আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

ইরানের ‘মোজাইক ডিফেন্স’-এ কাবু যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল

জমির উদ্দিন

ইরানের ‘মোজাইক ডিফেন্স’-এ কাবু যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল

মধ্যপ্রাচ্যে ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ এখন শুধুই সামরিক সংঘাত নয়। এটি আধুনিক কৌশল ও কূটনীতির একটি নতুন অধ্যায়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইরানের মোজাইক ডিফেন্স কৌশল-যা বিভক্ত, স্বনির্ভর এবং কম খরচে দীর্ঘায়িত প্রতিরোধ নিশ্চিত করছে। প্রতিপক্ষকে চাপের মধ্যে রাখছে। এর কারণে যুদ্ধকে দ্রুত শেষ করা সহজ হচ্ছে না।

ইরানের মিলিটারি কূটনীতিতে মোজাইক ডিফেন্স একটি যুগান্তকারী কৌশল হিসেবে বিবেচিত। এর মূল ধারণা হলো কেন্দ্রীয় কমান্ড কাঠামো ভেঙে দিয়ে একটি বহুস্তরীয়, স্বনির্ভর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তৈরি করা। যাতে এক বা দুটি বড় হামলায় পুরো সামরিক চালক শক্তি ধ্বংস হওয়া অসম্ভব। এটি শুধু যুদ্ধের প্রতিক্রিয়া নয়; এটি সময়কে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করার একটি কৌশল। এই ডিফেন্স মডেলে বেসিজ মিলিশিয়া, ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি), নৌবাহিনী, ক্ষেপণাস্ত্র ইউনিট ও স্থানীয় কমান্ডগুলো স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে।

বিজ্ঞাপন

এ কৌশল মূলত এমন একটি পরিস্থিতির জন্য তৈরি করা হয়েছে, যেখানে ইরানের উচ্চপদস্থ কমান্ডার নিহত, যোগাযোগ নেটওয়ার্ক বিঘ্নিত বা সদর দপ্তর ধ্বংস হয়ে গেলেও স্থানীয় ইউনিটগুলো স্বতন্ত্রভাবে লড়াই চালিয়ে যেতে পারে। ফলে এক বা একাধিক লক্ষ্যবস্তুকে বাদ দিয়ে ফেলে দিলে পুরো ব্যবস্থা ভেঙে যাবে- এমন ধারণা এই ডিফেন্সে নেই।

আন্তর্জাতিক সামরিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, ইরান এই কৌশলকে ব্যবহার করে যুদ্ধকে দীর্ঘায়িত ও ব্যয়বহুল করেছে। যেখানে তারা কম খরচে বেশি রকম প্রতিক্রিয়া তৈরি করছে। ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনগুলো তুলনামূলক সস্তা হলেও এগুলো প্রতিপক্ষকে হাজারো ডলারের ব্যয়বহুল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যবহার করে প্রতিহত করতে বাধ্য করছে। এর ফলে ইরান ডিপ্লোম্যাটিক ও অর্থনৈতিক চাপও তৈরি করতে সক্ষম হচ্ছে।

ইরান শুধু সামরিক লড়াইতে জিততে চায় না বরং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের রাজনৈতিক ইচ্ছাশক্তি কমিয়ে দিতে চাইছে। এটি এমন এক কৌশল যেটি ধারণক্ষমতা, কম ব্যয় ও একটি দীর্ঘায়িত যুদ্ধের প্রস্তুতি প্রদর্শন করে।

কেন্দ্রীয় কমান্ডে আঘাত, কিন্তু ইরানের প্রতিরোধ অব্যাহত

যুদ্ধের বর্তমান পর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ বিমান অভিযানগুলোতে ইরানের উঁচু পর্যায়ের কমান্ড সদস্য ও কমিউনিকেশন লিংকগুলোকে লক্ষ্য করা হয়েছে। এই আক্রমণের পরেও ইরানের স্বনির্ভর ইউনিটগুলো যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। যার ফলে ইরানের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বহীন প্রতিরোধ নতুন বাস্তবতা হিসেবে দাঁড়িয়েছে।

বিশেষ করে রেডিও কমান্ড বা স্যাটেলাইট যোগাযোগ বন্ধ হলেও স্থানীয় কমান্ড ভিত্তিক প্রতিরোধ কার্যক্রম গতিশীল আছে। এতে যুদ্ধক্ষেত্রে সিংহভাগ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন চালানোর ক্ষমতা বজায় রাখা সম্ভব হচ্ছে, যদিও সাম্প্রতিক ডেটা অনুযায়ী ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের ব্যবহারের সংখ্যা কিছুটা কমে এসেছে বলে দাবি করেছে যুক্তরাষ্ট্র।

যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর এখন পর্যন্ত ইরান বিভিন্ন অঞ্চলে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। আবুধাবি, দুবাই ও অন্যান্য এলাকায় প্রায় ১৮৯টি ব্যালিস্টিক মিসাইল ও ৯৪১টি ড্রোন হামলা হয়েছে। এতে কয়েকজন সৈনিক ও সাধারণ নাগরিক নিহত ও আহত হয়েছে বলে সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে। এমনকি ইরান বাহরাইন, কুয়েত, কাতার ও অন্যান্য উপসাগরীয় অঞ্চলে নিজেদের লক্ষ্যবস্তুর বিরুদ্ধে হামলার তথ্যও আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে। যা যুদ্ধকে একটি একাধিক দেশ জুড়ে বিস্তৃত সংঘাতে পরিণত করেছে।

ইরান যে প্রতিরোধ কৌশল গ্রহণ করেছে তা কেবল সরাসরি প্রতিক্রিয়া নয়; এটি দীর্ঘায়িত যুদ্ধের পরিকল্পনা হিসেবেই দেখা হচ্ছে। দেশটির শীর্ষ কর্মকর্তা ইতোমধ্যে জানিয়েছেন, ইরান যুদ্ধকে দীর্ঘমেয়াদি ধরা হয়েছে এবং তারা তা মোকাবিলা করতে প্রস্তুত, বরং যুদ্ধের সমাপ্তি নিজেদের শর্তে হবে বলে মন্তব্য এসেছে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরান ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহারের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে এবং নিজেদের জন্য সময় কিনছে। এমন কৌশল যুদ্ধকে স্থিতিশীল দীর্ঘায়িত করছে।

যুদ্ধের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বায়ু প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, রাডার ও ক্ষেপণাস্ত্র লঞ্চিং ইউনিট লক্ষ্য করে বহু আক্রমণ চালিয়েছে এবং অনেক সিস্টেম দুর্বল করে দিয়েছে। স্থলসীমান্তেও ইরান ক্ষেপণাস্ত্র ভিত্তিস্থল ও ইউএভি (ড্রোন) উৎপাদন কেন্দ্রগুলোকে পুনর্বিন্যস্ত করে দ্রুত প্রতিক্রিয়া করছে। এমনকি ইরান বিভিন্ন স্বনির্ভর ইউনিট ও পৃথক কমান্ড ইউনিটে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার করেছে, যাতে কোনো কেন্দ্রীয় কমান্ড ধ্বংস হলে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা বজায় থাকে— যা তাদের প্রতিরোধকে টেকসই করে তুলেছে।

যুদ্ধ শুরু হওয়ার প্রথম ১০০ ঘণ্টায় যুক্তরাষ্ট্রের আনুমানিক ব্যয় প্রায় ৩.৭ বিলিয়ন ডলার (প্রতি দিন গড়ে প্রায় ৮৯১ মিলিয়ন ডলার) হয়েছে বলে ওয়াশিংটনভিত্তিক একটি গবেষণা জানায়। বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ৪৫ হাজার ২৫১ কোটি টাকা (প্রতি ডলার ১২২ টাকা ধরে হিসাব)। প্রতিদিন গড়ে এই খরচ প্রায় ৮৯১.৪ মিলিয়ন ডলার বা ৯৭ হাজার ৮৮০ কোটি টাকার বেশি। এই ব্যয়ের মধ্যে বায়ু অভিযান, সামরিক সরঞ্জাম, প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও অপারেশনাল লজিস্টিক্স অন্তর্ভুক্ত। অনেকে বিশ্লেষণ করছেন যে, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা কম খরচে হলেও প্রতিপক্ষকে উচ্চ ব্যয়ের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা চালাতে বাধ্য করছে।

কেন অপ্রতিরোধ ইরান? ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গ ও মিসাইল স্থাপনা

ইরান মধ্যপ্রাচ্যে নিজের প্রতিরক্ষা ক্ষমতা বাড়াতে কয়েকটি অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ টানেল ও মিসাইল সিটি তৈরি করেছে। এটি তাদের বহুবছরের কষ্টের ফসল। বিশেষ করে কেরমানশাহ ও সেমনান প্রদেশে এসব টানেল ও গোপন সুড়ঙ্গ বিস্তৃত। এসব স্থাপনায় ক্ষেপণাস্ত্র সংরক্ষণ, লঞ্চ ও রডোম ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা রয়েছে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এসব টানেল একাধিক স্তরের নিরাপত্তা ও স্বনির্ভর ইউনিটের মাধ্যমে পরিচালিত হয়, যাতে আক্রমণ সত্ত্বেও প্রতিরক্ষা বজায় থাকে। তবে মোট দৈর্ঘ্য বা টানেলের সংখ্যা সরকারি সূত্রে প্রকাশিত হয়নি, কারণ এগুলো গোপন সামরিক তথ্য হিসেবে গণ্য হয়।

ইরানের প্রতিরক্ষা কৌশলের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে প্রায় ২,৫০০টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, যা মধ্যপ্রাচ্যে সবচেয়ে বড় ক্ষেপণাস্ত্র শেলফের অংশ। এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর মধ্যে আছে

খোররামশাহর, সেজিল, ঘাদর, এমাদ ও শাহাব‑৩। যেগুলো বিভিন্ন রেঞ্জের এবং ভারী ওয়ারহেড বহন করতে সক্ষম। এসব ক্ষেপণাস্ত্র ভূগর্ভস্থ টানেলে সংরক্ষণ করা হয়, যাতে তারা কোনো একক হামলায় ধ্বংস না হয়।

এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল বিভিন্ন স্থানে হামলা চালালেও, ইরানের ভূগর্ভস্থ টানেল ও মিসাইল সিটি অধিকাংশ প্রতিরক্ষা সক্ষমতা অক্ষত রেখেছে। স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণে দেখা গেছে, কিছু প্রবেশদ্বার ধ্বংস হলেও ভিতরে থাকা কিছু স্থাপনা নিরাপদ রয়েছে। ইরান স্বনির্ভর ইউনিট ও পৃথক কমান্ড সিস্টেম ব্যবহার করে দ্রুত প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে, যা তাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে আরও টেকসই করেছে।

টানেলের দৈর্ঘ্য ও সম্পূর্ণ নেটওয়ার্কের তথ্য এখনো প্রকাশিত হয়নি। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা কেবল এই ভূগর্ভস্থ সুরঙ্গ ও মিসাইল সিটির অস্তিত্ব নিশ্চিত করেছেন। আইএএএ প্রধানের তথ্য অনুযায়ী, ইসফাহান অঞ্চলে উচ্চ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম থাকতে পারে এবং এর অবস্থান ও দৈর্ঘ্য সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য নেই। এই গোপনীয়তা ইরানের প্রতিরক্ষা কৌশলকে আরও শক্তিশালী ও প্রতিপক্ষের জন্য জটিল করেছে।

তবে এখন পর্যন্ত ইরানের বিভিন্ন শহর ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিস্তৃত বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়েছে। তেহরানসহ দেশটির অনেক অঞ্চলে ধোঁয়া ও বিস্ফোরণের চিহ্ন লক্ষ্য করা গেছে। বেসামরিক এলাকা, শিল্প ও শক্তি প্রতিষ্ঠান লক্ষ্য করে হামলা চালানোর ফলে তেলের খাত, বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। হামলার পর আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা উল্লেখ করেছেন, ধ্বংস ও অরাজকতা শহরাঞ্চলে চরম পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে।

ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানায়, এখন পর্যন্ত প্রায় ১,২৫৫ জনেরও বেশি মানুষ নিহত, যার মধ্যে বেশিরভাগই সাধারণ নাগরিক। আহতের সংখ্যা হাজারের ওপর, এবং হাসপাতালে ভর্তি ও জরুরি চিকিৎসার চাহিদা ব্যাপকভাবে বেড়ে গেছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল ও বসতি এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় জীবনযাত্রায় বড় প্রভাব পড়েছে।

হামলা শুধু দেশের ভেতরেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। ইরান পাল্টা প্রতিরোধ হিসেবে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে বাহরাইন, কুয়েত, ওমান ও কাতারসহ উপসাগরীয় কয়েকটি দেশে। এসব আক্রমণে সামরিক ও বেসামরিক লক্ষ্যবস্তু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, এবং কিছু অঞ্চলে প্রাণহানি ও আহতের খবর পাওয়া গেছে। যুদ্ধের যন্ত্রণা শুধু ইরানের নাগরিকদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ১৫০ জন সেনা আহত হয়েছেন, ৬জন নিহত হয়েছেন। যার মধ্যে কয়েকজন গুরুতর অবস্থায়। ইসরায়েলও ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় সামরিক ও বেসামরিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে, যদিও এ সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম

যুক্তরাষ্ট্র‑ইসরাইলকে চাপে রাখা: বাস্তবতা কি?

ইরানের কৌশলটি প্রতিপক্ষকে শুধুই সামরিকভাবেই চাপে রাখছে না; এটি একটি মানসিক ও দেরিহীন যুদ্ধের পরিস্থিতি তৈরি করেছে, যেখানে প্রতিটি আঘাতে নির্দিষ্ট ফল পাওয়া যাচ্ছে না, কিন্তু প্রতিক্রিয়া দেয়া বাধ্যতামূলক হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল বায়ুস্বত্বাধিকার ও আধুনিক অস্ত্র ব্যবহারে বড়সড় ক্ষতি করার শক্তি রাখলেও, ইরানের বহুস্তরীয় প্রতিরক্ষা কাঠামো বিস্তৃত জীবন্ত লক্ষ্য হিসেবে কাজ করছে. অর্থাৎ একাধিক স্বাধীন ইউনিট ও প্রতিরক্ষা স্তরগুলো প্রতিপক্ষের নজরকে অনেকটা বিভক্ত করে দিয়েছে।

একই সঙ্গে ইরান মধ্যপ্রাচ্যের অনেকে সহযোগী ও প্রভাবশালী গ্রুপকে লড়াইয়ে যুক্ত রেখে একক কোর্সে আক্রমণ বন্ধ নয়, বরং যুদ্ধকে বহু ফ্রন্টে বিস্তৃত করেছে। এটি ইরানের রাজনৈতিক নৈপুণ্যকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।

বহু বিশ্লেষক মনে করেন, ইরানের কৌশলটি কেবল সামরিক প্রতিরোধ হিসেবেই সীমাবদ্ধ নেই; এটি সময়ের অভাবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের দীর্ঘ‑মেয়াদি লক্ষ্য অর্জনের পথকে কঠিন করছে। সহজভাবে বলতে গেলে, ইরান সমস্ত শক্তিকে একসাথে শেষ করে জয়ী হওয়ার পরিবর্তে, সময়কে অধিক কীভাবে কাজে লাগানো যায় সে দিকে নজর দিয়েছে। এই কৌশল দীর্ঘায়িত যুদ্ধকে আরো সম্ভব করে তুলছে, যা বিপক্ষের সামরিক ও অর্থনৈতিক সহনশীলতাকে পরীক্ষায় ফেলছে। অন্যদিকে অর্থনৈতিক চাপ, বিশেষ করে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের মূল্য এবং জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা এই যুদ্ধকে শুধু সামরিক ভেন্ডেটা নয়, বরং আঞ্চলিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপরও চাপ হিসেবে তুলে ধরেছে।

যুদ্ধ ‘খুব শিগ্‌গিরই’ শেষ হবে-ট্রাম্প,আইআরজিসি বলছে যুদ্ধ শেষ করবো আমরাই!

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বেশ কয়েকটি বক্তব্যে বলেছেন যে যুক্তরাষ্ট্র‑ইসরায়েলের যুদ্ধ খুব শিগগিরই বা কয়েকদিনের মধ্যেই শেষ হওয়ার আশা করছে। তিনি জানিয়েছেন যে তারা এই যুদ্ধে ইতোমধ্যে কয়েক হাজার লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে এবং লক্ষ্য হল ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন স্টক, সামরিক সক্ষমতা ও হুমকি নির্মূল করা, যা দ্রুত নিষ্ক্রিয় করা সম্ভব হচ্ছে বলে তিনি দাবি করেছেন। ট্রাম্প ফ্লোরিডায় এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, এই যুদ্ধ খুব দীর্ঘ হয়নি এটি শিগগিরই শেষ হবে এবং তিনি ইরানকে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত করলে আরও কঠোর জবাব দেওয়ার হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন।

ট্রাম্পের আরও একটি মন্তব্যে তিনি বলেছেন, এই যুদ্ধ short‑term excursion-একটি স্বল্পকালীন অভিযান, যা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল তাদের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে করেছে। যদিও ট্রাম্প বলেন যে তাঁরা অনেক জায়গায় জয় পেয়েছেন, তিনি আবারও জোর দিয়ে মন্তব্য করেছেন যে এখনও পর্যাপ্ত জয় হয়নি, এমনকি বাইডেন প্রশাসনের সময় থেকে এই উত্তেজনা মোকাবিলায় তিনি বিভিন্ন এআইডি ব্যবহারের পক্ষে বলে জানিয়েছেন।

এই মন্তব্যের জবাবে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) ঘোষণা দিয়েছে যে যুদ্ধের শেষের সিদ্ধান্ত মার্কিনাবিশেষ নয়, বরং ইরানই নেবে। তারা ট্রাম্পের সময়সীমা‑ভিত্তিক মন্তব্যকে ননসেন্স বলে সমালোচনা করেছে এবং হুঁশিয়ারি দিয়েছে যে ইরান হরমুজ প্রণালিতে তেলের চলাচল বন্ধ করে দিতে পারে, যদি মার্কিন ও ইসরায়েলি বাহিনী তাদের লক্ষ্যে আক্রমণ চালিয়ে যায়।

আইআরজিসি আরো বলে, এই অঞ্চলে পরিস্থিতির ভবিষ্যত ইরানের কৌশল ও প্রতিরোধের ওপর নির্ভর করবে, এবং যুক্তরাষ্ট্র‑ইসরায়েলের কাছে যুদ্ধের সময়সীমা ধার্য করার কোনো অধিকার নেই। ইরানের এই কঠিন অবস্থানের ফলে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত চাপ তৈরি করছে, এবং ইরান নিজেকে মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতা রক্ষাকারী শক্তি হিসাবেও উপস্থাপন করছে।

ইসরায়েলের সরকার ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন যে তারা ইরানের দীর্ঘমেয়াদি অস্তিত্ব হুমকি মোকাবিলায় সামরিক অভিযান চালাচ্ছে এবং ইরানের কৌশলগত সামর্থ্যকে দুর্বল করেছে। ইসরায়েলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিদেওন সার বলেছেন যে যুদ্ধটি ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের ইচ্ছা অনুযায়ী চলবে, এবং পরিস্থিতি তখনই শেষ হবে যখন তারা স্থায়ী নিরাপত্তা ও হুমকি নির্মূল দেখতে পাবে। সার ইরানকে ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে অস্থিতিশীল উপাদান হিসেবে উল্লেখ করেছে এবং ইরানের নতুন সুপ্রিম লিডার মোজতবা খামেনীইকে চরমপন্থী বলে অভিহিত করেছে।

তিনি আরও বলেছেন যে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও আনুষঙ্গিক স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলা চালিয়ে এসেছে এবং লক্ষ্য ছিল ইরানকে হুমকি থেকে মুক্তি দেওয়া, যদিও তিনি নির্দিষ্ট সময়সীমা দেয়নি। সার বিশ্ব সম্প্রদায়ের কাছে তেহরানের কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নকরণ ও আন্তর্জাতিক চাপ বৃদ্ধির আহ্বান জানিয়েছেন।

এদিকে আন্তর্জাতিকভাবে ঘটনাগুলোর পেছনে আরও জটিল কূটনৈতিক অবস্থান তৈরি হয়েছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প ও রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন প্রায় এক ঘণ্টা ফোনালাপে কথা বলেছেন, যেখানে পুতিন যুদ্ধের দ্রুত রাজনৈতিক সমাধানের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে আলোচনা করেছেন। পুতিন ট্রাম্পকে ইঙ্গিত দিয়েছেন যে আন্তর্জাতিক চাপ ও কূটনৈতিক উদ্যোগের মাধ্যমে যুদ্ধ দ্রুত সমাধানের পথ খুঁজে পাওয়া উচিত।

এই সব মন্তব্য ও প্রতিক্রিয়ার ফলে মনে হচ্ছে, ইরান‑যুক্তরাষ্ট্র‑ইসরায়েল সংঘাতের ভবিষ্যত কূটনৈতিক ও সামরিক চাপের মিশ্রণে নির্ধারিত হবে, এবং দুই পক্ষই নিজেদের লক্ষ্য ও অবস্থান পরিবর্তনে প্রস্তুত নয়। যার ফলে যুদ্ধের সমাপ্তি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য অনিশ্চিত রয়ে গেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে এই যুদ্ধ নিয়ে বড় ধরনের সমালোচনা ও প্রতিবাদও চলছে। বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ হয় যেগুলো হামলার বিরোধিতা করে এবং ইরান‑ইয়্যাক সেনা নিহতের খবরকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি করেছে।

স্থল হামলায় ইরান জিততে পারে?

মধ্যপ্রাচ্যে ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের উত্তেজনা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যদি স্থল অভিযান চালানো হয়, তাতে ইরান ভূপ্রকৃতির সুবিধা ব্যবহার করে প্রতিরোধে এগিয়ে থাকবে। দেশটির পাহাড়ি, মরুভূমি ও অল্প বসতি এলাকা সরাসরি হামলায় প্রতিপক্ষকে জটিল পরিস্থিতিতে ফেলে। বিশেষ করে কেরমানশাহ, কুস্তান ও এলবুরজ অঞ্চলের পাহাড়ি অঞ্চল মার্কিন ও ইসরায়েলি স্থল বাহিনীর জন্য কঠিন।

ইরানের উত্তর-পশ্চিম এবং মধ্যাঞ্চলের পাহাড়ি এলাকায় ঘন বন ও দুর্গম স্থান আছে। এসব এলাকা প্রতিরক্ষা সহজ, এবং সামরিক বাহিনীকে গোপনভাবে লুকিয়ে রাখার সুবিধা দেয়। এছাড়া নদী, মরুভূমি ও খারাপ সড়ক পরিস্থিতি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি বাহিনীর সরঞ্জাম চালাতে সীমাবদ্ধতা তৈরি করে। এই ভূপ্রকৃতির সুবিধা ইরানকে ছোট ইউনিটে কৌশলগত আক্রমণ ও প্রতিক্রিয়া দেখানোর সুযোগ দেয়।

ইরানের মোজাইক ডিফেন্স শুধু আকাশে নয়, স্থল অভিযানে ও কার্যকর। স্থানীয় কমান্ড ইউনিট ও বেসিজ মিলিশিয়া স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে। ফলে একাধিক ছোট হামলা একসাথে প্রতিপক্ষকে বিভ্রান্ত করে এবং মূল কমান্ড ধ্বংস হলেও লড়াই অব্যাহত থাকে। ছোট ইউনিট দ্রুত অবস্থান পরিবর্তন করতে পারে, যা স্থল হামলায় বড় সুবিধা।

স্থল আক্রমণের আগে ইরান ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহার করে সরাসরি সামরিক স্থাপনাকে লক্ষ্য করতে পারে। খোররামশাহর, সেজিল, ঘাদর, এমাদ ও শাহাব‑৩ ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র দূরদূরান্ত থেকে আঘাত করে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলি বাহিনীকে স্থল পদক্ষেপে বাধা দেয়। এছাড়া স্থল অভিযান শুরুর আগে ব্যালিস্টিক ও কৌশলগত ড্রোন হামলা প্রতিপক্ষের সরঞ্জাম ও যোগাযোগ নেটওয়ার্ক দুর্বল করতে পারে।

ইরান ইতোমধ্যেই কেরমানশাহ, সেমনান ও এলবুরজ অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ টানেল ও মিসাইল সিটি তৈরি করেছে। স্থল আক্রমণের সময় এই টানেলগুলো ইউনিট ও ক্ষেপণাস্ত্রকে নিরাপদ রাখে, দ্রুত লঞ্চ ও পুনঃলক্ষণে সক্ষম করে। ফলে, বড় আঘাতের পরেও প্রতিরক্ষা অব্যাহত থাকে।

ইরানের যুদ্ধের লক্ষ্য উচিত শিক্ষা দেওয়া

ইরান যুদ্ধকে কেবল প্রতিরক্ষা হিসেবে দেখছে না, বরং এটিকে রাজনৈতিক ও কৌশলগত প্রভাব বিস্তার করার একটি মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করছে। সামরিক ও কূটনৈতিক সূত্র জানাচ্ছে, ইরানের প্রধান লক্ষ্য হলো যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আক্রমণ সীমিত করা এবং দেশের ভূখণ্ড, জনগণ ও সামরিক স্থাপনা রক্ষা করা। বিশেষ করে তেহরান, ইসমান ও কেরমানশাহ প্রদেশের ভূগর্ভস্থ টানেল ও মিসাইল সিটি ধরে রাখা ইরানের প্রধান প্রতিরক্ষা কৌশল। এই স্থাপনার মাধ্যমে ইরান ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন এবং সামরিক সরঞ্জাম দ্রুত মোতায়েন করতে পারে, যা যুদ্ধকে দীর্ঘস্থায়ী এবং কার্যকর করে।

দ্বিতীয়ত, ইরান আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারেও মনোযোগী। তারা উপসাগরীয় অঞ্চলে নিজেদের শক্তি প্রদর্শন করে প্রতিপক্ষকে চাপের মধ্যে রাখছে। সাম্প্রতিক হামলায় ইরান বাহরাইন, কুয়েত, ওমান এবং কাতার অঞ্চলে সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। এর উদ্দেশ্য কেবল সামরিক ক্ষতি করা নয়, বরং এই অঞ্চলে তাদের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রভাব রক্ষা করা। ইরানের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা বলেছেন, আমরা শুধু প্রতিরক্ষা করছি না, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও নিজেদের প্রভাব নিশ্চিত করছি।

তৃতীয়ত, ইরান যুদ্ধকে কূটনৈতিক ও আন্তর্জাতিক চাপের হাতিয়ার হিসেবেও ব্যবহার করছে। তারা আন্তর্জাতিক সংস্থা, মধ্যস্থতাকারী দেশ এবং প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের কার্যক্রম সীমিত করতে চাচ্ছে। একই সঙ্গে দেশটি নিজস্ব প্রযুক্তি ও কম ব্যয়ে সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর জোর দিচ্ছে, যাতে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধেও স্থিতিশীলভাবে প্রতিরক্ষা চালানো সম্ভব হয়। এই কৌশল ইরানের লক্ষ্যকে প্রতিরক্ষা, আঞ্চলিক প্রভাব এবং কূটনৈতিক শক্তি-এই তিন স্তরে সফল করার দিকে নিয়ে যাচ্ছে।

সূত্র: RadioFreeEurope/RadioLiberty, The Wall Street Journal, Caspian Post

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন