মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর জন্ম এমন একসময়ে, যখন ভারতে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন ভয়ংকর, কুৎসিত ব্যবস্থা তুঙ্গে। জন্মের পরপরই-অর্থাৎ ১৮৮০-এর দশকের প্রথম দিকের সময়েই তিনি উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন বিদেশিদের শাসন, লুণ্ঠনসহ নিজ মাতৃভূমি বিনাশে ওই শক্তি বা ঔপনিবেশিকতা কতটা ভয়ংকর, কুৎসিত, অমানবিক এবং হিংস্র হতে পারে। তিনি এটাও উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন এবং নিজেও প্রত্যক্ষ করতে পেরেছিলেন যে, এই ভারতেরই একদল দালালশ্রেণি বিদেশি ‘প্রভুদের’ গোলাম বা দালাল হতে পারে সামান্য স্বার্থের লোভে। আর এই দালাল, মধ্যশ্রেণি, গোলাম জমিদারসহ শ্রেণিটির মূলত জন্ম হয়েছিল বড় বড় অভিজাত দালালশ্রেণির প্ররোচনায়, যার জন্ম হয়েছিল এমন এক কূটকৌশলে, যাকে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত আইন বলা হয়। এটি প্রবর্তন করা হয় ১৭৯৩ সালে, যাতে সীমাহীন ক্ষতিগ্রস্ত হয় মওলানা ভাসানীর পূর্বপুরুষরাসহ অসংখ্য মুসলমান জমিদার, তালুকদারসহ একটি বিশাল জনগোষ্ঠী। সাম্প্রদায়িকতা অথবা হিন্দু-মুসলিম বিভেদ সৃষ্টির উদ্দেশ্য এবং মুসলমান শ্রেণিকে লক্ষ্য বা টার্গেট করে যে এই ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হয়েছে, তাও মওলানা ভাসানী খুবই অল্প বয়সে উপলব্ধি করেছিলেন।
একদিকে ব্রিটিশদের সঙ্গে নিয়ে গোলাম ও দালালশ্রেণির কর, খাজনা আদায়সহ নানা অজুহাতে কী নির্মম নির্যাতন, নিপীড়ন, ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ পর্যন্ত করা হয়, তাও মওলানা নিজ চোখে দেখেছেন। আবার অন্যদিকে হিন্দু, মুসলিম এককাতারে ঐক্যবদ্ধ হয়ে ধর্ম, জাত, পাত ভুলে গিয়ে একের পর এক আন্দোলন এবং বিদেশি শক্তি খেদাওয়ের কৃষকের স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং অধিকার আদায়ে কখনো নিরস্ত্র এবং কখনো সশস্ত্র সংগ্রাম, তাও মওলানা ভাসানী প্রত্যক্ষ করেছেন, শুনেছেন ও দেখেছেন। এর ওপরে জমি-জিরাতবিহীন বাপ, মা, বোন, ভাইয়ের অকালমৃত্যুর পর কখনো এর, কখনো ওর আশ্রয়ে বেড়ে ওঠার নিদারুণ ব্যক্তিগত কষ্টের অভিজ্ঞতা-অর্থাৎ সবকিছু মিলিয়ে মজলুমের একজন হয়ে ওঠার বাস্তব অভিজ্ঞতাই আবদুল হামিদ খান ভাসানীকে অপরাপর মজলুমের নেতা হওয়ার শক্ত পাটাতন এবং ভিত্তি তৈরি করে দেয়, ওই পরিস্থিতিতে স্বাভাবিকভাবেই।
মওলানা ভাসানীকে নিয়ে কোনো আলোচনা বা বিশ্লেষণের মূল সমস্যাটি হচ্ছে এক জীবনে একজন মানুষ কতটা লড়াই, সংগ্রাম, আন্দোলন করতে পেরেছেন জনমানুষের জন্য? অতি সামান্য ফিরিস্তি দেওয়াও খুবই মুশকিল।
মওলানা ভাসানীর ‘বিশাল জীবন’ নিয়ে যৎসামান্য ফিরিস্তি বা আলোচনা করার সমস্যাটা এখানেই। তাকে অনেকে বিশেষত, সাম্রাজ্যবাদীরা যে নামে মওলানাকে অভিহিত করতে পছন্দ করেন, সেই লাল বা ‘রেড মওলানা’-অর্থাৎ কমিউনিস্ট বলে অভিহিত করতে চেষ্টা করছেন জান-পরান দিয়ে। এক কথায়, মওলানা মজলুমের নিপীড়িত মানুষের নেতা এর অন্যথা নয় এবং এটাই সত্য। মওলানা ভাসানীর তুলনা মওলানা ভাসানীই, অন্য কেউ নন। তিনি একদিকে ধর্মপ্রাণ একজন মুসলমান ছিলেন এবং একই সঙ্গে ছিলেন সত্যিকারের অসাম্প্রদায়িক। তিনি আশৈশব সীমাহীন কষ্ট-ক্লেশে মানুষ হয়েছেন এবং মনেপ্রাণে অতিসাধারণ মানুষের হয়ে রাজনীতি করেছেন, তার তুলনা এই উপমহাদেশ তো বটেই, বিশ্বের হাতে গোনাদের একজন। তার ‘স্বশ্রেণি বদল’ বা ডি ক্লাস্ট হওয়ার প্রয়োজন পড়েনি। কিন্তু মওলানা ভাসানীকে খাটো করার জন্যই ‘রেড মওলানাসহ’ নানা কথায় মওলানা ভাসানীকে আদৌ ক্ষতি করতে পারেনি।
মওলানা ভাসানী আসামে কৃষক আন্দোলন করেছেন। তীব্র আন্দোলন-সংগ্রাম করেছেন। তিনি উচ্চারণ করেছেন সেই বিখ্যাত বাণী ও দাবি-‘আকাশ-জমিনের মালিক আল্লাহ’Ñতাহলে কৃষকও জমির মালিক। কীসের খাজনা আর জমি থেকে উচ্ছেদ? মওলানা ভাসানীর জীবন বিশ্লেষণে দেখা যায়, তিনি নিজের হাতে জংলা-জমির গাছ কেটে ছোট্ট কুড়ে ঘর বানিয়েছেন। আর তাতে সস্ত্রীক থেকেছেন। আসামের চরাঞ্চলসহ বিশাল এলাকার কৃষকদের ঐক্যবদ্ধ করে কুখ্যাত লাইনপ্রথাবিরোধী ব্যবস্থাসহ নানা সময়ে বিশাল আন্দোলন গড়ে তুলেছেন এবং এ কারণে তিনি ব্রিটিশ শাসক এবং তার এ দেশীয় দালালদের ভয়াবহ কোপানলে পড়েছেন। তিনি শুধু আন্দোলনেই ক্ষান্ত থাকেননি, এর অংশ হিসেবে আসাম প্রাদেশিক সভার সদস্যও নির্বাচিত হন। আসাম প্রাদেশিক সভায় তিনিই প্রথম বাংলায় বক্তৃতা দেন। আসামের জীবন নিয়েই শুধু একটি বড়সড় বই লেখা সম্ভব।
আমরা আলোচনা করছি মওলানা ভাসানীর ঐতিহাসিক ফারাক্কা মার্চ বা মিছিল নিয়ে। কেউ কেউ এই ফারাক্কা মার্চকেই মওলানা ভাসানীর উল্লেখযোগ্য কাজ বলে মনে করেন, এ কারণে ভুলভাবে উপস্থাপন করতে চান। তারা এ ধরনের কার্যক্রম পরিচালনা করেন। ফারাক্কা মিছিল মওলানার অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক কর্মকাণ্ডের শুধু একটি মাত্র। এ কারণে মওলানাকে শুধু ফারাক্কা মার্চ দিয়ে ‘বৃত্তবন্দি’ ব্র্যাকেটবন্দি করা ঠিক নয়। এ জন্য খুবই সংক্ষেপে মওলানা ভাসানীর জীবনের অন্যান্য দু-একটি দিক নিয়েও আলোচনা করতে চাই।
মওলানা ভাসানীর দীর্ঘজীবনের অন্তত ৩০ বছর কেটেছে হয় কারাবন্দি, গৃহবন্দি অথবা আত্মগোপনে। মওলানাকে বুঝতে গেলে এই স্বল্প পরিসরে সম্ভব নয়। তাই খুব সংক্ষেপে মওলানা ভাসানীর কয়েকটি মাত্র ঐতিহাসিক ঘটনার উল্লেখ করব।
মওলানা ভাসানী লাহোর প্রস্তাব বাস্তবায়নের একজন উল্লেখযোগ্য নেতা ছিলেন। ১৯৪০ লাহোর মূল প্রস্তাবে বলা ছিল, ব্রিটিশ শাসনামলের অবিভক্ত বাংলা, আসামসহ মুসলমান অধ্যুষিত অঞ্চল নিয়ে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র গঠিত হবে অখণ্ড ভারতের পূর্বাঞ্চলে। পশ্চিমাঞ্চলেও অনুরূপ হবে। ১৯০৫-এর বঙ্গভঙ্গের প্রেক্ষাপটে এটি ছিল এক বিশাল পদক্ষেপ। কিন্তু মুসলমানদের বা আশরাফশ্রেণি বা উচ্চবর্গ কিছু হিন্দু নেতা এবং ব্রিটিশদের কারণে তা আর সম্ভব হয়নি।
মওলানা ভাসানী এই বিশাল মনোবেদনা নিয়ে স্থায়ীভাবে চলে আসেন নিজ জন্মভূমিতেÑঅর্থাৎ ১৯৪৭ সালে গঠিত পাকিস্তানে। কিন্তু আসাম থেকে বুকে নিয়ে আসেন এক বিশাল ক্ষতÑঅর্থাৎ লাহোর প্রস্তাব অনুযায়ী দেশভাগ হয়নি ও হলো না। পরবর্তীকালে মওলানা ভাসানী বারবার এ নিয়ে আক্ষেপ করেছেন। এ বিষয়টি পাঠকদের মনোযোগ আকর্ষণ করবে বলে মনে করি ইতিহাস জানার জন্য।

মওলানা ভাসানীই প্রথম রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এবং নেতা, যিনি এ কথা স্পষ্ট করে বুঝেছিলেন, ঔপনিবেশিক ব্রিটিশদের কাছ থেকে মুসলমান অভিজাতশ্রেণি একটি রাষ্ট্র পেয়েছে বটে, তবে তা সাধারণ জনমানুষের জন্য নয়। তিনিই বুঝেছিলেন শাসক বদল হয়েছে মাত্র; কিন্তু এতে জনমানুষের কোনো উন্নয়ন হবে না। অধ্যাপক তাজুল ইসলাম হাশমী তার বইয়ে Pakistan as a peasants utopia বলেন, বৃহত্তর বাংলার কৃষিনির্ভর দেশে কৃষক সমাজকে যে অলীক কল্পরাজ্যের স্বপ্ন দেখানো হয়েছিল, তা স্বপ্নরাজ্যই থেকে গেছে, বাস্তবায়িত হয়নি কখনো। মওলানা ভাসানী এটি বুঝতে পেরেছিলেন বলেই ভিন্নপথ অনুসরণ করেন।
এই ভিন্নপথটি হলো ১৯৪৯ সালে আওয়ামী মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠা। ওই বছরের-অর্থাৎ ৪৯ সালের ২৩ জুন মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীকে সভাপতি, শামসুল হককে সাধারণ সম্পাদক এবং শেখ মুজিবুর রহমান ও খোন্দকার মোশতাক আহমদকে যুগ্ম সম্পাদক করে প্রথম কেন্দ্রীয় কমিটি গঠন করা হয়। অল্পকালেই অসাম্প্রদায়িক চরিত্র দেওয়ার জন্য আওয়ামী মুসলিম লীগ নাম থেকে মুসলিম শব্দটি বাদ দেওয়া হয়। এ জাতির ইতিহাসে এমন ঐতিহাসিক ঘটনা স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। লেখা থাকবে মওলানা ভাসানীর নাম। বাংলাদেশের ইতিহাস লিখতে হলে এই সুবিশাল ঘটনা বাদ দেওয়া কোনোক্রমেই যাবে না। কিন্তু দুর্ভাগ্য পরবর্তীকালের আওয়ামী লীগ তার দলের প্রতিষ্ঠাতা-অর্থাৎ মওলানা ভাসানীর অবদানকে তো অস্বীকার করেই, সঙ্গে সঙ্গে যাবতীয় নিন্দা করা হয়। এখনো তা বাদ যায়নি।
এ কথাও আমাদের মনে রাখতে হবে, ১৯৫৪ সালে তৎকালীন অভিজাতশ্রেণির প্রতিনিধিত্বকারী ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগবিরোধী মওলানা ভাসানী, শেরেবাংলা ফজলুল হক এবং সোহরাওয়ার্দীর সমন্বয়ে যুক্তফ্রন্ট নামে এক নির্বাচনি জোট গঠন করেন পূর্ব পাকিস্তান সাধারণ নির্বাচন কেন্দ্র করে। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে মুসলিম লীগের ভরাডুবি হয় এবং যুক্তফ্রন্ট বিপুল আসনে বিজয়ী হয়। বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাস লিখতে গেলে ১৯৫৪-এর যুক্তফ্রন্টের নির্বাচন এবং মওলানা ভাসানীর অবদানকে কোনোক্রমেই অস্বীকার করা যাবে না।
বাংলাদেশের মুক্তি ও স্বাধীনতার আন্দোলন-সংগ্রামে ১৯৫২-এর রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন প্রথম মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে যে ২১ দফা ঘোষণাপত্র, তাতে প্রথম দফাটিই ছিল বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করতে হবে। এছাড়া ভাষা আন্দোলনের মূল বিষয় বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার ক্ষেত্রে মওলানা ভাসানীর ভূমিকা এবং আন্দোলনের কথা স্মরণে রাখতেই হবে। এ কথাও জানা দরকার, ১৯৫২ সালেই রাষ্ট্রভাষা বাংলা স্বীকৃতি পায়নি, পেয়েছিল ১৯৫৬-এর পরে। এটিও সত্য, ১৯৫৬ সালে মওলানা ভাসানী তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রীকে নিয়ে রাষ্ট্রীয়ভাবে শহীদ মিনারের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন, যা ছিল বাংলাকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতিপ্রাপ্তির একটি পদক্ষেপ।
মওলানা ভাসানীর ফারাক্কা মার্চ নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে কেন অতীত ইতিহাস নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটিÑএ প্রশ্ন আসতেই পারে। ইচ্ছাকৃত এবং উদ্দেশ্যমূলকভাবেই এটা করেছি, যাতে নবপ্রজন্মের কাছে মওলানা ভাসানীর খণ্ডিত ইতিহাস উপস্থাপনের একটি প্রচেষ্টা দেশে তো বটেই, দেশের বাইরেও লক্ষ করা যাচ্ছে, তা মোকাবিলা যাতে করা যায়।
মওলানা ভাসানীই ছিলেন প্রথম পাকিস্তানি এবং যতদূর জানা যায় উপমহাদেশেরও প্রথম; যিনি মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের আধিপত্য এবং হস্তক্ষেপের সরাসরি ও প্রত্যক্ষ বিরোধিতা করেন। পাকিস্তানের তৎকালীন সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আইউব খানের মদতে তৎকালীন দুর্বল সরকার স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি ত্যাগ করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দুটো আন্তর্জাতিক অসম প্রতিরক্ষা এবং সামরিক চুক্তি স্বাক্ষরের চেষ্টা চালায় ১৯৫০-এর শেষের দিকে। মওলানা ভাসানী প্রকাশ্যে আওয়ামী লীগের মধ্যে এবং জনসমাবেশগুলোয় সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গে সব ধরনের চুক্তির বিরোধিতা করেন। কিন্তু দুর্ভাগ্য, আওয়ামী লীগেরই একাংশ-অর্থাৎ হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী এবং শেখ মুজিবুর রহমানসহ তাদের সমর্থকরা চুক্তির পক্ষে অবস্থান নেন এবং মওলানা ভাসানীর বিপক্ষে রাষ্ট্রদ্রোহী, ভারতের দালালসহ নানা কুৎসা রটনা করতে থাকে। এই চুক্তির প্রধানতম উদ্দেশ্য ছিল কমিউনিস্ট হটানোর নামে প্রগতিশীল, স্বাধীন পররাষ্ট্র নীতির সমর্থকদের এবং সরকারের প্রতিবাদ দমনের লক্ষ্যে তাদের ওপর নিপীড়ন, নির্যাতন করা। দুই. পাকিস্তানকে কোনো না কোনোভাবে আমেরিকার সম্প্রসারণবাদী যুদ্ধে জড়িয়ে ফেলা। শেষ পর্যন্ত CENTO (কেন্দ্রীয় ট্রি ট্রি সংস্থা) এবং SEATO দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ট্রি ট্রি সংস্থার চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় ১৯৫৪ এবং ৫৫ সালে। এর সঙ্গে ১৯৫৫-৫৬-এর দিকে দুই দেশের মধ্যে ‘পাক-আমেরিকা’ গোপন চুক্তিও স্বাক্ষরিত হয়। এর ফল হলো দুটো-এক. পাকিস্তান স্থায়ীভাবে হারালো তার স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি। দুই. মওলানা ভাসানীর প্রতিষ্ঠিত দল আওয়ামী লীগ থেকে মওলানা বেরিয়ে গেলেন। সেদিন সোহরাওয়ার্দী ও শেখ মুজিব প্রকাশ্যে ওই চুক্তির জোরালোভাবে সপক্ষে না দাঁড়ালে পাকিস্তান এবং পরবর্তীকালের বাংলাদেশের ইতিহাস ভিন্ন হতে পারত।
মওলানা ভাসানী আলাদা দল গঠন করলেও মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বিরোধিতার কারণে ১৯৫৮ সালে আইউব খানের সামরিক শাসনের প্রথমদিকেই মওলানা ভাসানীকে বিশেষ নিরাপত্তা আইনে গ্রেপ্তার করা হয়।
বর্তমান প্রজন্ম হয়তো জানে না একমাত্র মওলানা ভাসানীই পূর্ব পাকিস্তানের প্রথম রাজনৈতিক নেতা ও ব্যক্তিত্ব, যিনি শোষণ-বঞ্চনা বন্ধ না করলে পাকিস্তানি সরকারকে আসসালামু আলাইকুমÑঅর্থাৎ স্বাধীন পূর্ব পাকিস্তান গঠনের কথা প্রকাশ্যে জনসভায় বলেছেন। একবার নয়, কয়েকবার। ১৯৫৫ সালের ১৭ জুন প্রথম ঢাকার পল্টন ময়দানে, দ্বিতীয়বার আরো স্পষ্টভাবে ১৯৫৭, ১৯৭০-সহ অসংখ্যবার।
বিস্তারিত আলোচনার জন্য সৈয়দ আবুল মকসুদের ‘মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী’ [আগামী প্রকাশনী এবং অলি আহাদের জাতীয় রাজনীতি : ১৯৪৫ থেকে ১৯৭৫ (বাতিঘর প্রকাশনী)]।
কাজেই আশা করি, এখন আর বুঝতে অসুবিধা হবে না যে, মওলানা ভাসানী কেন আমাদের জন্য অপরিহার্য ছিলেন এবং তার মতো নেতার পক্ষেই ভারতের দেওয়া মরণফাদবিরোধী ফারাক্বা মিছিল করা সম্ভব। ভারতের বাঁধ, ড্যাম নির্মাণসহ আন্তর্জাতিক নদীকে ভাটি অঞ্চলের দেশের বিরুদ্ধে পানি অবরোধের বিপক্ষে তীব্র প্রতিবাদের জন্যই মওলানা ভাসানী ফারাক্কা মার্চ বা ফারাক্কা মিছিল করেন। এটি ছিল স্পষ্টই আধিপত্যবাদবিরোধী ঐতিহাসিক পদক্ষেপ।
ফারাক্কা মিছিল
মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ১৯৭৬ সালের ১৬ মে ঐতিহাসিক ফারাক্কা মার্চ বা মিছিলের নেতৃত্ব দেন। ৯৪ বছর বয়সি মওলানা ভাসানী তখন ঢাকায় অসুস্থ অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তিনি তা উপেক্ষা করেই এই ঐতিহাসিক কাজটি করেছেন, যা চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে বাংলাদেশের অস্তিত্বের সঙ্গে। ইতোমধ্যে ভারত নির্মিত ফারাক্কা বাঁধের কারণে বাংলাদেশের, বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে শুরু করে। আন্তর্জাতিক নদী গঙ্গার পানির ন্যায্য হিস্যা বঞ্চিত করার জন্য এবং বাংলাদেশকে আধিপত্যবাদের থাকার মধ্যে নেওয়ার হীন এবং নগ্নকৌশল মাথায় নিয়েই ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণ করা হয়। যদিও প্রকাশ্যে বলা হয়, হুগলি নদীর নাব্য রক্ষা করে কলকাতা পোর্টকে চালু রাখা এবং ভারতের পূর্বাঞ্চলের এক বিশাল অংশের সেচব্যবস্থার সুবিধার জন্য এই বাঁধ নির্মাণ করে ভারত। ১৯৭৪ সাল বা তারও আগে থেকে যতদূর জানা যায়, ভারত গোপনে আন্তর্জাতিক গঙ্গা নদীর পানিপ্রবাহ ইচ্ছামতো নিয়ন্ত্রণ করে। বাংলাদেশের তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার এটা জানলেও কোনো আনুষ্ঠানিক অথবা অনানুষ্ঠানিক প্রতিবাদ পর্যন্ত জানায়নি, টুঁ শব্দটিও করেনি। শেষ পর্যন্ত ১৯৭৫ সালের ২১ এপ্রিল থেকে ৩১ মে পর্যন্ত ৪১ দিনের জন্য ফারাক্কা বাঁধের পরীক্ষামূলকভাবে চালু করার জন্য ভারত আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশকে জানায়। যাতে ভারত প্রতিদিন মাত্র ১১ থেকে ১৬ হাজার কিউসেক পানি প্রত্যাহারের অনুমতি পেয়েছিল। শেখ মুজিব সরকার বিলম্ব না করে এর অনুমতি দেয়। সেই পরীক্ষামূলক চালুর ভাঁওতাবাজিতে ভারত ইচ্ছামতো পানি প্রত্যাহার করতে থাকে। তারা কখনোই চুক্তি মোতাবেক পানি দেয়নি।
কিন্তু জাতিসংঘ স্বীকৃত আন্তর্জাতিক নদী আইন অনুযায়ী আন্তঃসীমান্ত বা অভিন্ন নদীর উজানের দেশগুলোকে একতরফাভাবে বাঁধ বা ব্যারাজ নির্মাণ নিষিদ্ধ করেছে। কারণ এতে ভাটির দেশগুলোর উল্লেখযোগ্য ক্ষতি হয় এবং এমনটা আইন অনুমোদন করে না। আন্তর্জাতিক আইনে এ জন্য ক্ষতিপূরণেরও বিধান রয়েছে। এ জন্য আন্তর্জাতিক নদী আইন কমিশনও রয়েছে জাতিসংঘে।
তবে ভারত এসব আন্তর্জাতিক বিধিনিষেধ ইচ্ছামতো ক্রমাগত উপেক্ষা করতে থাকে। পরবর্তীকালে বাংলাদেশ সরকার-অর্থাৎ শেখ মুজিব-পরবর্তী সময়ে বিষয়টি নিয়ে ভারতের সঙ্গে দেনদরবার এবং জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিকভাবে উত্থাপন করলেও কোনো কাজ হয়নি।
মওলানা ভাসানী স্পষ্ট বুঝতে পেরেছিলেন, ভারত বাংলাদেশে তার আধিপত্যবাদ এবং সম্প্রসারণবাদী নীতির আওতায় গঙ্গা নদীতে ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণ করেছে। তিনি এও স্পষ্টভাবে বুঝতে পারেন, ভারত আন্তর্জাতিক অভিন্ন নদীর পানিকে যুদ্ধাস্ত্র (Weapon of War) হিসেবে ব্যবহার করছে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে। এই যুদ্ধের অনিবার্য ফল বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশ বিপর্যয় এবং অর্থনৈতিক ক্ষতি, খাবার পানির সংকট, আর্সেনিকযুক্ত পানি। ২০২৪-২৫-এর এক হিসাবে দেখা গেছে, ফারাক্কা বাঁধের কারণে সরাসরি অর্থনৈতিক এবং পরিবেশগত বিপর্যয়ের কারণে প্রতিবছর দৃশ্যমান ৫ থেকে ৬ হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হচ্ছে। এ তো গেল বার্ষিক দৃশ্যমান ক্ষতি। কিন্তু বাস্তুচ্যুতি, অভ্যন্তরীণ অভিবাসন, কৃষি, মৎস্যসহ হিসাব করলে এই পরিমাণ প্রতিবছরে অথবা এ পর্যন্ত কত দাঁড়াবে? কী ভয়াবহ ক্ষতি, তা টাকার অঙ্কে হিসাব করা যাবে না।
আগেই বলেছি, মওলানা ভাসানী স্পষ্টই বুঝতে পেরেছিলেন, ফারাক্কা শুধু বাঁধই নয়, বাংলাদেশকে পরাধীনতার আওতায় আনার জন্য অর্থনৈতিক, পরিবেশ, কৃষির বাইরেও হীন এবং ভয়ংকর উদ্দেশ্য রয়েছে। এটা হচ্ছে, ভূরাজনৈতিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার জন্য বিকল্প পন্থার অপ্রতিরোধী নীরব যুদ্ধ (Passive war)।
এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, ফারাক্কা লংমার্চের আগে-পরে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে অন্তত দুই দফা আনুষ্ঠানিক চিঠি লেখেন এবং এতে তিনি ফারাক্কা সমস্যার স্থায়ী সমাধান কামনা করেন। জবাবে ইন্দিরা গান্ধী বলেন, ফারাক্কা বাঁধের উদ্দেশ্য এবং বিষয়ে ও ভারতের আন্তরিকতাকে বাংলাদেশকে ভুল বোঝানো হচ্ছে।
এই হচ্ছে ফারাক্কা মার্চের ইতিহাস। লাখ লাখ মানুষ ১৯৭৬ সালের ১৬ মে অনুষ্ঠিত ফারাক্বা মার্চ-এ অংশগ্রহণ করেন। যে ঐতিহাসিক মিছিলের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী। রাজশাহী থেকে শুরু হওয়া ৬৪ মাইলের মিছিলটি বাংলা-ভারত সীমান্তবর্তী চাঁপাইনবাবগঞ্জের কানসাটে শেষ হয়। মিছিল শেষে মওলানা ভাসানী বাংলাদেশের লাখ লাখ মানুষ দুহাত তুলে গঙ্গার পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়, দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং দেশ গড়ার কাজে আত্মোৎসর্গ করার শপথ পাঠ করান। আন্তর্জাতিক অভিন্ন নদীর পানির হিস্যা আদায়ে এমন লংমার্চ বিশ্বের ইতিহাসে বিরল। আর এটি শুধু মওলানা ভাসানীর পক্ষেই সম্ভব ছিল।
আজ জাতি সমৃদ্ধচিত্তে একজন মওলানা ভাসানীর অভাব মর্মে মর্মে অনুভব করছে। সামগ্রিক পরিস্থিতি মোকাবিলায় একজন মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ‘আবার কি আসিবে এই দেশে, বাংলাদেশে?’
লেখক : গবেষক এবং নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষাবিষয়ক বিশ্লেষক
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

