বাজেটে অবহেলিত কৃষি

ফরিদা-আখতার
ফরিদা আখতার

বাজেটে অবহেলিত কৃষি

বিএনপি সরকার ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট জাতীয় সংসদে ঘোষণা করেছে। বিশাল বাজেট। অনেক খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি পেয়েছে। আমি কৃষি খাতের বরাদ্দ কত হয়েছে দেখার জন্য বাজেটে খুঁজেছি। বিস্ময়কর বিষয় হলো কৃষি খাতে বরাদ্দের বিষয়টি পত্রপত্রিকায় এত গৌণভাবে এসেছে যে, টর্চ দিয়ে খুঁজেও বিশেষ কিছু পাওয়া যাচ্ছে না। হ্যাঁ, বাজেট বরাদ্দ অবশ্যই হয়েছে। কৃষি, খাদ্য এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের জন্য মোট ৪৩ হাজার ৩৩৫ কোটি টাকা বরাদ্দ হয়েছে, যা দেশের জিডিপির শূন্য ০.৬৩ শতাংশ। গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে এ খাতের জন্য ৩৭ হাজার ১২৬ কোটি টাকা (জিডিপির ০.৬১ শতাংশ) বরাদ্দ ছিল। মোট ৬ হাজার ২০৯ কোটি টাকা বরাদ্দ বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে। এই বৃদ্ধি খুবই সামান্য। কৃষির এই বরাদ্দ মোট বাজেটের ৩.২ শতাংশ, যা অন্যান্য খাতের তুলনায় সর্বনিম্ন (জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাত বাদ দিয়ে)।

কৃষির নামে বরাদ্দকৃত এই বাজেটে আরো দুটি ভাগীদার আছে। ভাগীদাররা হচ্ছে খাদ্য এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাত। অথচ কৃষি, খাদ্য এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ তিনটি ভিন্ন ও স্বতন্ত্র মন্ত্রণালয়, কিন্তু এবারে সরকার কৃষি, খাদ্য এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ গুচ্ছ করে একসঙ্গে করেছে। একজন পূর্ণ মন্ত্রী আছেন, যিনি কৃষি ও খাদ্য মন্ত্রণালয় দেখছেন, আর একজন প্রতিমন্ত্রী দেখছেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়। সরকারের বাজেট ঘোষণায় এখনো পরিষ্কার নয়, কৃষি আলাদাভাবে কত বরাদ্দ পাচ্ছে; তেমনি খাদ্য আলাদাভাবে এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ কত পাচ্ছে, তা আমরা এখনো জানি না। তাদের কাজ আলাদা, অতএব তাদের বরাদ্দ অনুযায়ী কাজ করতে হবে। প্রয়োজনের তুলনায় এই বরাদ্দ সব সময়ের মতো এবারও অপ্রতুল।

বিজ্ঞাপন

সরকার খাদ্য মজুত ও সংগ্রহের প্রতি নজর দেয় অনেক বেশি। অর্থমন্ত্রী জানিয়েছেন ২০২৬-২৭ অর্থবছরে খাদ্যশস্য ধারণক্ষমতা ২৪ লাখ ৫০ হাজার মেট্রিক টনে এবং সংগ্রহ লক্ষ্যমাত্রা ৪১ লাখ ২৯ হাজার মেট্রিক টনে উন্নীতকরণের পদক্ষেপ নিয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে খাদ্যশস্য সংগ্রহের সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩৮ লাখ ১৯ হাজার মেট্রিক টন।

এখানে তিনটি মন্ত্রণালয়ের জন্য একটি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, সেটা হচ্ছে ৪৩ হাজার ৩৩৫ কোটি টাকা। কৃষি মন্ত্রণালয়ের কাজ খাদ্যফসলসহ সব ধরনের কৃষি ফসলের উৎপাদন বাড়ানো। বড় দাগে এই মন্ত্রণালয়ের মূল দায়িত্ব হচ্ছে খাদ্যফসল বিশেষ করে ধান উৎপাদন করে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। আমাদের দেশে তিনটি মৌসুমে বছরে প্রায় ৩.৯ কোটি মেট্রিক টন ধান উৎপাদিত হয়। বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের হিসাব অনুযায়ী দেশে বার্ষিক ধানের চাহিদা হচ্ছে প্রায় সাড়ে তিন কোটি থেকে তিন কোটি ৮০ লাখ মেট্রিক টন। বন্যা, খরা কিংবা প্রাকৃতিক দুর্যোগে উৎপাদনে ঘাটতি হলে খাদ্য মন্ত্রণালয় চাল আমদানি করে বাজার স্থিতিশীল রাখে। তাদের লক্ষ্য দেশের অভ্যন্তরীণ বাজার স্থিতিশীল রাখা এবং কৃষকদের ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের মূল কাজ খাদ্যফসল বিশেষ করে ধান উৎপাদন নিশ্চিত করার জন্য কৃষকদের সহায়তা করা এবং সেটা করা হয় বিদ্যমান কৃষিনীতি, যা আসলে কৃষির নীতি নয়, বরং ‘ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফুড প্রোডাকশন’। এই কৃষি মূলত রাসায়নিক সার ও কীটনাশক, গভীর নলকূপ দিয়ে সেচ এবং ধান লাগানো থেকে শুরু করে কাটা পর্যন্ত যন্ত্রের ব্যবহারের ওপর নির্ভরশীল। এই বিকৃত কৃষিব্যবস্থার ত্রুটি এবারের বোরো মৌসুমে দেখা গেছে। ইরানে মার্কিন-ইসরাইলের অবৈধ ও আগ্রাসী যুদ্ধের কারণে সারা দেশে জ্বালানি সংকটের সময়ে বোরো ফসলে ডিজেল সংকটের কারণে সেচ দেওয়া সম্ভব হয়নি; এবং হাওরে অসময়ে বৃষ্টিতে প্রায় পাকা ধান নষ্ট হয়ে গেছে। এই সময় দ্রুত ধান কাটার জন্য শ্রমিক পাওয়া যায় নি, এমনকি এতদিন কৃষকদের মিথ্যা আশ্বাস দেওয়া সেই কম্বাইন্ড হারভেস্টার মেশিনও কাদায় নামতে পারেনি। হাওরের একটি মাত্র কৃষি ফসল বোরো ধান, কৃষকের চোখের সামনে পানিতে ডুবে নষ্ট হয়ে গেল। বলাবাহুল্য, হাওরে এখন যে ধান উৎপাদিত হয়, তা অধিকাংশ উচ্চ ফলনশীল ও হাইব্রিড জাতের। বর্তমানে ধানের তিনটি মৌসুমের মধ্যে বোরো মৌসুম থেকে আসে ৫৫ শতাংশ এবং হাওরে মোট বোরো ধানের প্রায় ২০ শতাংশ উৎপাদিত হয়।

এ বছর হাওরে বোরো ধানের ক্ষতির পরিমাণ পত্রপত্রিকা থেকে জানা গেছে দুই লাখ ১৪ হাজার মেট্রিক টন এবং প্রায় দুই লাখ কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। কিন্তু বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী কৃষিতে কৃষকের বিপর্যয়সহ টিকে থাকার নানা চ্যালেঞ্জের কথা বেমালুম ভুলে গেলেন। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য কোনো প্রণোদনা দিলেন না। আফসোস।

কৃষিতে বরাদ্দ মানে সার-কীটনাশকে ভর্তুকি দেওয়া, অর্থাৎ বিষ কোম্পানি ও সার কোম্পানির মুনাফা নিশ্চিত করা। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে কৃষি খাতের সম্প্রসারণ ও উৎপাদন খরচ কমানোর লক্ষ্যে সার ও কীটনাশকের ওপর বিদ্যমান সাড়ে সাত শতাংশ ভ্যাট ও কর পুরোপুরি প্রত্যাহার করছে সরকার। কিন্তু বুঝতে হবে এই সুবিধা কৃষকের জন্য আসছে না, আসছে সার ও কীটনাশক ব্যবসায়ীদের জন্য। যেখানে সার ও বিষনির্ভর কৃষিব্যবস্থা থেকে সরে আসা কৃষিনীতির প্রধান মেরুদণ্ড হওয়ার কথা ছিল, সরকার তার উল্টোটা সবসময় করে আসছে। সার-কীটনাশকের খরচ আছে অস্বীকার করার উপায় নেই, কিন্তু অন্যান্য খরচও তো আছে। যেমন ধান লাগানো ও ধান কাটার জন্য কৃষিশ্রমিকের খরচ, সেচের পানির খরচ, উৎপাদন-পরবর্তী প্রক্রিয়ার খরচ প্রভৃতি। কিন্তু সেসব খরচের দায় সরকার নিচ্ছে না। তার চেয়েও জরুরি বিষয় হচ্ছে, উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা, যা বেশিরভাগ সময় উৎপাদন খরচের চেয়ে কম থাকে এবং তাই কৃষকের দেনা কমে না। খাদ্য আমদানিসহ সরকারের বাণিজ্যনীতি সবসময়ই ব্যবসায়ীদের স্বার্থ রক্ষা করে এবং সরাসরি কৃষকের স্বার্থের বিরুদ্ধে কাজ করে। অথচ বাজেটে এ বিষয়ে কোনো কথা নেই। ১০ হাজার টাকা কৃষি ঋণ মওকুফ করা এবং কৃষক কার্ডের সুবিধা সব কৃষক পাবে, তার কোনো গ্যারান্টি কি আছে?

তাছাড়া জলবায়ু পরিবর্তন, জ্বালানি সমস্যাসহ কৃষির উৎপাদনশীলতা যেভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, সেজন্য সার-কীটনাশকে ভর্তুকির চেয়েও বেশি দরকার কৃষিনীতিকে নতুনভাবে ঢেলে সাজানো। এই কৃষিব্যবস্থা ১৮ কোটি মানুষের নিরাপদ খাদ্য জোগান দিতে পারছে না। খাদ্যে অতিরিক্ত কীটনাশকের ব্যবহারে ক্যানসারসহ অসংক্রামক রোগের বিস্তার ঘটছে, যা মোট মৃত্যুর প্রায় ৭১ শতাংশ। স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়ালেই স্বাস্থ্য পরিস্থিতি উন্নত হবে না, যদি খাদ্য উৎপাদন নিরাপদ করা না হয়।

জাতীয় অর্থনীতিতে কৃষির অবদান ক্রমেই কমে আসছে, এখন তা দাঁড়িয়েছে মাত্র ১০.৯ শতাংশে। ১৯৭৫ সালে বাংলাদেশের অর্থনীতি কৃষিনির্ভর ছিল, যেখানে কৃষির অবদান ছিল ৬২ শতাংশ। কিন্তু দেশ ক্রমে শিল্পায়ন (৩৪ শতাংশ) এবং সেবা খাতের (৫১ শতাংশ) দিকে এগোচ্ছে। শিল্পায়ন বলতে তৈরি পোশাকশিল্পই মূলত বোঝায়, যা আমাদের অর্থনীতিতে স্বল্প মেয়াদে কিছু অর্থের জোগান দিলেও দীর্ঘ মেয়াদে উৎপাদনশীল খাত তৈরি করছে না। কৃষির প্রতি সরকারের মনোযোগের অভাবে জিডিপিতে কৃষির অবদান কমে যাওয়া দ্রুত গতিতে ঘটছে। ২০১০ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত এক দশকে কমেছে ১৭ শতাংশ থেকে ১২ শতাংশ। অর্থাৎ ১০ বছরে পাঁচ শতাংশ অবদান কমে গেছে। কৃষির সঙ্গে জড়িয়ে আছে দেশের প্রায় অর্ধেক জনগোষ্ঠীর জীবন-জীবিকা। কৃষি থেকে উৎখাত হলে তাদের শহরে চলে আসতে হয়। তাদের মেয়েরা যায় গার্মেন্ট কারখানায় আর ছেলেরা যায় প্রবাসে শ্রমিক হয়ে। এই সুযোগও ক্রমে সীমিত হয়ে আসছে।

কৃষি বরাদ্দের মধ্যে আর এক ভাগীদার হচ্ছে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাত। এ খাতের মাধ্যমে মাছ, মাংস, দুধ ও ডিমের মতো প্রাণিজ আমিষ সরবরাহ করা হয়। কৃষির মতোই এ খাতের সঙ্গে যুক্ত আছে বিশাল গোষ্ঠী; যেমন জেলে/মৎস্যজীবী, গরু, ছাগল ও হাঁস-মুরগি পালনকারী গরিব নারী এবং লাখ লাখ ছোট খামারি। তারা কী ধরনের বাজেট সুবিধা পাবে, তার কোনো উল্লেখ নেই।

জিডিপিতে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদের অবদান একত্রে প্রায় ৪.৩ শতাংশ। কর্মসংস্থানের দিক থেকে শ্রমজীবী মানুষের ২৫ শতাংশ এ খাতের সঙ্গে যুক্ত। মৎস্য খাতে প্রায় ১৮ লাখ নিবন্ধিত মৎস্যজীবী আছে। প্রাণিসম্পদে যুক্ত আছে প্রায় ১৪ লাখ খামার, যেখানে প্রায় এক কোটি মহিলা গরু-ছাগল ও হাঁস-মুরগি পালনে নিয়োজিত আছে। এক বিশাল জনগোষ্ঠী এ খাতে যুক্ত হয়েও বাজেটের সময় উপেক্ষিত থাকছে।

এবার বাজেটে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদের ভাগে কত বরাদ্দ হবে, তা জানা যায়নি, তবে গত বাজেটের ৩৯ হাজার ৬২০ কোটি টাকার মধ্যে কৃষিফসল খাতে বরাদ্দ ছিল ২৭ হাজার ২২৪ কোটি টাকা (৬৮ শতাংশ), আর মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে ছিল মাত্র ৩ হাজার ৩৯২ কোটি টাকা, মাত্র ৮.৫ শতাংশ ।

সামগ্রিক বাজেটে কৃষিতে অবহেলা বিপজ্জনক। তার মধ্যে আরো বিশেষভাবে অবহেলিত হচ্ছে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাত। অথচ দুটো খাত মিলেই শুধু খাদ্যের জোগান দিচ্ছে না, পুষ্টি নিশ্চয়তা এবং বৈদেশিক মুদ্রা আয়েরও প্রধান ক্ষেত্র হয়ে ওঠার সমূহ সম্ভাবনা ধারণ করে।

কৃষির অবহেলা জনগণের খাদ্য ও পুষ্টির নিরাপত্তা অনিশ্চিত করে তুলবে—এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। এই অবহেলা দেশের অর্থনীতির জন্যে মঙ্গল বয়ে আনবে না।

লেখক : অর্ন্তবর্তীকালীন সরকারের সাবেক উপদেষ্টা

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন