২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভূতপূর্ব গণঅভ্যুত্থানের মুখে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পতন ও ভারতে পলায়নের মধ্য দিয়ে অবসান ঘটে আওয়ামী লীগের টানা প্রায় ১৬ বছরের শাসনের। পরবর্তী সময়ে দলটির রাজনৈতিক কার্যক্রমে সাময়িক নিষেধাজ্ঞা এবং ২০২৫ সালের মে মাসে নির্বাচন কমিশন কর্তৃক নিবন্ধন স্থগিতের ফলে দলটি দৃশ্যত রাজনীতিতে অস্তিত্বের সংকটে পড়ে। ২০২৬ সালের সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ অংশগ্রহণ করতে না পারলেও রাজনৈতিক অঙ্গনে তাদের অনানুষ্ঠানিক উপস্থিতি ছিল। স্থানীয় সরকার নির্বাচন কেন্দ্র করে দলটিকে পুনর্বাসনের চেষ্টা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে এখন নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের এই ফেরার পটভূমি কীভাবে এবং কারা তৈরি করছে, তা গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দৃশ্যমান ও নেপথ্যের কয়েকটি প্রভাবক বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে না পারলেও আওয়ামী লীগ তাদের রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তনের জন্য স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোকে প্রধান হাতিয়ার বা ‘এন্ট্রি পয়েন্ট’ হিসেবে বেছে নিতে চাচ্ছে। এরই মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান বলেছেন, আইনগত বাধা না থাকলে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা অন্যদের মতো স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারবেন। স্থানীয় সরকার নির্বাচন আইন সংশোধন করে দলীয় প্রতীকে নির্বাচনের বিধান বিলোপ করা হয়েছে। ফলে নির্বাচন হবে নির্দলীয়। নিবন্ধন স্থগিত থাকা বা কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞা স্থানীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণকে আইনগতভাবে বাধাগ্রস্ত করতে পারবে না বলে আশা করছে দলটি। উপদেষ্টার বক্তব্য কাজে লাগিয়ে বিদেশে পলাতক নেতারা তৃণমূল নেতাকর্মীদের নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত ও উজ্জীবিত করছেন।
স্থানীয় নির্বাচনের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন আইনজীবী সমিতি ও অন্যান্য পেশাজীবী সংগঠনের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ-সমর্থিত প্যানেলগুলোর অনানুষ্ঠানিক অংশগ্রহণ এবং কিছু ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ফলাফল দলটির তৃণমূল নেতাকর্মীদের আবার সংগঠিত হওয়ার সুযোগ করে দিচ্ছে।
আওয়ামী লীগকে সক্রিয় ও সংগঠিত হওয়ার পাটাতন তৈরি করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখছে প্রশাসনের ভেতর ঘাপটি মেরে থাকা ‘আওয়ামী নেটওয়ার্ক’। শেখ হাসিনার ক্ষমতার দেড় দশকে দলীয়করণের মাধ্যমে সিভিল প্রশাসন, পুলিশ ও বিচার বিভাগে যে বিশাল জনবল কাঠামো তৈরি হয়েছিল, দু’বছরে তা পুরোপুরি ভেঙে ফেলা সম্ভব হয়নি। অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার উদ্যোগ এবং পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের নানামুখী পদক্ষেপের পরও প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে আওয়ামী ঘরানার কর্মকর্তাদের একটি বড় অংশ রয়ে গেছে। এরা আড়ালে থেকে দলের অনুকূলে পরিবেশ তৈরি করতে এবং সরকারের নীতিনির্ধারণে পরোক্ষ প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং বর্তমান নির্বাচিত সরকারের সামনে অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দেয়, প্রশাসনে শেখ হাসিনার তিন মেয়াদে গড়ে ওঠা অনুগত কর্মকর্তা ও নেটওয়ার্ক অপসারণ করা। প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে এবং গুরুত্বপূর্ণ পদে ঘাপটি মেরে থাকা দলটির অনুগত কর্মকর্তাদের চিহ্নিত করতে এবং তাদের নিষ্ক্রিয় করতে মূলত বেশ কয়েকটি পদ্ধতি ও প্রশাসনিক কৌশল ব্যবহার করা হয়েছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে। বাধ্যতামূলক অবসর ও ওএসডি করা ছিল এর অন্যতম দিক। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে সুবিধাভোগী এবং রাজনৈতিকভাবে অতিসক্রিয় কর্মকর্তাদের বড় একটি অংশকে সরাসরি দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। সিভিল সার্ভিসের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের (সচিব, অতিরিক্ত সচিব) একটি বড় অংশকে সরকারি চাকরি আইনের আওতায় বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে। যাদের বিরুদ্ধে দলীয় আনুগত্যের তীব্র সন্দেহ রয়েছে, তাদের অনেককে গুরুত্বপূর্ণ দপ্তর থেকে সরিয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে ওএসডি করে রাখা হয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে অবসরে যাওয়ার পরও বহু কর্মকর্তাকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিয়ে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তর ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে শীর্ষ পদে রাখা হয়েছিল। এসব চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাতিল করা হয়েছে। ফলে দলটির শীর্ষ নীতিনির্ধারক কর্মকর্তাদের নেটওয়ার্ক অনেকটাই ভেঙে পড়েছে বলে ধারণা করা হয়েছে।
শেখ হাসিনার শাসন দীর্ঘস্থায়ী করতে এবং টিকিয়ে রাখতে মাঠ প্রশাসন (ডিসি ও এসপি) সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ও বর্তমান বিএনপি সরকার প্রায় সব জেলার ডিসি এবং এসপিদের প্রত্যাহার করে পুলিশ লাইন্স বা মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করে। তাদের স্থলে অতীতে বঞ্চিত বা অপেক্ষাকৃত পেশাদার ও নিরপেক্ষ কর্মকর্তাদের পদায়ন করার কথা বলা হয়েছে। তবে এত বিপুলসংখ্যক বিকল্প কর্মকর্তা না থাকায় অনেক ক্ষেত্রে অযোগ্য, অদক্ষ, এমনকি আওয়ামী লীগ অনুসারীও পদায়িত হয়েছেন। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে যেসব দক্ষ ও যোগ্য কর্মকর্তা কেবল ভিন্ন মতাদর্শ বা রাজনৈতিক কারণে পদোন্নতিবঞ্চিত হয়েছিলেন, কিংবা বাধ্যতামূলক অবসরে গিয়েছিলেন, তাদের অনেককে প্রশাসনে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। অনেককে ভূতাপেক্ষ (অতীতের সময় থেকে কার্যকর) পদোন্নতি দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোয় বসানো হয়েছে, যাতে তারা পুরোনো রাজনৈতিক নেটওয়ার্কের প্রভাব সহজে প্রতিহত করতে পারেন। আবার আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে শেখ হাসিনার বিশ্বস্ত অনেকে ভালো পদ বাগিয়ে নিয়েছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
প্রশাসনে শুদ্ধি অভিযানের মধ্যেও দীর্ঘ ১৫ বছরে প্রশাসনের একদম রুট লেভেল বা তৃণমূল স্তর পর্যন্ত দলীয়করণ হওয়ায় সহসা এই নেটওয়ার্ক সম্পূর্ণ নির্মূল করা সম্ভব হয়নি। অনেক কর্মকর্তা নিজেদের আড়াল করতে খোলস বদল করেছেন। এ কারণে প্রশাসনকে পুরোপুরি গতিশীল ও নিরপেক্ষ করতে সরকার এখনো ধাপে ধাপে যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া ও সংস্কার কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।
পুলিশ প্রশাসনে ব্যাপক রদবদল, সংস্কার এবং আওয়ামী লীগের অনুগত শীর্ষ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হলেও বাহিনীটির ভেতর এখনো তাদের একটি প্রচ্ছন্ন প্রভাব বা অদৃশ্য নেটওয়ার্কের অস্তিত্ব রয়েছে বলে মনে করেন নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
পুলিশে দলটির অনুগতদের নেটওয়ার্কের বর্তমান পরিস্থিতি ও গভীরতা বোঝার জন্য কয়েকটি দিক লক্ষ করা প্রয়োজন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পুলিশের শীর্ষ স্তরে আওয়ামী নেটওয়ার্কে কিছুটা ভাঙন ধরানো গেলেও মধ্য ও তৃণমূল স্তরে প্রভাব রয়ে গেছে। সরকার পরিবর্তনের পর পুলিশের আইজিপি, ডিআইজি, কমিশনার এবং এসপি পর্যায়ের দৃশ্যমান ও অতিসক্রিয় দলীয় কর্মকর্তাদের বড় অংশকে হয় বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে, ওএসডি করা হয়েছে, অথবা তারা আত্মগোপনে গেছেন। তবে সমস্যা রয়ে গেছে এএসপি, ইন্সপেক্টর (ওসি), সাব-ইন্সপেক্টর ও কনস্টেবল পর্যায়ে। শেখ হাসিনার ১৫ বছরে নিয়োগ পাওয়া এই বিশালসংখ্যক পুলিশ সদস্যের একটি বড় অংশের ব্যাকগ্রাউন্ড রাজনৈতিক বা দলীয় সুপারিশের ভিত্তিতে হওয়ায় তাদের অনেকেই এখনো বিভিন্ন থানায় এবং গুরুত্বপূর্ণ ডেস্কে দায়িত্ব পালন করছেন। প্রশাসনে ঘাপটি মেরে থাকার সবচেয়ে বড় কৌশল হলো খোলস বদলানো বা সাময়িকভাবে নিষ্ক্রিয় হয়ে যাওয়া। আওয়ামী লীগ আমলের অনেক সুবিধাভোগী কর্মকর্তা রাতারাতি নতুন সরকারের বা নতুন রাজনৈতিক পরিস্থিতির অনুসারী সেজে নিজেদের আড়াল করার চেষ্টা করছেন। এদের অনেককে ‘সুবিধাবাদী’ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে, যারা সুযোগের অপেক্ষায় মূলত নিষ্ক্রিয় হয়ে বা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে সময় পার করছেন।
এখনো সবচেয়ে ঝুঁকিতে রয়েছে গোয়েন্দা কার্যক্রম ও তথ্য আদান-প্রদানের অদৃশ্য নেটওয়ার্কে। প্রকাশ্যে কোনো রাজনৈতিক তৎপরতা চালাতে না পারলেও পুলিশের ভেতরে থাকা অনুগতদের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ এবং তথ্য ফাঁসের মতো ঘটনা এখনো পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ মামলা, তদন্ত বা অভিযানের আগাম তথ্য অনেক সময় বাইরে থাকা দলটির নেতাকর্মীদের কাছে পৌঁছে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে, যা প্রমাণ করে যে ভেতরের চেইন অব কমান্ড পুরোপুরি নিষ্ক্রিয় করা যায়নি। এই অনুগত নেটওয়ার্কের এক ধরনের ‘অসহযোগিতা’ বা অন্তর্ঘাতমূলক মনোভাবও কাজ করে থাকে।
কাঠামোগতভাবে আওয়ামী লীগের দৃশ্যমান চেইন অব কমান্ড বা সরাসরি সাংগঠনিক নেটওয়ার্কটি পুলিশ প্রশাসনে এখন অনেকটাই দুর্বল ও খণ্ডিত। তবে দেড় দশকের তীব্র দলীয়করণের কারণে বাহিনীর ভেতরে যে আদর্শিক ও ব্যক্তিগত সুবিধার নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছিল, তা রাতারাতি পুরোপুরি নির্মূল করা সম্ভব হয়নি। এই প্রচ্ছন্ন নেটওয়ার্কটি এখনো প্রশাসনের জন্য একটি বড় হুমকি ও অন্তরায় হয়ে দেখা দিয়েছে। তাদের ওপর ভর করে আওয়ামী লীগ সক্রিয় হচ্ছে এবং ক্রমে আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠছে।
এছাড়া আওয়ামী লীগের সক্রিয় হওয়ার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পটভূমিও গুরুত্ব পাচ্ছে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয় পেয়ে বিএনপি সরকার গঠন করলেও দলটির অভ্যন্তরে ও বাইরে নানা কৌশলগত অবস্থান তৈরি হচ্ছে। বিএনপি যেমন একদিকে গণতন্ত্রের বহুত্ববাদে বিশ্বাসী হয়ে সব দলের অংশগ্রহণের কথা বলছে, আবার অন্যদিকে আওয়ামী লীগের সরাসরি পুনর্বাসনের পক্ষেও ভূমিকা নিতে পারছে না।
জামায়াত ক্ষমতার রাজনীতির নানা হিসাব-নিকাশে আওয়ামী লীগের মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে জড়াতে অনাগ্রহী। বরং সংসদের প্রধান বিরোধী দলটি আওয়ামী লীগের উদার বা সমাজে অপেক্ষাকৃত ইতিবাচক অবস্থান আছে, এমন লোকদের সঙ্গে সখ্য গড়ে তুলে নিজ দলের প্রতি আকৃষ্ট করার দিকে মনোযোগ দিয়েছে।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাদের হাত ধরে গঠিত ‘ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি’ (এনসিপি) শুরু থেকেই আওয়ামী লীগের পুনর্বাসনের বিরুদ্ধে সবচেয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। তাদের মতে, জুলাই গণহত্যার অপরাধের বিচার সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত আওয়ামী লীগকে কোনো রাজনৈতিক ছাড় দেওয়া যাবে না। তবে এই রাজনৈতিক দলগুলোর পারস্পরিক দ্বন্দ্বে সৃষ্ট যেকোনো শূন্যতাকেই আওয়ামী লীগ নিজেদের ফেরার সুযোগ হিসেবে দেখছে।
এদিকে যেকোনো নতুন সরকারের আমলেই দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ বা অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মতো সংকট তৈরি হয়। আওয়ামী লীগের সাইবার উইং ও বিদেশে অবস্থানরত নেতারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বর্তমান সরকারের বিভিন্ন ব্যর্থতাকে বড় করে তুলে ধরছেন। বিস্মৃতিপরায়ণতারও সুযোগ নিতে চায় দলটি। ‘আগের সরকারই ভালো ছিল’—সাধারণ মানুষের এই মনস্তাত্ত্বিক দিকটি পুঁজি করে নিজেদের পক্ষে জনমত গঠনের চেষ্টা চালাচ্ছে দলটির প্রবাসে থাকা নেতৃত্ব।
গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর কোনো রাজনৈতিক দলের আবার রাজনীতিতে ফিরে আসা বা নির্বাচনে জয়ী হয়ে ক্ষমতায় যাওয়ার ঘটনা বিশ্বরাজনীতিতে একেবারে বিরল নয়। তবে এই ফিরে আসার প্রক্রিয়াটি সব জায়গায় একরকম হয় না। কোথাও দুই বছরে ফিরে আসার নজির যেমন আছে, আবার ৩৬ বছর অপেক্ষার দৃষ্টান্তও রয়েছে। কোনো কোনো দল নিজেদের সংস্কার করে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ফিরে এসেছে, আবার কিছু ক্ষেত্রে অভ্যুত্থান-উত্তর শাসনের বিশৃঙ্খলা বা সরকারের ব্যর্থতার সুযোগ নিয়ে পপুলিস্ট বা জনপ্রিয়তাবাদী স্লোগান দিয়ে ফিরেছে।
লাতিন আমেরিকার দেশ বলিভিয়ায় ২০১৯ সালে ব্যাপক গণবিক্ষোভ ও সেনা চাপের মুখে দেশটির বামপন্থি প্রেসিডেন্ট ইভো মোরালেস পদত্যাগ করতে বাধ্য হন এবং দেশ ছাড়েন। মোরালেসের পতনের পর একটি অন্তর্বর্তীকালীন ডানপন্থি সরকার গঠিত হয়। কিন্তু চরম রাজনৈতিক নিপীড়ন ও অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনার কারণে সেই সরকার দ্রুত জনপ্রিয়তা হারায়। ফলে মাত্র এক বছর পর ২০২০ সালের অক্টোবরে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে ইভো মোরালেসের দল লুইস আরসের নেতৃত্বে বিপুল ভোটে জয়ী হয়ে আবার ক্ষমতায় ফিরে আসে।
এশিয়ার ফিলিপাইনের চিত্র অবশ্য ভিন্ন। ১৯৮৬ সালে ফিলিপাইনে ঐতিহাসিক ‘পিপল পাওয়ার রেভল্যুশন’ বা গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে স্বৈরশাসক ফার্দিনান্দ মার্কোস ক্ষমতাচ্যুত হন। দুর্নীতি, মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং সামরিক শাসনের কারণে তাকে সপরিবারে দেশ ছেড়ে পালাতে হয়েছিল। দীর্ঘ তিন দশক ধরে মার্কোস পরিবার ফিলিপাইনের রাজনীতিতে ধীরে ধীরে প্রভাব বিস্তার করে। তারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে ব্যবহার করে ফার্দিনান্দ মার্কোসের স্বৈরাচারী আমলকে ফিলিপাইনের ‘স্বর্ণযুগ’ হিসেবে তরুণ প্রজন্মের কাছে উপস্থাপন করে। ফলস্বরূপ ২০২২ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে গণঅভ্যুত্থানের ৩৬ বছর পর স্বৈরশাসকের ছেলে জুনিয়র ফার্দিনান্দ মার্কোস (বংবং মার্কোস) বিপুল ভোটে দেশের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন।
আরেক ধরনের চিত্র আছে তিউনিসিয়ায়। ২০১১ সালের আরব বসন্তের সূচনা হয়েছিল তিউনিসিয়ার গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে, যেখানে দীর্ঘদিনের স্বৈরশাসক বেন আলী ক্ষমতাচ্যুত হন। বেন আলীর দল ‘আরসিডি’ নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। কিন্তু তার দলের সাবেক প্রযুক্তিবিদ, ধর্মনিরপেক্ষ আমলা এবং প্রবীণ রাজনীতিবিদরা মিলে পরবর্তী সময়ে ‘নিদা তিউনিস’ নামে একটি নতুন দল গঠন করেন। আরব বসন্তের পর গঠিত ইসলামপন্থি সরকারের ব্যর্থতা এবং অর্থনৈতিক স্থবিরতার সুযোগ নিয়ে ২০১৪ সালের সংসদীয় ও প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে এই নিদা তিউনিস পার্টি জয়লাভ করে। অর্থাৎ, পরোক্ষভাবে সাবেক ব্যবস্থার লোকেরাই রাজনীতির মূল ধারায় ফিরে আসে।
বিশ্বের এই উদাহরণগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, জনরোষে বা গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত একটি দল মূলত তিনটি কারণে রাজনীতিতে ফিরে আসতে পারে। প্রথমত, পরবর্তী সরকারের ব্যর্থতায়। গণঅভ্যুত্থানের পর গঠিত নতুন সরকার যদি জনগণের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও জানমালের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়, তবে মানুষের মধ্যে পুরোনো আমলের প্রতি এক ধরনের দুর্বলতা জাগ্রত হয়। দ্বিতীয়ত, ভোটের রাজনীতি ও সাংগঠনিক শক্তি। স্বৈরাচারী বা ক্ষমতাচ্যুত দলগুলোর তৃণমূল পর্যন্ত একটা সুপ্ত নেটওয়ার্ক বা আর্থিক সুবিধাভোগী গোষ্ঠী থেকে যায়। গণতান্ত্রিক নির্বাচনে অভ্যুত্থানের পক্ষের দলগুলো বিভক্ত থাকলে এই সুসংগঠিত ভোটব্যাংক তাদের দ্রুত পুনরুত্থানে সাহায্য করে। আর তৃতীয়ত, নিজেদের সংস্কার। অনেক দল তাদের পুরনো উগ্রপন্থি বা স্বৈরাচারী ইমেজ ঝেড়ে ফেলে নতুন নেতৃত্ব ও আধুনিক জনকল্যাণমুখী কর্মসূচি নিয়ে জনগণের সামনে হাজির হয়।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগ ফেরার বিষয়টি ওপরে বর্ণিত তিনটি ফ্যাক্টর ছাড়াও আরো কিছু বিষয়ের ওপর নির্ভর করবে। তার মধ্যে রয়েছে আঞ্চলিক আধিপত্যবাদী রাষ্ট্রের ভূমিকা এবং ভূরাজনৈতিক সমীকরণ। রাজনীতিতে দলটির ক্রমাগত সক্রিয়তার চেষ্টার পেছনে কাজ করছে অভ্যন্তরীণ টিকে থাকার কৌশল, প্রশাসনের ভেতরে থাকা সুবিধাভোগী গোষ্ঠী, আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতি এবং দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতির একটি যৌথ সমীকরণ। তবে আওয়ামী লীগের দ্রুত বা পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক পুনরুত্থান কতটা সফল হবে, তা নির্ভর করছে দলটির অতীত কর্মকাণ্ডের জন্য অনুশোচনা, জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ, আত্মোপলব্ধি এবং বর্তমান রাজনৈতিক দলগুলোর দূরদর্শিতার ওপর। বিশেষত আওয়ামী লীগ নেত্রী শেখ হাসিনা ও দলটির পলাতক নেতারা ফিরে আসার পর কঠিন প্রতিশোধের যে হুংকার প্রতিদিন দিয়ে চলেছেন, সেটাই তাদের ফেরার পথে নতুন করে বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়াবে। পরিবর্তিত সিভিল, সামরিক ও পুলিশ প্রশাসনের কাছে আওয়ামী লীগের প্রত্যাবর্তন নিজেদের অস্তিত্বের জন্য বড় ঝুঁকি ও গুরুতর হুমকি বলে মনে হওয়াই স্বাভাবিক। তার সঙ্গে বিদ্যমান রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাকর্মীও চরম পরিণতির আশঙ্কায় সর্বশক্তি দিয়ে প্রতিরোধের বিকল্প ভাবতে পারবে না। জুলাইয়ের বাস্তবতা অস্বীকার করে প্রতিশোধ স্পৃহা নিয়ে আওয়ামী লীগের ফেরা কঠিন হবে। তবে তারা দেশে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টিতে অনেকটা সফল হতে পারে। আত্মোপলব্ধি ও উগ্র প্রতিশোধপরায়ণ মনোভাব পরিবর্তন না করলে মার্কোস পরিবারের মতো ৩৬ বছর অপেক্ষা করতে হবে, যদি না বর্তমান ক্ষমতাসীনরা মোটাদাগে ভুল ও ব্যর্থতার পরিচয় দিয়ে পথ সুগম করে দেয়।
লেখক : যুগ্ম সম্পাদক, আমার দেশ ও কলামিস্ট
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন



গজলডোবা ব্যারাজ খুলে দিল ভারত, হু হু করে বাড়ছে তিস্তার পানি
ইরানের সঙ্গে ট্রাম্পের চুক্তি স্বাক্ষরের নেপথ্য গল্প