রাজধানী ঢাকা এখন এক ভিন্ন আতঙ্কের নগরী। দিনের আলোয় প্রকাশ্যে কোপানো, রাতের অন্ধকারে ছিনতাই, পাড়ায় পাড়ায় কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য—এই চিত্র এখন আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং নিত্যদিনের বাস্তবতা। পুলিশের পরিসংখ্যান বলছে গণমাধ্যমের প্রতিবেদন এবং সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতা—সবকিছু মিলিয়ে পাওয়া যাচ্ছে একটাই বার্তা। তা হলো ঢাকায় অপরাধ পরিস্থিতি ক্রমেই অবনতির দিকে যাচ্ছে।
হত্যার সংখ্যা উদ্বেগজনক
২০২৬ সালের শুরু থেকেই ঢাকায় হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। পুলিশ সদর দপ্তরের পরিসংখ্যান বলছে, চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে সারা দেশে ৮৫৪টি হত্যা মামলা হয়েছে, যার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঢাকায়।
শুধু ঢাকা মহানগরীতেই এই তিন মাসে ৬১টি হত্যা মামলা রেকর্ড করা হয়েছে।
এপ্রিল মাসে পরিস্থিতি আরো উদ্বেগজনক রূপ নিয়েছে। ১২ এপ্রিল মোহাম্মদপুরের রায়েরবাজার এলাকায় দিনের বেলা প্রকাশ্যে কিশোর গ্যাং ‘অ্যালেক্স গ্রুপের’ নেতা ইমন হোসেনকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। ঘটনাটি সিসি ক্যামেরায় ধরা পড়ে এবং ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়ে যায়। এর মাত্র তিন দিন পর, ১৫ এপ্রিল, একই এলাকায় আরেকজনকে মাদক ব্যবসার বিরোধে হত্যা করা হয়। ১৭ এপ্রিল পল্লবীতে একা বসবাসরত এক বয়োজ্যেষ্ঠ শিক্ষিকাকে হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। আর ১৪ এপ্রিল যাত্রাবাড়ীতে পাওনা টাকা নিয়ে বিরোধে এক কলেজছাত্রীকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। একই ঘটনায় তার মায়ের একটি হাত কবজি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
মোহাম্মদপুর : অপরাধের কেন্দ্রবিন্দু
ঢাকার মধ্যে মোহাম্মদপুর থানা এলাকাটি এখন সবচেয়ে বেশি উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) নিজস্ব তথ্যই বলছে, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত মাত্র ২০ মাসে মোহাম্মদপুরে ২৩ থেকে ২৪ জন হত্যার শিকার হয়েছেন। এ এলাকায় সক্রিয় রয়েছে অন্তত ৫০টি অপরাধী চক্র। মাদকের টাকা ভাগাভাগি, এলাকার দখল এবং চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে এই চক্রগুলো পরস্পরের বিরুদ্ধে সহিংসতায় জড়াচ্ছে। ডিএমপির তথ্যমতে, এই এলাকায় প্রতিদিন গড়ে অন্তত পাঁচটি চুরি-ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে।
ছিনতাই ও অপহরণের ঊর্ধ্বগতি
শুধু হত্যা নয়, ছিনতাই ও অপহরণের সংখ্যাও আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত—এই সাত মাসে—সারা দেশে ৫৪৮টি অপহরণের ঘটনা ঘটেছে। যেখানে আগের বছর একই সময়ে ছিল মাত্র ২৯৪টি। অর্থাৎ অপহরণ বেড়েছে ৮৬ শতাংশ। ঢাকায় প্রতি মাসে গড়ে ৪৬টি ছিনতাই মামলা এবং ৭০টি চাঁদাবাজির মামলা হচ্ছে বলে ডিএমপির পরিসংখ্যানে উঠে এসেছে।
কিশোর গ্যাং : নতুন আতঙ্ক
ঢাকার অপরাধ চিত্রে নতুন একটি উদ্বেগজনক মাত্রা যোগ করেছে কিশোর গ্যাংয়ের উত্থান। মোহাম্মদপুর, পল্লবী, মিরপুরসহ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় কিশোর ও তরুণ বয়সিদের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এসব গ্যাং ছিনতাই, মাদক, চাঁদাবাজি এবং এলাকার আধিপত্য দখলে সক্রিয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজেদের শক্তি প্রদর্শন করে প্রভাব বিস্তার করা এই গ্যাংগুলোর সদস্যদের একজনকে গ্রেপ্তার করা হলেও কিছুদিন পর ভিন্ন নামে আবার সক্রিয় হয়ে ওঠে।
অপরাধ বৃদ্ধির কারণ
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ২০২৪ সালে গণঅভ্যুত্থানের পর পুলিশের একটি বড় অংশ নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মধ্যে একটি শূন্যতা তৈরি হয়। পেশাদার অপরাধীরা এই সুযোগকে কাজে লাগিয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিচার প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতার কারণে অপরাধীদের মধ্যে শাস্তির ভয় কমে গেছে। বারবার জামিনে মুক্ত হয়ে ফের একই অপরাধে ফিরে আসার চিত্র এখন খুবই সাধারণ। এছাড়া, অর্থনৈতিক সংকট ও কর্মসংস্থানের অভাবও কিছু মানুষকে অপরাধের পথে ঠেলে দিচ্ছে।
পুলিশের পদক্ষেপ ও সীমাবদ্ধতা
এপ্রিল মাসে ডিএমপি রাজধানীর অপরাধপ্রবণ এলাকাগুলোয় ব্লক রেইড অভিযান জোরদার করেছে। সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ ও মাদক ব্যবসায়ীদের তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে। মার্চ মাসেই বিভিন্ন অপরাধে ৯ হাজার ২৫৯ জনকে গ্রেপ্তার এবং ১ হাজার ৩০৫টি মামলা করা হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু গ্রেপ্তার করলেই হবে না—দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে। অপরাধীর শাস্তি যদি দৃষ্টান্ত হিসেবে উপস্থাপন না হয়, তাহলে গ্রেপ্তারের প্রভাব দীর্ঘমেয়াদি হয় না।
কী করণীয়
ঢাকার ক্রমবর্ধমান অপরাধ পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিশেষজ্ঞরা কয়েকটি জরুরি পদক্ষেপের কথা বলছেন। প্রথমত, বিচারব্যবস্থার গতি বাড়াতে হবে, যাতে অপরাধীরা দ্রুত শাস্তি পায়। দ্বিতীয়ত, আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করে কার্যকর করতে হবে। তৃতীয়ত, কিশোর অপরাধ দমনে শুধু গ্রেপ্তার নয়, সামাজিক পুনর্বাসনেও মনোযোগ দিতে হবে। চতুর্থত, নগরবাসীকেও সচেতন হতে হবে—সন্দেহজনক কার্যকলাপ দেখলে পুলিশকে জানানোর সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। ঢাকা একটি মেগাসিটি—এখানে কোটি মানুষের বাস। এই নগরীকে নিরাপদ রাখা শুধু পুলিশের একার দায়িত্ব নয়, এটি রাষ্ট্র, সমাজ এবং প্রতিটি নাগরিকের সম্মিলিত দায়িত্ব। অপরাধের বিরুদ্ধে যদি এখনই কঠোর ও কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তাহলে পরিস্থিতি আরো জটিল হয়ে পড়বে।
লেখক : সাংবাদিক ও অপরাধবিশ্লেষক
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

