আবুধাবিতে অনুষ্ঠিত নিলামে ২০২৫ সালের ১৬ ডিসেম্বর কলকাতা নাইট রাইডার্স (কেকেআর) ৯ কোটি ২০ লাখ রুপিতে মোস্তাফিজকে আসন্ন আইপিএল টুর্নামেন্টে খেলার জন্য কিনে নেয়। কেকেআর মালিক অভিনেতা শাহরুখ খান এবং অভিনেত্রী জুহি চাওলা। বিসিসিআইয়ের অনুরোধে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) ১৮ ডিসেম্বর আইপিএলে খেলার জন্য মোস্তাফিজকে যথারীতি ছাড়পত্র দেয়। কেকেআর কর্তৃক মোস্তাফিজকে কেনার পর থেকেই ভারতের হিন্দুত্ববাদী কিছু নেতা এর বিরুদ্ধে উগ্র চেহারা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েন। মধ্যপ্রদেশের মহাদেব মন্দিরের প্রধান উপাসক মহাবীর নাথ ২৭ ডিসেম্বর মোস্তাফিজকে আইপিএল থেকে বাদ দেওয়ার দাবি জানায় এবং তাকে খেলালে পিচ নষ্ট করে দেওয়ার হুমকি দেয়। উত্তর প্রদেশের বিজেপি নেতা সংগীত সোম ৩০ ডিসেম্বর মোস্তাফিজকে কেনায় কেকেআর মালিক শাহরুখ খানকে গাদ্দার এবং দেশদ্রোহী অভিহিত করে। তিনি বলেন, ভারতে খেলতে এলে মোস্তাফিজের পা বিমানবন্দরের বাইরে রাখতে পারবেন না। হিন্দু গুরু দেবকীনন্দন ঠাকুর শাহরুখ খান এবং কেকেআর ম্যানেজমেন্টের উদ্দেশে বলেন, মোস্তাফিজকে যেন না খেলানো হয়। বিসিসিআই সচিব দেবজিৎ সাইকিয়া ২০২৬ সালের ৩ জানুয়ারি বলেন, সাম্প্রতিক ঘটনার কারণে বিসিসিআই কেকেআরকে বাংলাদেশি খেলোয়াড় মোস্তাফিজুর রহমানকে ছেড়ে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। ঘোষণাটির পরপরই কেকেআর মোস্তাফিজকে ছেড়ে দেওয়ার কথা ঘোষণা করে। তারা বলে, যথাযথ প্রক্রিয়া পরামর্শ অনুসরণ করে বিসিসিআইয়ের নির্দেশে মোস্তাফিজকে ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হয়েছে।
ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড বিসিসিআইয়ের নির্দেশে কেকেআর গত ৩ জানুয়ারি মোস্তাফিজকে বাদ দেয়। হিন্দুত্ববাদীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে বিসিসিআই এই সিদ্ধান্ত নেয়।
মোস্তাফিজকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে বিজেপি নেতা সংগীত সোম বলেন, ১০০ কোটি সনাতনী ভারতীয়দের প্রতি লক্ষ রেখে বিসিসিআইয়ের এই সিদ্ধান্তের জন্য ধন্যবাদ। তিনি বলেন, ১০০ কোটি মানুষের আবেগ-অনুভূতিকে হেলাফেলা করা যায় না এবং এটি পুরো দেশের হিন্দুদের বিজয়। উত্তর প্রদেশের মন্ত্রী এবং বিজেপি নেতা নরেন্দ্র কাশ্যপ বলেন, আমরা বিসিসিআইয়ের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানাই। তারা দেশের আবেগ-অনুভূতি বুঝেছেন এবং বাংলাদেশি খেলোয়াড়কে বাদ দিয়েছেন, যেহেতু বাংলাদেশে হিন্দুদের ওপর অত্যাচার চলছে। দেবকীনন্দন ঠাকুর ও যথারীতি বিসিসিআইকে ধন্যবাদ জানিয়েছে। তবে ভারতের কিছু নেতা মোস্তাফিজকে বাদ দেওয়ার বিপক্ষে কথা বলেছেন। উত্তর প্রদেশ বিধান সভার বিরোধী নেতা মাতা প্রসাদ পান্ডে ও কংগ্রেস নেতা সুরেন্দ্র রাজপুত বলেছেন, মুসলিম বলে শাহরুখ খানকে গাদ্দার বা দেশদ্রোহী বলা হচ্ছে। ভারতীয় সমাজ পার্টির নেতা ওম প্রকাশ রাজভর ও সংগীত সোমের সমালোচনা করেন। কংগ্রেস নেতা ও লোকসভা সদস্য শশী থারুর বলেন, আমি মনে করি না যে, ক্রিকেটকে বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার ভার বহন করতে দেওয়া উচিত। তিনি বলেন, মোস্তাফিজ একজন ক্রিকেটার, এসব ঘটনার সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক নেই। তিনি ব্যক্তিগতভাবে ঘৃণাসূচক কথা, হামলা বা এমন কর্মকাণ্ডকে সমর্থন বা ন্যায্যতা দেওয়ার জন্য কখনো অভিযুক্ত হয়নি। তিনি একজন ক্রীড়াবিদ এবং বিষয় দুটিকে মিশিয়ে ফেলা অনুচিত। তিনি বলেন, খেলোয়াড়টি যদি লিটন দাস বা সৌম্য সরকার হতেন, তাহলে কী হতো? এখানে আমরা কাকে শাস্তি দিচ্ছিÑএকটি দেশকে, একজন ব্যক্তিকে নাকি তার ধর্মকে? তিনি আরো বলেন, খেলাধুলাকে এভাবে নির্বিচারে রাজনৈতিক রঙে রাঙানো আমাদের শেষ পর্যন্ত কোথায় নিয়ে যাবে? ভারতের সাবেক ক্রিকেটার মদন লাল বলেন, ওপর মহলের চাপে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
আইপিএল থেকে মোস্তাফিজকে বাদ দেওয়ায় বাংলাদেশে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া হয়। এতে দেশের মানুষ ক্ষুব্ধ এবং ব্যথিত হয়। জনগণের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানায়। সরকারের পক্ষ থেকে এ ঘটনার প্রতিবাদ জানানো হয় এবং বেশ কিছু সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। প্রথমত, ৭ ফেব্রুয়ারি থেকে ভারত এবং শ্রীলঙ্কায় অনুষ্ঠিত টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে খেলতে বাংলাদেশ দল ভারতে যায়নি। দ্বিতীয়ত, সরকারের তথ্য এবং সম্প্রচার মন্ত্রণালয় দেশে আইপিএলের খেলা সম্প্রচার বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ও শেখ হাসিনার ভারতে পালানোর পর থেকে ভারতের কিছু ব্যক্তি ও মিডিয়া তথ্যপ্রমাণ ছাড়া এ দেশে হিন্দু নির্যাতনের মিথ্যা প্রোপাগান্ডা চালিয়ে যাচ্ছে। এর মাধ্যমে তারা বাংলাদেশে অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টির অপচেষ্টা চালাচ্ছে। অথচ আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর মুসলমানরা হিন্দুদের মন্দির-ঘরবাড়ি পাহারা দিয়েছে, তাদের পাশে দাঁড়িয়েছে। হিন্দু সম্প্রদায়ের কোনো ব্যক্তির ওপর যদি হামলার ঘটনা ঘটে, তবে তা কোনোভাবেই ধর্মীয় বিদ্বেষের কারণে হয়নি। সেটি সম্পূর্ণভাবে রাজনৈতিক কারণেই হয়েছে। মুসলিম সম্প্রদায়ের আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী যেই কারণে হামলার শিকার হয়েছেন, একই কারণে হিন্দু সম্প্রদায়ের আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী হামলার শিকার হতে পারেন। এখানে পুরো ব্যাপারটিই রাজনৈতিক এবং সাম্প্রদায়িকতাও সংখ্যালঘু নির্যাতনের কোনো ব্যাপার নেই। আমরা সব ধরনের সহিংসতা ও সন্ত্রাসের বিরোধী এবং সব সময়ই শান্তি এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিতে বিশ্বাসী। বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ। ঐতিহাসিককাল থেকেই এ দেশে বিভিন্ন ধর্মের মানুষ মিলে-মিশে একসঙ্গে বসবাস করছে এবং প্রত্যেকেই তার নিজ ধর্ম স্বাধীনভাবে পালন করছে।
বাংলাদেশে হিন্দু নির্যাতনের মিথ্যা অভিযোগ তুলে এর প্রতিক্রিয়া হিসেবে ভারত মোস্তাফিজকে আইপিএল থেকে বাদ দিয়েছে। অথচ ভারতেই মসজিদ ভেঙে মন্দির করা হয়েছে। গরুর মাংস খাওয়ার অপরাধে অনেক মুসলমানকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। হিজাব পরিধান করায় বহু নারীকে লাঞ্ছিত করা হয়েছে। মুসলমানদের জোর করে ‘হরে কৃষ্ণ, হরে রাম’ বলানোর মতো ঘটনাও ঘটেছে। এভাবে ভারতেই সংখ্যালঘুরা প্রায়ই হেনস্তার শিকার। বাংলাদেশের পেসার মোস্তাফিজুর রহমান একজন অত্যন্ত উঁচুমানের ক্রিকেটার। তিনি পেশাদার ক্রিকেটার এবং রাজনীতির সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক নেই। তিনি কোনো রাজনৈতিক দলের কর্মী নন এবং কোনো ধরনের রাজনৈতিক তৎপরতার সঙ্গেও যুক্ত নন। অথচ ভারত তাকে বলির পাঁঠা বানিয়েছে।
লেখক : ব্যাংকার
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

