জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে যোগ দেওয়ার মধ্য দিয়ে বিশ্বমঞ্চে আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি সরকার গঠনের পর এটিই ছিল আন্তর্জাতিক পরিসরে তার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। ভাষণ, দ্বিপক্ষীয় বৈঠক এবং পার্শ্ব-আয়োজন মিলিয়ে এই সফর থেকে বাংলাদেশের প্রাপ্তি যেমন আছে, তেমনি আছে কিছু প্রশ্নও।
কূটনীতির টেবিলে মুসলিম বিশ্ব
এই সফরের উল্লেখযোগ্য দিক হলো মুসলিম বিশ্বের তিন প্রভাবশালী রাষ্ট্রের শীর্ষ নেতার সঙ্গে বৈঠক। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ও তুরস্কের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বৈঠক প্রত্যাশিতই ছিল। তবে ইরানের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বৈঠক অনেকের ধারণার বাইরে ছিল। এর মধ্য দিয়ে মুসলিম বিশ্বে বাংলাদেশের কণ্ঠস্বর জোরালো করার পথে তিনি এক ধাপ এগোলেন বলা যায়।
এখানে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের উত্তরাধিকারের ছায়া স্পষ্ট। ওআইসি গঠিত ইসলামি শান্তি কমিটির সদস্য হিসেবে জিয়াউর রহমান ইরান-ইরাক যুদ্ধ বন্ধের উদ্যোগে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছিলেন এবং ওআইসিতে বাংলাদেশের অবস্থান শক্ত করেছিলেন। তারেক রহমান সেই ধারাকেই সামনে নিয়ে যেতে চাইছেন বলে মনে হয়।
একই সফরে তিনি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নৈশভোজে তার সঙ্গে একান্তে কথা বলেছেন। প্রধানমন্ত্রীর যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানকালেই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বাংলাদেশের বোয়িং কেনার সিদ্ধান্তের প্রশংসা করে ট্রুথ সোশ্যালে বার্তা দিয়েছেন। এর আগে চিঠির মাধ্যমে ধন্যবাদ জানিয়েছেন। মার্কিন ব্যবসায়ী মহলে এই বার্তা ইতিবাচক সাড়া ফেলবে বলেই ধারণা করা হচ্ছে। একদিকে ওয়াশিংটন, অন্যদিকে তেহরান—এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা কঠিন কূটনৈতিক কাজ। সেই ভারসাম্য কতটা টেকসই হয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
নতুন এক প্রথা : ‘ফার্স্ট লেডি’ কূটনীতি
এই সফরের আরেকটি নতুন দিক হলো পশ্চিমা ধাঁচের ‘ফার্স্ট লেডি’ সংস্কৃতির সূচনা। প্রধানমন্ত্রীর স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান মার্কিন ফার্স্ট লেডির আয়োজিত বিশেষ নৈশভোজে যোগ দেন। পেশায় চিকিৎসক হওয়ায় তিনি নিজের পেশাগত সক্ষমতা থেকে স্বাস্থ্যবিষয়ক জাতিসংঘের একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। পাশাপাশি তারেক রহমান বাংলাদেশি চিকিৎসকদের একটি প্রতিনিধিদলের সঙ্গে কথা মতবিনিময় করেছেন, যেখানে তার স্ত্রী জুবাইদা রহমানকে বেশ সম্পৃক্ত দেখা গেছে।
আনুষ্ঠানিকতার বাইরে গিয়ে পেশাগত যোগ্যতাকে কূটনীতিতে কাজে লাগানোর এই চর্চা প্রশংসার দাবি রাখে।
ভাষণে ‘আমি’ নয়, ‘আমরা’
একই পরিবারের তিনজন সদস্য রাষ্ট্র বা সরকারপ্রধান হিসেবে জাতিসংঘের সবুজ মার্বেল পাথরের সামনে দাঁড়িয়ে ভাষণ দিয়েছেন—বিশ্বের ইতিহাসে এমন ঘটনা বিরল। ভাষণে সে কথা তিনি একবারই উল্লেখ করেছেন, সংযত ভঙ্গিতে—‘এই বিশ্বমঞ্চে দাঁড়িয়েই আমার পিতা বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এবং আমার মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী মরহুমা খালেদা জিয়া দেশ এবং জনগণের পক্ষে ভাষণ দিয়েছিলেন।’
বিগত ফ্যাসিবাদী সরকারপ্রধান শেখ হাসিনার জাতিসংঘে দেওয়া ভাষণগুলোর বড় অংশ ছিল তার পরিবারের স্তুতিতে ভরা। সেই তুলনায় তারেক রহমান তার বক্তব্যে একই সঙ্গে সংযম ও নতুনত্বের বার্তা দিয়েছেন।
ভাষণের কেন্দ্রে ছিল জনগণ। শুরুতেই তিনি বলেছেন, ‘আমরা বিশ্বাস করি, জনগণই আমাদের সকল রাজনৈতিক ক্ষমতার উৎস।’ শেষ দিকে আরো স্পষ্ট করে বলেছেন, ‘রাষ্ট্রের নাগরিকদের ক্ষমতাহীন রেখে রাষ্ট্র কখনো শক্তিশালী হতে পারে না।’ এই আমরাই হচ্ছে—‘গণতন্ত্র’।
ফিলিস্তিন প্রশ্নে তিনি বাংলাদেশের মানুষের সংহতি তুলে ধরে বলেছেন, ‘আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার এবং একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের অধিকারসহ তাদের ন্যায্য দাবির প্রতি বাংলাদেশ পুনরায় তার অবিচল সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করছে।’
রোহিঙ্গা সংকটে তার অবস্থান ছিল দ্ব্যর্থহীন—‘রোহিঙ্গা সংকটের উৎস ও উৎপত্তি মিয়ানমারে; তাই এর সমাধানও সেখানেই নিহিত।’ একই সঙ্গে সতর্ক করেছেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ব্যর্থ হলে এটি ‘অদূর ভবিষ্যতে এক মানবিক সংকটে রূপ নিতে পারে।’
প্রযুক্তি প্রসঙ্গে ভাষণের সম্ভবত সবচেয়ে স্মরণীয় বাক্যটি ছিল—‘আমরা চাই না, আজকের ডিজিটাল বিভাজন আগামী দিনের আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের বিভাজনে পরিণত হোক।’
উন্নয়নশীল দেশের জন্য প্রযুক্তি হস্তান্তর ও সাশ্রয়ী প্রবেশাধিকারের দাবি গ্লোবাল সাউথের একটি ন্যায্য দাবি, যা তিনি স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন।
জলবায়ু প্রশ্নে তিনি অভিযোগের পাশাপাশি নিজেদের উদ্যোগও দেখিয়েছেন—পাঁচ বছরে ২৫ কোটি গাছ লাগানো, ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন, তিস্তা মহাপরিকল্পনা ও পদ্মা ব্যারাজ এবং ১৯৯২ সালের পানি কনভেনশনে স্বাক্ষর। অভ্যন্তরীণ নীতিতে ফ্যামিলি কার্ডকে তিনি তুলে ধরেছেন নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের প্রতীক হিসেবে, কারণ কার্ডটি ইস্যু হচ্ছে পরিবারের নারীপ্রধানের নামে। স্নাতক পর্যন্ত নারীদের বিনা বেতনে শিক্ষা এবং প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের জন্য দুপুরের খাবারের মতো কর্মসূচিও তিনি বিশ্বসভায় উপস্থাপন করেছেন।
ভাষণ শেষ হয়েছে দলের পরিচিত স্লোগানে—‘সবার আগে বাংলাদেশ : সবার জন্য বাংলাদেশ।’
বাবা-মেয়ের একই দিনে বিশ্বমঞ্চে
ভাষণের সময় সাধারণ পরিষদের হলে শাড়ি পরে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর মেয়ে ব্যারিস্টার জাইমা রহমান। জাতিসংঘের ওয়েবসাইট সূত্রে জানা যায়, একই দিনে তিনি জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের কার্যালয়ে আইন কর্মকর্তা হিসেবে যোগ দিয়েছেন। বলা চলে, বাবা-মেয়ের বিশ্বমঞ্চে যাত্রা একই দিনে। যুক্তরাষ্ট্রের বাঙালি কমিউনিটিতে এখন আলোচনা—তারেক রহমান মেয়েকে ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করছেন। তবে সমালোচকেরা একে দক্ষিণ এশিয়ার পরিচিত পরিবারতান্ত্রিক রাজনীতির ধারাবাহিকতা হিসেবেও দেখতে পারেন, যে প্রশ্নের জবাব সরকারকে কাজ দিয়েই দিতে হবে।
যেখানে ঘাটতি রয়ে গেল
ভাষণের ইতিবাচক দিক অনেক, তবে কিছু অপূর্ণতাও চোখে পড়ে।
প্রথমত, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স নিয়ে তিনি সুযোগের বৈষম্যের কথা বলেছেন এবং জাতিসংঘের নীতিমালার দাবি তুলেছেন; কিন্তু এর ক্ষতিকর দিক প্রায় অনুপস্থিত। ডিপফেক, ভুয়া তথ্যের বিস্তার, নির্বাচনে হস্তক্ষেপ এবং সাইবার নিরাপত্তার ঝুঁকি—যেগুলো বাংলাদেশের মতো তরুণ ও সোশ্যাল মিডিয়া-নির্ভর সমাজে বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক, সেগুলো স্পষ্ট করে বলা দরকার ছিল।
দ্বিতীয়ত, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত নিরসনে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে একটি সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব বিশ্বসভায় তুলে ধরার সুযোগ ছিল। ফিলিস্তিনের প্রতি সমর্থন জানানো হয়েছে ঠিকই; কিন্তু যুদ্ধবিরতি, মানবিক সহায়তা বা জবাবদিহিতা নিয়ে কোনো কংক্রিট উদ্যোগের কথা আসেনি। ইরান, তুরস্ক ও পাকিস্তানের নেতাদের সঙ্গে বৈঠকের প্রেক্ষাপটে এমন প্রস্তাব বাংলাদেশের নতুন কূটনৈতিক ভূমিকাকে আরো অর্থবহ করতে পারত।
তৃতীয়ত, রোহিঙ্গা প্রশ্নে অবস্থান দৃঢ় হলেও তা মূলত পুরোনো অবস্থানেরই পুনরাবৃত্তি। প্রত্যাবাসনের জন্য নতুন কোনো কৌশল বা আঞ্চলিক উদ্যোগের রূপরেখা ছিল না।
চতুর্থত, আন্তর্জাতিক মঞ্চে ‘ফ্যাসিবাদ’ শব্দের বারবার ব্যবহার দেশের মানুষের অভিজ্ঞতার প্রতিফলন হলেও কিছু বিদেশি শ্রোতার কাছে তা অভ্যন্তরীণ রাজনীতির ভাষা মনে হতে পারে। একইভাবে ৩১ দফার ৭৩ শতাংশ কার্যক্রম এসডিজির সঙ্গে সরাসরি মেলে, এমন দাবির পেছনের হিসাব স্পষ্ট করা হলে তা আরো বিশ্বাসযোগ্য হতো। স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণ নিয়েও বাংলাদেশ সময় বাড়ানোর পক্ষে কি না, সে বিষয়ে পরিষ্কার অবস্থান আসেনি।
পঞ্চমত, ভাষণে জুলাই অভ্যুত্থানের শহীদদের স্মরণ করা হয়েছে, গুম-খুন আর দুর্নীতির কথাও এসেছে। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে বীর ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে সকল শহীদ এবং আহতদের প্রতিও আমি অকৃত্রিম শ্রদ্ধা জানাই।’ কিন্তু শ্রদ্ধার পরের ধাপ, অর্থাৎ বিচারের প্রশ্নটি বিশ্বসভায় অনুপস্থিত থেকে গেছে।
অথচ এই দাবির পক্ষে সবচেয়ে শক্ত প্রমাণ দিয়েছে জাতিসংঘ নিজেই। জাতিসংঘ মানবাধিকার কার্যালয়ের (ওএইচসিএইচআর) তথ্যানুসন্ধান প্রতিবেদনে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে জানানো হয়, জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষ নিহত হয়ে থাকতে পারেন এবং এসব হত্যাকাণ্ড মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে গণ্য হতে পারে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ইতোমধ্যে শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতে তার বিরুদ্ধে রায় দিয়েছে, কিন্তু তিনি এখনো ভারতে অবস্থান করছেন। পলাতক অভিযুক্তদের ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করতে আন্তর্জাতিক জনমত ও কূটনৈতিক চাপ অপরিহার্য। জাতিসংঘের মঞ্চে দাঁড়িয়ে জাতিসংঘেরই প্রতিবেদন উদ্ধৃত করে বিচারের দাবি তোলার চেয়ে কার্যকর সুযোগ আর হতে পারত না।
একইভাবে প্রয়োজন ছিল অপতথ্যের বিরুদ্ধে স্পষ্ট বক্তব্য। অভ্যুত্থানের পর থেকে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন সূত্র থেকে বাংলাদেশকে উগ্রবাদী ও সংখ্যালঘু-নির্যাতনকারী রাষ্ট্র হিসেবে তুলে ধরার সংগঠিত প্রচারণা চলেছে, যার অনেকগুলোকে দেশের তথ্য যাচাইকারী প্রতিষ্ঠানগুলো ভুয়া হিসেবে চিহ্নিত করেছে। আন্তর্জাতিক পরিসরে এই প্রচারণার জবাব দেওয়া না গেলে বিনিয়োগ, পর্যটন ও কূটনৈতিক সম্পর্কে তার নেতিবাচক প্রভাব পড়তে বাধ্য। প্রধানমন্ত্রী নিজেই ভাষণে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ও সোশ্যাল মিডিয়া নিয়ে জাতিসংঘের নীতিমালার দাবি তুলেছেন। সেই দাবির সঙ্গে বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা যুক্ত করলে বক্তব্যটি আরো জোরালো ও বাস্তবভিত্তিক হতো।
সব মিলিয়ে তারেক রহমানের বৈশ্বিক অভিষেক আত্মবিশ্বাসী ও সংযত। ভাষণে দেশের নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা, মানবিক প্রশ্ন ও উন্নয়ন-আকাঙ্ক্ষা একসঙ্গে উঠে এসেছে, আর সফরের কূটনৈতিক তৎপরতা মুসলিম বিশ্ব ও পশ্চিমের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্কের ইঙ্গিত দেয়। তবে বিশ্বমঞ্চে কথার চেয়ে কাজের মূল্য বেশি। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন, জলবায়ু অর্থায়ন আর প্রযুক্তি হস্তান্তরের যে দাবিগুলো তিনি তুলেছেন, সেগুলো আগামী দিনের কূটনীতিতে কতটা বাস্তব ফল আনে, তার ওপরই নির্ভর করবে এই অভিষেকের প্রকৃত মূল্যায়ন।
লেখক: স্টেট ইউনিভার্সিটি অব নিউ ইয়র্ক-ডাচেস-এর সহকারী অধ্যাপক; বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজের নির্বাহী পরিচালক
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

