হজ ইসলামের মৌলিক স্তম্ভের অন্যতম। যেসব মুসলিম নর-নারীর শারীরিক সক্ষমতা ও আর্থিক সংগতি রয়েছে, তাদের জন্য জীবনে একবার হজ পালন করা ফরজ। হজ অত্যন্ত বরকতময় ও ফজিলতপূর্ণ ইবাদত। তাছাড়া হজ পালন ইসলামের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলো অবলোকনের সুযোগ এনে দেয়। বিশেষ করে কাবা শরিফ, মসজিদে নববি ও রিয়াজুল জান্নাতে নামাজ আদায় এবং হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর রওজা মোবারক জিয়ারতের অসামান্য সুযোগ পাওয়া প্রতিটি মুসলিম নর-নারীর কাছেই পরম আরাধ্য ও সৌভাগ্যের বিষয়।
বাংলাদেশ বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ। হিজরি প্রথম শতকের শেষার্ধে ইসলামের সুমহান বাণী এই জনপদের মানুষের হৃদয়কে জয় করে নিয়েছিল। সময়ের পরিক্রমায় বর্তমানে এ দেশের জনসংখ্যার প্রায় ৯৩ শতাংশ মুসলমান। সর্বোচ্চসংখ্যক হজযাত্রী প্রেরণকারী দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান চতুর্থ। এ পরিসংখ্যান থেকেই এ দেশের মুসলমানদের হজ পালনের তীব্র আকাঙ্ক্ষা সহজেই অনুমান করা যায়। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) চেয়ারম্যান তারেক রহমান এ দেশের ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের এই আকাঙ্ক্ষাকে অনুধাবন করেই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলটির নির্বাচনি ইশতেহারে হজ ব্যবস্থাপনার বিষয়ে সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি দেন। বাংলাদেশের নির্বাচনি ইতিহাসে এই প্রথম কোনো ইশতেহারে হজ ব্যবস্থাপনাকে এত গুরুত্ব দেওয়া হলো, যা সরকারের দূরদর্শিতা ও গণমুখী চিন্তার বহিঃপ্রকাশ।
সরকারের নির্বাচনি ইশতেহারে একটি সাশ্রয়ী, সহজলভ্য, মানবিক ও প্রবাসীবান্ধব হজ ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা হবে এবং হজ পালনের ব্যয় কমাতে রাষ্ট্রীয় ও কূটনৈতিক উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে মর্মে অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হয়েছে। এ প্রতিশ্রুতি সামনে রেখেই সরকার ২০২৭ সালের হজ প্যাকেজ নির্ধারণ করেছে। এ দেশের ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা যাতে যৌক্তিক খরচে হজ পালন করতে পারেন, সেই লক্ষ্যে সম্ভাব্য সব ধরনের ব্যয় সংকোচন করেছে।
হজের খরচ বাড়ানো বা কমানোর ক্ষেত্রে ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয় তথা বাংলাদেশ সরকারের ভূমিকা রাখার সুযোগ খুবই কম। হজের খরচের প্রায় ৭০ শতাংশ ব্যয় হয় সৌদি প্রান্তে এবং এসব খরচ সৌদি সরকার নির্ধারিত এবং তা সব দেশের জন্যই সমান। অবশ্য দু-একটি ক্ষেত্রে বিকল্প বা পছন্দমতো সেবা বেছে নেওয়ার সুযোগ আছে, যেমন—মিনা-আরাফায় কোন জোনে তাঁবু নেওয়া হবে, কোন সার্ভিস প্যাকেজ গ্রহণ করা হবে প্রভৃতি। মক্কায় হোটেল ভাড়া নির্ভর করে হারাম শরিফ থেকে হোটেলের দূরত্ব ও মানের ওপর; মদিনায়ও তাই। সরকার তথা ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয় প্রশিক্ষণ, কল্যাণ তহবিল, প্রচার, আইটি চার্জ, আইডি কার্ড প্রভৃতি বাবদ মাত্র ১৫০০ থেকে ১৬০০ টাকা গ্রহণ করে থাকে। ২০২৭ সালের হজে প্রকৃতপক্ষে বিমান ভাড়া ছাড়া অন্য কোনো খাতে দরকষাকষির সুযোগ ছিল না। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ব্যক্তিগত উদ্যোগ, দৃঢ়তা ও অটুট মনোভাবের কারণেই বিমানভাড়া গত হজের তুলনায় ২৪,৮৩০ টাকা কমেছে। বিগত কয়েক বছরের বিমানভাড়া পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ২০২২ সালের হজে বিমানভাড়া ছিল ১৪০,০০০ টাকা। কিন্তু ২০২৩ সালে সেটা এক লাফে ৫৭,৭৯৭ টাকা বৃদ্ধি করে ১৯৭,৭৯৭ টাকা নির্ধারণ করা হয়। ২০২৪ সালে বিমানভাড়া ৩,৭৯৭ টাকা কমিয়ে নির্ধারণ করা হয় ১৯৪,০০০ টাকা। অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদে ২০২৫ সালে বিমানভাড়া নির্ধারণ করা হয় ১৬৭,৮২০ টাকা। সর্বশেষ ২০২৬ সালের হজে বিমানভাড়া ছিল ১৫৪,৮৩০ টাকা। ২০২৭ সালের হজে প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত উদ্যোগে বিমানভাড়া কমিয়ে ১৩০,০০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। হজ ফ্লাইটে বিমানভাড়া কমানোর ক্ষেত্রে সরকারের এ উদ্যোগ একটি মাইলফলক।
২০২৭ সালে সরকারি মাধ্যমে দুটি হজ প্যাকেজ ঘোষণা করেছে সরকার, যথা : ‘হজ প্যাকেজ-১’ ও ‘হজ প্যাকেজ-২ (সাশ্রয়ী)’। হজ প্যাকেজ-১-এর হজযাত্রীদের মক্কায় হারাম শরিফের বহির্চত্বর থেকে ১০০০ থেকে ১৪০০ মিটারের মধ্যে এবং মদিনায় মারকাজিয়া এরিয়ায় আবাসন সুবিধা দেওয়া হবে। মিনায় জোন-২-এ তাঁবুসহ মিনা-আরাফায় ‘সার্ভিস প্যাকেজ-৩’ ক্যাটাগরির সার্ভিস এবং অনুমোদিত ক্যাটারিংয়ের মাধ্যমে খাবার সরবরাহ করা হবে। অতিরিক্ত অর্থ পরিশোধসাপেক্ষে রুম আপগ্রেডেশন ও শর্ট প্যাকেজ সুবিধা নেওয়া যাবে। এ প্যাকেজের খরচ ধরা হয়েছে ৬১৫,২৬৩ টাকা। অন্যদিকে, হজ প্যাকেজ-২ (সাশ্রয়ী) একটি সুলভ প্যাকেজ। এই প্যাকেজের হজযাত্রীদের মক্কায় হোটেল হারাম শরিফের বহির্চত্বর থেকে দু-তিন কিলোমিটারের মধ্যে হবে এবং মদিনায় মারকাজিয়া এলাকার বাইরে মসজিদে নববি থেকে ৮০০ মিটারের মধ্যে আবাসনের ব্যবস্থা করা হবে। মিনায় জোন-৫-এ তাঁবুসহ মিনা-আরাফায় ‘সার্ভিস প্যাকেজ-৩’ ক্যাটাগরির সার্ভিস এবং অনুমোদিত ক্যাটারিংয়ের মাধ্যমে খাবার সরবরাহ করা হবে। হোটেলের অবস্থান দুই কিলোমিটারের বেশি দূরে হলে সৌদি সরকারের বিধান অনুসারে সালাওয়াত বাসের ব্যবস্থা থাকবে। এ প্যাকেজের খরচ ধরা হয়েছে ৫০৫,৬৪৮ টাকা।
বেসরকারি তথা হজ এজেন্সির জন্য ‘বেসরকারি মাধ্যমের সাধারণ হজ প্যাকেজ’ নামে একটি প্যাকেজ নির্ধারণ করে দিয়েছে সরকার। এই প্যাকেজের হজযাত্রীদের মক্কায় হারাম শরিফের বহির্চত্বর থেকে সর্বোচ্চ তিন কিলোমিটারের মধ্যে এবং মদিনায় মসজিদে নববি থেকে এক কিলোমিটারের মধ্যে আবাসন সুবিধা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এক রুমে সর্বোচ্চ ছয়জনের আবাসনের ব্যবস্থা রাখা যাবে। মিনায় জোন-৫-এ তাঁবুর অবস্থান হবে এবং মিনা-আরাফায় ‘সার্ভিস প্যাকেজ-৩’ ক্যাটাগরির সার্ভিসসহ অনুমোদিত ক্যাটারিংয়ের মাধ্যমে খাবার সরবরাহ করা হবে। হোটেলের অবস্থান দুই কিলোমিটারের বেশি দূরে হলে সৌদি সরকারের বিধান অনুসারে সালাওয়াত বাসের ব্যবস্থা রাখতে হবে। এ প্যাকেজের খরচ ধরা হয়েছে ৫১৩,৬৪৮ টাকা। হজ এজেন্সিগুলোকে সরকার অনুমোদিত ‘বেসরকারি মাধ্যমের সাধারণ হজ প্যাকেজ’ গ্রহণ করতে হবে এবং গ্রুপভুক্ত এজেন্সিগুলো পারস্পরিক আলোচনার ভিত্তিতে অতিরিক্ত তিনটি প্যাকেজ ঘোষণা করতে পারবে। তবে সরকার ঘোষিত হজ প্যাকেজ-২-এ বর্ণিত সেবা-সুবিধা কমিয়ে কোনো প্যাকেজ ঘোষণা করতে পারবে না। ঘোষিত প্যাকেজগুলো হজ পোর্টালসহ এজেন্সির নিজস্ব ওয়েবসাইটে প্রকাশ করতে হবে। দমে শোকর বা আদাহি ও ক্যাটারিং বাধ্যতামূলক হওয়ায় এ দুটি খাতের ব্যয় অন্তর্ভুক্ত না করে কোনো প্যাকেজ ঘোষণা করা যাবে না।
সৌদি সরকার প্রায় প্রতিবছরই হজ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে নতুন নতুন উদ্যোগ গ্রহণ করে থাকে। ২০২৭ সালের হজেও সৌদি হজ ও ওমরাহ মন্ত্রণালয় হাজীদের সেবা, আবাসন ও ব্যবস্থাপনার উৎকর্ষের বেশ কিছু উদ্যোগ নিয়েছে। মক্কা ও মদিনায় হজযাত্রীদের আবাসন, যাতায়াত, ক্যাটারিং, তাঁবু, মিনা-আরাফায় সার্ভিস প্যাকেজ প্রভৃতিকে একটি সমন্বিত প্যাকেজের মধ্যে আনার ঘোষণা দিয়েছে সৌদি সরকার। ২০২৬ সালের হজে চারটি সার্ভিস প্যাকেজ ছিল। কিন্তু ২০২৭ সালের হজে মিনা-আরাফায় সার্ভিস প্যাকেজ হবে তিনটি; ‘ডি’ সার্ভিস প্যাকেজটি থাকবে না। ২০২৭ সালের হজে মিনা-আরাফায় সার্ভিস প্যাকেজসমূহকে সার্ভিস প্যাকেজ-১, সার্ভিস প্যাকেজ-২ ও সার্ভিস প্যাকেজ-৩ নামকরণ করা হবে। সর্বশেষ হজে সরকারি মাধ্যমে সর্বনিম্ন প্যাকেজ তথা হজ প্যাকেজ-৩-এর হজযাত্রীদের জন্য ‘ডি’ সার্ভিস প্যাকেজটি গ্রহণ করা হয়েছিল, যার মূল্য ছিল ২৫০০ সৌদি রিয়াল। ২০২৭ সালের হজে সর্বনিম্ন সার্ভিস প্যাকেজ তথা সার্ভিস প্যাকেজ-৩ ধরে প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়েছে, যার মূল্য ৩২০০ সৌদি রিয়াল। সৌদি সরকার কর্তৃক মিনা-আরাফায় সার্ভিস প্যাকেজ আপগ্রেডেশনের কারণে ২০২৭ সালের হজে শুধু সার্ভিস প্যাকেজেই গত হজের সর্বনিম্ন প্যাকেজের তুলনায় বাংলাদেশি মুদ্রায় ২৩,২৪০ টাকা খরচ যোগ হয়েছে।
২০২৭ সালের হজে হাফ বোর্ড ক্যাটারিং বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। ২০২৬ সালে সরকারি মাধ্যমে সর্বনিম্ন প্যাকেজ মূল্য ছিল ৪৬৭,১৩৭ টাকা। এ হজ প্যাকেজে খাবার খরচ অন্তর্ভুক্ত ছিল না, হজযাত্রীদের প্যাকেজের বাইরে আলাদাভাবে খাবারের টাকা সঙ্গে নেওয়ার জন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। এ বছর ক্যাটারিং বাধ্যতামূলক হওয়ায় প্যাকেজে ১,১৯০ সৌদি রিয়াল যোগ হয়েছে, যা দেশীয় মুদ্রায় ৩৯,৫০৮ টাকা। বর্তমানে সৌদি রিয়ালের বিনিময় হারও কিছুটা বেড়েছে, যার ফলে ২০২৭ সালের সর্বনিম্ন হজ প্যাকেজে ৩,৮২৬ টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে। এছাড়া, সৌদি সরকার ২০২৭ সালের হজে ব্যাকআপ অ্যাকোমডেশন ১ থেকে ২ শতাংশে উন্নীত করার বিধান চালু করায় প্যাকেজে বাড়তি ১,৩২৮ টাকা যোগ হয়েছে। অর্থাৎ সার্ভিস আপগ্রেডেশন, বাধ্যতামূলক ক্যাটারিং, মুদ্রার বিনিময় হার ও ব্যাকআপ অ্যাকোমডেশনের হার বৃদ্ধি করার কারণে প্যাকেজে বাড়তি যোগ হয়েছে ৬৭,৯০২ টাকা। ২০২৬ সালের সর্বনিম্ন প্যাকেজ অপরিবর্তিত থাকলেও ২০২৭ সালে খরচ হতো ৫৩৫,০৩৯ টাকা। কিন্তু সরকারের নানামুখী পদক্ষেপে তা কমিয়ে ৫০৫,৬৪৮ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে, যার ফলে প্রকৃত অর্থে ২৯,৩৯১ টাকা খরচ কমানো সম্ভব হয়েছে।
শুধু বিমানভাড়া বা প্যাকেজ মূল্যই নয়, প্রবাসীদের ভ্রমণ খরচ ও বিড়ম্বনা লাঘবে বিশেষ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ২০২৭ সালের হজে প্রবাসী বাংলাদেশি হজযাত্রীরা অবস্থানরত দেশ থেকেই স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও টিকা গ্রহণ করে ভিসার আবেদন করতে পারবেন। পাশাপাশি, তারা যাতে সরাসরি অবস্থানরত দেশ থেকেই হজের জন্য সৌদিতে পৌঁছাতে পারেন, সে বিষয়েও সরকার কাজ করছে।
২০২৩ সালের হজে বিমানভাড়া ছিল প্রায় ২ লাখ টাকা। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ব্যক্তিগত উদ্যোগে ২০২৭ সালের হজে বিমানভাড়া নির্ধারিত হয়েছে ১৩০,০০০ টাকা। বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ নানামুখী ঊর্ধ্বগতির মধ্যেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বিমানভাড়া কমানো সরকারের সদিচ্ছা ও আন্তরিকতার বহিঃপ্রকাশ। হজের খরচ হ্রাস এবং প্রবাসী বাংলাদেশি হজযাত্রীদের অর্থ, সময় ও ভ্রমণ সাশ্রয়ে গৃহীত উদ্যোগ বর্তমান সরকারের নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
লেখক : জনসংযোগ কর্মকর্তা, ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়
পিআইডি ফিচার
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


