক রেখেছে। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের সঙ্গে সেই সম্পর্কও ভেঙে পড়েছে। ভারতকে এই নীতি পরিবর্তন করতেই হবে। বিশেষ দল বা সম্প্রদায়ের সঙ্গে নয়, ভারতের সম্পর্ক হতে হবে বাংলাদেশের জনগণের সঙ্গে। অন্যথায় এই সম্পর্ক কখনোই টেকসই হবে না।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনে ভারত সহযোগিতা করেছে—এ জন্য আমরা কৃতজ্ঞ। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, আমরা আমাদের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা বিসর্জন দিয়ে ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্ব করব। সমতা, ন্যায্যতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতেই ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক গড়ে উঠতে হবে। এতেই দুদেশের জনগণের কল্যাণ নিশ্চিত হবে। বাংলাদেশ একতরফা সম্পর্ক চায় না।

লেখক : প্রকৌশলী ও রাষ্ট্রচিন্তক গবেষক

ই-মেইল : omar_ctg123@yahoo.com

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন