ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের প্রায় দেড় মাসের নির্বিচার হামলার সময় দেশটির প্রায় ৩০ বিশ্ববিদ্যালয়ে বোমা এবং ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে এগুলো ধ্বংস অথবা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে ইসরাইলি যুদ্ধবিমান। ক্ষতিগ্রস্ত উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি হলো তেহরানের শরিফ প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, যেটিকে অনেকেই যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির (এমআইটি) সঙ্গে তুলনা করেন। উচ্চশিক্ষার বিরুদ্ধে ইসরাইলের এই আগ্রাসনকে অনেক পণ্ডিত ‘শিক্ষাবিদ হত্যা’ বা ‘জ্ঞান হত্যা’ বলে অভিহিত করেছেন।
ইরানের এতগুলো বিশ্ববিদ্যালয়কে টার্গেট করার অনেক কারণ আছে। এসব বিশ্ববিদ্যালয় হলো গবেষণা ও পাণ্ডিত্যের কেন্দ্র। এগুলো যেকোনো শক্তিশালী সমাজের বৈজ্ঞানিক অবকাঠামো গঠন করে। ইরানের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এশিয়া, আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা, ইউরোপ এবং যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মতোই এমন জায়গা, যেখানে চিকিৎসা, প্রকৌশল, স্থাপত্য, কলা, সমাজবিজ্ঞান এবং মানবিক বিদ্যায় অত্যাধুনিক গবেষণা পরিচালিত হয়। এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের মাধ্যমে আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে ইরানের অগ্রগতি অর্জনের পথকে বাধাগ্রস্ত করতেই পরিকল্পিতভাবে দেশটির বিশ্ববিদ্যালয়গুলো হামলার টার্গেট করেছিল ইসরাইল।
ইসরাইলের এই বর্বর হামলার আরো একটি কারণ এটাই যে, তারা এসব বিশ্ববিদ্যালয়কে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। এই বর্বরতা মুসলিম দেশগুলোর উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে ইসরাইলের গভীর ঘৃণার ইতিহাসেরই প্রতিফলন। কিন্তু মার্কিন মিডিয়া তাদের প্রতিবেদনে ইসরাইলের এই বর্বরতাকে এমনভাবে তুলে ধরে যে, এটা তেমন উল্লেখযোগ্য কোনো ঘটনাই নয়।
প্রভাবশালী মার্কিন মিডিয়া নিউ ইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘সরকারি কর্মকর্তা এবং সরকারবিরোধী কর্মী উভয়েই তেহরানের শরিফ প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে হামলার নিন্দা জানিয়েছেন, যেটি ইরানে ইসরাইলের সর্বশেষ লক্ষ্যবস্তু হওয়া উচ্চশিক্ষা কেন্দ্র।’ এই বাক্যটি অবশ্যই একটি বিদ্বেষপূর্ণ ইঙ্গিত বহন করে, যেখানে ‘সরকারি কর্মকর্তা ও সরকারবিরোধী’ শব্দগুলো অনাহুতভাবে টেনে আনা হয়েছে।
একটি প্রধান উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করাকে সেই চিরাচরিত সরকারপন্থি বনাম সরকারবিরোধী দ্বিবিভাজনের ছাঁকনি দিয়ে বিচার করা যায় না, যা নিউ ইয়র্ক টাইমসের মতো পত্রিকা তাদের অভ্যাসবশত ইরানের ক্ষেত্রে ব্যবহার করেছে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে এটাই, একটি দেশের রাজনৈতিক বিভাজন নির্বিশেষে ইরান, ফিলিস্তিন বা লেবাননে একটি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বোমা হামলা করা একটি বর্বর কাজ, একটি জঘন্য অপরাধ।
নিউ ইয়র্ক টাইমসের এই খবরের উদ্দেশ্য সত্য প্রকাশ করা নয়। বরং যখনই ইসরাইলের বর্বরতা দেশটি সম্পর্কে বিশ্ববাসীর সামনে নেতিবাচক খবরকে সামনে আনে, তখন তথ্যকে নিজেদের মতো করে সাজিয়ে নেওয়া এবং নিয়ন্ত্রণ করাই নিউ ইয়র্ক টাইমসের মতো পশ্চিমা মিডিয়াগুলোর কাজ হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু ইরানি শিক্ষাবিদ ও শিক্ষার্থীদের মতে, ইসরাইলের এই হামলা ইরানের সার্বভৌমত্ব এবং প্রযুক্তিগত স্বায়ত্তশাসন মুছে ফেলার একটি পরিকল্পিত তৎপরতা।
যদি প্রতিবেদক তার প্রতিবেদনে প্রেক্ষাপট তুলে ধরার প্রয়োজন মনে করেন, তাহলে তিনি লিখবেন, ‘প্রায়ই যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির (এমআইটি)’ সঙ্গে তুলনা করা হয় তেহরানের শরিফ ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজিকে যেটি কয়েক দশকের পুরোনো একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এটি পশ্চিম এশিয়ার অন্যতম শীর্ষস্থানীয় প্রকৌশল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে ব্যাপকভাবে স্বীকৃত। এর প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের মধ্যে রয়েছেন মরিয়ম মির্জাখানি, যিনি ২০১৪ সালে গণিতের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার ফিল্ডস মেডেল লাভকারী প্রথম নারী এবং প্রথম ইরানি।’ এটাই দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা।
কিন্তু দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসের জায়নবাদী সম্পাদক ও পাঠকরা কি আদৌ জানেন মরিয়ম মির্জাখানি কে ছিলেন? প্রকৃতপক্ষে ইসরাইলপন্থি এই মিডিয়াগুলো তাদের পাঠকদের তথ্য জানানোর কাজে নিয়োজিত নয়, বরং এসব মিডিয়া নিজেদের তৈরি করা বয়ান প্রচারের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য আড়াল করতে ও পাঠকদের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টির কাজেই সবসময় নিয়োজিত থাকে।
‘ইসরাইল’ শব্দটির প্রতি বিশ্বব্যাপী যে বিতৃষ্ণা, তার অনেক কারণ আছে। ইরানে নৃশংসতার মাত্রা ইসরাইলি গণমাধ্যমকেও স্বীকার করতে হয়েছিল। ইসফাহান ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি সম্পর্কে ‘দ্য টাইমস অব ইসরাইল’-এর রিপোর্টে বলা হয়েছিল, ‘বোমাবর্ষণে বিধ্বস্ত বিশ্ববিদ্যালয়কে জাদুঘরে পরিণত করবে ইরান।’
খবরটি বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল এবং ইউনিভার্সিটি ওয়ার্ল্ড নিউজও এ অঞ্চলের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সমাজের ওপর ইসরাইলের অপরাধমূলক ধ্বংসযজ্ঞের বিবরণ নথিভুক্ত করছিল। ইসরাইলি লবি বিপুলসংখ্যক আমেরিকানের ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়ে এই হামলাকে সমর্থন করার জন্য লিন্ডসে গ্রহাম এবং টেড ক্রুজের মতো দুর্নীতিগ্রস্ত মার্কিন রাজনীতিবিদদের সংগঠিত করেছিল।
ভিন্নমতের কেন্দ্র
অন্যান্য দেশের বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলোর মতোই ইরানের বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসও শুধু গবেষণা ও পাণ্ডিত্যের কেন্দ্র নয়। এগুলো ভিন্নমতকে স্তব্ধ করতে চাওয়া একটি রাষ্ট্রের স্বৈরাচারী প্রবণতার বিরুদ্ধে প্রতিরোধেরও কেন্দ্র। বিভিন্ন সময়ে এসব বিশ্ববিদ্যালয় এ ধরনের ভূমিকা পালন করেছে। গত ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে ইরানে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের সময় ইসরাইলের ঘাতক এজেন্টরা সেখানে অনুপ্রবেশ করে বিক্ষোভকারীদের হত্যা করতে শুরু করে, মসজিদ পুড়িয়ে দেয় এবং কোরআনের কপিতে অগ্নিসংযোগ করে। এগুলো নাগরিক স্বাধীনতার জন্য গণঅভ্যুত্থানের স্বাভাবিক প্রকাশ নয়। বরং এগুলো অন্তর্ঘাত করার জন্য পরিকল্পিত কাজ, যাতে ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের সব ধরনের সহায়তার স্পষ্ট প্রমাণ আছে ইরান সরকারের কাছে।
ইসরাইল চায় না তার চারপাশের দেশগুলোর সুস্থ সমাজে এ ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে জ্ঞান-বিজ্ঞান ও আধুনিক প্রযুক্তির চর্চা আরো বিকশিত হোক। ইহুদি বর্ণবাদী দেশটির উদ্দেশ্য হলো তার সামরিক রাষ্ট্রের চারপাশের বিশ্বকে সেই একই অনুর্বর বর্বরতায় পর্যবসিত করা, যেখান থেকে গণহত্যাবাদী জায়নবাদের উদ্ভব হয়েছিল।
ইসরাইলের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশের উচ্চকণ্ঠ ও উৎসাহী সমর্থনে, তাদের কাপুরুষ সেনাবাহিনী ফিলিস্তিন ও লেবাননে একইভাবে উচ্চশিক্ষার কেন্দ্রগুলো ধ্বংস করেছে এবং এখন অন্যত্র বিশেষ করে, তুরস্ক ও পাকিস্তানেও একই কাজ করার প্রকাশ্য হুমকি দিচ্ছে।
তারা তাদের চারপাশের বিশ্বকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হতে দেখতে চায়, যাতে তাদের বর্ণবাদী ও বসতি স্থাপনকারী সামরিক রাষ্ট্রটি এ অঞ্চলে নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখতে পারে।
এসব অপরাধ করার সময় ইসরাইলি নেতারা বিশেষ করে, নেতানিয়াহু, ইতামার বেন-গভির, বেজালেল স্মোট্রিচ, নাফতালি বেনেট, ইসরাইল কাটজ, ড্যানি ড্যানন প্রমুখ উগ্রপন্থি নেতার হিংস্র মুখগুলোর দিকে তাকান। তাদের প্রতিটি মুখ হিংস্রতা ও ধ্বংসের প্রতিচ্ছবি মধ্যপ্রাচ্যে পশ্চিমাদের চাপিয়ে দেওয়া বর্বরতার উদাহরণ হচ্ছে ইসরাইল।
পশ্চিমা ক্যাম্পাসগুলোয় ভীতি প্রদর্শন
অক্সফোর্ড ও কেমব্রিজ, কলাম্বিয়া এবং হার্ভার্ড, শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয় ও স্ট্যানফোর্ডে যদি ইসরাইল বোমা হামলা চালাত, তাহলে ইউরোপীয় এবং আমেরিকানরা কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাত? তবে আক্রমণ ঠিকই হচ্ছে, কিন্তু সেটা ভিন্নভাবে। ইসরাইলি এবং ইসরাইলপন্থি জায়নবাদীরা কয়েক দশক ধরেই এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে আক্রমণ করে আসছে। তবে বোমা দিয়ে নয়, বরং অপবাদ ও ভীতি প্রদর্শন, ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস, কোটি কোটি ডলারের মামলা, হলুদ সাংবাদিকতা এবং ইসরাইলের গণহত্যার বর্বরতার বিরুদ্ধে ভিন্নমতকে স্তব্ধ করার জন্য নিরলস প্রচারণার মাধ্যমে।
হেরিটেজ ফাউন্ডেশন পরিচালিত ‘প্রজেক্ট এস্থার’ আমেরিকান বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে বোমা ফেলার একটি প্রচেষ্টা ছাড়া আর কিছু নয়। এটার উদ্দেশ্য হচ্ছে ক্যাম্পাসে ভীতি প্রদর্শন এবং নীরবতা ছড়িয়ে দেওয়া, যাতে ইসরাইলের জঘন্য আচরণের সমালোচনা করে কেউ একটি শব্দও উচ্চারণ করার সাহস না পায়। তারা কি ফিলিস্তিনি-আমেরিকান পণ্ডিত অ্যাডওয়ার্ড সাঈদকে ভয় দেখাতে কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে তার কার্যালয়ে অগ্নিবোমা হামলা করেনি?
তারা সত্যকে ঘৃণা করে, সমালোচনামূলক চিন্তাকে ঘৃণা করে। তারা তথ্যকেও ঘৃণা করে। তারা চায় ইসরাইল যখন ফিলিস্তিনিদের হত্যা করে, লেবাননকে ধ্বংস করে, ইরানে নির্বিচারে বোমাবর্ষণ করে, সিরিয়ার ভূখণ্ড দখল করে এবং আমেরিকান প্রেসিডেন্টকে অন্তহীন যুদ্ধে সমর্থন দিতে প্ররোচিত করে তাদের দেউলিয়া করে, তখন বিশ্ব যেন চুপ করে থাকে।
প্রজেক্ট এস্থারের অভ্যন্তরীণ রণাঙ্গন হলো আমেরিকার বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলো এবং এর বৈদেশিক রণাঙ্গন হলো ইরান ও ফিলিস্তিনের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় বোমা হামলা করা। সেন্সরশিপ, ভীতি প্রদর্শন, কণ্ঠরোধ এবং পাঠ্যক্রম নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে আমেরিকান ও ইউরোপীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে লক্ষ্যবস্তু বানানো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, যা ইরানি ও ফিলিস্তিনি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে সরাসরি বোমা মেরে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করারই সমতুল্য।
মিডল ইস্ট আই অবলম্বনে মোতালেব জামালী
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


আইসিটিতে সাজাপ্রাপ্তরা অযোগ্য, বাতিল ইভিএম পোস্টাল ব্যালট