সরকারের ৬ মাস ও জ্বালানি মহাপরিকল্পনা

সরকারের ৬ মাস ও জ্বালানি মহাপরিকল্পনা

চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে দীর্ঘ প্রতীক্ষিত পরিবর্তনের পর ১২ ফেব্রুয়ারির ইতিহাসসেরা নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন হন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তার নেতৃত্বাধীন সরকার ছয় মাস পূর্ণ করেছে। একটি ভঙ্গুর রাষ্ট্রব্যবস্থাকে পুনর্গঠন এবং জনআকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটানোর কঠিন দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে গত ১৭ ফেব্রুয়ারি যাত্রা শুরু করেছিল এই সরকার। গত ছয় মাসে একদিকে যেমন দৃশ্যমান কিছু যুগান্তকারী সংস্কারের ছোঁয়া চোখে পড়ছে, তেমনি বেশ কিছু চ্যালেঞ্জও সরকারকে মোকাবিলা করতে হচ্ছে। শতভাগ অর্জন না হলেও এই ১৮০ দিন ছিল মূলত রাষ্ট্র মেরামতের এক পরীক্ষা পর্ব।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকার গত ছয় মাসে যে কাজগুলো করেছে, তাতে বলা যায় শাসনব্যবস্থা ব্যক্তির বৃত্ত থেকে বেরিয়ে জনগণের আঙিনায় ফিরে এসেছে। এ সময়ে জনকল্যাণ ও নির্বাচনি ইশতেহার বাস্তবায়নে উল্লেখযোগ্য কাজ হয়েছে। কৃষক, নারী, শিক্ষার্থী, ক্রীড়াবিদ, প্রবাসী, প্রবীণ ও নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য বিশেষ কার্ড এবং সামাজিক নিরাপত্তামূলক কর্মসূচি চালু করা হয়েছে। ক্ষুদ্র কৃষকদের জন্য কৃষিঋণ মওকুফ, ১৫ টাকা কেজি দরে খাদ্য সহায়তা, নারী উদ্যোক্তা ও তরুণদের জন্য সহজ ঋণ এবং স্টার্টআপ তহবিল গঠন করা হয়েছে। ২৪ লাখ টনের ইতিহাসের সর্বোচ্চ খাদ্য মজুত করতে পেরেছে সরকার। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জনকেন্দ্রিক রাষ্ট্রচর্চা এখন আলোচিত বিষয়।

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশের সংসদীয় ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ। প্রথম ও দ্বিতীয় অধিবেশন শেষে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একটি বড় অংশ একমত যে, দেশের আইনসভা দীর্ঘদিনের ‘উইনার টেকস অল’ বা বিজয়ী পক্ষই সব নিয়ন্ত্রণ করে, এই সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসছে। সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যকার গঠনমূলক বিতর্ক, গুরুত্বপূর্ণ আইন পাস এবং জাতীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে ফলপ্রসূ আলোচনা সংসদকে একটি প্রাণবন্ত প্রতিষ্ঠানে রূপ দিয়েছে। আগামী ২০ আগস্ট অনুষ্ঠেয় রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সামনে রেখে সংসদের তৃতীয় অধিবেশন শুরু হতে যাচ্ছে, যা এই সংসদের পারফরম্যান্সের কার্যকারিতাকে আরো এক ধাপ এগিয়ে নেবে।

সরকারের সামনে বড় যে চ্যালেঞ্জগুলো রয়েছে, এর মধ্যে আছে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা, মূল্যস্ফীতি এবং দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, আইনশৃঙ্খলা স্বাভাবিক রাখা, পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রেÑঅর্থাৎ কূটনীতিতে এরই মধ্যে যে সফলতা এসেছে, তা ধরে রেখে এগিয়ে যাওয়া। এক কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের সংকট নিরসন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকার এই চ্যালেঞ্জগুলো চিহ্নিত করে কাজ করে যাচ্ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিরোধী দল ও ব্যক্তিবর্গের পক্ষ থেকে অসহিষ্ণুতাও লক্ষ করা যাচ্ছে। মাত্র ছয় মাসের মধ্যেই এমন অসহিষ্ণু হওয়া মনে হয় ঠিক নয়। বর্তমান সরকারি দল বিএনপি যতবার ক্ষমতায় এসেছে, তারা একটি ধ্বংসস্তূপ পেয়েছে এবং আন্তর্জাতিক অস্থিরতার মধ্যে পড়েছে। অতীতে যখন এগুলো মোকাবিলা করে বিএনপি সরকার দেশকে ঘুরে দাঁড়াতে ভূমিকা রেখেছে। দেশ ও জনকল্যাণে কাজের দৃষ্টান্ত রেখেছে, তেমনি এবারও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দিনরাত কাজ করছেন দেশ ও জনগণের কল্যাণে নিয়ে আসার। তার আন্তরিকতা দেখে যে কারো উপলব্ধি হওয়ার কথা, তিনি সফল হবেন।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজেই দেশের চলমান গ্যাস ও জ্বালানি সংকটের কথা জানিয়ে তা দ্রুত কাটিয়ে উঠতে এবং এর দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ ঘোষণা করেছেন। বিরোধী দলগুলোর কিছু কঠোর সমালোচনার প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করে তিনি বলেছেন, কোনো দলের কাছে যদি তিন বা ছয় মাসের মধ্যে এই সংকট মোকাবিলায় বাস্তবসম্মত সমাধান থাকে, তবে সরকার তা সানন্দে গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করবে। এরই মধ্যে একেবারেই গ্যাস না পাওয়ার যে সংকট, এর কিছুটা স্বাভাবিক হয়েছে। শনিবার ভোর থেকে ৪৬০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ হচ্ছে, যা পর্যায়ক্রমে স্বাভাবিক ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুটে উন্নীত হবে। ত্রুটির কারণে বন্ধ হয়ে যাওয়া এক্সিলারেট অ্যানার্জি পরিচালিত এলএনজি টার্মিনালের ত্রুটি আংশিক মেরামত শেষে ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হচ্ছে। ১৯ আগস্ট নাগাদ মেরামত শেষ হওয়ার কথা। এটি সম্পন্ন হলে এক্সিলারেট অ্যানার্জি থেকে ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট এবং সামিট এলএনজি থেকে ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট মিলিয়ে ১,১০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ হবে। তবে প্রধানমন্ত্রীর জ্বালানি মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে দেশের জন্য সেটই হবে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের দীর্ঘমেয়াদি সমাধান। এই পরিকল্পনাটি দশ বছর মেয়াদি, যা প্রধানমন্ত্রী জাতীয় সংসদে পেশ করবেন।

আজকের এই সংকট হওয়ার মূল কারণ শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদী সরকার, গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে কার্যকর কোনো কাজই করেনি। গত ১৭ বছর বাপেক্সকে বসিয়ে রাখা হয়েছে। অনুসন্ধান কাজ একেবারেই বন্ধ ছিল। তখন উদ্যোগ নেওয়া হলে এর সুফল আজ জনগণ ভোগ করত।

১০ বছর জ্বালানি মহাপরিকল্পনা

আগেই উল্লেখ করেছি, দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের টেকসই রূপান্তরের জন্য ১০ বছরের একটি মহাপরিকল্পনা তৈরির কাজ চলছে। আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে দেশ ও জনগণের স্বার্থ রক্ষাই হবে এই মহাপরিকল্পনার উদ্দেশ্য।

এই মহাপরিকল্পনায় বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতকে সম্পূর্ণ নতুনভাবে সাজানো হবে। দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই উপায়ে বর্তমান জ্বালানি সংকট দূর করা হবে। আগামী ১০ বছর দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন, ব্যবস্থাপনা ও সরবরাহের সুনির্দিষ্ট কাঠামো কী হবে, তা এতে নির্ধারণ করা হবে। মহাপরিকল্পনাটি তৈরি হওয়ার পর তা জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করা হবে।

চলতি বছরের ৯ আগস্ট চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে আয়োজিত এক জনসমাবেশে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজে নতুন এই মহাপরিকল্পনার কথা প্রথম জনসম্মুখে প্রকাশ করেন। প্রধানমন্ত্রী জানান, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের নেওয়া ভুল নীতি ও মুষ্টিমেয় মানুষের স্বার্থ হাসিলের কারণে জ্বালানি খাত আজ সংকটাপন্ন। ফ্যাসিবাদী সরকারের সৃষ্ট দীর্ঘমেয়াদি মাশুল ও পুঞ্জীভূত সংকট রাতারাতি দূর করা দুরূহ। তবে সরকার সৃষ্ট সংকটের তাৎক্ষণিক সমাধানেও জরুরি পদক্ষেপ নিচ্ছে।

কেন ১০ বছরের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, জরুরি উদ্যোগ

আওয়ামী লীগ সরকারের অলিগার্কি বা সিন্ডিকেট ভাঙার লক্ষ্যে গুটিকয়েক মানুষের স্বার্থে নেওয়া অপরিকল্পিত নীতি পুনর্বিন্যাস করে পুরো জ্বালানি ব্যবস্থাকে জনগণের উপযোগী করে গড়ে তোলার পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। তাদের আমদানিনির্ভর নীতির কারণে বর্তমানে দেশের ৬৫ শতাংশ জ্বালানি আমদানি করতে হয়। ডলার সংকটের কারণে এলএনজি ও জ্বালানি আমদানির এই ব্যয়বহুল স্থায়ী বোঝা কমানোই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার লক্ষ্য।

আগামী ১০ বছরের জন্য প্রস্তাবিত বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মহাপরিকল্পনাটি সরাসরি জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করা হবে, যাতে সব মহলে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত হয়।

বর্তমান গ্যাস ও বিদ্যুৎ বিপর্যয় সামাল দিতে অন্তর্বর্তী ও জরুরি ভিত্তিতে কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। এগুলো হচ্ছে, গ্যাস সরবরাহ কিছুদিনের মধ্যে স্বাভাবিক করা। বঙ্গোপসাগরের এক্সিলারেট এনার্জি এলএনজি টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের কারণে গ্যাস সরবরাহ প্রায় অর্ধেকে নেমেছিল। অক্ষত বয়লারটি চালু করা হয়েছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত বয়লারটি মেরামতের জন্য একটি সুবিধাজনক উইন্ডো খোঁজা হচ্ছে।

বৈরী আবহাওয়ার কারণে সমুদ্রে আটকে থাকা এলএনজি কার্গো দ্রুত খালাসের চেষ্টা চলছে। প্রধানমন্ত্রী জানিয়েছেন, কিছুদিনের মধ্যে এ সংকট অনেকটা কেটে যাবে। জরুরি এলএনজি সরবরাহ নিশ্চিত করতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সহযোগিতা বৃদ্ধির আলোচনা চলছে। গ্যাসের অভাবে দেশের প্রায় ৭,০০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা অলস বসে আছে। টার্মিনাল সচল করে গ্যাস সরবরাহ বৃদ্ধির মাধ্যমে এগুলো চালুর চেষ্টা চলছে।

স্বল্প মেয়াদে শিল্পকারখানা চালু রাখতে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর সর্বোচ্চ উৎপাদন নিশ্চিত করার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। সৌরবিদ্যুতের সম্প্রসারণ (টার্গেট ১০,০০০ মেগাওয়াট) করা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী সব বড় সরকারি ভবনের ছাদে পর্যায়ক্রমে সোলার প্যানেল স্থাপনের নির্দেশ দিয়েছেন। সোলার ইনভার্টার উৎপাদন এবং ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পে বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের পাঁচ বছরের ট্যাক্স হলিডেসহ বিভিন্ন প্রণোদনা দেওয়া হচ্ছে, যাতে দ্রুত গ্রিডে ২ থেকে ৩ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ যুক্ত করা যায়।

শুধু যন্ত্রাংশ কেনা নয়, দেশীয় অনুসন্ধান সংস্থা বাপেক্সের কর্মকর্তাদের কারিগরি দক্ষতা বাড়াতে আন্তর্জাতিক কোম্পানির যৌথ সহায়তা নেওয়ার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। ভোলাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে আবিষ্কৃত গ্যাস ও পুরোনো গ্যাসক্ষেত্রের অবশিষ্টাংশ দ্রুত জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার প্রক্রিয়া চলছে।

সরকারি কর্মকর্তাদের জ্বালানি বরাদ্দ ৩০ শতাংশ কমানো হয়েছে। এছাড়া অফিস সময় পুনর্বিন্যাস, সপ্তাহে অতিরিক্ত একদিন ছুটি বা ওয়ার্ক ফ্রম হোম এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কিছু ক্লাস অনলাইনে নেওয়ার মতো একাধিক সাশ্রয়ী নীতি ক্যাবিনেটে আলোচনাধীন।

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত এবং প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন এরই মধ্যে জানিয়েছেন, সরকার কোনো সমস্যা লুকাচ্ছে না। ১৬ বছরের পুঞ্জীভূত সমস্যা রাতারাতি সমাধান সম্ভব না হলেও জনগণের দুর্ভোগ কমাতে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালানো হচ্ছে।

আওয়ামী আমলে জ্বালানি খাতে সোয়া লাখ কোটি টাকার দুর্নীতি-লুটপাট

আওয়ামী লীগ সরকারের ১৫ বছরের শাসনামলে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে প্রায় ১ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকার (১২ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার) বেশি দুর্নীতি এবং লুটপাট হয়েছে বলে অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত ‘অর্থনীতির শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটি’র প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এই খাতে প্রতিযোগিতাহীন চুক্তি এবং নীতিগত ভুল সিদ্ধান্তের কারণে খাতটি পুরো অর্থনীতির জন্য একটি বিশাল স্থায়ী ঋণের বোঝা বা ‘টাইম বোমায়’ পরিণত হয়েছে।

আওয়ামী লীগ আমলে সবচেয়ে বড় অনিয়ম ছিল ‘ইনডেমনিটি’ বা দায়মুক্তি আইন। ২০১০ সালে পাস করা হয় এই আইন, যা ‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানি দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন’ নামে পরিচিত ছিল। এর মাধ্যমে সাধারণ প্রতিযোগিতামূলক টেন্ডার বা দরপত্র প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ বাইপাস করা হয়। সরকার আইনটি বাতিল করেছে।

বিদ্যুৎ খাতের ইনডেমনিটি এই আইনের অধীনে যেকোনো ব্যক্তি বা সংস্থাকে সরাসরি বিদ্যুৎকেন্দ্রের কাজ দেওয়া হতো এবং এর বিরুদ্ধে আদালতে কোনো মামলা করার সুযোগ ছিল না। ফলে পতিত শেখ হাসিনার কার্যালয় এবং মুষ্টিমেয় আমলা-ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট নিজেদের পছন্দের মানুষকে বিদ্যুৎকেন্দ্রের লাইসেন্স দিয়ে হাজার হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়।

বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর সঙ্গে চুক্তিতে ‘ক্যাপাসিটি চার্জ’ বা কেন্দ্র ভাড়া দেওয়ার নিয়ম রাখা হয়েছিল। অর্থাৎ, কেন্দ্রটি বিদ্যুৎ উৎপাদন করুক বা অলস বসে থাকুক, সরকার তাকে নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা দিতে বাধ্য। দেশের সর্বোচ্চ চাহিদার চেয়েও প্রায় ৫,০০০ মেগাওয়াট বা ২০ শতাংশ অতিরিক্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা তৈরি করার কথা বলা হয়েছিল শুধু ক্যাপাসিটি চার্জের ব্যবসা দেওয়ার জন্য। গত এক দশকে কোনো বিদ্যুৎ না দিয়েই বেসরকারি কেন্দ্রগুলো ১ লাখ কোটি টাকার বেশি পকেটে ভরেছে।

শেখ হাসিনার আমলে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান বন্ধ করে ‘এলএনজি আমদানি’ করা হয়েছে। ২০১৭ সাল থেকে আওয়ামী লীগ সরকার দেশীয় স্থলভাগ ও সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধানে বাপেক্সকে সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় করে রাখে। নিজস্ব গ্যাস উত্তোলন করলে সিন্ডিকেটের ব্যক্তিগত লাভ কম হতো, তাই তারা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানির দিকে ঝুঁকে পড়ে। উচ্চমূল্যের এলএনজি আমদানি করতে গিয়ে দেশের ডলার রিজার্ভ শূন্য হয়ে পড়ে এবং স্থায়ী জ্বালানি সংকট তৈরি হয়।

অন্তর্বর্তী সরকারের চুক্তি পর্যালোচনা কমিটির তদন্তে দেখা গেছে, ভারতের আদানি পাওয়ারের সঙ্গে করা বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তিটি ছিল সম্পূর্ণ একপেশে এবং দেশের স্বার্থবিরোধী। আদানির কয়লার দাম ও বিদ্যুৎ বিল দেশের অন্যান্য কেন্দ্রের তুলনায় অস্বাভাবিক বেশি ধরা হয়েছিল, যা দুর্নীতি ও রাষ্ট্রীয় অর্থ অপচয়ের বড় উদাহরণ।

পলাতক বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নাসরুল হামিদ বিপু এবং জ্বালানি উপদেষ্টা তৌফিক-ই-ইলাহীর বিরুদ্ধে ঘুসের বিনিময়ে বিশেষ বিবেচনায় গ্যাস-বিদ্যুতের সংযোগ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশনের তদন্ত অনুযায়ী, নাসরুল হামিদ ও তার পরিবারের নামে ৯৮টি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ৩,১৮১ কোটি টাকারও বেশি সন্দেহজনক লেনদেনের তথ্য মিলেছে। এই বিপুল অর্থের একটা বড় অংশ অবৈধ হুন্ডির মাধ্যমে বিদেশে পাচার করা হয়েছে।

ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার সময় আওয়ামী লীগ সরকার বিদ্যুৎ খাতে প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকার বকেয়া বা দেনা রেখে যায়। বিদেশি গ্যাস সরবরাহকারী এবং দেশীয় বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর এই বিল পরিশোধ করতে না পারায় বর্তমান সরকারকে চরম তারল্য সংকটে পড়তে হচ্ছে। ফলে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বড় সংকট বিদ্যমান। সরকার তাই এ সংকটের দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই সমাধানের পথে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

লেখক : সরকারের প্রধান তথ্য কর্মকর্তা, সাবেক সাধারণ সম্পাদক, জাতীয় প্রেস ক্লাব

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন