একটি দেশের ভবিষ্যৎ শুধু তার অর্থনৈতিক অবকাঠামো কিংবা প্রযুক্তির অগ্রগতিতে নির্ধারিত হয় না; নির্ধারিত হয় আগামী প্রজন্মকে যারা গড়ে তুলছেন, তাদের মান ও মর্যাদার ওপরও। কারণ, শ্রেণিকক্ষে দাঁড়ানো একজন শিক্ষক হয়তো এক দিনে একটি পাঠ পড়ান, কিন্তু তার প্রভাব বিস্তৃত হয় বহু বছর ধরে—একজন শিক্ষার্থীর মনন, মূল্যবোধ ও দক্ষতার বিকাশ থেকে ভবিষ্যৎ পেশাজীবন পর্যন্ত। সেই অর্থে শিক্ষকতা শুধু একটি পেশা নয়; এটি দেশের ভবিষ্যৎ নির্মাণের দায়িত্ব। শিক্ষকতা যদি জ্ঞানচর্চা, পেশাগত মর্যাদা ও ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গড়ার আকাঙ্ক্ষা থেকে নির্বাচিত না হয়ে অন্য কোথাও সুযোগ না পাওয়া মানুষের ‘উপায়হীন বিকল্প’ হয়ে ওঠে, তাহলে সংকটটি শুধু শিক্ষকতায় সীমাবদ্ধ থাকে না। এর অভিঘাত পড়ে শিক্ষার মান, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং শেষ পর্যন্ত জাতীয় অর্থনীতিতে। তাই শিক্ষকতায় কারা আসছেন, কেন আসছেন এবং কতটা মর্যাদা ও পেশাগত বিকাশের সুযোগ নিয়ে তারা এই পেশায় থাকছেন—এসব প্রশ্ন এখন শিক্ষানীতির কেন্দ্রেই থাকা উচিত।
গত ৫ অক্টোবর বিশ্ব শিক্ষক দিবস উপলক্ষে ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে আয়োজিত গুণী শিক্ষকদের সম্মাননা প্রদান অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির ভাষণে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রাষ্ট্রের সেই মৌলিক ভিতের ওপর আলোকপাত করেন। তিনি বলেন, ‘শিক্ষকতা কখনো উপায়হীন বিকল্প হতে পারে না।’ তার এই বক্তব্য শুধু শিক্ষকতার মর্যাদা নিয়ে একটি নৈতিক আহ্বান নয়; শিক্ষক নিয়োগ, কর্মপরিবেশ, পেশাগত বিকাশ ও ক্যারিয়ার কাঠামো নিয়ে রাষ্ট্রের নতুন করে ভাবারও সুযোগ তৈরি করেছে।
অর্থনীতির মানবসম্পদ তত্ত্বে থিওডোর শুলৎজ ও গ্যারি বেকার দেখিয়েছেন, শিক্ষা ও দক্ষতায় বিনিয়োগ মানুষের উৎপাদনশীলতা বাড়ায় এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ভিত্তি তৈরি করে। সেই বিনিয়োগের অন্যতম প্রধান বাহক হচ্ছেন শিক্ষক। একজন চিকিৎসক একজন রোগীকে সুস্থ করেন, একজন প্রকৌশলী অবকাঠামো নির্মাণ করেন; কিন্তু শিক্ষক তৈরি করেন সেই মানুষকে, যিনি ভবিষ্যতে চিকিৎসক, প্রকৌশলী, বিজ্ঞানী, উদ্যোক্তা বা প্রশাসক হয়ে দেশকে এগিয়ে নেবেন। তাই শিক্ষকতার মান প্রকৃতপক্ষে একটি দেশের ভবিষ্যৎ মানবসম্পদের মানের সঙ্গে সম্পর্কিত। দক্ষ ও কার্যকর শিক্ষক শিক্ষার্থীর শেখার ফলাফলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নির্ধারক। তাই অবকাঠামো, প্রযুক্তি ও পাঠ্যবইয়ের যতই উন্নয়ন হোক না কেন, শ্রেণিকক্ষে যোগ্য এবং উদ্দীপিত শিক্ষক না থাকলে শিক্ষার কাঙ্ক্ষিত মান অর্জন কঠিন।
বাংলাদেশের জন্য বিষয়টি আরো গুরুত্বপূর্ণ। দেশের জনমিতিতে বিপুলসংখ্যক তরুণ রয়েছে। এই তরুণদের দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করতে পারলে জনমিতিক সুবিধা পরিণত হবে অর্থনৈতিক শক্তিতে। আর এ ক্ষেত্রে ব্যর্থতা বেকারত্ব ও সামাজিক অস্থিরতার কারণ হয়ে উঠতে পারে। দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির অত্যাবশ্যকীয় অনুষঙ্গ হচ্ছে মানসম্মত শিক্ষা। তাই শিক্ষকতায় মেধাবীদের আকৃষ্ট করা কোনো একটি মন্ত্রণালয়ের একক প্রশাসনিক দায়িত্ব নয়; এটি হওয়া উচিত জাতীয় উন্নয়ন কৌশলের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
তাই আমাদের এমন একটি ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে, যেখানে সবচেয়ে মেধাবীদের কাছে পেশা হিসেবে শিক্ষকতা আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। আর এ জন্য প্রথমেই প্রয়োজন নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ কর্মপরিবেশ। বিগত সময়ে দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকদের হুমকি, লাঞ্ছনা, হামলা ও শারীরিকভাবে হেনস্তার ঘটনা ঘটেছে। শ্রেণিকক্ষে যাওয়ার আগে একজন শিক্ষক যদি নিজের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকেন, তাহলে তার পক্ষে শিক্ষার্থীদের মধ্যে জ্ঞান, নৈতিকতা ও আত্মবিশ্বাসের পরিবেশ তৈরি করা কঠিন। তাই শিক্ষক সুরক্ষা কোনো বিচ্ছিন্ন প্রশাসনিক বিষয় নয়; এটি মানসম্মত শিক্ষার অন্যতম শর্ত। এ ক্ষেত্রে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব এবং আচরণের সীমারেখা স্পষ্ট করতে হবে। কোনো শিক্ষক হয়রানি বা সহিংসতার শিকার হলে দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত এবং কার্যকর আইনি ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি। শিক্ষক দিবসে ফুল দিয়ে সম্মান জানানোর পাশাপাশি সারা বছর তার নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করাই হবে প্রকৃত সম্মান।
এর সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ হলো পেশাগত অগ্রগতির সুযোগ। সরকারি-বেসরকারি স্কুল-কলেজের যোগ্য শিক্ষকদের বছরের পর বছর একই পদে আটকে রাখা হলে মেধাবী তরুণদের এ পেশায় আকৃষ্ট করা কঠিন হবে। পদোন্নতি যদি অনিশ্চিত ও দীর্ঘসূত্রতাপূর্ণ হয়, তাহলে শিক্ষকতা একজন তরুণের কাছে দীর্ঘমেয়াদি পেশা হিসেবে কতটা আকর্ষণীয় থাকবে, সেটিও ভাবতে হবে। এ ক্ষেত্রে প্রয়োজন স্বচ্ছ, সময়বদ্ধ ও দক্ষতাভিত্তিক ক্যারিয়ার কাঠামো। প্রশিক্ষণ, শ্রেণিকক্ষের দক্ষতা ও পেশাগত অবদানের ভিত্তিতে পদোন্নতির সুস্পষ্ট পথরেখা থাকতে হবে। একই সঙ্গে বেতন-ভাতা, প্রশিক্ষণ, পেশাগত স্বাধীনতা ও সামাজিক মর্যাদার মধ্যে একটি যৌক্তিক ভারসাম্য তৈরি করতে হবে।
শিক্ষককে শুধু প্রশাসনিক নির্দেশ পালনকারী কর্মচারী নয়, শিক্ষাব্যবস্থার পেশাজীবী হিসেবে দেখতে হবে। শিক্ষানীতি ও পাঠ্যক্রম প্রণয়নে এবং শিক্ষা ব্যবস্থাপনায় শিক্ষকদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।
একুশ শতকে শিক্ষকের ভূমিকাও বদলেছে। শিক্ষক এখন শুধু পাঠ্যবইয়ের তথ্য দেবেন না; শিক্ষার্থীর বিশ্লেষণী ক্ষমতা, সৃজনশীলতা, সমস্যা সমাধান, প্রযুক্তি ব্যবহারের দক্ষতা এবং পরিবর্তিত শ্রমবাজারের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর সক্ষমতা গড়ে তুলবেন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও অটোমেশনের যুগে শিক্ষকদেরও নিয়মিত প্রশিক্ষণ এবং পুনর্দক্ষতা অর্জনের সুযোগ দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারে মেধাবী তরুণদের শিক্ষকতায় আকৃষ্ট করা এবং শিক্ষকদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধির যে প্রতিশ্রুতি রয়েছে, তা বাস্তব প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তবে এর সাফল্য নির্ভর করবে বাস্তবায়নপ্রক্রিয়ার মানের ওপর।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি শুধু শিক্ষকতার নয়, বরং আমরা কেমন প্রজন্ম তৈরি করতে চাই, তারও প্রশ্ন। তাই আমাদের এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যেখানে একজন মেধাবী তরুণ গর্ব করে বলতে পারেন, ‘আমি শিক্ষক হয়েছি নিজের পছন্দে, যোগ্যতায় এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গড়ার প্রত্যয়ে’—অন্য কোনো পেশায় ব্যর্থ হয়ে নয়। অতএব, এখন প্রয়োজন কথাকে নীতিতে এবং নীতিকে বাস্তব কর্মপরিকল্পনায় রূপ দেওয়ার। এ লক্ষ্যে সরকারকে শিক্ষকতার জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় কর্মপরিকল্পনা নিতে হবেÑযেখানে মেধাভিত্তিক নিয়োগ, প্রতিযোগিতামূলক পারিশ্রমিক, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, সময়বদ্ধ পদোন্নতি এবং ধারাবাহিক পেশাগত উন্নয়নের সুযোগ থাকবে।
কারণ, শিক্ষকতা যখন মেধাবীদের প্রথম পছন্দ হয়ে ওঠে, তখন শুধু শিক্ষকতার মর্যাদাই বাড়ে না; একটি জাতির ভবিষ্যৎও শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়ায়।
লেখক: চিফ (ডিএলপি বিভাগ), বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (ব্যানবেইস)
ই-মেইল: frkhan62@yahoo.com
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

