আমেরিকা-পরবর্তী নতুন বিশ্ব

আমীর খসরু

আমেরিকা-পরবর্তী নতুন বিশ্ব
আমীর খসরু

আমরা বর্তমান বিশ্বব্যবস্থার দিকে দৃষ্টি দিলে এ বিষয়টি অবশ্যই দেখতে পাব যে, বিশ্বব্যবস্থা বা ওয়ার্ল্ড অর্ডারের ক্রমাগত পরিবর্তন হচ্ছে। খুব সূক্ষ্ম দৃষ্টিতে দেখলে দেখা যাবে, ইরান যুদ্ধ বিশ্বব্যবস্থায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমহ্রাসমান অবস্থার ইঙ্গিতবাহী। ইরান যুদ্ধের মধ্য দিয়ে এ বিষয়টি স্পষ্ট যে, এককেন্দ্রিক বা একক পরাশক্তিনির্ভর বিশ্বব্যবস্থার নড়াচড়া শুরু হয়েছে এবং চলছে। আমেরিকা আর আগের অবস্থায় নেই। যুক্তরাষ্ট্রকে বিচার-বিশ্লেষণে দেখা যাবে কীভাবে বিশ্ব মোড়লের মোড়লিপনা পরিবর্তন হতে যাচ্ছে এবং পারে। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের আগ পর্যন্ত বিশ্বব্যবস্থা বা ওয়ার্ল্ড অর্ডার ছিল দ্বিমেরুকেন্দ্রিক। কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর বিশ্ব এককেন্দ্রিক হয়ে গেছে। এককেন্দ্রিকতার সমস্যাটি হচ্ছে, শক্তির ভারসাম্যহীনতার সৃষ্টি। আর এ কথাও সত্য যে, বিশ্ব কখনোই একক শক্তি দ্বারা শাসিত হয়নি এবং হয় না।

অতীত ইতিহাস এ সত্যই প্রমাণ করে, যা সবারই জানা আছে। মার্কিন লেখক এবং সাংবাদিক ফরিদ জাকারিয়া তার দ্য পোস্ট আমেরিকান ওয়ার্ল্ড (The Post American World) বইয়ে গত ৫০০ বছরে ক্ষমতার টেকনিক বা পাটাতনের ব্যাপক পরিবর্তন বিশ্লেষণ করে বলেন, এই সময়কালে বিশ্বক্ষমতার শক্তির এবং ক্ষমতার পরিবর্তনের ঘটনা ঘটেছে। এগুলো হয়েছে আন্তর্জাতিক রাজনীতি, অর্থনীতি, সংস্কৃতিসহ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য ক্ষেত্রে। আর এই পরিবর্তনগুলো অতি সাধারণ ছিল না, ছিল মৌলিক, গুণগত এবং ব্যাপক। প্রথমটি হচ্ছে—১৫ শতাব্দীতে বিশ্বজুড়ে পশ্চিমা শক্তির উত্থান ঘটেছে এবং নাটকীয়ভাবে ১৭০০ শতাব্দীতে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, বাণিজ্য এবং পুঁজির আহরণ বা পুঞ্জীভবন ঘটেছে। এ সময় কৃষির ‍উন্নয়নও হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

ফরিদ জাকারিয়ার মতে, দ্বিতীয়টি হচ্ছে—১৮ শতকের শেষের দিকে আমেরিকার উত্থান এবং এটি ঘটেছে পশ্চিমা শিল্পবিপ্লবের পরপরই। এছাড়া এর পরপরই আমেরিকা বা যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়। ফরিদ জাকারিয়াসহ ইতিহাসবিদদের মতে, রোমান সাম্রাজ্যের বিশ্ব পরাক্রমশালিতার পরে যুক্তরাষ্ট্রই একমাত্র দেশ, যা এমন শক্তি এবং ক্ষমতাধর হয়ে ওঠে। কিন্তু অন্যদিকে কয়েক দশক ধরে উত্থান হচ্ছে—দ্য রেস্ট অব দ্য রেস্ট, অর্থাৎ বাকিদের মধ্যে বাকিরা। এই বাকিদের মধ্যে বাকিদের অধিকাংশই হচ্ছে, এশীয়, যাকে বলা হয়, দ্য রাইজ অব এশিয়া বা এশিয়ার উত্থান। এই ঘটনাবলি ঘটেছে ১৯ শতকের শেষ থেকে বর্তমান পর্যন্ত।

অর্থনীতিবিদ অ্যান্টনি ভ্যান অ্যাগমেল (Antonie van Agmel) ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, বিশ্বের অন্তত ২৫টি মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানি থাকবে, যার মালিকানা যুক্তরাষ্ট্রের হবে না, থাকবে অন্য দেশের—অর্থাৎ চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, মালয়েশিয়াসহ এ ধরনের দেশগুলোর মালিকানার। আর তারাই নিয়ন্ত্রণ করবে উদীয়মান বিশ্ববাজার।

ফরিদ জাকারিয়া এখন থেকে প্রায় দুই দশক আগে অন্য এক লেখায় বলেছিলেন, সামরিক ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের এক নম্বর সুপার পাওয়ার। কিন্তু ক্ষমতার বিন্যাসে ক্ষমতার ভাগাভাগি হচ্ছে। আমেরিকার একচ্ছত্র ক্ষমতা ক্রমেই দূরে সরে যাবে, যাকে বলা হবে, পোস্ট-আমেরিকান ওয়ার্ল্ড বা আমেরিকা-উত্তর বিশ্ব। এমন লক্ষণ কি আমরা দেখতে পাচ্ছি না?

বিভিন্ন ইতিহাসবিদ, রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, আমেরিকার উচিত পরিবর্তিত নয়া বিশ্বব্যবস্থার সঙ্গে সঙ্গে খাপ খাইয়ে তাদের মনোভাব ভূরাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং কৌশলগত পরিবর্তন করা। এই লক্ষ্যে তাদের বেশ কয়েকটি বিষয় পরিবর্তন, সংশোধন এবং পরিমার্জন করা জরুরি।

বিশ্বখ্যাত মার্কিন সাময়িকী দ্য আটলান্টিকে (মার্চ ২০২৬ সংখ্যা) প্রখ্যাত সাংবাদিক এবং গবেষক

রবার্ট ক্যাগান (Robert kagan) তার নিবন্ধ আমেরিকা ভার্সেস দ্য ওয়ার্ল্ডে বলেন, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চান ১৯ শতকের বিশ্বব্যবস্থায় ফিরে যেতে। ট্রাম্প আমেরিকাকে ওই শতকের দিকে নিয়ে গিয়ে ফেলে যেতে চান, যেখানে সমৃদ্ধিশালী, উন্নত, সফল এবং ক্ষমতাবান আমেরিকা আর থাকবে না। সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বকেও তিনি নিয়ে যেতে চান এক অনিরাপদ বা নিরাপত্তাহীন ব্যবস্থায় এবং অবস্থায়।

রবার্ট ক্যাগান বলছেন, ট্রাম্প প্রশাসনের নিরাপত্তা কৌশলবিশারদ দল এ কথা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, আমেরিকান আধিপত্যশীল উদারনৈতিক বিশ্বব্যবস্থার সমাপ্তি ঘটেছে। কারণ ওই ব্যবস্থায় আসলে এবং আদতে টিকে থাকতে পারবে না, তা প্রমাণিত হয়েছে। কারণ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে আর ঐতিহাসিক অভূতপূর্ব এবং নজিরবিহীনভাবে বিশ্বকে নিরাপত্তা দিতে অক্ষম। আর এটা তারা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে। ক্যাগানের ধারণা, ৮০ বছর ধরে যে নীতি ব্যবস্থার পথে যুক্তরাষ্ট্র চলছিল, তাকে ধ্বংস করার মতো বিশ্বব্যবস্থার পথেই হাঁটছে ওই দেশটি। আমেরিকানরা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় এবং আগে পরের ভয়াবহ পথের মধ্যেই ঢুকে পড়ছে, যাকে তারা ছেলেখেলা বা সহজ-সরলীকৃত একটি কাজ হিসেবেই বিবেচনা করেছিল। আর স্নায়যুদ্ধকে মনে করেছিল বেহেশত (Paradise)। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি হচ্ছে, বর্তমান অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় তারা বিশ্বকে ১৯৪৫-এর আগের মতোই সম্ভবত দেখতে চায়। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতা হচ্ছে প্রতিযোগিতা এবং বিবাদের পরিস্থিতি এবার বহু গুণে বাড়বে—যেমনটা ঘটে থাকে দ্রুত ক্যানসার ছড়িয়ে পড়ার মতো। ক্যাগানের আশঙ্কা, আমেরিকা নির্ভরযোগ্য বন্ধুহীন হয়ে পড়বে এবং তেমন কোনো সহায়ক জোটও থাকবে না। টিকে থাকা, শক্তি প্রদর্শন এবং সমৃদ্ধি—অর্থাৎ যা কিছু করার, তা নিজে নিজে আমেরিকাকে করতে হবে, একান্তই নিজস্ব শক্তিতে। আর এই পরিস্থিতিতে প্রতিরক্ষা ব্যয় আরো বাড়াতে হবে, কোনো ক্রমেই কমবে না। কমানো যাবে না। কারণ জোটবদ্ধ এবং অ্যালায়েন্সের মাধ্যমে যে সুবিধাটা পাওয়া যাচ্ছিল, যেমন অন্যান্য দেশের সম্পদ, বাজারে অবাধ অধিকার তা ক্রমেই সংকুচিত হতে থাকবে। উল্টো কৌশলগত যেসব সামরিক ঘাঁটি ছিল এবং এর জন্য যে সুযোগ-সুবিধা, তাও আর পাওয়া যাবে না। কারণ একা হয়ে গেলে, জোটবদ্ধতা না থাকলে, তা স্বাভাবিক নিয়মেই কমবে। বরং যুক্তরাষ্ট্রকে অন্যান্য যে বৃহৎ শক্তিশালী প্রতিপক্ষ আছে তাদের একাই মোকাবিলা করতে হবে।

কিন্তু আমেরিকানরা বাস্তবে অথবা মনস্তাত্ত্বিকভাবে এমন পরিস্থিতির জন্য এবং তা মোকাবিলা করার জন্য প্রস্তুত নয়। কারণ আট দশক ধরে তারা এক কথিত উদার বিশ্বব্যবস্থার মধ্যে শক্তিমানভাবে বসবাস এবং এমন পরিস্থিতিতেই অভ্যস্ত হয়ে পড়েছেন। জনগণও এমন এক ব্যবস্থার মধ্য থেকে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছেন, যেখানে জনগণ চান ইউরোপের এবং এশীয় দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক এবং যথাসম্ভব কম বা নিষ্ক্রিয় সামরিক, প্রতিরক্ষার সহাবস্থান থাকবে। তারা এসব দেশের সঙ্গে অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক আদান-প্রদান এবং সংযোগেই বিশ্বাসী।

কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্প কি সেই পথে হাঁটছেন? না, হাঁটছেন না। বরং উল্টোপথে হাঁটছেন বলে মনে করে বিশ্বের প্রভাবশালী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকস। তাহলে আমরা দেখব কী বলছে, এই প্রভাবশালী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি তাদের গবেষণামূলক বিশ্লেষণে।

আমেরিকা

নতুন বিশ্বের জন্ম

লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকসের ভাষ্যে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রকে ঘিরে উদ্বেগ এবং শঙ্কার তৈরি হয়েছে। মধ্যম শক্তিগুলো ভারসাম্য রক্ষার জন্য নতুন এক বিশ্ব জন্ম দিচ্ছে। ২০ এপ্রিল লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকসের ওই পর্যালোচনায় প্রফেসর ক্যাথলিন ম্যাকনামারা বলেন, বর্তমান বিশ্বের সব অপ্রত্যাশিত এবং উদ্বেগজনক পরিবর্তনের মধ্যে একটি তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা ঘটে গেছে এবং তা হচ্ছে পশ্চিমা অন্য শক্তিগুলোর মধ্যে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নেওয়া পদক্ষেপগুলো সদ্য সাবেক মিত্রদের মধ্যে, বিশেষ করে ইউরোপে ভয়ভীতি এবং উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। আর এর কারণে এসব দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও তাদের জনগণ আমেরিকানকে আর নির্ভরযোগ্য সঙ্গী বা অংশীদারের বদলে প্রতিপক্ষ হিসেবেই বিবেচনা করছে।

প্রফেসর ক্যাথলিন ম্যাকনামারা গবেষণা এবং বিশ্লেষণের ওপর নির্ভর করে বলেন, আমরা এমন এক বিশ্বের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি, যেখানে আমেরিকার একসময়ের মিত্ররা আর ওই দেশটির সঙ্গে কোনো অর্থনৈতিক চুক্তি করতে চাইবে না। বরং আমেরিকাকে পাশ কাটিয়ে নতুন পথ এবং পন্থা বের করতে চাইবে। ইতোমধ্যে এর আলামত শুরু হয়ে গেছে। দক্ষিণ আমেরিকার জোট, যাকে সংক্ষেপে মারকোসুর বলা হয় এবং এতে আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, প্যারাগুয়েসহ ওই অঞ্চলের প্রায় সব দেশ রয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন যুক্তরাষ্ট্রকে পাশ কাটিয়ে মারকোসুরের সঙ্গে বাণিজ্য, অর্থনৈতিকসহ নানা চুক্তি করেছে। এটা একটি ঐতিহাসিক ঘটনা নয়া বিশ্বের জন্য। বাজার সৃষ্টি, অর্থনৈতিক সহযোগিতার বাইরেও বিশ্বব্যবস্থার ভারসাম্য পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এ রকম ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে মূলত যুক্তরাষ্ট্র অর্থনৈতিক তো বটেই, রাজনৈতিকভাবেও ক্রমেই বিচ্ছিন্নতার পথে এগিয়ে যাচ্ছে। আর এমন প্রবণতা নিঃসন্দেহে যুক্তরাষ্ট্রকে অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল থেকে দুর্বলতর করতে থাকবে।

প্রফেসর ক্যাথলিন ম্যাকনামারা একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন, ট্রান্স-আটলান্টিক বা আন্তঃআটলান্টিক সম্পর্কের অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, এক পাশের দেশগুলো অন্য পাশের দেশগুলোর মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষার রাজনীতি। কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পরে স্নায়ুযুদ্ধ এবং দ্বিমেরুকেন্দ্রিকতার সেই ব্যবস্থার বিদায়ের পর একটি নতুন ব্যবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল। আন্তঃআটলান্টিক ভারসাম্যের ব্যবস্থার ফলে যুক্তরাষ্ট্রসহ পুরো আমেরিকা মহাদেশের সঙ্গে যেমন ইউরোপ ও এশিয়ার নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা, বাণিজ্য, অর্থনৈতিকসহ নানা ক্ষেত্রে আস্থা, বিশ্বাসের সম্পর্কের সৃষ্টি হয়েছিল। বিষয়টি জটিল সমীকরণের হলেও ইউরোপ এবং এশিয়ার সঙ্গে আমেরিকা মহাদেশীয় দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে ওঠা ছিল ইতিবাচক এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এটি ছিল একটি উদাহরণযোগ্য মডেল। এরই কারণে ন্যাটো থেকে বিশ্ববাণিজ্য সংস্থা (ডব্লিউটিও) এবং এ ধরনের আন্তঃমহাদেশীয় সংস্থা ও সংগঠন গঠিত হয়। নানা অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক, পরিবেশ সুরক্ষাসহ নানা চুক্তি হয় বিভিন্ন দেশের মধ্যে। রাষ্ট্রীয় সম্পর্কের চেয়ে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে এটি ছিল আরো অনেক বেশি গভীর। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পরেও এককেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থায় নতুন বৈশ্বিক নেটওয়ার্কগুলো একত্র করলে দেখা যায়, সার্বভৌমত্বের সম্মিলন—অর্থাৎ বিভিন্ন দেশের নানা সম্পর্ক এবং ইতিবাচক বোঝাপড়ার এক দুনিয়া। অভিবাসন, দেশান্তরের প্রশ্নেও সহজীকরণের এক উদাহরণ সৃষ্টি হয়।

কিন্তু প্রেসিডেন্ট হিসেবে ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর পরিস্থিতির অবনতি হতে শুরু করে। বিশেষ করে, ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে পরিস্থিতির নাটকীয় পরিবর্তন হয় বলে মনে করে দি লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকস। প্রভাবশালী এই জ্ঞানপীঠ বলছে, আপাতদৃষ্টিতে কল্যাণকর আমেরিকার আধিপত্যের সেই কথিত উদারনৈতিক মডেল থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে এবং আমেরিকা শক্তি প্রদর্শন এবং বিদ্বেষপূর্ণ রূপে আবির্ভূত হয়েছে। ট্রাম্প এখন গ্রিনল্যান্ড দখলেরও কথা বলছেন। চীন, রাশিয়া, কানাডাসহ নানা দেশকে হুমকি প্রদর্শন করছেন। শুধু হুমকিই নয়, যেসব দেশ শুল্কমুক্ত সুবিধা পেয়ে আসছিল, মুক্ত বাজারের সুবিধাভোগী ছিল, তারা আমেরিকার কার্যক্রমে আমেরিকান প্রতিষ্ঠানগুলোর পতন দেখতে পাচ্ছে।

আমেরিকার ভবিষ্যৎ সম্পর্কে প্রফেসর ক্যাথলিন ম্যাকনামারার ভাষ্য হচ্ছে এ রকম, বিশ্ব রাজনীতিতে আমরা আগেও বৈশ্বিক ভারসাম্য রক্ষার বিষয় দেখেছি। দুই বিশ্বযুদ্ধের মধ্যবর্তী সময়ে বাণিজ্যসহ জোটবদ্ধতার উত্থান বিশ্ব প্রত্যক্ষ করেছে। আর একসময়ের বিশ্বশক্তি ব্রিটেনের পতন হয়েছে। তখন সংশোধনবাদী যুদ্ধবাজ শক্তির উত্থান হয়েছিল। কিন্তু ফল ভালো হয়নি। প্রফেসর ম্যাকনামারা তার গবেষণায় বর্তমান আমেরিকাকে নতুন আমেরিকা হিসেবে অভিহিত করে বলেন, নতুন এই আমেরিকাকে নিয়ে বিশ্বের অন্য দেশগুলো তার নাগরিকদের জন্য প্রবৃদ্ধি, শান্তি, স্থিতিশীলতা সুরক্ষিত করতে পারবে না। রাষ্ট্রীয় এবং বেসরকারি সংস্থাগুলো কি পারবে এই আমেরিকাকেন্দ্রিক কোনো পরিকল্পনা করতে?

এই লেখায় যেসব বিশেষজ্ঞ এবং রাজনীতি বিজ্ঞানীদের বক্তব্য উপস্থাপিত হয়েছে, তারা প্রায় সবারই একই ভাষ্য, আমেরিকা-উত্তর নয়া বিশ্বব্যবস্থার আবির্ভাব হতে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরাও এমন অভিমত দিয়ে ইতোমধ্যে বিস্তর গবেষণা, বিশ্লেষণ এবং ভাবষ্যদ্বাণী করছেন যে, সুপার পাওয়ার আমেরিকার পতন এবং ক্ষয়িষ্ণু পরিস্থিতির শুরু হয়েছে।

প্রভাবশালী আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা চাথাম হাউস (Chatham House) ওই ভবিষ্যদ্বাণীর সঙ্গে একমত পোষণ করে এই এপ্রিলের গোড়ার দিকে এক গবেষণা নিবন্ধে বলেছে, একসময়ের শান্তি এবং স্থিতিশীলতার আমেরিকার (Pax America) ওই পরিণতির রূপান্তর হঠাৎ করে হবে না। হবে, তবে বিচ্ছিন্নভাবে, অসংলগ্ন ঘটনাবলির মাধ্যমে। আর এটা হবে আমেরিকান নেতৃত্বের আইনকানুন, রীতিনীতি না মানা এবং এসব ব্যবস্থা থেকে ক্রমাগত সরে যাওয়ার কারণে।

কেউই দ্বিমত পোষণ করছেন না যে, পরিস্থিতি আমেরিকা-উত্তর বিশ্বব্যবস্থার দিকেই এগিয়ে যাচ্ছে। ইরান যুদ্ধ কি তারই সূচনা এবং ইঙ্গিত?

লেখক : গবেষক, নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষাবিষয়ক বিশ্লেষক

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন