আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

সার্বভৌমত্বের চোরাবালি

সেভাস্টোপল থেকে চট্টগ্রাম বন্দর ফেনী করিডর

কমডোর জসীম উদ্দীন ভূঁইয়া (অব.)

সেভাস্টোপল থেকে চট্টগ্রাম বন্দর ফেনী করিডর
কমডোর জসীম উদ্দীন ভূঁইয়া (অব.)

ভূ-রাজনীতির নির্মম ও কঠিন সমীকরণে একটি স্বাধীন দেশের মানচিত্র অনেক সময় দৃশ্যমান কোনো বাহিনীর অগ্রযাত্রার মাধ্যমে নয়, বরং পর্দার অন্তরালে থাকা গোপন চুক্তির অদৃশ্য কালিতে এবং তথাকথিত উন্নয়নের নামে দীর্ঘমেয়াদি লিজের মাধ্যমে নতুন করে লেখা হয়। ইউক্রেন যুদ্ধের দাউদাউ আগুনের ধোঁয়াশা যখন বৈশ্বিক রাজনীতির আকাশকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে, তখন বাংলাদেশের মানুষের সামনে একটি অত্যন্ত ভীতি জাগানিয়া সমান্তরাল চিত্র ফুটে উঠছে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, ক্রিমিয়ার পতন হঠাৎ কোনো আকস্মিক আগ্রাসনের মাধ্যমে শুরু হয়নি; এর বীজ বপন করা হয়েছিল আরো কয়েক বছর আগে ‘সেভাস্টোপল শ্যাডো’ বা একটি আইনি চুক্তির মাধ্যমে। আজ যখন আমরা মৈত্রী সেতুর মাধ্যমে ফেনী করিডর চালু হওয়া এবং আমাদের সামুদ্রিক প্রবেশপথগুলোর ওপর বিদেশি নিয়ন্ত্রণের নতুন নতুন তৎপরতা দেখছি, তখন প্রশ্ন তোলা জরুরি—বাংলাদেশ কি নিজের অজান্তেই তার নিজের ‘সেভাস্টোপল ট্র্যাপ’ বা ফাঁদে পা দিচ্ছে?

সেভাস্টোপল নজির এবং এনডিএর মারণফাঁদ

বিজ্ঞাপন

ইউক্রেনের করুণ ট্র্যাজেডি যে কোনো সার্বভৌম রাষ্ট্র, বিশেষ করে যারা আঞ্চলিক বৃহৎ শক্তির প্রতিবেশী, তাদের জন্য এক চরম শিক্ষা। ২০১০ সালের বহুল আলোচিত ‘খারকিভ প্যাক্ট’-এর মাধ্যমে সেভাস্টোপল নৌঘাঁটিতে রাশিয়ার লিজের মেয়াদ ২৫ বছর বাড়ানো হয়েছিল। তৎকালীন সময়ে একে একটি অর্থনৈতিক প্রয়োজনীয়তা হিসেবে প্রচার করা হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে এটি ইউক্রেনের ভেতরে রাশিয়ার একটি ‘রাষ্ট্রের ভেতরে রাষ্ট্র’ তৈরির সুযোগ করে দিয়েছিল। একবার যখন ইউক্রেন তার কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রগুলোর ওপর অপারেশনাল ও আইনি নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছিল, তখন তার আঞ্চলিক অখণ্ডতা শুধু একটি কারিগরি বিষয়ে পরিণত হয়েছিল।

আমি ইতঃপূর্বে চট্টগ্রাম বন্দর নিয়ে আমার নিবন্ধ ‘ইউক্রেনযুদ্ধ: চট্টগ্রাম বন্দরের জন্য সতর্কবার্তা’-এ সবিস্তারে উল্লেখ করেছিলাম, এই সার্বভৌমত্ব হারানোর প্রক্রিয়ায় প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয় নন-ডিসক্লোজার এগ্রিমেন্ট বা গোপনীয়তার চুক্তি। এনডিএ বা গোপন চুক্তি হলো ‘ধীরে ধীরে গ্রাস করার’ একটি আধুনিক করপোরেট রূপ। এটি সাধারণ জনগণকে অন্ধকারে রাখে এবং দেশের জাতীয় সম্পদকে নীরবে বিদেশের হাতে তুলে দেয়।

মৈত্রী সেতু : অবকাঠামো ও ভারতের কৌশলগত সুবিধা

ফেনী নদীর ওপর নির্মিত ১ দশমিক ৯ কিলোমিটার দীর্ঘ মৈত্রী সেতু, যা ভারতের ত্রিপুরার সাবরুমকে বাংলাদেশের রামগড়ের সঙ্গে যুক্ত করেছে, সেটি মূলত ভারতের ‘অ্যাক্ট ইস্ট’ নীতির এক মুকুটহীন বিজয়। এই ব্রিজটির নির্মাণকাজ বাস্তবায়ন করেছে ভারতের এনএইচআইডিসিএল। ২০২১ সালের ৯ মার্চ ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে সেতুটির উদ্বোধন করেছিলেন।

এই সেতুটি চালুর মাধ্যমে ভারত তার দীর্ঘদিনের স্বপ্ন পূরণ করছে—বঙ্গোপসাগরে সরাসরি ও নিরবচ্ছিন্ন প্রবেশাধিকার। সাবরুম থেকে সড়কপথে চট্টগ্রাম বন্দরের দূরত্ব মাত্র ৮০ কিলোমিটার। যদিও একে বন্ধুত্বের প্রতীক হিসেবে দেখানো হচ্ছে, কৌশলগত বিশ্লেষকদের মতে এটি মূলত বাংলাদেশের প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা ব্যূহকে পাশ কাটিয়ে তৈরি করা একটি স্থায়ী করিডোর। বর্তমানে কাস্টমস ও ইমিগ্রেশন চেক-পয়েন্ট পুরোপুরি প্রস্তুত না হওয়ায় বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু হয়নি।

করিডোর

৫ আগস্ট-পরবর্তী জনআকাঙ্ক্ষা ও বর্তমান স্থবিরতা

বাংলাদেশে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ঐতিহাসিক ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান এদেশের জাতীয় চেতনায় এক মৌলিক পরিবর্তন এনে দিয়েছে। বিগত ফ্যাসিবাদী সরকারের পতনের পর এই প্রকল্পের কাজ বর্তমানে পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। রামগড় স্থলবন্দর ও সেতুর প্রবেশপথে বিজিবির চেকপোস্ট বসানো হয়েছে। বর্তমান স্বাধীনতাকামী জনমনে প্রশ্ন উঠেছে যে, একবার যদি আন্তর্জাতিক কার্গো পরিবহনের জন্য এই পথ খুলে দেওয়া হয়, তবে বাংলাদেশের নিজস্ব সার্বভৌম কর্তৃত্ব, যেমন পণ্য পরিদর্শন করার অধিকার এবং সীমান্তের অখণ্ডতা এক ভয়াবহ অস্তিত্ব সংকটের সম্মুখীন হবে।

ঐতিহাসিক ৯৯ বছরের লিজ এবং এসএসএ বিতর্ক

আমাদের দেশের প্রধান সম্পদ ও সার্বভৌমত্বকে ক্ষুণ্ণ করার নানামুখী প্রচেষ্টাগুলো দীর্ঘদিনের। এর মধ্যে অন্যতম হলো স্টিভেডোরিং সার্ভিসেস অব আমেরিকা বা এসএসএ’র (SSA) বিতর্কিত প্রস্তাব। ২০০০ সালের শুরুর দিকে চট্টগ্রাম বন্দরের নিউ মুরিং কনটেইনার টার্মিনালটি এই কোম্পানির কাছে ৯৯ বছরের জন্য লিজ দেওয়ার একটি ষড়যন্ত্র হয়েছিল।

ঐতিহাসিকভাবে এটি অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক যে, এই আত্মঘাতী প্রস্তাবে তৎকালীন প্রধান দুটি রাজনৈতিক দলই (আওয়ামী লীগ ও বিএনপি) বিভিন্ন সময়ে সমর্থন জুগিয়েছিল। ১৯৯৮ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এমওইউ স্বাক্ষরিত হলেও ২০০১-পরবর্তী বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট সরকারও একই পথে হেঁটেছিল। এটি প্রমাণ করে, জাতীয় স্বার্থ রক্ষার চেয়ে রাজনৈতিক বলয়ে বিদেশ-তুষ্টির আকাঙ্ক্ষা অনেক সময় প্রবল হয়ে ওঠে।

চট্টগ্রামের মেয়র এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী এই লিজের বিরুদ্ধে এক কালজয়ী আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। ২০০৬ সালের এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, ‘আমি এক দিনের জন্য বন্দর বন্ধ করে বছরের বাকি ৩৬৪ দিনের জন্য বন্দরের মর্যাদা রক্ষা করতে চেয়েছিলাম।’ পরে ২০০২ সালে ড. কামাল হোসেনের আইনি লড়াইয়ের পরিপ্রেক্ষিতে উচ্চ আদালত এই চুক্তিকে অবৈধ ঘোষণা করে পর্যবেক্ষণে বলেছিল, রাষ্ট্র জনগণের সম্পদের ট্রাস্টি মাত্র এবং এমন কোনো দীর্ঘমেয়াদি লিজ দেওয়া সংবিধানের পাবলিক ট্রাস্ট ডকট্রিনের পরিপন্থী।

ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও কমডোর গোলাম রব্বানী হত্যাকাণ্ড

আমাদের সামুদ্রিক সার্বভৌমত্ব ও বন্দর সুরক্ষার লড়াইটি ছিল দেশপ্রেমের এক কঠিন পরীক্ষা। ইতিহাসের সেই উত্তাল সময়ে আমি সরকারি ডেপুটেশনে কর্মরত থাকাকালে কমডোর গোলাম রব্বানী হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটনে ব্যক্তিগতভাবে সচেষ্ট ছিলাম। কমডোর রব্বানী কেবল আমার সাবেক বসই ছিলেন না, তিনি ছিলেন আমার নিকটতম প্রতিবেশীও।

হামলার সংবাদ পাওয়ামাত্রই আমি নৌবাহিনী প্রধানকে বিষয়টি অবহিত করি। কমডোর রব্বানী চট্টগ্রামে থাকলেও তার স্ত্রী ঢাকায় আমার ঠিক পাশের বাসার প্রতিবেশী ছিলেন। খবরটি পাওয়ার পর আমি তাৎক্ষণিকভাবে আমার স্ত্রীকে জানাই যেন তিনি দ্রুত ভাবির কাছে গিয়ে সান্ত্বনা দেন। গোয়েন্দা সূত্রে আমি তখন জানতাম স্যারের অবস্থা আশঙ্কাজনক। তবুও তার স্ত্রীর মানসিক অবস্থা বিবেচনা করে আমি আমার স্ত্রীকে বলেছিলাম শুরুতে বলতে যে, এটি একটি সাধারণ দুর্ঘটনা। পরবর্তী সময়ে তাকে সিএমএইচ এবং পরে ব্যাংকক নেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত তিনি শাহাদত বরণ করেন।

১৯৯৯ সালে তৎকালীন সরকার যখন এসএসএ চুক্তির পথে হাঁটছিল, তখন চট্টগ্রাম বন্দরের চেয়ারম্যান হিসেবে তিনি এই চুক্তির ভয়াবহ পরিণতি আঁচ করতে পেরেছিলেন। একজন সরকারি চাকরিজীবী হিসেবে সরাসরি সরকারের নির্দেশ অমান্য করা তার জন্য কঠিন ছিল, তাই তিনি অত্যন্ত গোপনে চুক্তির নেপথ্য তথ্যগুলো মেয়র মহিউদ্দিন চৌধুরীর কাছে পৌঁছে দেন। কমোডর রব্বানীর এই গোপন সহযোগিতা ছাড়া মেয়রের পক্ষে সেই বিশাল প্রতিরোধ গড়ে তোলা অসম্ভব ছিল।

একটি সুগভীর ষড়যন্ত্র বা ডিপ স্টেট অ্যারেঞ্জমেন্ট : কমোডর রব্বানী অবসর নেওয়ার পর যখন কোরিয়ান ইপিজেডে যোগ দেন, তখন কমোডর এমএম রহমান তাকে সেখানে যেতে নিষেধ করেছিলেন। ২০০৪ সালের ১১ এপ্রিল তার ওপর হামলার পরপরই আমি আমার তৎকালীন ডিজি’কে বিষয়টি জানাই। তিনি তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় বলেছিলেন, তিনি আগে থেকেই এমন কিছু ঘটার আশঙ্কা করছিলেন। আজ ফিরে তাকালে মনে হয়, এই হত্যাকাণ্ডটি ছিল একটি সুগভীর ষড়যন্ত্র বা ডিপ স্টেট অ্যারেঞ্জমেন্ট, যার মূল উদ্দেশ্যটি সুনিপুণভাবে লোকচক্ষুর অন্তরালে ঢাকা ছিল।

তৎকালীন গোয়েন্দা কর্মকর্তা হিসেবে আমি সত্য অনুসন্ধানে সচেষ্ট থাকলেও ষড়যন্ত্রের জালটি এতটাই গভীর ছিল যে, এর প্রকৃত কারণটি পুরোপুরি অনুধাবন করা তখন দুঃসাধ্য ছিল। পর্দার আড়ালের মূল নায়করা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে গেলেও অন্য এক অপরাধীকে বিচারের আওতায় আনা হয়েছিল। ২০ বছর আগের সেই অস্পষ্ট সংশয় আজ বর্তমানের অভিজ্ঞতায় অনেক বেশি স্পষ্ট। হয়তো সেই সময়ে ঘটনাপ্রবাহ বুঝতে আমারও কিছুটা ভুল হতে পারত, কিন্তু বর্তমানের প্রজ্ঞায় দাঁড়িয়ে আমি নিশ্চিতভাবে বুঝতে পারছি, তৎকালীন নীতিনির্ধারকদের মাঝে এই গভীর ষড়যন্ত্র বোঝার মতো দূরদর্শিতার অভাব ছিল। ফলে দেশের স্বার্থকে বিসর্জন দেওয়ার জন্য যে বিশাল চাপ তৈরি করা হয়েছিল, তা বাইরে থেকে কারো পক্ষেই বোঝা সম্ভব ছিল না; অথচ সেই অনভিপ্রেত প্রাতিষ্ঠানিক চাপের মর্মার্থ আমি আজ এই পরিণত বয়সে এসে তীব্রভাবে উপলব্ধি করছি।

অবশেষে ২০২০ সালের ২৪ নভেম্বর এই মামলার রায়ে খুনি আবু নাসের চৌধুরীর যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়। কমোডর রব্বানী অত্যন্ত সহজ-সরল হৃদয়ের মানুষ ছিলেন। আজও চট্টগ্রাম বন্দরে প্রতি ২৫ এপ্রিল বন্দর দিবসে তার বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনায় দোয়া করা হয়। তার আত্মত্যাগ শেখায়, সার্বভৌমত্ব রক্ষায় কখনো কখনো নিজ প্রতিষ্ঠানের ভেতরে থেকেও নিঃশব্দে লড়াই চালিয়ে যেতে হয়। এই সংগ্রামেরই একপর্যায়ে ২০০৫ সালে আমি আবার নৌবাহিনীতে ফিরে আসি।

শেষকথা

বাংলাদেশকে ‘সেভাস্টোপল ছায়া’ থেকে বাঁচাতে হলে আমাদের ২০০২ সালের সেই বিচারিক চেতনা এবং দেশপ্রেমের আদর্শে ফিরে যেতে হবে। আমি আমার পূর্ববর্তী নিবন্ধে যেমনটি সতর্ক করেছিলাম, আমাদের দেশের যেকোনো কৌশলগত সম্পদ যদি গোপন এনডিএ বা অস্বচ্ছ চুক্তির মাধ্যমে পরিচালনার চেষ্টা করা হয়, তবে তা হবে আত্মঘাতী। বিশেষ করে চট্টগ্রাম বন্দরের মতো স্পর্শকাতর জাতীয় সম্পদের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের ‘নন-ডিসক্লোজার এগ্রিমেন্ট’ বা গোপন চুক্তির সুযোগ রাখা মানেই হলো সার্বভৌমত্বের চাবিকাঠি বিদেশিদের হাতে তুলে দেওয়া। আমাদের মনে রাখতে হবে, যে সড়ক বা সেতু আমাদের জাতীয় গোপনীয়তা ও নিরাপত্তার নিয়ন্ত্রক হতে চায়, সেই পথ আমাদের জন্য মুক্তির নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি পরাধীনতার।

লেখক : সাবেক সহকারী নৌবাহিনী প্রধান ও উপ-উপাচার্য, বিইউপি

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন