দেশ এক অদ্ভুত সময় পার করছে। অর্থনীতি চাপের মুখে। জ্বালানি সংকট তীব্র। বিদ্যুৎ নেই। কারখানা বন্ধের পথে। বাজারে আগুন। বিনিয়োগ থমকে গেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে উত্তপ্ত রাজনীতি। বক্তব্যে আগুন। পাল্টা বক্তব্যে আরো আগুন। ফলে কী হচ্ছে? মানুষ উদ্বিগ্ন। রাষ্ট্র অস্থির। ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত।
এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—এই সংকট কি শুধুই অর্থনৈতিক? না। এটি রাজনৈতিক। এটি প্রাতিষ্ঠানিক। এটি বিশ্বাসের সংকট।
অর্থনীতির ভাষা খুব সরল। সংকট থাকলে তার লক্ষণ দেখা যায়। এখন আমরা কী দেখছি? জ্বালানি ঘাটতি, বিদ্যুৎ উৎপাদনে বিঘ্ন, শিল্পে স্থবিরতা, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, বিনিয়োগে স্থবিরতা, আর্থিক খাতে অনিশ্চয়তা। এগুলো বিচ্ছিন্ন নয়। এগুলো একই চিত্রের অংশ।
সরকার যদি বলে—‘সংকট নেই’—তাহলে সমস্যা আরো বাড়ে। কারণ বাস্তবতা অস্বীকার করলে সমাধানও অস্বীকার করা হয়। অর্থনীতিবিদ জন মেনার্ড কেইনস বলেছিলেন—‘ফ্যাক্টস চেঞ্জ। আই চেঞ্জ মাই মাইন্ড। হোয়াট ডু ইউ ডু?’ বাংলায় অর্থ—বাস্তবতা বদলালে সিদ্ধান্তও বদলাতে হয়। কিন্তু এখানে আমরা উল্টোটা দেখছি। বাস্তবতা বদলাচ্ছে। নীতিনির্ধারণ স্থির।
সংকট সামাল দিতে সরকার টাকা ছাপাচ্ছে—এমন অভিযোগ উঠছে। এটি বিপজ্জনক। কারণ—এতে মুদ্রাস্ফীতি বাড়ে, টাকার মান কমে, সঞ্চয় ক্ষতিগ্রস্ত হয়, দরিদ্র আরো দরিদ্র হয়। মিল্টন ফ্রিডম্যান স্পষ্টভাবে বলেছিলেন—‘ইনফ্লেশন ইজ অলওয়েজ অ্যান্ড এভরিহোয়্যার আ মনিটারি ফেনোমেনন।’ অর্থাৎ মুদ্রাস্ফীতি মূলত অর্থ সরবরাহের সমস্যা। যদি উৎপাদন না বাড়ে; কিন্তু বাজারে টাকা বাড়ে—তাহলে দাম বাড়বেই। এখানে সেটাই হচ্ছে।
রাজনৈতিক উত্তাপ : গণতন্ত্র না প্রতিহিংসা
এই অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যেই রাজনীতি আরো তপ্ত হয়েছে। বিএনপি বলছে—জামায়াতকে ‘নির্মূল’ করতে হবে। জামায়াত বলছে—এটি অসাংবিধানিক। এটি বিপজ্জনক ভাষা। কারণ গণতন্ত্রে ‘নির্মূল’ শব্দের কোনো স্থান নেই। রাজনীতি মানে প্রতিযোগিতা। ধ্বংস নয়। হান্না আরেন্ট বলেছিলেন : ‘দ্য এসেন্স অব পলিটিকস ইজ প্লুরালিটি।’ অর্থাৎ রাজনীতির প্রাণ বহুত্ব। যেখানে ভিন্ন মত থাকবে। ভিন্ন দল থাকবে। ভিন্ন মতাদর্শ থাকবে। যদি কেউ বলে—অন্যকে মুছে ফেলতে হবে, তাহলে সেটি গণতন্ত্র নয়। সেটি আধিপত্যবাদ।
বিরোধীদের প্রতিক্রিয়াও কম তীব্র নয়। তারা বলছে—এই বক্তব্য ফ্যাসিবাদের ভাষা। এটি সহিংসতার ইঙ্গিত। সমস্যা হলো—দুই পক্ষই একই ভাষা ব্যবহার করছে। একজন বলছে ‘নির্মূল’, অন্যজন বলছে ‘ফ্যাসিবাদ’। ফলে রাজনৈতিক ভাষা ক্রমেই চরমপন্থি হচ্ছে। কার্ল পপার সতর্ক করেছিলেন: ‘আনলিমিটেড টলারেন্স মাস্ট লিড টু দ্য ডিসঅ্যাপিয়ারেন্স অব টলারেন্স।’ অর্থাৎ অসহিষ্ণুতা যদি বাড়ে, তাহলে সহিষ্ণুতাই হারিয়ে যায়। বাংলাদেশ এখন সেই ঝুঁকিতে দাঁড়িয়ে।
গণভোট বিতর্ক : বৈধতা বনাম ক্ষমতা
গণভোট নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। কিন্তু এখন এটি রাজনৈতিক সংঘাতের কেন্দ্রে। ১১ দল বলছে—৭০ শতাংশ মানুষের রায় মানতে হবে। সরকার পক্ষ নীরব বা অস্বীকার করছে। এখানে মূল প্রশ্ন—রাষ্ট্রের বৈধতা কোথা থেকে আসে? নির্বাচন? গণভোট? নাকি জনসমর্থন? জ্যাঁ জাক রুশো বলেছিলেন : ‘দ্য জেনারেল উইল ইজ অলওয়েজ রাইট।’ অর্থাৎ জনগণের সম্মিলিত ইচ্ছাই চূড়ান্ত। এর মানে গণভোটে রায় মানতে হবে। যদি জনগণের বড় অংশ মনে করে তাদের মতামত উপেক্ষিত— তাহলে রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়বে।

নাহিদ ইসলাম বলেছেন, ‘সংসদ আর রাজপথ একাকার হয়ে যাবে।’ তার এই বক্তব্যে কী বোঝায়? এটি বোঝায়—প্রাতিষ্ঠানিক রাজনীতির ওপর আস্থা কমছে। সংসদে সমাধান না হলে রাজপথে যাবে। এটি গণতন্ত্রের জন্য সতর্ক সংকেত। স্যামুয়েল হান্টিংটন বলেছিলেন : ‘পলিটিক্যাল অর্ডার ইজ মোর ইম্পর্ট্যান্ট দ্যান পলিটিক্যাল পার্টিসিপেশন।’ অর্থাৎ শৃঙ্খলা ছাড়া অংশগ্রহণ বিশৃঙ্খলা তৈরি করে। যদি সবকিছু রাজপথে নির্ধারিত হয়—তাহলে প্রতিষ্ঠান দুর্বল হয়। উল্টো দিকও আছে, সরকার যদি প্রতিষ্ঠানকে দুর্বল করতে চায়, তাহলে জনগণ রাজপথ বেছে নেয়।
সবচেয়ে বড় বিষয় হলো—মানুষ ভালো নেই। দাম বাড়ছে, চাকরি কমছে, বিদ্যুৎ নেই ও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ—এই বাস্তবতা রাজনীতিকে আরো উত্তপ্ত করে। কারণ ক্ষুব্ধ মানুষ সহজেই আন্দোলনে জড়ায়। টেড গার বলেছিলেন : ‘রিলেটিভ ডিপ্রাইভেশন লিডস টু পলিটিক্যাল ভায়োলেন্স।’ অর্থাৎ মানুষ যখন মনে করে তারা বঞ্চিত—তখন সংঘাত বাড়ে।
বাংলাদেশ এখন সেই পর্যায়ে ঢুকছে কি না—সেটি গুরুত্ব সহকারে ভাবতে হবে। রাজনীতিতে নতুন শক্তির উত্থান হচ্ছে। নতুন দল। নতুন নেতৃত্ব। নতুন দাবি। এটি স্বাভাবিক।
কিন্তু সমস্যা হচ্ছে—সবাই সংঘাতের ভাষা ব্যবহার করছে। কেউ আপসের ভাষা ব্যবহার করছে না। ফলে রাজনীতি হয়ে উঠছে ‘জিরো-সাম গেম’—যেখানে একজন জিতলে অন্যজন হারবেই। এটি বিপজ্জনক।
আজকের সবচেয়ে বড় সংকট জ্বালানি নয়। অর্থনীতিও নয়। সবচেয়ে বড় সংকট—বিশ্বাস। মানুষ বিশ্বাস করছে না। যখন বিশ্বাস ভেঙে যায়—তখন রাষ্ট্র দুর্বল হয়। ফ্রান্সিস ফুকুয়ামা বলেছিলেন : ‘ট্রাস্ট ইজ দ্য ফাউন্ডেশন অব সোশ্যাল অর্ডার।’ বিশ্বাস ছাড়া উন্নয়ন হয় না। রাজনীতি টেকে না। রাষ্ট্র স্থিতিশীল থাকে না।
সরকার কী করবে
এই পরিস্থিতিতে সরকারের সামনে কয়েকটি বড় দায়িত্ব রয়েছে। ১. বাস্তবতা স্বীকার করুন, সংকট অস্বীকার নয়। স্বীকার করতে হবে। জ্বালানি সমস্যা আছে, অর্থনৈতিক চাপ আছে—স্বীকার করলে সমাধান শুরু হয়। ২. রাজনৈতিক ভাষা বদলান। ‘নির্মূল’, ‘ধ্বংস’—এই শব্দ বাদ দিন। গণতন্ত্রে প্রতিপক্ষ শত্রু নয়। প্রতিদ্বন্দ্বী। সংলাপ শুরু করুন। সমঝোতার পথ খুলুন। ৩. গণভোট ইস্যুতে স্বচ্ছতা আনুন। যদি গণভোট হয়ে থাকে—তার ফল নিয়ে স্পষ্ট অবস্থান দিন। মানবেন? না মানলে কেন? অস্পষ্টতা অস্থিরতা বাড়ায়। ৪. অর্থনীতিতে জরুরি পদক্ষেপ—জ্বালানি আমদানিতে অগ্রাধিকার, শিল্পে প্রণোদনা, বাজার মনিটরিং জোরদার, টাকা ছাপানো কমানো ও স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা দরকার। ৫. প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করুন, বিচারব্যবস্থা স্বাধীন রাখুন, প্রশাসন নিরপেক্ষ রাখুন, নির্বাচন কমিশন বিশ্বাসযোগ্য করুন। প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী না হলে রাজনীতি অস্থিরই থাকবে। ৬. বিরোধী দলকে শত্রু ভাববেন না। বিরোধী দল গণতন্ত্রের অংশ। তাদের দমন নয়—তাদের সঙ্গে কাজ করতে হবে।
নেলসন ম্যান্ডেলা বলেছিলেন : ‘ইফ ইউ ওয়ান্ট টু মেক পিস উইথ ইউর এনেমি, ইউ হ্যাভ টু ওয়ার্ক উইথ ইউর এনেমি।’ অর্থাৎ আপনি যদি আপনার শত্রুর সঙ্গে শান্তি করতে চান, তাহলে তার সঙ্গে কাজ করতে হবে।
বাংলাদেশ এখন এক ক্রান্তিকালে। একদিকে অর্থনৈতিক চাপ। অন্যদিকে রাজনৈতিক উত্তাপ। এই দুই মিলেই তৈরি হয়েছে অস্থির পরিবেশ। যদি এখনই সতর্ক না হওয়া যায়—
সংকট গভীর হবে। কিন্তু সুযোগও আছে। সংলাপের সুযোগ, সংস্কারের সুযোগ, নতুন আস্থার সুযোগ। প্রশ্ন একটাই—রাষ্ট্র কি সেই পথ বেছে নেবে? নাকি সংঘাতের পথেই হাঁটবে? ইতিহাস বলে—সংঘাত কখনো স্থায়ী সমাধান দেয় না।
সমাধান আসে সংলাপ থেকে। সাহসী সিদ্ধান্ত থেকে এবং বাস্তবতা স্বীকার করার মধ্য দিয়ে। বাংলাদেশের সামনে এখন সেই পরীক্ষা।
লেখক : সাবেক সাধারণ সম্পাদক, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

