অফিস ছুটি এক দিন বাড়ানো কেন জরুরি

অনিক কুমার মণ্ডল

অফিস ছুটি এক দিন বাড়ানো কেন জরুরি

জ্বালানি সংকট কোনো সাময়িক অস্বস্তির নাম নয়; এটি অর্থনীতি, প্রশাসন, শিল্প, পরিবহন এবং জনজীবনের ওপর সরাসরি আঘাত হানা এক গভীর জাতীয় সংকট। এমন সংকটে রাষ্ট্রের প্রতিটি পদক্ষেপ হওয়া উচিত সুস্পষ্ট, কার্যকর ও ফলদায়ক। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, সংকট যত বড়, আমাদের কিছু সিদ্ধান্ত ততটাই ছোট, দুর্বল । প্রতিদিন অফিস সময় এক ঘণ্টা কমানোর সিদ্ধান্ত তারই একটি উদাহরণ। কাগজে এটি ‘কৃচ্ছ্রসাধন’, বাস্তবে এটি ‘প্রহসন’। কারণ, এতে সংকটের মূলে আঘাত করা হয়নি; বরং জনগণকে বোঝানোর চেষ্টা করা হয়েছে, কিছু একটা করা হচ্ছে।

বাস্তবতা হচ্ছে, একটি অফিসের জ্বালানি ব্যয় শুধু দিনের শেষ এক ঘণ্টার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে না। অফিস খোলার সঙ্গে সঙ্গেই পুরো অবকাঠামো চালু হয়ে যায়। শীতাতপ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা, আলোকসজ্জা, লিফট, কম্পিউটার, প্রিন্টার, সার্ভার, ইন্টারনেট, নিরাপত্তাব্যবস্থা—এমনকি অনেক ক্ষেত্রে জেনারেটর প্রস্তুত অবস্থায় থাকে। ব্যবহার করতে হয় সব সরকারি যানবাহন। অর্থাৎ অফিস একবার সচল হলে ‘বেস লোড’ বা ন্যূনতম জ্বালানি ব্যয় প্রায় নিশ্চিত। সেখানে শেষ এক ঘণ্টা কেটে দিলে কাগজে হয়তো সাশ্রয়ের অঙ্ক দাঁড় করানো যায়, কিন্তু বাস্তবে তাতে উল্লেখযোগ্য কোনো পরিবর্তন আসে না। এ এক ধরনের আত্মপ্রবঞ্চনা যেখানে সিদ্ধান্ত আছে; কিন্তু ফল নেই; বিজ্ঞপ্তি আছে, কিন্তু কার্যকারিতা নেই।

বিজ্ঞাপন

প্রশ্ন হচ্ছে, এক ঘণ্টা কমিয়ে আনলে কী অর্জিত হলো? অফিসের কাজ কি কমেছে? ফাইলের চাপ কি কমেছে? নাগরিক সেবা কি সহজ হয়েছে? বাস্তব অভিজ্ঞতা বলছে, না। বরং আট ঘণ্টার কাজ সাত ঘণ্টায় গুঁজে দেওয়ার ফলে কর্মীদের ওপর চাপ বেড়েছে, সেবাগ্রহীতাদের ভিড় বেড়েছে, প্রশাসনিক জটিলতা বেড়েছে এবং অদৃশ্যভাবে কাজের অদক্ষতা আরো তীব্র হয়েছে। যে কাজের জন্য মানুষ সকাল থেকে লাইনে দাঁড়ায়, সেই কাজের সময় সংকুচিত হলে জ্বালানি সাশ্রয়ের চেয়ে বেশি হয় সময়ের অপচয়, জনভোগান্তি এবং কর্মঘণ্টার বিকৃত ব্যবহার। অর্থাৎ সিদ্ধান্তটি জ্বালানি বাঁচানোর চেয়ে মানুষের ধৈর্য ক্ষয় করেছে বেশি।

এখানেই আসে প্রকৃত বিকল্পের প্রশ্ন। প্রতিদিন এক ঘণ্টা কমানোর চেয়ে সপ্তাহে এক দিন অফিস সম্পূর্ণ বন্ধ রাখা অনেক বেশি যৌক্তিক, বাস্তবসম্মত এবং ফলপ্রসূ হতো। কারণ, ‘partial cut’ আর ‘full shutdown’ এক জিনিস নয়। এক ঘণ্টা কমানো মানে চলমান ব্যবস্থার সামান্য ছাঁটাই; কিন্তু এক দিন বন্ধ মানে একটি পূর্ণ কর্মদিবসে জ্বালানি ব্যবহার বড় পরিসরে বন্ধ। জ্বালানি সংকটে দরকার ছিল এমন পদক্ষেপ, যা সংখ্যায় বোঝা যায়, শুধু ঘোষণায় নয়।

আরো বড় কথা হলো, জ্বালানিসংকটের সময়ে রাষ্ট্রের সিদ্ধান্তে ‘সাহস’ থাকতে হয়। সংকট যখন বাস্তব, তখন প্রতিক্রিয়াও হতে হবে বাস্তব। দুর্বল সিদ্ধান্ত দিয়ে শক্ত সংকট মোকাবিলা হয় না। এক ঘণ্টা অফিস সময় কমানো আসলে এমন এক সিদ্ধান্ত, যা দেখায় রাষ্ট্র সমস্যা স্বীকার করছে, কিন্তু সমস্যার গভীরে যেতে চাইছে না। সংকট ব্যবস্থাপনা কোনো প্রচারমূলক অনুশীলন নয়, এটি ফলের পরীক্ষা। আর সেই পরীক্ষায় এক ঘণ্টা কমানোর সিদ্ধান্ত খুব শক্তভাবে উত্তীর্ণ হয়েছে, এ কথা বলা কঠিন।

বাংলাদেশের বাস্তবতা আরো কঠিন। আমরা এখনো জ্বালানি আমদানিনির্ভর। আন্তর্জাতিক বাজারে তেল-গ্যাস-এলএনজির মূল্য বাড়লে তার ধাক্কা সরাসরি পড়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনে, শিল্পে, পরিবহনে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে এবং শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের জীবনে। এমন অবস্থায় অর্ধেক-অধূরো পদক্ষেপ আসলে সমস্যাকে দীর্ঘায়িত করে। কারণ সংকটের চিকিৎসা যদি প্রতীকী হয়, তবে তার ব্যথা বাস্তবই থেকে যায়। এক ঘণ্টা কমিয়ে প্রশাসনিক সময় সংকুচিত করা যায়, কিন্তু জাতীয় জ্বালানি ব্যবস্থার ওপর চাপ কমানো যায় না, এ সত্য যত দ্রুত স্বীকার করা হবে, ততই ভালো।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও উপেক্ষা করা উচিত নয়। আধুনিক প্রশাসন এখন শুধু অফিসকক্ষনির্ভর নয়। অনলাইন ফাইল, ভার্চুয়াল মিটিং, রোটেশনাল ডিউটি, সীমিত উপস্থিতি—এসব ব্যবস্থার মাধ্যমে জরুরি সেবা সচল রেখেও সপ্তাহে এক দিন সাধারণ প্রশাসনিক কার্যক্রম বন্ধ রাখা সম্ভব। হাসপাতাল, বিদ্যুৎ, পানি, গ্যাস, নিরাপত্তা, জরুরি ব্যাংকিং—এসব খাত আলাদা ব্যবস্থা নিয়ে চলতে পারে। কিন্তু যেসব খাত কাগুজে বা রুটিন প্রশাসনিক কার্যক্রমে আবদ্ধ, সেখানে পূর্ণ এক দিন বন্ধ রাখা অসম্ভব ছিল, এ দাবি গ্রহণযোগ্য নয়। বরং সেটিই হতো কার্যকর সংকট ব্যবস্থাপনার পরিচয়।

সবচেয়ে দুঃখজনক হলো, এ ধরনের অকার্যকর সিদ্ধান্ত জনগণের আস্থা ক্ষয় করে। মানুষ যখন দেখে, ত্যাগ স্বীকারের আহ্বান আছে; কিন্তু তাতে বাস্তব ফল নেই, তখন তারা সিদ্ধান্তকে গুরুত্ব দেওয়া বন্ধ করে। সংকটের সময়ে এটি অত্যন্ত বিপজ্জনক। কারণ রাষ্ট্র যদি কঠিন সময়েও দৃশ্যমান ফল দিতে না পারে, তবে কৃচ্ছ্রসাধনের বার্তাও একসময় কানে পৌঁছায় না। জ্বালানি সাশ্রয় তখন নীতির বিষয় না থেকে শুধু বিজ্ঞপ্তির ভাষা হয়ে দাঁড়ায়।

লেখক : কর্মরত, বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস)

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন