ফারাক্কার প্রভাবে ব্রিজের নিচে নদী নেই!

প্রফেসর ড. মো. ফখরুল ইসলাম

ফারাক্কার প্রভাবে ব্রিজের নিচে নদী নেই!

বাংলার নদীমাতৃক ভূখণ্ডের দিকে তাকালে একসময় যে দৃশ্য চোখে পড়ত, আজ তার অনেকটাই স্মৃতি। যেখানে ছিল উত্তাল স্রোত, জেলেদের জাল, নৌকার বৈঠা আর নদীপাড়ের প্রাণচাঞ্চল্য, সেখানে এখন ধু-ধু বালুচর, ফেটে যাওয়া মাটি আর নীরবতা। আমাদের দেশের দক্ষিণাঞ্চলের বহু নদীর বুক শুকিয়ে গেছে। অনেক সেতুর নিচে নদী নেই, আছে শুধু বালু, আগাছা আর বিচ্ছিন্ন কিছু পানির গর্ত। এই ভয়াবহ বাস্তবতার পেছনে সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত নাম হচ্ছে ফারাক্কা বাঁধ।

১৯৭৫ সালে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে গঙ্গার ওপর নির্মিত ফারাক্কা বাঁধের মূল উদ্দেশ্য ছিল কলকাতা বন্দরের নাব্যতা রক্ষা করা। কিন্তু এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদীগুলোর ওপর ভয়াবহ আকারে এসে পড়ে। গঙ্গার স্বাভাবিক প্রবাহ কমে যাওয়ার ফলে পদ্মা, গড়াই, মধুমতী, কুমার, ভৈরব, কপোতাক্ষ, চিত্রা, নবগঙ্গা, ইছামতীসহ অসংখ্য নদী ধীরে ধীরে পানিশূন্য হয়ে পড়ে। নদীর প্রাণশক্তি হারিয়ে যেতে থাকে। যে নদীগুলো একসময় জীবনের উৎস ছিল, সেগুলো আজ মৃতপ্রায়।

বিজ্ঞাপন

দক্ষিণাঞ্চলে ভ্রমণ করলে এখন প্রায়ই দেখা যায় অনেক বড় বড় সেতু দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু নিচে নদী নেই। যেন নদী হারিয়ে গেছে, শুধু ব্রিজটি অতীতের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ঝিনাইদহ, যশোর, কুষ্টিয়া, মাগুরা, খুলনা, সাতক্ষীরা কিংবা নড়াইল অঞ্চলে এমন বহু সেতু রয়েছে, যার নিচে বর্ষা ছাড়া আর পানি দেখা যায় না। শুষ্ক মৌসুমে এসব নদী পায়ে হেঁটে পার হওয়া যায়। কোথাও নদীর তলদেশ চাষের জমিতে পরিণত হয়েছে, কোথাও ইটভাটা কিংবা বালু ব্যবসার দখলে চলে গেছে।

একসময় গড়াই নদী ছিল পদ্মার প্রধান শাখা। এই নদী দিয়েই দক্ষিণাঞ্চলের অধিকাংশ নদী প্রাণ পেত। কিন্তু ফারাক্কার পর পদ্মার পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ায় গড়াইয়ের মুখে পলি জমতে থাকে। ধীরে ধীরে নদীটি তার গভীরতা হারায়। গড়াই শুকিয়ে যাওয়ার অর্থ ছিল দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদী ব্যবস্থার মৃত্যুঘণ্টা বেজে ওঠা; কারণ গড়াই ছিল পুরো অঞ্চলের ‘মাদার চ্যানেল’। গড়াই দুর্বল হয়ে পড়ার পর মধুমতী, কপোতাক্ষ, ভৈরবসহ অসংখ্য নদীও মৃতপ্রায় হয়ে পড়ে।

কপোতাক্ষ নদীর নাম শুনলে আজও মানুষের মনে ভেসে ওঠে কবি মাইকেল মধুসূদনের স্মৃতি। কিন্তু সেই কপোতাক্ষ আজ অধিকাংশ স্থানে খালে পরিণত হয়েছে। কোথাও কোথাও নদীর অস্তিত্বই বোঝা যায় না। কবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত যে নদীর স্মৃতি বুকে নিয়ে ‘সতত হে নদ, তুমি পড় মোর মনে’ লিখেছিলেন, সেই নদী আজ অধিকাংশ স্থানে কেবল পলিমাটি আর আগাছার রেখা। যশোরের ভৈরব নদী একসময় ছিল দক্ষিণাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ। এখন অনেক স্থানে এই নদী কেবল নামমাত্র অস্তিত্ব ধরে রেখেছে। নদীর ওপর নির্মিত ব্রিজের নিচে দাঁড়ালে বোঝাই যায় না, এটি কোনো নদী ছিল।

স্থানীয়রা বলেন, ‘নদী মরলে শুধু পানি মরে না, মানুষের জীবনও মরে।’ কারণ নদী শুকিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কৃষি, মৎস্য, নৌপরিবহন, জীববৈচিত্র্য—সবকিছুতে নেমে এসেছে বিপর্যয়।

ফারাক্কার আরেকটি ভয়াবহ প্রভাব হলো লবণাক্ততার বিস্তার। গঙ্গার স্বাভাবিক প্রবাহ কমে যাওয়ায় দক্ষিণাঞ্চলে মিঠা পানির চাপ হ্রাস পায়। ফলে সমুদ্রের লবণাক্ত পানি ভেতরের দিকে প্রবেশ করতে থাকে। খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট অঞ্চলে কৃষিজমি ক্রমেই লবণাক্ত হয়ে পড়ছে। একসময় যেখানে ধান, পাট, ডাল, সবজি উৎপাদিত হতো, সেখানে এখন চিংড়িঘেরের বিস্তার। মিঠাপানির মাছ হারিয়ে যাচ্ছে। পানীয় জলের সংকট বাড়ছে। নারীরা বহুদূর থেকে সুপেয় পানি সংগ্রহ করতে বাধ্য হচ্ছেন।

নদী শুকিয়ে যাওয়ার সঙ্গে পরিবেশগত ভারসাম্যও নষ্ট হয়েছে। দক্ষিণাঞ্চলের জলাভূমি, খাল-বিল, হাওর-বাঁওড় ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হচ্ছে। পাখি, মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণীর আবাসস্থল ধ্বংস হচ্ছে। সুন্দরবনের ওপরও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। কারণ সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য টিকে থাকার জন্য মিঠাপানির প্রবাহ অত্যন্ত জরুরি। নদীতে মিঠাপানি কমে গেলে বনাঞ্চলে লবণাক্ততা বাড়ে, যা বনের প্রাণবৈচিত্র্যের জন্য হুমকি।

ফারাক্কার কারণে শুধু পরিবেশ নয়, সামাজিক ও অর্থনৈতিক জীবনও বদলে গেছে। একসময় দক্ষিণাঞ্চলের মানুষ নদীকেন্দ্রিক অর্থনীতির ওপর নির্ভরশীল ছিল। জেলে, মাঝি, নৌকার কারিগর, ঘাট ব্যবসায়ী, মাছ বিক্রেতা—অসংখ্য মানুষের জীবন-জীবিকা নদীর সঙ্গে জড়িত ছিল। নদী শুকিয়ে যাওয়ার ফলে এসব পেশা হারিয়ে গেছে। অনেকে বাধ্য হয়ে শহরমুখী হয়েছেন। ফলে গ্রাম থেকে শহরে অভিবাসন বেড়েছে।

একসময় দক্ষিণাঞ্চলের নদীপথ ছিল যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম। নৌকায় মানুষ বাজারে যেত, পণ্য পরিবহন হতো, নদীপথে গড়ে উঠেছিল স্থানীয় সংস্কৃতি। এখন সেই নদীপথ হারিয়ে যাওয়ায় যোগাযোগব্যবস্থার ঐতিহ্যও বিলীন হচ্ছে। নদীর ঘাটগুলো পরিত্যক্ত। মাঝিদের গান শোনা যায় না। নদীভিত্তিক লোকজ সংস্কৃতিও ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে।

আজ দক্ষিণাঞ্চলের অনেক সেতুর নিচে দাঁড়ালে মনে হয় নদী যেন হারিয়ে যাওয়া কোনো ইতিহাস। বিশাল ব্রিজ দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু তার নিচে প্রাণহীন বালুচর। শিশুরা সেখানে ক্রিকেট খেলছে, গরু চরছে, মানুষ হাঁটছে; অথচ কয়েক দশক আগেও সেখানে নৌকা চলত, জোয়ার-ভাটা খেলত এবং মাছ ধরা হতো। এই দৃশ্য শুধু প্রকৃতির পরিবর্তন নয়, এটি একটি সভ্যতার সংকেত। নদী হারালে কেবল পানি হারায় না; হারায় সংস্কৃতি, অর্থনীতি, পরিবেশ ও মানুষের স্মৃতি।

ফারাক্কা ইস্যু দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বাংলাদেশ বহুবার ন্যায্য পানির হিস্যার দাবি জানিয়েছে। বিভিন্ন সময় চুক্তি ও আলোচনা হলেও শুষ্ক মৌসুমে পর্যাপ্ত পানিপ্রবাহ নিশ্চিত হয়নি। আন্তর্জাতিক নদীর ক্ষেত্রে উজান ও ভাটির দেশের মধ্যে ন্যায়সংগত ও টেকসই পানি ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত জরুরি। কারণ একতরফাভাবে পানি প্রত্যাহার করলে ভাটির দেশের পরিবেশ, কৃষি ও অর্থনীতি মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়ে।

তবে সমস্যার সব দায় শুধু ফারাক্কার ওপর চাপিয়ে দিলে বাস্তবতা পূর্ণাঙ্গভাবে বোঝা যাবে না। আমাদের নিজেদেরও নানা ব্যর্থতা রয়েছে। এতদিন ধরে নতজানু পররাষ্ট্রনীতি ও কূটনৈতিক অলসতা ও ব্যর্থতাকে এজন্য বহুলাংশে দায়ী করা হয়। এছাড়া নদী দখল, দূষণ, অবৈধ স্থাপনা, অপরিকল্পিত সড়ক ও বাঁধ নির্মাণ, নিয়মিত খননের অভাব—এসব কারণে নদীগুলোর অবস্থা আরো খারাপ হয়েছে। নদীর প্রাকৃতিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়েছে। নদী রক্ষায় কার্যকর ও সমন্বিত উদ্যোগের ঘাটতি পরিস্থিতিকে জটিল করেছে।

আজ দক্ষিণ বাংলাদেশের বহু ব্রিজের নিচে দাঁড়ালে মনে হয়, এটি যেন নদীর কবরস্থান। বিশাল সেতু আছে, কিন্তু তার নিচে নদী নেই—কোথাও ধানক্ষেত, কোথাও শুকনো বালু, কোথাও মানুষের হাঁটার পথ। অথচ কয়েক দশক আগেও সেই স্থান ছিল উত্তাল স্রোতের নদী। এই পরিবর্তন শুধু ভৌগোলিক নয়; এটি ইতিহাস, সংস্কৃতি ও জীবনের পরিবর্তন।

ফারাক্কার প্রভাবে দক্ষিণ বাংলাদেশে বহু ব্রিজের নিচে নদী নেই, কারণ বর্ষাকাল ছাড়া নদীর অস্তিত্ব বোঝা যায় না বছরের আট থেকে দশ মাস। এই করুণ অবস্থা আমাদের মতো একটি ভাগ্যবান জাতির জন্য দীর্ঘ পরিবেশগত বেদনার প্রতিচ্ছবি। যদি এখনই কার্যকর উদ্যোগ না নেওয়া হয়, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম হয়তো শুধু বইয়ের পাতায় এসব খরস্রোতা নদীর গল্প পড়বে, কিন্তু বাস্তবে নদী আর দেখতে পাবে না।

ফারাক্কা ইস্যু শুধু পানি বণ্টনের প্রশ্ন নয়, এটি বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম এলাকার মানুষের জীবন ও অস্তিত্বের প্রশ্ন। বাংলাদেশ বহু বছর ধরে ন্যায্য পানির হিস্যার দাবি জানিয়ে আসছে। বিভিন্ন সময়ে চুক্তি হলেও শুষ্ক মৌসুমে প্রয়োজনীয় পানিপ্রবাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। আন্তর্জাতিক নদীর ন্যায্য ব্যবহার ও আন্তঃসীমান্ত সহযোগিতার নীতিমালা অনুসরণ করে একটি কার্যকর ও টেকসই সমাধান প্রয়োজন। কারণ উজানে একতরফা পানি প্রত্যাহার ভাটির দেশের পরিবেশ ও অর্থনীতিকে বিপর্যস্ত করে।

সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় এসেছে। ১৫ বছর ধরে পশ্চিমবঙ্গ সরকার ফারাক্কা, তিস্তা প্রভৃতি নদীর পানিবণ্টন নিয়ে ভারতের কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে কাদা ছোড়াছুড়ি করে সময়ক্ষেপণ করার কৌশল নিয়েছিল। এখন কেন্দ্র ও রাজ্যে একই দল ক্ষমতায় থাকায় আর অন্য কারো ওপর এই দোষ চাপিয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। আমাদের নতুন বিএনপি সরকারকে এই বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে ভারতের সঙ্গে অভিন্ন সব নদীর পানিবণ্টন ইস্যু নিয়ে একটি টেকসই সমাধানকল্পে জোর কূটনৈতিক তৎপরতা চালানোর জন্য আশু পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত। বিশেষ করে ফারাক্কার প্রভাবে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে নবনির্মিত বহু ব্রিজের নিচে নদী নেই কেন—সেটির উত্তর দেওয়ার জন্য এই পদক্ষেপ নেওয়া খুবই জরুরি এবং এই সময়ের বিশেষ দাবি।

লেখক : রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের সাবেক ডিন

fakrul@ru.ac.bd

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন