যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পাকিস্তানে অনুষ্ঠিত সাম্প্রতিক আলোচনা কোনো চূড়ান্ত ফল ছাড়াই শেষ হওয়ায় পরিস্থিতি এখন আরো অনিশ্চিত ও উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। দীর্ঘ সময় ধরে চলা এই আলোচনায় উভয় পক্ষের মধ্যে মৌলিক মতপার্থক্য এতটাই গভীর যে, তাৎক্ষণিক কোনো সমঝোতার সম্ভাবনা খুবই সীমিত বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। এই আলোচনার ব্যর্থতা মূলত দুই পক্ষের অবস্থানের মৌলিক পার্থক্যের কারণেই ঘটেছে। যুক্তরাষ্ট্র চেয়েছে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ, বিশেষ করে ইউরেনিয়ামসমৃদ্ধকরণ সীমিত করা এবং সামরিক সক্ষমতা কমানো।
অন্যদিকে ইরান এসব দাবিকে তার সার্বভৌম অধিকারের পরিপন্থী হিসেবে দেখছে এবং নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, নিরাপত্তা নিশ্চয়তা ও আঞ্চলিক ভূমিকাকে স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি জানিয়েছে। এ দুই অবস্থান আসলে শুধু আলোচনা-সাপেক্ষ বিষয় নয়; এগুলো উভয় দেশের জাতীয় নিরাপত্তা নীতির মূলভিত্তি, যার ফলে সমঝোতা অর্জন অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। বিশ্বাসের সংকট এই ব্যর্থতার আরেকটি প্রধান কারণ। অতীতে করা চুক্তিগুলো পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়িত হয়নি—এই অভিযোগ ইরানের পক্ষ থেকে বারবার এসেছে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র মনে করে, ইরানের দাবিগুলো কৌশলগতভাবে ঝুঁকিপূর্ণ ও অতিরিক্ত। এই পারস্পরিক অবিশ্বাসের ফলে আলোচনা টেবিলে বসেও উভয় পক্ষ প্রতিরক্ষামূলক অবস্থানে থাকে, ফলে গঠনমূলক অগ্রগতি সম্ভব হয় না।
এই পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলেছে হরমুজ প্রণালির কৌশলগত গুরুত্ব। ইরান এই গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথকে একটি শক্তিশালী লিভারেজ হিসেবে ব্যবহার করছে, যেখানে বিশ্বের একটি বড় অংশের জ্বালানি পরিবহন হয়। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা এই রুটে অবাধ নৌ-চলাচলকে অপরিহার্য মনে করে। ফলে এই একটি ইস্যুই বৈশ্বিক অর্থনীতি ও জ্বালানি নিরাপত্তাকে সরাসরি প্রভাবিত করছে। ইতোমধ্যেই এই উত্তেজনার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ও শেয়ারবাজারে অস্থিরতা দেখা যাচ্ছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, ভবিষ্যৎ আলোচনার অনিশ্চয়তা। ইরানের পক্ষ থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে যে তারা বর্তমান শর্তে আলোচনায় আগ্রহী নয়, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রও তাদের অবস্থান থেকে সরে আসার কোনো লক্ষণ দেখাচ্ছে না। এতে করে একটি কূটনৈতিক অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে, যেখানে কেউই প্রথম ছাড় দিতে প্রস্তুত নয়, কিন্তু সংঘাত বাড়লে তার পরিণতি যে ভয়াবহ হবে—সেটিও উভয় পক্ষই উপলব্ধি করছে।
বর্তমান যুদ্ধবিরতি ভেঙে পড়ার সম্ভাবনাও এখন অনেক বেশি। আলোচনায় অগ্রগতি না হলে যেকোনো সময় আবার সংঘর্ষ শুরু হতে পারে। ইতোমধ্যেই এ সংঘাত আঞ্চলিক সীমা ছাড়িয়ে বৈশ্বিক প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে; নতুন করে যুদ্ধ শুরু হলে তা আরো বিস্তৃত ও অনিয়ন্ত্রিত হয়ে উঠতে পারে। তবে সম্পূর্ণ আশাহীন পরিস্থিতি নয়—এই পর্যবেক্ষণটি কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ইতিহাস দেখায়, গভীর দ্বন্দ্বের ক্ষেত্রেও যখন প্রতিপক্ষরা সরাসরি আলোচনায় বসতে রাজি হয়, তখন তা একটি ‘ডিপ্লোম্যাটিক উইন্ডো’ তৈরি করে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সাম্প্রতিক বৈঠক, ফলহীন হলেও, অন্তত এই ইঙ্গিত দেয় যে উভয় পক্ষই সংঘাতের দীর্ঘমেয়াদি ব্যয় সম্পর্কে সচেতন এবং সম্পূর্ণ সামরিক সমাধানের পথে যেতে চায় না।
প্রথমত, সরাসরি আলোচনায় বসার মধ্যেই একটি গুরুত্বপূর্ণ মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। দীর্ঘদিন ধরে পরোক্ষ বার্তা, মধ্যস্থতাকারী বা তৃতীয় দেশের মাধ্যমে যোগাযোগের পরিবর্তে যখন দুই পক্ষ মুখোমুখি আলোচনা করে, তখন ভুল বোঝাবুঝি কমার সম্ভাবনা তৈরি হয়। এতে করে উভয় পক্ষ একে অন্যের ‘রেড লাইন’, নিরাপত্তা উদ্বেগ এবং রাজনৈতিক সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে আরো স্পষ্ট ধারণা পায়। যদিও তাৎক্ষণিক ফল আসে না, তবু ভবিষ্যৎ সমঝোতার ভিত্তি তৈরি হয়।
দ্বিতীয়ত, ধাপে ধাপে সমঝোতার ধারণাটি এখানে অত্যন্ত কার্যকর হতে পারে। অতীতে দেখা গেছে, এক ধাপে বড় চুক্তি করার চেষ্টা প্রায়ই ব্যর্থ হয়, কারণ এতে উভয় পক্ষকেই একসঙ্গে অনেক বড় ছাড় দিতে হয়, যা রাজনৈতিকভাবে কঠিন। তার পরিবর্তে ‘ফেজড অ্যাপ্রোচ’ গ্রহণ করলে ছোট ছোট বিষয়ে আংশিক সমঝোতা সম্ভব হয়। যেমন—মানবিক সহায়তা, বন্দিবিনিময়, সীমিত নিষেধাজ্ঞা শিথিলকরণ অথবা পারমাণবিক কার্যক্রমে স্বচ্ছতা বৃদ্ধির মতো বিষয়গুলোয় প্রথমে অগ্রগতি আনা যেতে পারে। এসব ছোট সফলতা ধীরে ধীরে পারস্পরিক আস্থা তৈরি করে এবং বড় চুক্তির দিকে পথ খুলে দেয়।
তৃতীয়ত, তৃতীয় পক্ষের মধ্যস্থতা এই প্রক্রিয়াকে গতিশীল করতে পারে। সরাসরি দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় যেখানে আস্থার সংকট প্রবল, সেখানে নিরপেক্ষ বা তুলনামূলকভাবে গ্রহণযোগ্য কোনো রাষ্ট্র বা আন্তর্জাতিক সংস্থা মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করলে উভয় পক্ষই কিছুটা স্বস্তি পায়। মধ্যস্থতাকারী পক্ষ প্রস্তাব তৈরি, সমঝোতার কাঠামো নির্ধারণ এবং চুক্তি বাস্তবায়নে পর্যবেক্ষকের ভূমিকা রাখতে পারে। এতে করে প্রতিশ্রুতিভঙ্গের আশঙ্কাও কমে।
চতুর্থত, আস্থা বৃদ্ধির কার্যকর পদক্ষেপ বা Confidence-Building Measures (CBMs) অত্যন্ত জরুরি। বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় বাধা হলো পারস্পরিক অবিশ্বাস। এই অবিশ্বাস কমাতে হলে এমন কিছু বাস্তব পদক্ষেপ নিতে হবে, যা উভয় পক্ষের কাছে দৃশ্যমান ও যাচাইযোগ্য। যেমন—সামরিক উত্তেজনা কমানো, উসকানিমূলক বক্তব্য পরিহার, নির্দিষ্ট কার্যক্রমে স্বচ্ছতা বজায় রাখা, কিংবা আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের সীমিত প্রবেশাধিকার দেওয়া। এসব পদক্ষেপ ছোট হলেও এর প্রভাব বড়, কারণ এগুলো ধীরে ধীরে বিশ্বাস পুনর্গঠন করে।
তবে এই পুরো প্রক্রিয়াটি সহজ নয়। অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ, জাতীয়তাবাদী মনোভাব, আঞ্চলিক মিত্রদের স্বার্থ এবং বৈশ্বিক শক্তির প্রতিযোগিতা—সবকিছুই এই কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে জটিল করে তোলে। তবু বাস্তবতা হলো, দীর্ঘ মেয়াদে কোনো পক্ষই সংঘাতের ধারাবাহিকতা বহন করতে পারবে না। অর্থনৈতিক চাপ, সামরিক ঝুঁকি এবং আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা—সবকিছু মিলিয়ে শেষ পর্যন্ত কূটনৈতিক সমাধানই একমাত্র টেকসই পথ। সুতরাং, বর্তমান পরিস্থিতি যদিও অচলাবস্থার মতো মনে হচ্ছে, তবু এর ভেতরেই সম্ভাবনার বীজ রয়েছে। সঠিক কৌশল, ধৈর্য এবং বাস্তববাদী নেতৃত্বের মাধ্যমে এই ব্যর্থ আলোচনা ভবিষ্যতের সফল চুক্তির ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে। বর্তমান বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে এই তিনটি সম্ভাব্য দৃশ্যপট শুধু তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ নয়; বরং প্রতিটির পেছনে সুস্পষ্ট কৌশলগত গতিশীলতা, ঝুঁকি এবং বৈশ্বিক প্রভাব জড়িত রয়েছে—বিশেষত যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পারস্পরিক অবস্থান বিবেচনায়।

প্রথম দৃশ্যপট—যুদ্ধবিরতি ভেঙে আবার সংঘর্ষ শুরু হওয়া—সবচেয়ে তাৎক্ষণিক এবং বাস্তবসম্মত ঝুঁকি হিসেবে দেখা দিচ্ছে। কারণ আলোচনার ব্যর্থতা উভয় পক্ষের কূটনৈতিক বিকল্পকে সংকুচিত করে এবং সামরিক বিকল্পকে তুলনামূলকভাবে বেশি সক্রিয় করে তোলে। এই পরিস্থিতিতে কোনো ছোট ঘটনা, ভুল হিসাব বা উসকানিমূলক পদক্ষেপ দ্রুত বড় সংঘর্ষে রূপ নিতে পারে। বিশেষ করে, পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল এবং হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা বৃদ্ধি পেলে তা সরাসরি বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে আঘাত হানবে। তেলের দাম হঠাৎ বেড়ে যেতে পারে, যা বিশ্বব্যাপী মুদ্রাস্ফীতি বাড়াবে এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোকে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করবে। একই সঙ্গে আঞ্চলিক মিত্র ও প্রক্সি শক্তিগুলোর সম্পৃক্ততা সংঘাতকে আরো বিস্তৃত ও জটিল করে তুলতে পারে, যা একসময় নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার ঝুঁকি সৃষ্টি করবে।
দ্বিতীয় দৃশ্যপট—দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা বা ‘না যুদ্ধ, না শান্তি’ অবস্থা—একটি ধীর কিন্তু গভীর সংকটের জন্ম দেয়। এই পরিস্থিতিতে সরাসরি বড় যুদ্ধ না হলেও উত্তেজনা স্থায়ীভাবে বিদ্যমান থাকে। সীমিত আকারের সংঘর্ষ, প্রক্সি যুদ্ধ, সাইবার আক্রমণ বা অর্থনৈতিক চাপ অব্যাহত থাকতে পারে। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে অনিশ্চয়তা স্থায়ী রূপ নেয়, বিনিয়োগ কমে যায় এবং জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা নিয়মিত হয়ে দাঁড়ায়। রাজনৈতিকভাবে এটি সবচেয়ে জটিল অবস্থা, কারণ এতে কোনো পক্ষই পরাজয় স্বীকার করে না, আবার শান্তির জন্য প্রয়োজনীয় আপসও করে না। ফলে একটি ‘স্থায়ী সংকট’ তৈরি হয়, যা ধীরে ধীরে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে দুর্বল করে এবং কূটনীতির কার্যকারিতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
তৃতীয় দৃশ্যপট—ধীরে ধীরে কূটনৈতিক অগ্রগতি—সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত হলেও বাস্তবায়নে সবচেয়ে কঠিন। এর জন্য উভয় পক্ষকেই তাদের সর্বোচ্চ অবস্থান থেকে কিছুটা সরে এসে বাস্তববাদী সমঝোতার পথে হাঁটতে হবে। এটি সাধারণত এক ধাপে সম্ভব হয় না; বরং ধাপে ধাপে আস্থা গড়ে তোলা, আংশিক সমঝোতা এবং তৃতীয় পক্ষের মধ্যস্থতার মাধ্যমে এগোতে হয়। উদাহরণস্বরূপ, সীমিত পর্যায়ে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা, পারমাণবিক কার্যক্রমে আংশিক স্বচ্ছতা আনা বা আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে আলাদা সংলাপ শুরু করা—এ ধরনের পদক্ষেপ ধীরে ধীরে একটি বড় চুক্তির ভিত্তি তৈরি করতে পারে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক চাপ, অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং পারস্পরিক অবিশ্বাস এই প্রক্রিয়াকে ধীর এবং অনিশ্চিত করে তুলেছে।
সব মিলিয়ে দেখা যায়, প্রথম দুটি দৃশ্যপট—সংঘর্ষ বা অচলাবস্থা—স্বল্প মেয়াদে বেশি সম্ভাব্য আর তৃতীয়টি—কূটনৈতিক সমাধান—দীর্ঘ মেয়াদে একমাত্র টেকসই পথ হলেও তা অর্জনের জন্য সময়, ধৈর্য এবং সাহসী নেতৃত্ব প্রয়োজন। যতক্ষণ পর্যন্ত উভয় পক্ষ কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতার পরিবর্তে পারস্পরিক স্বার্থের একটি ভারসাম্য খুঁজে না পায়, ততক্ষণ এই তিনটি দৃশ্যপটের মধ্যেই বিশ্ব ঘুরপাক খেতে থাকবে। সামগ্রিকভাবে বলা যায়, এই আলোচনার ব্যর্থতা প্রমাণ করে যে উভয় পক্ষই এখনো আপসের জন্য প্রস্তুত নয়। ফলে নিকট ভবিষ্যতে স্থায়ী শান্তির সম্ভাবনা ক্ষীণ, বরং অনিশ্চয়তা ও ঝুঁকির মাত্রাই বেশি। যতক্ষণ না বাস্তবসম্মত সমঝোতা এবং পারস্পরিক আস্থার ভিত্তিতে একটি দৃঢ় চুক্তি হয়, ততক্ষণ এই সংকট বিশ্ব রাজনীতি ও অর্থনীতির ওপর একটি স্থায়ী চাপ হিসেবে রয়ে যাবে।
লেখক : অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তা
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

